মহররম মাস ও আশুরাঃ শিক্ষা ও করণীয়

ABUL KASHEM ২৯ আগস্ট,২০২০ ১৩৯ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৪.৮৯ ()

মহররম মাস ও আশুরাঃ শিক্ষা ও করনীয়

 

আরবি ১২ মাসের প্রথম মাস মহররম। এটি সম্মানিত মাস। ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মাস। সুখের মাস ও শোকের মাস। আনন্দ ও বেদনার মাস। হাসি ও কান্নার মাস। স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙের খেয়া। সুসংবাদ ও দুঃসংবাদের সারথি। হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী। মানুষ ও অমানুষের পরিচয়দানকারী।  পবিত্র কালামে পাকেও মহররম মাসকে অতি সম্মানিত মাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে মাস গণনায় মাস ১২টি, তন্মধ্যে চারটি মাস নিষিদ্ধ মাস, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান।’ এই আয়াতে ‘আরবায়াতুন হুরুম’ মানে অতি সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ চার মাস বোঝানো হয়েছে। এই মাসগুলো হলোজিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। এই চার মাসের মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের কারণে তখন যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়। শত্রু-মিত্র-নির্বিশেষে সবাই এই চার মাসের মর্যাদা রক্ষা করে যুদ্ধ-কলহ থেকে দূরে থাকত।

আশুরার দিন বা মহররমের ১০ তারিখ যেসব তাৎপর্যময় ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, সংক্ষেপে সেগুলো হলো : ১. এ দিনে আল্লাহ তাআলা পৃথিবী সৃষ্টি করেন। আর এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। ২. এ দিনে হজরত আদম (আ.) বেহেশত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসেন। মহররমের ১০ তারিখে আল্লাহ পাক আদম (আ.)-এর দোয়া কবুল করেন এবং এ দিনে তিনি স্ত্রী হাওয়া (আ.)-এর সঙ্গে আরাফার ময়দানে সাক্ষাৎ করেন। . হজরত নুহ (.)-এর জাতির লোকেরা আল্লাহর গজব মহাপ্লাবনে নিপতিত হওয়ার পর ১০ মহররম তিনি নৌকা থেকে ঈমানদারদের নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। . হজরত ইবরাহিম (.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ৪০ দিন পর ১০ মহররম সেখান থেকে মুক্তি লাভ করেন। . হজরত আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর কঠিন রোগ ভোগ করার পর মহররমের এ দিনে আল্লাহর রহমতে সুস্থতা লাভ করেন। ৬. হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.) তাঁর ১১ ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে কূপে পতিত হন এবং এক বণিক দলের সহায়তায় মিসরে গিয়ে হাজির হন। তারপর আল্লাহর বিশেষ কুদরতে তিনি মিসরের প্রধানমন্ত্রী হন। ৪০ বছর পর ১০ মহররম পিতার সঙ্গে মিলিত হন। ৭. হজরত ইউনুস (আ.) জাতির লোকদের প্রতি হতাশ হয়ে নদী অতিক্রম করে দেশান্তরিত হওয়ার সময় নদীর পানিতে পতিত হন এবং মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। মাছের পেট থেকে তিনি আল্লাহর রহমতে ৪০ দিন পর মুক্তি পান ১০ মহররম তারিখে। ৮. হজরত মুসা (আ.) ফেরাউনের অত্যাচারের কারণে তাঁর দলবলসহ অন্যত্র চলে যান। পথিমধ্যে নীল নদ পার হয়ে তিনি ফেরাউনের হাত থেকে আশুরার দিন মুক্তি পান। আর ফেরাউন তার দলবলসহ নীল নদের পানিতে ডুবে মারা যায়। ৯. হজরত ঈসা (আ.)-এর জাতির লোকেরা তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করলে মহররমের ১০ তারিখ আল্লাহ পাক তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে মুক্তি দান করেন। ১০. মহররম মাসের ১০ তারিখ কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার অবতারণা হয়। এদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইমাম হোসাইন কারবালা প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করেন।

ইসলামের ইতিহাসে ওপরে উল্লিখিত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলো মহররম মাসে সংঘটিত হওয়ার কারণে মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাস অতি সম্মানিত, বরকতময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। আশুরার এদিনে অনেক আম্বিয়ায়ে কেরাম আল্লাহ পাকের সাহায্য লাভ করেন এবং কঠিন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি লাভ করেন। এই সাহায্যের শোকরিয়া হিসেবে নবী-রাসুলরা ও তাঁদের উম্মতরা এদিনে রোজা পালন করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। তিনি জানতে পারলেন, এদিনে মুসা (আ.) তাওরাত কিতাব লাভ করেন। এদিনে তিনি ও তাঁর জাতির লোকেরা নীলনদ পার হয়ে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি লাভ করেন। তাই এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য মুসা (আ.)-এর অনুসারী ইহুদিরা এদিন রোজা রাখে। তখন মহানবী (সা.) ইহুদিদের লক্ষ্য করে বলেন, তোমাদের তুলনায় মুসা (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অধিকতর বেশি। সে হিসেবে এ ব্যাপারে আমরাই এর বেশি হকদার।’ তখন থেকে মহানবী (সা.) নিজেও আশুরার রোজা পালন করতেন এবং উম্মতকেও তা পালনের নির্দেশ দিলেন।’ (মিশকাত শরিফ)

তবে মহানবী (সা.) ১০ মহররমের সঙ্গে ৯ বা ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিস শরিফে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘আশুরার রোজা রাখতে হলে, তার আগে বা পরেও একটি রোজা রাখবে। কারণ এটি যেন ইহুদিদের অনুকরণে না হয়।’ (মুসলিম শরিফ)

অন্য আরো হাদিস থেকে উম্মতকে আশুরার রোজা পালনে মহানবী (সা.)-কে উৎসাহিত করতে দেখা যায়। একবার কয়েকজন সাহাবি মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা আশুরাকে বড় মনে করে। আমরা কেন এটিকে বড় মনে করব। উত্তরে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘আগামী বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকলে আমি মহররমের ৯ তারিখেও রোজা পালন করব।’

হাদিস শরিফে আরো আছে, ‘আশুরার দিন যে ব্যক্তি নিজের পরিবারবর্গকে পরিতৃপ্ত করে খেতে ও পরতে দেবে, আল্লাহ তাআলা তাকে সারা বছর পরিতৃপ্তিসহকারে খেতে ও পরতে দেবেন।’ (বায়হাকি)

বুখারি শরিফের বর্ণনা মতে, মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন রোজা পালন করা পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপর ফরজ ছিল। বিশেষত আশুরার দিন পূর্ববর্তী উম্মতরা রোজা পালন করতেন। কিন্তু রমজানুল মোবারকের রোজা ফরজ হওয়ার পর এর ফরজিয়াত রহিত হয়ে যায়। ফলে এর পর থেকে মহানবী (সা.) আশুরার রোজা পালনের জন্য সাহাবিদের আদেশ করতেন না, নিষেধও করতেন না। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আশুরার রোজা রাখতেন। মহানবী (সা.) আশুরার ফজিলত সম্পর্কে বলেন, ‘রমজানের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো মহররমের রোজা।’ (মিশকাত শরিফ)

আশুরার রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে অন্য এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আশাবাদী, আল্লাহ তাআলা এর অসিলায় অতীতের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (তিরমিজি শরিফ)

আল্লাহর রাসুল (সা.) আশুরার রোজাকে অনেক গুরুত্ব দিতেন। এ প্রসঙ্গে হজরত হাফসা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) চারটি কাজ কখনো ত্যাগ করেননি। এই চারটি কাজ হলো : ১. আশুরার রোজা, ২. জিলহজের প্রথম ৯ দিনের রোজা, ৩. আইয়ামে বিজের রোজাঅর্থাৎ প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজা এবং ৪. ফজর ওয়াক্তে ফরজের আগে দুই রাকাত সুন্নাত নামাজ।

ওপরের আলোচনা থেকে আমরা আশুরার দিনে সংঘটিত কতগুলো ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে আশুরার গুরুত্ব ও ফজিলত জানতে পারলাম। তবে এসব ঘটনার কোনো-কোনোটির বর্ণনা সূত্রের নির্ভরযোগ্যতা বিষয়ে কারো কারো দ্বিমত আছে। কিন্তু এ বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই যে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এই দিনটি মহিমান্বিত ও তাৎপর্যময়। দিনটিকে মুসলমানরা পবিত্র বরকতময় হিসেবে পালন করছেন। কিন্তু অতীতের সব ঘটনা ছাপিয়ে ৬১ হিজরি সনের ১০ মহররম এমন একটি দুঃখজনক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার অবতারণা হয়, যার কাছে সব ঘটনা ম্লান হয়ে যায়। ফলে এ দিনটি অনন্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের রূপ নেয়। ১০ মহররম মহানবী (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, খাতুনে জান্নাত হজরত ফাতেমা (রা)-এর কলিজার টুকরা হজরত হোসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদবাহিনীর হাতে অত্যন্ত নির্মম ও নৃশংসভাবে শাহাদাতবরণ করেন। ঐতিহাসিক ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত কারবালার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসের সব ঘটনাকে অতিক্রম করে একটি শোকাবহ স্মৃতি নিয়ে আজও মুসলমানদের বুক বিদীর্ণ করছে। স্মরণকালের ইতিহাসে কারবালার দুঃখজনক ঘটনার সঙ্গে আশুরার সম্পর্ক যেন একাকার হয়ে গেছে।

এ মাসে যেসব অনৈসলামিক কাজকর্ম ঘটতে দেখা যায় তার মধ্যে তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল ও র‌্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ করা যায়। এজন্য অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদী থেকেও বিরত থাকে। বলাবাহুল্য এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার।

মোটকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, তওবা-ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল। এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক চলাই মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোঃ গোলাম ওয়ারেছ
৩১ আগস্ট, ২০২০ ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ

সুন্দর উপস্থাপনা। লাইক ও রেটিং সাথে অসংখ্য শুভকামনা। সেই সাথে আমার আগস্ট ২০২০ ইং ২য় পাক্ষিক কন্টেন্ট "ন্যানো টেকনোলোজি" দেখে সুচিন্তিত মতামত, লাইক ও রেটিং প্রদানের অনুরোধ রইন। ধন্যবাদ।


নাহিদ আখতার পারভীন
৩০ আগস্ট, ২০২০ ১০:০২ অপরাহ্ণ

সুন্দর ও শ্রেণি উপযোগী কনটেন্ট আপলোড করার জন্য লাইক ও পূর্ণ রেটিং সহ শুভকামনা ও অভিনন্দন । আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে লাইক ও রেটিংসহ মূল্যবান মন্তব্য করবেন।


মোসাঃ রওশন আরা পারভীন
৩০ আগস্ট, ২০২০ ০৮:৫০ অপরাহ্ণ

পূর্ণ রেটিং ও লাইকসহ শুভকামনা ও অভিনন্দন।


শামীমা আক্তার
৩০ আগস্ট, ২০২০ ০৭:১৮ অপরাহ্ণ

Best wishes.


মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান (সুমন)
২৯ আগস্ট, ২০২০ ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

পুর্ণ রেটিং সহ শুভ কামনা রইল। আমার কনটেন্ট, ব্লগ ও ভিডিও কনটেন্ট দেখে আপনার অত্যন্ত মুল্যবান মতামত আশা করছি। সব সময় সুস্থ ও নিরাপদে থাকুন।


মীর্জা মোঃ মাহফুজুল ইসলাম
২৯ আগস্ট, ২০২০ ১০:২৬ অপরাহ্ণ

Full,ratings,best,/wof,luck,visit,my,page,আমার,ব্লগ,লিংক, https:/ww.teachers.gov.bd/blog-details/574922


শাওন সাহা
২৯ আগস্ট, ২০২০ ১০:০৯ অপরাহ্ণ

সুন্দর ও শ্রেণি উপযোগী কনটেন্ট আপলোড করার জন্য লাইক ও পূর্ণ রেটিং সহ শুভকামনা ও অভিনন্দন । আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে লাইক ও রেটিংসহ মূল্যবান মন্তব্য করবেন।