ম্যাগাজিন

চিচিঙ্গা একটি বর্ষজীবী, কোমল কাণ্ডবিশিষ্ট লতানো উদ্ভিদ, মোছাঃ মার্জুয়ারা বেগম, প্রধান শিক্ষক, দক্ষিণ বালাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডিমলা, নীলফামারী।

Most Marju Ara Begum ০২ ডিসেম্বর,২০২১ ১৩ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ রেটিং ( )


চিচিংগা নানাধরনের শারীরিক সমস্যা দূর করে থাকে। সুগার লেভেলকে কল্ট্রোল করে। এ ছাড়াও হজম এর কাজে এই সবজি পরম উপাদেয়। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করাতেও চিচিংগার জুড়ি মেলা ভার।

চিচিঙ্গা একটি বর্ষজীবী, কোমল কাণ্ডবিশিষ্ট লতানো উদ্ভিদ। কাণ্ড সরু, খাদালো প্রস্থচ্ছেদে পাঁচকোণী এবং লোমাবৃত। পাতার ফলক ১০-১২ সে.মি. দীর্ঘ এবং একই পরিমাণ চওড়া।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা গভীরভাবে ৩-৬টি গোলাকার ফুল একবাসি। ফল বেলনাকর।

ফলের উপরিভাগ মসৃণ, ত্বক সবুজ, নীলাভ সবুজ অথবা সবুজাভ সাদা কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই ফল একাধিক বর্ণে ডোরাদার অথবা বিচিত্রিত, ফলের ফলত্বকই ভক্ষণযোগ্য অংশ।

বীজের বর্ণ ধূসর কিনারা খাজকাটা এবং প্রায় উপবৃত্তাকার। চিচিংগা বাংলাদেশের সবার কাছে অন্যতম প্রিয় গ্রীষ্মকালীন সবজি। এর অনেক ওষুধি গুণ আছে।

উৎপাদন:
 মৌসুম চিচিংগা খরিপ মৌসুমের অন্যতম প্রধান সবজি। ফেব্র“য়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত যে কোনো সময় চিচিংগা লাগানো যেতে পারে। আগাম বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে কেউ কেউ শীতকালেও বীজ বুনে থাকেন।

তাপমাত্রা কম থাকায় আগাম ফসলের গাছ ধীরে ধীরে বাড়ে। পলিব্যাগে চারা উৎপাদন পলিব্যাগে চিচিংগার চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ৩-৪ ইঞ্চি (৮-১০সে.মি.) আকারের পলিব্যাগ ব্যবহার করা হয়।

সূর্যের তাপে শোধনকৃত জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ মাটি পলিব্যাগে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ইউথেন/ব্যাভিস্টিন/সিনকার/ ডায়থেন-এম ৪৫ দ্বারা মাটি শোধন করা যায়। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ছিদ্রযুক্ত পলিব্যাগ ব্যবহার করতে হবে।

পলিব্যাগে বীজ বপন প্রথমে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক গোবর মিশিয়ে মাটি তৈরি করে নিতে হবে। মাটিতে বীজ গজানোর জন্য জো নিশ্চিত করে (মাটিতে জো না থাকলে পানি দিয়ে জো করে নিতে হবে) তা পলিব্যাগে ভরতে হবে। অতঃপর প্রতি ব্যাগে একটি করে বীজ বুনতে হবে। বীজের আকারের দ্বিগুণ মাটির গভীরে বীজ পুঁতে দিতে হবে।

বীজ শোধন:
 বীজবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং সবল-সতেজ চারা উৎপাদনের জন্য বীজ শোধন জরুরি। কেজিপ্রতি ২ গ্রাম প্রোভক্স/ভিটাভ্যাক্স/ক্যাপটান/ব্যাভিস্টিন/সিনকার ব্যবহার করে বীজ শোধন করা যায়। বীজের পরিমাণ চিচিংগা চাষের জন্য শতাংশ জমিপ্রতি ১০ গ্রাম পরিমাণ বীজের প্রয়োজন হয়।

চারা রোপণ :
চারার বয়স ১৫-২০ দিন হলে তা তৈরি মাঠে লাগাতে হবে। চারাগুলো রোপণের আগের দিন বিকেলে পানি দিয়ে মাটি ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। পরের দিন বিকেলে চারা রোপণ করতে হবে।

মাদাগুলোর মাটি ভালোভাবে ওলট-পালট করে, কোদাল দিয়ে এক কোপ দিয়ে চারা লাগানোর জন্য জায়গা করে নিতে হবে। চারার পলিব্যাগের ভাজ বরাবর ব্লেড দিয়ে কেটে পলিব্যাগ সরিয়ে মাটির দলাসহ চারাটি নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়ে চারপাশে মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে।

চারা লাগানোর পর গর্তে পানি দিতে হবে। পলিব্যাগ সরানোর সময় এবং চারা রোপণের সময় সাবধান থাকতে হবে। যাতে মাটির দলা ভেঙে চারার শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

নতুবা শিকড়ের ক্ষতস্থান দিয়ে ঢলে পরা রোগের (ফিউজাারিয়াম উইল্ট) জীবাণু ঢুকবে এবং শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হলে গাছের বৃদ্ধি দেরিতে শুরু হবে।

বিশেষ পরিচর্যা শোষক শাখা অপসারণ :
 গাছের গোড়ার দিকে যে ছোট ছোট শাখা বা ফড়কি হয় তাকে শোষক শাখা বলা হয়। এগুলো গাছের ফলনে এবং যথাযথ শারীরিক বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটায়। কাজেই গাছের গোড়ার দিকে ৪০-৪৫ সে.মি. পর্যন্ত শাখাগুলো ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে অপসারণ করতে হবে।

ফসল তোলা :
 বীজ বোনার দু’মাসের ভেতর চিচিংগার ফল ধরা শুরু হয় এবং রোগাক্রান্ত না হলে গাছ ২ মাসের অধিক সময় ধরে ফল দিয়ে থাকে। পূর্ণ আকারপ্রাপ্ত হয়েছে অথচ বেশি পরিণত হয়নি এমন অবস্থায় ফল তোলা উচিত। পরিপক্ব ফলের শাস শক্ত ও কিছুটা তিতা।

জীবনকাল :
 মোট জীবনকাল প্রায় ৫ মাস। তবে জাত, মৌসুম ও আবহাওয়া ভেদে সময় কম-বেশি হতে পারে।

ফলন :
 উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে এর প্রতি ১৫ টন চিচিংগা পাওয়া যায়।

চিচিঙ্গা বাংলাদেশের সকলের নিকট প্রিয় অন্যতম প্রধান গ্রীষ্মকালীন সবজি। এর অনেক ঔষধী গুণ আছে।

চিচিঙ্গার ১০০ ভাগ ভক্ষণযোগ্য অংশে ৯৫ ভাগ পানি, ৩.২-৩.৭ গ্রাম শর্করা, ০.৪-০.৭ গ্রাম আমিষ, ৩৫-৪০ মিঃগ্রাঃ ক্যালসিয়াম, ০.৫-০.৭ মিঃগ্রাঃ লৌহ এবং ৫-৮ মিঃগ্রাঃ খাদ্যপ্রাণ সি আছে।

জলবায়ু ও মাটিy
উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় চিচিঙ্গা ভাল জন্মে। শীতের দু’ তিন মাস বাদ দিলে বাংলাদেশে বছরের যেকোন সময় চিচিঙ্গা জন্মানো যায়। সব রকম মাটিতে চিচিঙ্গার চাষ করা যায় তবে জৈব সার সমৃদ্ধ দো-আশঁ ও বেলে দো-আশঁ মাটিতে ভালো জন্মে।

জাত
বিএডিসি ‘ঝুম লং’ নামের একটি জাতের বীজ উৎপাদন করছে। এর ফল নীলাভ কালচে সবুজ ও দীর্ঘ। ফলধারী আরো একটি জাত ‘সাদা সাভারী’ নামে পরিচিত। তাছাড়া তিস্তা, তুরাগ, সুরমা, রূপসা, বিভিন্ন জাত এদেশে চাষ হয়।

জীবন কাল
মোট জীবনকাল প্রায় পাঁচ মাস। তবে জাত ও আবহাওয়া ভেদে সময় কমবেশী হতে পারে।

উৎপাদন মৌসুম
এদেশে চিচিঙ্গা প্রধানত খরিফ মৌসুমেই হয়ে থাকে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে যে কোন সময় চিচিঙ্গার বীজ বোনা যেতে পারে।

বীজের হার
চিচিঙ্গার জন্য হেক্টর প্রতি ৪-৫ কেজি (১৬-২০ গ্রাম/শতাংশ) বীজের প্রয়োজন হয়।

  সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি
সারের নাম /মোট পরিমাণ (হেক্টর প্রতি)
মোট পরিমাণ – জমি তৈরির সময় – চারা রোপণের —দিন পূর্বে —–দিন পর ——দিন পর——–দিন পর

(শতাংশ প্রতি)—–(শতাংশ প্রতি)—-৭-১০—চারা রোপণের ১০-১৫ —-চারা রোপনের ৩০-৩৫—-চারা রোপনের ৫০-৫৫——-চারা রোপনের ৭০-৭৫

পচা গোবর ২০ টন ৮০ কেজি ৪০ কেজি ৫ কেজি

টিএসপি ১৭৫ কেজি ৭০০ গ্রাম ৩৫০গ্রাম ৩০ গ্রাম

ইউরিয়া ১৭৫ কেজি ৭০০ গ্রাম -১৫ গ্রাম ১৫ গ্রাম ১৫ গ্রাম ১৫ গ্রাম

এমপি ১৫০ কেজি ৬০০গ্রাম ২০০ গ্রাম ২০ গ্রাম ১৫ গ্রাম

জিপসাম ১০০ কেজি ৪০০ গ্রাম ৪০০ গ্রাম

দস্তা সার ১২.৫ কেজি ৫০ গ্রাম ৫০ গ্রাম

বোরাক্স ১০ কেজি ৪০ গ্রাম ৪০ গ্রাম

ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইড ১২.৫কেজি ৫০ গ্রাম – ৫ গ্রাম

  অন্তর্র্বতীকালীন পরিচর্যা
# আগাছা সবসময় পরিষ্কার করে সাথে সাথে মাটির চটা ভেঙ্গে দিতে হবে।

# খরা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে। জুন-জুলাই মাস থেকে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর আর সেচের প্রয়োজন হয় না।

# বাউনী দেয়া চিচিঙ্গার প্রধান পরিচর্যা। চারা ২০-২৫ সেমি উঁচু হতেই ১.০-১.৫ মিটার উঁচু মাচা তৈরি করতে হবে । বাউনী দিলে ফলন বেশী ও ফলের গুনগত মানও ভালো হয়।

ফসল সংগ্রহ ও ফলন
চারা গজানোর ৬০-৭০ দিন পর চিচিঙ্গার গাছ ফল দিতে থাকে। স্ত্রীফুলের পরাগায়নের ১০-১৩ দিনের মধ্যে ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয়। ফল আহরণ একবার শুরু হলে তা দুই আড়াই মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে চিচিঙ্গার হেক্টর প্রতি ফলন ২০-২৫ টন (৮০-১০০ কেজি/শতাংশ)

বীজ উৎপাদনে করনীয়
কৃত্রিম পরাগায়নঃ বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আশেপাশে অন্য জাতের চিচিংগার গাছ থাকলে নির্বাচিত গাছের পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ফোটার আগে (সকাল ৯ঃ০০ ঘটিকা থেকে দুপুর ২ঃ০০ ঘটিকার মধ্যে) পেপার ব্যাগ দ্ধারা বেধেঁ নিতে হবে।

অতঃপর ফুল ফোটার পর কৃত্রিম পরাগায়ণ করতে হবে এবং পরাগায়ণ শেষে স্ত্রী ফুলটি আবার ব্যাগিং করে রাখতে হবে।

৩-৪ দিন পর ব্যাগ খুলে ফেলা যাবে। কৃত্রিম পরাগায়ণ অবশ্যই সকাল ৬ঃ০০ ঘটিকা থেকে ৯ঃ০০ ঘটিকার মধ্যেই সমাপ্ত করতে হবে।

চিচিঙ্গা (Snake gourd) চিচিঙ্গা, Trichosanthes anguina মসৃণ, হালকা সবুজ থেকে সাদা, কখনও ডোরাকাটা, সরু লম্বা ও বেলনাকার।

এটি বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন সবজি। দৈর্ঘ্য ৩০-১০০ সেমি পর্যন্ত। এ সবজি ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ।

ফেব্রুয়ারি-জুন মাসে মাঠে বীজবপন শুরু হয় এবং দুই মাসের মধ্যে সবজি খাওয়ার উপযোগী হয়। হেক্টর প্রতি ফলন ১০-১২ মে টন।

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোঃ রওশন জামিল
০৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

চমৎকার উপস্থাপনা। শুভ কামনা রইলো।।


মোঃ আবুল কালাম
০২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৯:০০ অপরাহ্ণ

লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা রইলো। আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।


Most Marju Ara Begum
০২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৭:৩৯ অপরাহ্ণ

পূর্ণ রেটিং সহ শুভকামনা রইলো।