শিক্ষা ব্যবস্থার আদি কথা শিক্ষা ব্যবস্থার আদি কথা শিক্ষা ব্যবস্থার আদি কথা শিক্ষা ব্যবস্থার আদি কথা

আবদুল্লাহ আল- মামুন ০৮ ডিসেম্বর,২০১৯ ২৪৯৮ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৪.৯০ (১০ )

উপনিবেশিক যুগ  ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকার ভারতের অধিবাসীদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারকে তাদের দায়িত্ব বা আইনগত বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে মনে করত না। ১৮১৩ সালে কোম্পানির সনদ নবায়নকালে ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য বার্ষিক এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হলে এ ধারার মধ্যে একটা পরিবর্তন সূচিত হয়। এর ফলে শিক্ষা সংক্রান্ত অনুদান বিতরণের জন্য একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৮২৩ সালে কলকাতায় একটি ‘জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন’ গঠিত হয়। এ কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ পাশ্চাত্য শিক্ষার পরিবর্তে প্রাচ্যশিক্ষার পক্ষে মতামত প্রদান করে এবং সংস্কৃত ও আরবি শিক্ষার জন্য এর তহবিল ব্যয় করে। ইংরেজি গ্রন্থসমূহ প্রাচ্য ভাষায় অনুবাদ করার জন্য এ তহবিলের একটি অংশ ব্যয় হয় এবং ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থ রচনা করার জন্য উৎসাহ প্রদান করার সিদ্ধান্ত হয়।

এসময় খ্রিস্টান মিশনারিদের কাছ থেকে শিক্ষা এক নতুন অনুপ্রেরণা লাভ করে। প্রাথমিক মিশনারিদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদেরকে শীঘ্রই দৃঢ় প্রত্যয়ী করে তোলে যে, ধর্মান্তরিতকরণের গুরুত্বপূর্ণ পন্থা হিসেবে অবশ্যই স্কুল চালু করতে হবে। ড্যানিশ মিশনারিগণ (১৭০৬-৯২) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সদয় তত্ত্বাবধান ও সহানুভূতিপূর্ণ সহায়তা লাভ করেছিলেন। বাংলায় শ্রীরামপুরের মিশনারিদের প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল এবং তারা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতেন, যদি শ্রীরামপুর ও চুঁচুড়ার ওলন্দাজগণ তাদেরকে রক্ষা না করতেন। এদের কার্যকলাপ প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে পাঠদান, একটি বিস্তারিত পাঠক্রম এবং সুস্পষ্ট শ্রেণি প্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে। দেশীয় বিভিন্ন ভাষায় বই-পুস্তক ছাপিয়ে মিশনারিগণ ভারতীয় ভাষাসমূহের উন্নয়নে প্রেরণা যোগায়। দেশীয় ভাষাসমূহ চর্চার সাথে সাথে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিষয়সমূহের শিক্ষাদান চলতে থাকে। এভাবেই ভারতে ইংরেজি শিক্ষার পথ সুগম হয়।

মিশনারিগণ ছাড়াও রাজা রামমোহন রায়ের মতো কিছু জ্ঞানদীপ্ত ভারতীয় ছিলেন যাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভারতীয়দেরকে ইংরেজি শিক্ষা দিতেই হবে। গভর্নর জেনারেলকে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক স্মারকলিপিতে তিনি জোরালো সুপারিশ করেন যে, কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বাতিল করতে হবে এবং ব্রিটিশ সরকারের উচিত গণিত, প্রাকৃতিক দর্শন, রসায়ন, অঙ্গব্যবচ্ছেদ বিদ্যা এবং অন্যান্য উপকারী বিজ্ঞান বিষয়সমূহ নিয়ে অধিকতর উদার ও জ্ঞানদীপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।

জেনারেল কমিটির মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যপন্থীদের উত্তপ্ত বিতর্কই বিষয়টির প্রকৃতিতে একটি পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়। অধিকতর সংস্কার মনোভাবাপন্ন তরুণ সদস্যগণ প্রাচ্য-শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতার নীতি সম্পর্কে আপত্তি জানান এবং ইংরেজির মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের পক্ষে সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ১৮৩৫ সালের শিক্ষা সংক্রান্ত মেকলের বিবরণী দ্বারা ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে এ বিতর্ক সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাঁর সুপারিশমালা বেন্টিঙ্কের অনুমোদন লাভ করে।

ভারতে ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের পেছনে অন্যান্য আরও কয়েকটি কারণ বেশ সহায়ক ছিল। উদাহরণস্বরূপ The Freedom of Press Act, ১৮৩৫ ইংরেজি ভাষায় বইয়ের মুদ্রণ, প্রকাশনা ও প্রাপ্যতাকে উৎসাহিত করে এবং এভাবে পরোক্ষভাবে শিক্ষা প্রসারের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়। কয়েক বছর পরে সরকারি দলিল-পত্রের ভাষা হিসেবে ফারসির বিলুপ্তি এবং এর পরিবর্তে ইংরেজি ও ভারতীয় ভাষার প্রবর্তনও উক্ত প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে। চূড়ান্তভাবে, সকল সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে ইংরেজি জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে ১৮৪৪ সালের ১০ অক্টোবর  লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর সিদ্ধান্ত ঘোষণা ভারতে ইংরেজি শিক্ষার চাহিদাকে জোরদার করে তোলে।

১৮৫৪ সালের চার্লস উড-এর ‘education despatch’ প্রত্যেক প্রদেশে শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনার জন্য আলাদা ডিপার্টমেন্ট সৃষ্টি, ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও ‘Grants-in-Aid’ প্রথা প্রবর্তনের প্রস্তাব দেয় এবং এ প্রতিবেদন সরকারের ভবিষ্যৎ শিক্ষা নীতির মূল উপাদান উপস্থাপন করে। নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের শিক্ষা দানের ভূমিকা পালন করা হতে দূরে ছিল। এ সময়ে তাদের কার্যক্রম পরীক্ষা পরিচালনা, অধিভুক্তির জন্য অনুমোদন এবং ডিগ্রি ও সনদপত্র প্রদান করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রতিষ্ঠা কলেজ শিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণে তেমন সুফল বয়ে না আনলেও নতুন শিক্ষায় শিক্ষিতগণ বিশেষ পান্ডিত্য প্রদর্শন করেন।

১৮৮২ সালের ভারতীয় শিক্ষা কমিশন ভারতের শিক্ষা সম্পর্কে প্রতিবেদন পেশকালে বিদ্রুপাত্মকভাবে অভিমত প্রকাশ করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি উচ্চাশার গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্যে পরিণত এবং সরকারি চাকুরিতে সম্মানজনক অবস্থান ও শিক্ষিত পেশার একটি পাসপোর্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। প্রবেশিকা পরীক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলির উপর প্রভূত নিয়ন্ত্রণক্ষমতা প্রয়োগ করত। এখন স্বল্প অভিজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ শিক্ষার মাধ্যম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাসমূহ সম্পর্কে বক্তব্য প্রদান করলে এর ফলাফল যথার্থভাবেই হবে দুর্ভাগ্যজনক। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলি, তাদের দিক থেকে মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে যথেষ্ট আগ্রহী হলেও সে প্রতিষ্ঠানগুলি জীবনের প্রয়োজনানুযায়ী তাদের ছাত্রদেরকে তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। ফলে নতুন ব্যবস্থা মাথাভারী হয়ে ওঠে। জনসাধারণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা এবং এর সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যবস্থাগ্রহণ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত- এ মর্মে কমিশন সুপারিশ করে। কমিশন কেতাবি মর্যাদার জন্য উগ্র প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে সতর্ক এবং ভীষণভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ছাত্রদের একাংশকে অধিকতর বাস্তবধর্মী বিষয়ের দিকে মনোযোগী করার প্রস্তাব করে। কমিশন বাণিজ্য, কৃষি ও প্রায়োগিক বিদ্যা সম্বলিত বিকল্প পাঠ্যক্রম বিবেচনার জন্য পেশ করে। কিন্তু তা খুবই অল্প সংখ্যক ছাত্রদের আকর্ষণ করে। যদিও প্রায়োগিক শিক্ষা সাধারণ জনগণের জনপ্রিয়তা লাভ করে, তবু সরকার এ বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকে।

ঊনিশ শতকের শেষ দশকসমূহে প্রাথমিক শিক্ষা অবহেলা ও অযত্নের শিকার হয় এবং মাধ্যমিক শিক্ষা যথার্থ তত্ত্বাবধানের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেসরকারি উদ্যোগের অবাধ স্বাধীনতায় অপরিকল্পিতভাবে বহু উচ্চবিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় গড়ে ওঠে। এগুলির মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষার কেন্দ্র না হয়ে শিক্ষাদান প্রতিষ্ঠানে (Coaching Institutions) পরিণত হয়েছে। সরকার অবাধ নীতি (Laissez-faire) গ্রহণ করায় এসকল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল অতি সামান্য।

ঊনিশ শতকের শেষার্ধে জাতীয়তাবাদের প্রবল জোয়ারের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, কতিপয় মুসলিম সংস্থা এবং অন্যান্য উপদলসমূহ ব্রিটিশদের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। তারা এর পরিবর্তে শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ভারতীয় ভাষাসমূহ ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক আন্তরিক প্রচেষ্টার দাবি জানায়। ১৮৯৯ সালে ভাইসরয়ের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য লর্ড কার্জন যখন ভারতে আসেন, তখন তিনি অনতিবিলম্বে জনগণের অনুভূতি উপলব্ধি করেন এবং দেশে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ পরীক্ষায় দেখা যায় যে, প্রতি পাঁচটি গ্রামের চারটিতেই কোন স্কুল ছিল না। প্রতি চারজন বালকের মধ্যে তিনজনই কোনরূপ শিক্ষা ছাড়া বেড়ে ওঠে এবং প্রতি চল্লিশজন বালিকার মধ্যে কেবল একজন কোন প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটেছে উল্লম্বভাবে, সমান্তরাল ভাবে নয়। সুতরাং কার্জন দুর্বল দিকগুলি সুদৃঢ় করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং জনকল্যাণমূলক বিষয়গুলির প্রতি প্রদেশসমূহের উদাসীন দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেন। তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও সংরক্ষণের পক্ষে মত প্রকাশ করেন, এগুলি বেসরকারি উদ্যোগের আদর্শ হিসেবে কাজ করবে। তিনি পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণের সতর্ক নীতির মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলির উপর কঠোরতর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এরূপ নীতি অবশ্যম্ভাবীরূপে শিক্ষিত ভারতীয়দের মনকে উত্তেজিত করে তোলে, যারা মনে করেন যে সরকার সম্পূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে তার নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে তুমল বিতর্ক হয়। দেশে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্জন ১৯০২ সালে ‘Indian Universities Commission’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ কমিশন সুপারিশ করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের আকার ছোট করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কেবল পরীক্ষাগ্রহণকারী সংস্থা হিসেবে নয়, শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কাজ করবে। উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অধিভুক্ত কলেজসমূহে মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য চাপ প্রদান করবে। শিক্ষা পাঠক্রম উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় সাহায্য প্রদান, দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজসমূহের বিলোপ সাধন এবং অধিভুক্ত কলেজসমূহে ন্যূনতম হারে ফি নির্ধারণ প্রভৃতি সম্পন্ন করার জন্য কমিশন সুপারিশ করে। তীব্র সমালোচনার কারণে শেষের দুটি সুপারিশ বাতিল করা হয় এবং অন্যান্যগুলির আইন পরিষদ ও সংবাদপত্রের বিরোধিতার মুখেও বাস্তবায়িত করা হয়।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর বাংলায় এক প্রচন্ড বিক্ষোভ দেখা দেয়। স্বভাবতই এই সময় শিক্ষা ক্ষেত্রেও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। কার্জনের শিক্ষা সংস্কার এমন এক সময়ে শুরু হয় যখন একে অবশ্যম্ভাবীরূপে শিক্ষার আমলাতান্ত্রিকীকরণের সাথে সমার্থক বিবেচনা করা হয়। পাঁচ বছরের অদম্য প্রচেষ্টার পরও কার্জন জনগণকে উজ্জীবিত করতে ব্যর্থ হন। অপর দিকে, বন্ধন দৃঢ়করণের ফলে কার্জনের নীতি এবং পদক্ষেপ বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের উত্থানের ক্ষেত্র প্রস্ত্তত করে। এ নতুন বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যাসমূহের প্রকৃতি পরীক্ষা করার এবং সম্ভব্য সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ, এ নতুন বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ শিক্ষা বিভাগের দ্রুত ভারতীয়করণ, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ভারতীয় ভাষাসমূহ গ্রহণ, সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস শিক্ষাদান এবং ছাত্রদের মধ্যে স্বদেশপ্রেমের চেতনা জাগ্রত করার দাবি করে। কার্জনের প্রশাসনিক নীতিসমূহ জাতীয় শিক্ষার জন্য প্রথম সংগঠিত আন্দোলন সৃষ্টি করে। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা পরিষদ কলকাতায় একটি জাতীয় কলেজ এবং একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাংলায় একান্নটি জাতীয় স্কুলের ভিত্তি স্থাপন করে। কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশন (১৯০৬)-এর লক্ষ্য হিসেবে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে এ আন্দোলন ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করে। স্বদেশী আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়লে অধিকাংশ জাতীয় বিদ্যালয়গুলি পরিণামে বন্ধ হয়ে যায়। এ আন্দেলনের প্রভাব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলায় বোলপুরের কাছে  শান্তিনিকেতনে ১৯০১ সালে তাঁর বিখ্যাত বিদ্যালয় শুরু করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার জন্য জাতীয়তাবাদীদের দাবি সর্ব-ভারতীয় মুসলিম লীগের এলাহবাদ এবং নাগপুর অধিবেশনে উচ্চারিত হয়।

কার্জন-এর উত্তরাধিকারিগণ মূল উদ্দেশ্যকে নির্বিঘ্ন রেখে শিক্ষানীতি কিছুটা সংশোধন করেন। কার্জনের সংস্কারের প্রতি বিরূপ জনমত সত্ত্বেও তাঁর শাসনামলে শিক্ষার উন্নতি উল্লেখযোগ্যভাবে সাধিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠিত হয়েছিল এবং সেগুলির পরীক্ষা গ্রহণ ও ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতা অব্যাহত রেখে সেগুলিকে শিক্ষা দানকারী সংস্থার রূপ দান করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নিয়োজিত পরিদর্শকগণ নিয়মিতভাবে কলেজগুলি পরিদর্শন করতেন। সরকারও সতর্ক ভূমিকা গ্রহণ করে এবং বেসরকারি বিদ্যালয়গুলিকে স্বীকৃতি প্রদানের উন্নততর ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। বিশৃঙ্খল প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থারও উন্নতি ঘটে। মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে উচ্চ শিক্ষার জন্য ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ হয়।

১৯১৭ সালের ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি কমিশন স্যার মাইকেল স্যাডলারের নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে এক তদন্ত পরিচালনা করে। এর মৌলিক উদ্দেশ্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে কেন্দ্রীভূত থাকলেও এর প্রাপ্ত তথ্যাদি ও প্রস্তাবসমূহের গুরুত্ব ছিল সর্ব ভারতীয়। মধ্যবর্তী কলেজসমূহ প্রতিষ্ঠাসহ কমিশন একটি মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড গঠনের সুপারিশ করে। এ কলেজগুলি দুবছর মেয়াদী একটি পাঠক্রম অনুসরণ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং উচ্চ-মাধ্যমিকোত্তর পর্যায় হবে তিন বছর মেয়াদী একটি স্নাতক পাঠক্রম। শিক্ষাদান প্রতিষ্ঠান এবং একক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে স্নাতকোত্তর ও অনার্স পাঠক্রমগুলি অগ্রাধিকার লাভ করবে। বিজ্ঞান চর্চা, টিউটোরিয়াল ও গবেষণা কাজের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। নারী শিক্ষা সম্পর্কে কমিশন সুপারিশ করে যে, হিন্দু এবং মুসলমান বালিকা, যাদের পিতা-মাতা তাদের ১৫ অথবা ১৬ বছর পর্যন্ত শিক্ষা দান করতে আগ্রহী, তাদের জন্য পর্দাস্কুল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। কমিশন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় নারী শিক্ষার জন্য একটি বিশেষ বোর্ড গঠনের প্রস্তাব করে, যা মহিলা কলেজসমূহে শিক্ষাদানের জন্য সহযোগিতামূলক ব্যবস্থার আয়োজন করবে। এ পর্ষদ বিশেষ করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা পাঠক্রম প্রস্ত্ততির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ঢাকা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বিভাগ সৃষ্টি করতে হবে এবং উচ্চ মাধ্যমিক, বি.এ এবং এম.এ পরীক্ষায় শিক্ষাকে আলাদা বিষয় হিসেবে প্রবর্তন করতে হবে।

ভারত সরকার এ প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলি সংক্ষিপ্ত আকারে ১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসে একটি প্রস্তাব আকারে প্রকাশ করে। তখন থেকে উচ্চ-শিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পর্কে যে, কোন আইনে কম-বেশি এ প্রতিবেদনের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করত।

কার্জনের নীতিসমূহ প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বৃহত্তম অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করায় ১৯০৫ এবং ১৯১২ সালের মধ্যে এর দ্রুত সম্প্রসারণ সাধিত হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর প্রস্থানের পর সরকার শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের পক্ষে তার অভিমত ব্যক্ত করে। ফলে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নীতি বাতিল হয়ে যায়। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী জনমত অবশ্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষেই ছিল। ১৯১০ এবং ১৯১৩-এর মধ্যে গোখলে সরকারকে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষানীতি গ্রহণ করার জন্য সাহসিকতার সাথে জোর প্রচেষ্টা চালান। বোম্বাই আইন পরিষদ পৌর এলাকায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য বিটলভাই জে. প্যাটেল-এর প্রস্তাবিত বিল গ্রহণ করে, যা পরিণামে ১৯১৮ সালে বোম্বাই প্রাথমিক শিক্ষা আইনে পরিণত হয় এবং তা পরবর্তীসময়ে প্রণীত আইনের আদর্শ হিসেবে ১৯২১ সাল পর্যন্ত কাজ করেছিল।

১৯১৯ সালের আইনে শিক্ষা হস্তান্তরিত বিষয়ে পরিণত হয় এবং প্রায় সম্পূর্ণভাবে এর দায়িত্ব প্রদেশগুলির উপর অর্পিত হয়। প্রত্যেক প্রদেশে, শিক্ষানীতি ও প্রশাসনের দায়িত্ব প্রাদেশিক আইন পরিষদ এবং চূড়ান্তভাবে জনগণের নিকট দায়ী শিক্ষামন্ত্রীর ওপর অর্পিত হয়। ইউরোপীয় রীতির শিক্ষা সংরক্ষিত বিষয় হিসেবে রাখা হলেও এটি ভারতীয় শিক্ষামন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে এ অনিয়ম চূড়ান্তভাবে সংশোধিত হয়। এর দ্বারা ‘হস্তান্তরিত’ এবং ‘সংরক্ষিত’ বিষয়সমূহের পার্থক্য চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত করা হয় এবং শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রদেশগুলিকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়।

১৯১৯ সালের আইনের দ্বারা সূচিত শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনসমূহ ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় এবং এ আন্দোলন বিলাতি প্রতিষ্ঠান ও দ্রব্যসমূহ বর্জন করার নির্দেশ দেয়। শিক্ষা বিষয়ক পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী জাতীয় বিদ্যালয়সমূহ খোলা এবং নির্বাচিত কেন্দ্রসমূহে বিদ্যাপীঠসমূহ (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত এ জাতীয়তাবাদী জোয়ার বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। প্রচন্ড সরকারি বিরোধিতার মুখে এবং উপযুক্ত যন্ত্রপাতি, দালানকোঠা, অর্থ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অভাবে এ আন্দোলন তার উদ্দ্যম হারিয়ে ফেলে।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রীদের অবস্থান আরো জোরদার করে। প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, বয়স্ক শিক্ষার প্রবর্তন, পেশাভিত্তিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ এবং নারী শিক্ষা ও অপরাপর অ-সুবিধাভোগী শ্রেণির শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ - প্রভৃতি প্রাদেশিক সরকারসমূহের উন্নয়ন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাদেশিক সরকারসমূহ কর্তৃক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন প্রণয়ন ছিল ১৯২১ এবং ১৯৪৭-এর মধ্যবর্তী সময়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক বৈশিষ্ট্য। এ আইনসমূহ স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে তাদের নিজ নিজ এক্তিয়ারভুক্ত এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা প্রদান করে।

এক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল গান্ধীর মৌলিক শিক্ষা পরিকল্পনা প্রবর্তন। গান্ধীর কর্মসূচি পরিকল্পনা করা হয়েছিল ছাত্রদেরকে কতিপয় মৌলিক পেশায় প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য বিষয় বেছে নেওয়ার অধিকার প্রদান, যা পরে তাদের অর্থ উপার্জনের উৎস হতে পারে। এটি ছিল জীবনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে শিক্ষার যোগসূত্র স্থাপনের একটি সচেতন পদক্ষেপ।

মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটে। ১৯৪৬-৪৭ সালে তালিকাভুক্ত ২১,৯৯,০০০ ছাত্রসহ উচ্চবিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৫২৯৮; অথচ ১৯১৬-১৭ সালে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৯৭,২০০ জন এবং স্কুলের সংখ্যা ছিল ১৫০৭টি। জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাধ্যমিক শিক্ষার দাবি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে গ্রাম ও উপ-শহরে স্কুলসমূহ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এসব স্কুলে স্বল্পোন্নত সম্প্রদায়গুলি অংশগ্রহণ করতে পারত। এসময় নারী শিক্ষার প্রতিও যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়। ১৯২১-২২ এবং ১৯৪৬-৪৭ সময়কালের মধ্যে নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।

বেসরকারি ভোকেশনাল বিদ্যালয়গুলিকে বিপুল আর্থিক অনুদান দিয়ে প্রাদেশিক সরকারসমূহ কারিগরি, বাণিজ্যিক ও কৃষি স্কুলগুলির উন্নতি সাধন করলে পেশাভিত্তিক শিক্ষা যথার্থ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। তহবিল ঘাটতি এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব শিক্ষার উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ অন্তরায় ছিল। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলি তখনও কলেজে কলা এবং বিজ্ঞান পাঠক্রমে ছাত্রদেরকে ভর্তির জন্য প্রস্ত্তত করতেই ব্যস্ত ছিল।

এ সময়ে (১৯১৬-১৭ হতে ১৯৪৬-৪৭) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয় এবং সমগ্র একক ও অধিভুক্ত ধরনের ১৪টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শিক্ষা সম্প্রসারণ কর্মসূচির অংশবিশেষ। নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরানো বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রশাসনিক অঙ্গের গণতন্ত্রায়ণ ঘটে। নতুন নতুন অনুষদ, পাঠ্যক্রম ও গবেষণা প্রকল্পগুলি চালু হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়। এর ফলে মহাবিদ্যালয় এবং তালিকাভুক্ত ছাত্রদের সংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে। সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ছাত্রদের শারীরিক শিক্ষা এবং চিত্তবিনোদনকারী কর্মকান্ডের ওপর বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়। আন্তবিশ্ববিদ্যালয় পর্ষদ গঠন এবং আন্তবিশ্ববিদ্যালয় কার্যকলাপের উন্নয়নের জন্য শিক্ষাঙ্গনের জীবনে নতুন গতি সংযোজিত হয়।

ভারত এবং পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর (১৯৪৭) উপনিবেশিক শাসনের ক্ষতিকর দিকগুলি দূরীভূত করার জন্য একটি পরিকল্পিত ও ব্যাপক শিক্ষা বিষয়ক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নতুন পরিকল্পনাকারীদের ওপর অর্পিত হয়।

১৯৪৭ পরবর্তী পর্যায়  ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭ সালে। এই সালটি এক জলবিভাজিকা, যেমন রাষ্ট্রনৈতিকভাবে তেমনি শিক্ষার ক্ষেত্রেও। এরপর বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষা কার্যক্রম যে পথ ধরে অগ্রসর হয়, তা ভারতীয় ধারা থেকে স্বতন্ত্র। এ বিষয়ে দুদেশের যে সম-ঐতিহ্য, তার প্রভাব মুছে যায়নি, যেহেতু ব্রিটিশ শাসনামলে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলির অস্তিত্ব অব্যাহত থাকে। এর পর যে প্রতিষ্ঠানগুলির পত্তন হয়, সেক্ষেত্রেও পুরানো আদল, অল্পবিস্তর পরিবর্তনসহ, অনুসৃত হয়। যেমন জীবনে তদ্রুপ শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ ছেদের অবকাশ নেই।

ব্রিটিশ শাসন রেখে গিয়েছিল একটি উত্তরাধিকার। সংক্ষেপে, পশ্চিমি ধারায় ১৮৩৫-এর ভারতীয় শিক্ষা প্রসঙ্গে মেকলের প্রস্তাবানুযায়ী (Mecaulay’s Minute, 1835) শিক্ষার মাধ্যম স্থির হয়েছিল ইংরেজি, আর শিক্ষার বিষয়গুলি এসেছিল পশ্চিমের উদারনৈতিক শিক্ষার বিবিধ বিদ্যা থেকে। শিক্ষায় গৃহীত হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের সম-অধিকারের নীতি। সনাতন প্রাচ্যবিদ্যা ভিত্তিক শিক্ষার জন্য সরকার কোন দায়-দায়িত্ব বহন করবেনা, এদের দায়িত্ব এরাই পালন করবে। সরকারের সবিশেষ দৃষ্টি ছিল উচ্চশিক্ষার উপর; ভাবা হয়েছিল, সুসংগঠিত উচ্চশিক্ষার প্রভাব পড়বে নিম্নতর মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্তরসমূহে।

১৯৪৭ সালের পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণভাবে সেকালে নির্দেশিত ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন কমিটি-কমিশন দ্বারা সমর্থিত ব্রিটিশ নীতির প্রতিফলনই দেখা যায়। সার্জেন্ট কমিটির রিপোর্ট (১৯৪৪), যা পুরোপুরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় এক নতুন প্রাথমিক শিক্ষা-ব্যবস্থার সুপারিশ করেছিল, ওই সময়ে পাকিস্তানের অংশে পরিণত বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হলো না। একে যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়েছিল ভারত, পাকিস্তান দেয় নি। ইতোমধ্যে শিক্ষা পরিণত হয়েছে প্রাদেশিক বিষয়ে; করাচি, পরে ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার দূর থেকে নজরদারি করেছে। মাঝে-মধ্যে যে হস্তক্ষেপ করেছে তার মধ্যে সদিচ্ছার প্রকাশ যেমন ছিল, আবার অজ্ঞতা-প্রসূত ও কুফল প্রদায়ী হস্তক্ষেপও কোন কোন ক্ষেত্রে ঘটেছে।

স্বাধীনতা লাভের পর পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক সরকার স্কুল পর্যায়ে একটি নতুন পাঠ্যক্রম প্রস্ত্ততির লক্ষ্যে প্রবীণ রাজনীতিক ও ইসলামি শাস্ত্রে সুপন্ডিত মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ’র নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। কমিটির সুপারিশকৃত প্রাথমিক শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ মাতৃভাষা ভিত্তিক। ধর্মশিক্ষা থাকবে, তবে তা হবে মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ ছিল এক কথায় দুঃখজনক। দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা ১৯২০-এর আইনে যে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছিল, তা কেড়ে নেওয়া হলো। সরকারকে দেওয়া হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা এর মধ্যে উপাচার্যের নিয়োগও ছিল এক নতুন ও ব্যাপক ক্ষমতা, যা আরও দুঃখজনক। বহু-সংখ্যক কলেজ, কিছু সরকারি, অধিকাংশ বেসরকারি, সবই অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক নিয়ন্ত্রণে আনা হলো। এই বিশ্ববিদ্যালয় জন্মাবধি ছিল একটি অধিভুক্তিহীন শুদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে সকল দায়িত্ব প্রায় শতবর্ষকাল পালন করে এসেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সকল দায়িত্ব পালনের না ছিল অভিজ্ঞতা, না ছিল যোগ্যতা, বা কিছুমাত্র আগ্রহ। নতুন ব্যবস্থায়  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেল দারুণ আঘাত, আর কলেজসমূহের ভাগ্যে ছিল নামে মাত্র অ্যাকাডেমিক নজরদারি।

১৯৪৭ সালে শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি এ রকম উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থানুকূল্যে পরিচালিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিচের স্তরে, কলেজসমূহ ও প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্কুলসমূহ নিয়ে একটি বেসরকারি সেক্টর। এর ফলে শিক্ষার দুটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সরকারের সম্পৃক্ততার প্রয়োজন ও যৌক্তিকতা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকার যেভাবে এই চাহিদায় সাড়া দিয়েছে, তা কখনও যদিও বা সঠিক হয়েছে, অন্য সময়ে তা আবার হয়ও নি। কখনও লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে ও লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে কিন্তু সকল ব্যর্থতার পরও, এই প্রদেশে, পরবর্তীকালের বাংলাদেশ রাষ্ট্রে যা ঘটেছে, তা হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ধারাবাহিক ও রৈখিক  অগ্রগতি।

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোঃ মেরাজুল ইসলাম
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:২৮ অপরাহ্ণ

রেটিং সহ শুভ কামনা রইলো স্যার। আমার এ সপ্তাহের আপলোড করা কন্টেন্ট টি দেখে আপনার সুচিন্তিত মতামত পরামর্শ লাইক ও পূর্ণ রেটিং পয়েন্ট দিয়ে আমাকে বাতায়নে আরো অধিক সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।


মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৬:৩৭ অপরাহ্ণ

তথ্যবহুল লেখার জন্য ধন্যবাদ


মো:তাজুল ইসলাম ভূইয়া
১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৭:০০ অপরাহ্ণ

তথ্যবহুল লেখার জন্য ধন্যবাদ।আমার কন্টেন্ট দেখার আবেদন রইল।


হিমিয়া আফরিন
১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

Thanks. Gave the full rating because I learned about the history of education.


মোঃ আমিনুল ইসলাম
১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৯:৩৮ অপরাহ্ণ

ধন্যবাদ স্যার। পূর্ণ রেটিং দিয়েছি।


মোঃ রুহুল আমিন খান
০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:৫২ অপরাহ্ণ

ধন্যবাদ স্যার। পূর্ণ রেটিং সহ শুভ কামনা রইল।


মুহাম্মাদ আলীমুদ্দীন
০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৬:০৬ অপরাহ্ণ

লাইক এবং পূর্ণ রেটিংসহ শুভকামনা রইল।


লাইলী আক্তার
০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ

লাইক এবং পূর্ণ রেটিংসহ শুভকামনা রইল। আমার এই সপ্তাহের কনটেন্ট ৫ম শ্রেণির English বিষয়ের Happy Birthday, Unite: 15 কনটেন্টটি দেখবেন এবং মতামত ও রেটিং দিবেন।