অতীত ও আজকের মুসলমান,,,অতীত ও আজকের মুসলমান

মোঃ শরিফুল ইসলাম ১৯ জানুয়ারি,২০২১ ২০ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()

অতীত ও আজকের মুসলমান


উর্দু ভাষার বিখ্যাত কবি মরহুম আল্লামা আকবর এলাহাবাদী তাঁর কাল্পনিক প্রেমের প্রকাশ ঘটাতে যেয়ে কবিতার ভাষায় শ্লেষমিশ্রিত বচনে ইসলামকে “এক কিসসায়ে মাযী” অর্থাৎ “অতীত রূপকথার একটি গল্প” বলেছেন। কাল্পনিক প্রেমকাহিনীর বিবরণ দিতে যেয়ে তিনি বলেন, এক ইউরোপীয় রমণীর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি তার শৈল্পিক সৌন্দর্যের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন। তিনি তার প্রেমে পড়ে কামনা করলেন, সে যেন তার হয়ে যায়। কিন্তু হায় আফসোস! ইউরোপীয়ান রমণী আকবর এলাহাবাদীকে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, “অসম্ভব কোনো মুসলমানকে আমার পক্ষে ভালোবাসা!” সে আরো বলে, “এখনো তাদের (মুসলমান) শিরায়-উপশিরায় জিহাদের নির্দেশের প্রভাব বিরাজ করছে।” মুসলমান এখনো জিহাদ করতে পূর্ণ প্রস্তুত। তাই যাদের মাঝে জিহাদী আবেগ বিরাজমান তাদের সাথে আমার প্রেম-ভালোবাসা কল্পনাও করা যায় না। রমণীর প্রত্যাখ্যান বাক্য শ্রবণে আকবর এলাহাবাদী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন এবং তাকে সম্মত করানোর জন্য অভ্যন্তরীণ একটি সত্য কথা বলে দিলেন, “আমাদের মাঝে অবশিষ্ট নেই পূর্বসূরি বীর খালিদের ঐতিহ্য; এখন শুধু অবশিষ্ট আছে হাদীসের কাব্যিক অভিব্যক্তি!”


এরপর তিনি আরো বলেন, “এখানে নেই সেই তাকবীর ধ্বনী। নেই সিপাহীর সেই ক্ষিপ্রতা। সকলে এমনিতেই বলে উঠে সুবহানাল্লাহ।” কবি এরপর আরো এক কদম অগ্রসর হয়ে বলেন, “আমার ইসলামকে তুমি কেবল অতীত রূপকথার একটি উপাখ্যান মনে করতে পার।”

এ কথা শুনে ইউরোপীয় রমণী বলে উঠল, “তাহলে তুমি আমাকে সম্মত আছি বলে ভাবতে পার।” অর্থাৎ তোমার সাথে প্রেমে সম্মত আছি বলে মনে করতে পার।


আল্লামা আকবর এলাহাবাদী এখানে বিদ্রƒপাত্মকভাবে ইসলামকে যে অতীত রূপকথার অধ্যায় বলেছেন, তা দ্বারা মুসলিম সম্প্রদায়ের পশ্চাদপদতা ও অধঃপতনের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন মাত্র। তার এ উপমা দেয়ার দ্বারা ‘দ্বীন ইসলাম অতীত যুগের লুপ্ত প্রায় একটি অচল ধর্ম’ বলা উদ্দেশ্য নয়। বাস্তব কথা হলো, আকবর এলাহাবাদীর যুগেও ইসলাম ধর্ম যেমন স্বগৌরবে বিরাজমান ছিল, তা আজও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইসলামী দর্শন, ইসলামী টেকনোলজি, ইসলামী জীবন নির্বাহের পদ্ধতি আকবর এলাহাবাদীর যুগ থেকেও দু‘শত বছর পূর্বেই “কিসসায়ে মাযী” অতীত রূপকথার কাহিনী বনে গিয়েছে। তাইতো মুসলিম রেনেসাঁর কবি আল্লামা ইকবাল বর্তমান মুসলমানদের পরিচয় দিতে যেয়ে বলেন, “নির্বাপিত প্রেমের আগুন অন্ধকার, উত্তাপহীন। মুসলমান নয়, যেন স্তূপিকৃত ছাইভস্ম।” এ কবিতায় মুসলমানদের স্তূপীকৃত ছাই-ভস্মের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তাদের যে এক গৌরবদীপ্ত ইতিহাস-ঐতিহ্য ছিল তা আজ লুপ্ত প্রায়। তারা স্বীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের উত্তরাধিকারকে খুয়ে ফেলেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে বুৎপত্তি লাভের অধীর আগ্রহ-আবেগ তাদের অন্তরে হাজার বছর পর্যন্ত প্রজ্ব¡লিত অগ্নির ন্যায় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস কালের বিবর্তনে তা নির্বাপিত হয়ে যায়। জাগতিক ভোগ-বিলাসের মোহে কুরআনের বিধানাবলীকে বিসর্জন দেয়। তাইতো আল্লামা ইকবাল এ চরিত্রের অধিকারী মুসলমানদের উদ্দেশে বলেছেন, “মুসলিম জাতি সে যুগে সম্মানিত, মহিমান্বিত হয়েছিল প্রকৃত মুসলিম হওয়ার কারণে। আর আজ তোমরা কুরআন ত্যাগ করে হয়েছো হতভাগ্য ভবঘুরে জাতি।”


মুসলিম জাতিকে “অতীত রূপকথার কাহিনী” প্রমাণ করা তেমন দুঃসাধ্য কোনো বিষয় নয়। মধ্যযুগের ইসলামী ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন এবং এর সাথে সাথে অধুনিক কালের সমাজব্যবস্থার সাথে বর্তমান মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করুন। এ দুয়ের মাঝে অনেক ব্যবধান-পার্থক্য অনুভব করতে পারবেন। তখন আপনিই বলে উঠবেন, সত্যিই তো ইসলাম “অতীত রূপকথার একটি অধ্যায়ে পর্যবসিত হয়েছে আজ।”


মধ্যযুগীয় ইসলামী দর্শন, উন্নত কৃষ্টি-কালচার, উৎকৃষ্ট সমাজব্যবস্থা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, উন্নত কলা-কৌশল অবলম্বন, ন্যায়বিচার, বীরত্ব প্রদর্শন, আত্মত্যাগের মহান আদর্শ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকৃর্ষ সাধনে মুসলমানদের যে ভূমিকা ছিল তা তো আজ আমাদের কাছে “অতীত রূপকথার কাহিনীই” মনে হয়।


আজ কেন আমাদের মধ্যে যাকারিয়া পাওয়া যায় না? আবু কামেল কেন জন্ম নেয় না? জাবির ইবনে হাইয়্যান আজ কোথায়? খাওয়ারেযেমীর কি কোনো সন্ধান আমাদের কেউ দিতে পারবে? বু-অলী সীনা কেন আমাদের মাঝে পরিলক্ষিত হয় না? আল বেরুনী, আল বাগদাদী, আল ফারাবী, আল গাজ্জালী, আল কিনদী আজ কোথায়? ইবনে রূশদ, ইবনে যহর, ইবনে খালদুন, আবনে হাইসাম আজ কেন আমাদের থেকে হারিয়ে গিয়েছে? ইসলামী বিশ্ব কেন আজ ঐ সকল মহামনীষীদের উত্তরসূরি থেকে বঞ্চিত? এ বঞ্চিত থাকার দায়-দায়িত্ব কি মুসলিম নেতৃবৃন্দের উপর বর্তায় না? ঐ সকল মনীষীবৃন্দের অনুপস্থিতি কি এ কথাই প্রমাণ করে না যে, ইসলাম হলো “অতীত রূপকথার একটি কাহিনী মাত্র।”


ইউরোপীয় এক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক পযধৎষবংষ এরষষপংঢ়রব ঐ সকল বৈজ্ঞানীকের তালিকা প্রণয়ন করেছেন, যারা মধ্যযুগে (সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত) বিজ্ঞানকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং পাশাপাশি বর্তমান বৈজ্ঞানিক বিপ্লবেরও ভিত্তি রেখেছেন। ঐ তালিকায় প্রায় একশত বিশজন বৈজ্ঞানিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে একশত পাঁচজনের সম্পর্ক ইসলামী জগতের সাথে ছিল। দশ-বারজন এমন ছিলেন, যাদের সম্পর্ক অমুসলিম ইউরোপের সাথে ছিল। কিন্তু তারপরও তাদের অধিকাংশ মুসলিম স্পেনের ইউনিভার্সিটিতে (কর্ডোভা, গ্রানাডা) বিজ্ঞানের উপর লেখাপড়া করেছিলেন। মোটকথা মধ্যযুগে প্রায় নব্বই শতাংশ বৈজ্ঞানিকদের সম্পর্ক মুসলিম জাহানের সাথে ছিল। বিজ্ঞানের আবিষ্কার এবং বিজ্ঞানভিত্তিক রচনাবলীর সাথেও তাদের সম্পৃক্ততা ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দী আগমনের সাথে এ চিত্র সম্পূর্ণরূপে পাল্টে যায়। মুসলিম জাহান থেকে বিজ্ঞান সমূলে বিদায় নেয়। ১৯৮১ সালের এক জরিপ অনুযায়ী ইউরোপের সবচাইতে ক্ষুদ্রতম একটি দেশ নরওয়েতে বৈজ্ঞানিক, ইঞ্জিনিয়ার এবং ডাক্তারদের সংখ্যা গোটা মুসলিম জাহানের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি ছিল। অথচ এ সংখ্যা জাপানের মোট সাইন্টিস্টদের অর্ধেকের চেয়েও কম ছিল। ১৯৮১ সালে পৃথিবীব্যাপী বিজ্ঞানের উপর যে সকল রচনাবলী বিভিন্ন প্রচারপত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, এর মধ্যে মুসলিম দেশগুলো থেকে প্রকাশিত রচনাবলীর সংখ্যা এক শতাংশ থেকেও কম ছিল। লক্ষ্য করুন! মধ্যযুগে যখন গোটা বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। সে সময় বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় মুসলমাদের অবদান ছিল প্রায় নব্বই শতাংশ। পক্ষান্তরে বিংশ শতাব্দীতে যখন গোটা পৃথিবীতে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ, তখন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের অবদান এক শতাংশ থেকেও কম।


মধ্যযুগে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, গবেষণার প্রাণকেন্দ্র ছিল বাগদাদ, সমরকন্দ, দামিশক, কায়রো, কর্ডোভা, গ্রানাড ও বুখারাসহ নানা স্থান। এ স্থানগুলো থেকে গোটা বিশ্ব উপকৃত হতো। কিন্তু আফসোস! বিংশ শতাব্দীতে এ উপকারী জ্ঞান মুসলিম জাহান থেকে একেবারই হারিয়ে যায়। বর্তমানে প্রত্যেক নতুন আবিষ্কারের মুকুট ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিকদের মাথায় শোভায় পাচ্ছে। বাষ্পের ইঞ্জিন থেকে নিয়ে অ্যারোপ্লেন তৈরি, প্রাণরক্ষাকারী ঔষধের আবিষ্কার (খরভব ঝধারহম উৎঁমং) কম্পিউটার আবিষ্কার, বিভিন্ন উপকরণ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি; মোটকথা মানুষের কল্যাণকর সকল বিষয়ে পশ্চিমাদেরই অবদান পরিলক্ষিত হয়। এতে মুসলমানদের কোনো ভূমিকা দেখা যায় না। তাইতো বলা হয়, “ইসলাম আজ অতীত রূপকথার কাহিনীতে পর্যবসিত হয়ে গেছে।”

মোঃ শরিফুল ইসলাম,  সহকারী শিক্ষক 

ICT4E District Ambassador, Naogaon 

sislam455@yahoo.com 

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
আব্দুল্লাহ আত তারিক
২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০৫:১৩ অপরাহ্ণ

শুভ অপরাহ্ন, আপনার বাতায়নের পথচলা সাফল্যমণ্ডিত হোক। আপনার শ্রমলব্ধ চমৎকার নির্মাণ দেখে অভিভূত হলাম। মৌলিকতা অনন্য বৈশিষ্ট্য আপনার । চেষ্টা অব্যাহত রাখুন, সফলতা আসবেই । আমার এই পাক্ষিক-এ নবম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ের কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ""কপোতাক্ষ নদ"" কবিতার উপর নির্মিত কনটেন্ট দেখে আপনার মতামতের প্রত্যাশায় রইলাম।


মোসাঃশারমিন আক্তার
২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০৪:৩৭ অপরাহ্ণ

লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা রইলো। আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।


মোছাঃ জেসমিন আক্তার
২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৩৮ অপরাহ্ণ

লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা রইলো। আমার এ পাক্ষিকের আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।


লুৎফর রহমান
২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ

আসসালামু অ্যালাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহ। লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভ কামনা রইলো। আমার এ পাক্ষিকে আপলোডকৃত ৫০ তম কনটেন্টটি দেখে লাইক,গঠন মূলক মতামত ও রেটিং প্রদানের জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। কনটেন্ট লিংকঃ https://www.teachers.gov.bd/content/details/836568 Blog link: https://www.teachers.gov.bd/blog-details/589408


মোঃ তারেকুন্নবী ICT4E জেলা অ্যাম্বাসেডর
২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০১:২৯ পূর্বাহ্ণ

লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা রইলো। আমার এ পাক্ষিকের আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।


মোঃ সাইফুর রহমান
২০ জানুয়ারি, ২০২১ ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

শ্রেণি উপযোগী ও মান সম্মত কনটেন্ট আপলোড করে বাতায়নকে সমৃদ্ধি করার জন্য ধন্যবাদ। লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভ কামনা রইল। এ পাক্ষিকে আমার আপলোডকৃত "ট্রাপিজিয়ামের ক্ষেত্রফল" শিরোনামে ৪৬তম কনটেন্ট ও ব্লগ দেখে লাইক ও রেটিংসহ আপনার মতামত দেওয়ার জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি। স্যার আপনার সাফল্য কামনা করছি। ধন্যবাদ।