বিশ্ব মহামারি করোনা ভাইরাসের সময় অনলাইন শিক্ষার রকমফের

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ১৫ জানুয়ারি,২০২১ ১৯ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()


  

দেশ হয়েছে ডিজিটাল। সেই ডিজিটালের ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। মানুষ এখন ঘরে বসেই অনলাইন সুবিধার মাধ্যমে করছে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেনসহ ব্যাংকিং কার্যক্রম। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।  এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাব্যবস্থায় করা হয়েছে আধুনিকায়ন। শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে করা হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। দেওয়া হয়েছে ল্যাপটপ, কম্পিউটার। আসল কথা হলো  কত ভাগ স্কুল-কলেজ এই সুবিধা পেল, সেই পরিসংখ্যান কি আমাদের জানা আছে?

বিশ্ব মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাস শুরু করে। শিক্ষার্থীরা জুম অ্যাপস, গুগল ক্লাসরুম, ফেসবুক রুম, ফেসবুক লাইভসহ বিভিন্ন সাইট ব্যবহার করে শিক্ষাকদের সঙ্গে অনলাইন ক্লাস করছে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ট্যাব, স্মার্টফোনের মাধ্যমে তারা ক্লাসে অংশগ্রহণ করছে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। এছাড়া সরকারিভাবে সংসদ চ্যানেলের মাধ্যমেও রেকর্ডিং করা ক্লাস করানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা গৃহবন্দি সময়টাকে যেন অবহেলায় হারিয়ে না ফেলে, তাই অনলাইন ক্লাস সিদ্ধান্ত একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

 অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা কতটুকু মানসম্মত এবং শতকরা কত জন শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাচ্ছে? দেশের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী শুধু এই সুবিধার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর বহুবিধ কারণ থাকতে পারে।

আমি আমার প্রতিষ্ঠানের আলোক কথাই বলতে পারি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রায় সবাই সুবিধাবঞ্চিত শিশু। এরা সবাই স্বল্প আয়ের পরিবারের সদস্য। তাদের কাছে কম্পিউটার তো দূরের কথা, স্মার্টফোন থাকাটা অনেকটা বিলাসিতার মতোই। যদিও ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন থাকলেও সমস্যা রয়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারের। সেক্ষেত্রে তাদের সম্ভব হচ্ছে না অনলাইনে ক্লাস করানো। এক্ষেত্রে আমরা এনালগ ফোনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি এসাইনমেন্ট  ওয়ার্কশিট, প্রশ্নপত্র। আবার ফোনের মাধ্যমে নিচ্ছি  পরীক্ষা। মোবাইল কোম্পানি যেভাবে কলরেট বাড়িয়ে দিয়েছে, তাতে এই পদ্ধতি খুবই ব্যয়বহুল।

অনলাইন ক্লাসে যে সমস্যাগুলো উঠে এসেছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র যদি তুলে ধরা যায়। তাতে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে বসেই শিক্ষকের অগোচরে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে স্লিট স্ক্রিন সুবিধা গ্রহণ করে ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছে। শিক্ষক কিছুই বুঝতে পারছেন না। এ যেন পাঠ্যবইয়ের ভেতরে উপন্যাসের বই লুকিয়ে পড়ার মতোই। ক্লাসের বাইরেও অন্য সময় শিক্ষার্থীরা পড়ে আছে অনলাইনে, ভার্চুয়াল জগতে। দিনের প্রায় দীর্ঘ একটা সময় অনলাইনে থাকার কারণে শিক্ষার্থীর চোখের সমস্যার পাশাপাশি দেখা দিচ্ছে অন্যান্য সমস্যা। ক্লাসে ছাত্রদের যে মনোযোগ বা আকর্ষণ পাওয়া যায়, অনলাইন ক্লাসে তা দেখা যায় না। এছাড়া ক্লাসে যেসব ছাত্র চুপচাপ বসে থাকে, অনলাইন ক্লাসে তারা আরো বেশি চুপ মেরে থাকে। ক্লাসে একটা বিষয়বস্তু বা ধারণা বোঝাতে যে সময় লাগছে, অনলাইনে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগছে, কখনো কখনো তা সাবলীল হচ্ছে না। কেননা, অনলাইন ক্লাস শব্দটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কাছে একটি অপরিচিত শব্দ। গুগল ক্লাসরুম, ফেসবুক রুম শব্দের সঙ্গে পরিচয় ছিল না অনেকেরই। আর প্রয়োজন পড়েওনি কোনো দিন। আর এতে করে প্রশিক্ষণের অভাবে শিক্ষকেরা সাবলীলভাবে ক্লাস করাতে পারছেন না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মুখোমুখি শিক্ষা প্রক্রিয়ার মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা এতে নেই।

এছাড়া আরো একটি প্রকট সমস্যা হচ্ছে গ্রামাঞ্চল, দুর্গম ও চর এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ ও নেটওয়ার্কের সমস্যা। ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ইন্টারনেটের যে সুবিধা পাওয়া যায়, গ্রামে সেই সুবিধা নেই। দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে কখনো কখনো শিক্ষার্থীরা ক্লাস বুঝতে পারছে না, আবার অনেকে ক্লাসেই অংশগ্রহণ করতেই পারছে না। নিম্ন আয়ের মানুষের করোনাকালীন আয় ও তাদের সামর্থ্যের অভাবও এই অনলাইন ক্লাসের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাড়ির একটিমাত্র আয়ের উত্স গাভি-গরু বিক্রি করে মেয়েকে অনলাইন ক্লাসের জন্য স্মার্টফোন কিনে দেওয়ার কথা আমরা শুনেছি। ঘরে বসে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, তাই গাছের ডালে বসে অনলাইনে ক্লাস করার সময় ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে হাত-পা ভাঙার কথা আমরা শুনেছি। এমন হাজারো সমস্যার দরুন অনলাইন ক্লাস সার্বজনীন সম্ভব হচ্ছে না।

তবু একটি কথা বলা যায়, ‘নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’। রাজা ম্যাকগির ভাষায় বলতে হয়, ‘এতদিনের টানা ছুটিতে ওরা যাতে পড়াশোনার খেই হারিয়ে না ফেলে, সে জন্যই অনলাইন ভরসা।’ এটা শুধু সময়ের প্রয়োজনে। টানা ছয় মাসের ছুটিতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে দূরে থাকলে ক্ষতির পাল্লাটা হয়তো আরো ভারী হতো।

সর্বোপরি, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, দীর্ঘমেয়াদি এই অনলাইন শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা যে সার্বজনীন ও ফলপ্রসূ হবে না, তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই আজ স্কুলে বা বিদ্যালয়ে ফেরার স্বপ্নে বিভোর। ঘণ্টার সেই টুংটাং শব্দ অথবা বেলের ক্রিং ক্রিং আওয়াজে তালাবদ্ধ ক্লাসরুম একদিন মুখরিত হবে শিক্ষার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে। বসন্তের মতো জেগে উঠবে স্কুলের খেলার মাঠ। দূষণমুক্ত পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারিবদ্ধ হয়ে আবারও একদিন গলায় গলা মিলিয়ে সবাই একসঙ্গে গেয়ে উঠবে— ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি ...।


মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
আব্দুল আলীম
১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

মুজিব শতবর্ষের শুভেচ্ছা। চমৎকার ও সময় উপযোগী কন্টেন্ট আপলোড করে প্রিয় শিক্ষক বাতায়নকে সমৃদ্ধ করার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন। লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ শুভ কামনা। চলতি মাসের দ্বিতীয় পাক্ষিকে আমার আপলোডকৃত ৬১তম কন্টেন্ট ও ৫৮তম ব্লগ দেখে আপনার মূল্যবান মতামত কামনা করছি। ভাল থাকুন, নিরাপদে থাকুন ও ঘরেই থাকুন। কন্টেন্ট লিংকঃ https://www.teachers.gov.bd/content/details/843083 ব্লগ লিংকঃ https://www.teachers.gov.bd/blog-details/589178


মোঃ তারেকুন্নবী ICT4E জেলা অ্যাম্বাসেডর
১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা রইলো। আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।


মোঃ নূরল আলম
১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

যুগপযোগি কন্টেন্ট তৈরি করায় লাইক ও পূর্ণ রেটিং সহ শুভ কামনা রইল। সেই সাথে আমার বাতায়ন পেইজ ঘুরে আসার জন্য আমন্ত্রন রইল।


মোঃ সাইফুর রহমান
১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ১১:১৮ অপরাহ্ণ

উপযোগী ও মান সম্মত কনটেন্ট আপলোড করে বাতায়নকে সমৃদ্ধি করার জন্য ধন্যবাদ। লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভ কামনা রইল। এ পাক্ষিকে আমার আপলোডকৃত ৪৫তম কনটেন্ট,ভিডিও কনটেন্ট, ব্লগ দেখে লাইক ও রেটিংসহ আপনার মতামত দেওয়ার জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি। স্যার আপনার সাফল্য কামনা করছি। ধন্যবাদ


লুৎফর রহমান
১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

আসসালামু অ্যালাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহ। লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভ কামনা রইলো। আমার এ পাক্ষিকে আপলোডকৃত ৫০ তম কনটেন্টটি দেখে লাইক,গঠন মূলক মতামত ও রেটিং প্রদানের জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। কনটেন্ট লিংকঃ https://www.teachers.gov.bd/content/details/836568


মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০৯:৫৫ অপরাহ্ণ

সম্মানিত প্যাডাগজি রেটার মহোদয়গণ, এডমিন প্যানেল মহোদয়গণ, সেরা কনটেন্ট নির্মাতাগণ, ICTE4 জেলা আম্ব্যাসেডর মহোদয়গণ, বাতায়ন প্রেমী শিক্ষকমন্ডলী আমার কনটেন্ট দেখে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত ও রেটিং বিনীতভাবে আশা করছি । আপনাদের সহযোগিতা ও উৎসাহ পেলে বাতায়ন কে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবো। আমিও স্বপ্ন দেখি, একদিন বাতায়নের সেরা কন্টেন্ট নির্মাতা হবো। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, বাতায়নের সাথে থাকুন এবং নিরাপদে থাকুন।