বাংলাদেশের সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে ড. আহমদ শরীফ

মোহাম্মদ আবদুল কাদের ১৩ ফেব্রুয়ারি ,২০২১ ১০ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()

বাংলাদেশের সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে ড. আহমদ শরীফ (১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯২১-২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯) একজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব; যাকে উপেক্ষা করা যায়, তবে কোনো অবস্থাতেই তার বিশাল কীর্তি অস্বীকার করা যায় না। সম্ভবত তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সবার কাছে প্রিয় হওয়ার দুর্বলতাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

পেশাগত জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। পঞ্চাশ দশকের প্রথম থেকে নব্বই দশকের শেষ অবধি সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাসসহ প্রায় সব বিষয়ে অজস্র লিখেছেন।

বর্তমান নিবন্ধটি ড. আহমদ শরীফ প্রকাশিত (২০০৯) ডায়েরি ‘ভাব-বুদ্বুদ’ থেকে সংকলিত। বৃহৎ আকারের না হলেও গ্রন্থটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২০৪। উদ্ধৃত করার মতো অসংখ্য বাক্য ছিল; কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে বলে সংক্ষিপ্ত আকারে সংকলিত হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধটি চারটি ভাগে বিভক্ত। যেমন- ক. ভাবদর্শন, খ. অনুভূতি, গ. ব্যক্তিত্ব, ঘ. প্রত্যাশা।

ভাবদর্শন

এ পর্যায়ে আহমদ শরীফের চিন্তা-চেতনার জীবনে যে ভাব, অভিজ্ঞতার উদ্ভব ঘটেছিল তার প্রতিফলন ঘটেছে উদ্ধৃত করা বাক্যগুলোতে। এগুলো মন-মনন, সমাজ এবং সামাজিক সম্পর্ক ইত্যাদির ওপর রচিত হয়েছে : ‘প্রীতিহীন হৃদয় ও নিলক্ষ্য কর্ম-দু-ই বন্ধ্যা।’ ‘গুণ ও ঘ্রাণ গোপন রাখা যায় না।’ ‘সুখ কেউ কাউকে দিতে পারে না, সুখ পেতে জানতে হয়।’ ‘সুখ বাইরে নেই, সুখ চিত্তলোকে সৃষ্টি করতে হয়।’ ‘কল্পনা বিশ্বাস আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে ম্যাজিক আর ঐহিকতা হচ্ছে লজিক। তাই যুক্তিই জীবনাচারের নিয়ামক।’ ‘বিস্ময় কল্পনা ভয় ভক্তি ভরসাজাত, লৌকিক-অলৌকিক, অলীক ও শাস্ত্রিক সংস্কার বিশ্বাসকে এক শব্দে Prejudice বলে সংজ্ঞায়িত বা অভিহিত করলে এ Prejudice বর্জন করে ভাব-চিন্তা-কর্ম আচরণে ও আচারে-বিচারে জ্ঞান ও যুক্তি প্রয়োগই হচ্ছে আধুনিকতা।’

‘এ যুগ বিজ্ঞানের যুগ, এ যুগ প্রকৌশল প্রযুক্তি যন্ত্রের যুগ। কাজেই বিজ্ঞানের তত্ত্বে, তথ্যে ও সূত্রে আস্থা এবং বিজ্ঞানীর আবিষ্কার, উদ্ভাবন ও সৃষ্টিই জীবন-জীবিকার অবলম্বন।’ ‘মানুষ শিক্ষিত মানুষ অশিক্ষিত, মহৎ-ইতর-জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে সবাই নিজের জন্য স্বাধীনতা আবশ্যিক বলে জানে। কিন্তু অন্যের জন্যও যারা জরুরি বা ন্যায্য বলে মানে না, যারা নিজেদের জন্য রাষ্ট্রিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে, তারাও অন্যদের অধীনে রাখার জন্য প্রাণপণে প্রয়াসী।

এ একটি আধি বা মনুষ্যত্ববিরোধী বা মানবতাবিরোধী।’ ‘প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মানুষ হওয়ার জন্য মন ও মনন দুই-ই-দরকার।’ ‘আনুগত্য মুক্তবুদ্ধির ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের বাধা বা পরিপন্থি।’ ‘বিশ্বাসের দুর্গে যুক্তি প্রবেশ পথ পায় না। তেমনি যুক্তির জগতে বিশ্বাস কখনো গ্রাহ্য হয় না।’

অনুভূতি

এ পর্যায়ে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ড. আহমদ শরীফের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে, যাতে তার চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে : ‘২১ শে ফেব্রুয়ারি গৌরবের রোমন্থন, না সমকালীন সংকটে-সমস্যায় ২১ শের সংগ্রামের অনুসরণ বা কর্তব্য কি ২১ শে গৌরবের রোমন্থন, না সংগ্রামের অনুসরণ?’ ‘প্রেম জীবনে একটি নতুন অনুভব, একটি নতুন উপলব্ধি, একটি নতুন সুখ, একটি নতুন আনন্দরূপে জাগে।’

‘নাস্তিকের কারও কৃপার প্রত্যাশাও থাকে না, মৃত্যু উত্তর ভয়েরও আশঙ্কা থাকে না। সে থাকে ভয়-ভরসার ঊর্ধ্বে নিশ্চিন্ত।’ ‘মানুষে মানুষে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া, সে বেড়া শাস্ত্রের, স্থানের, ভাষার, মতের, পথের, বিত্তের, বিদ্যার, বিশ্বাসের, সংস্কারের, সাংস্কৃতিক ও আচারের পার্থক্য জাত ঘৃণা, অবজ্ঞা, স্বাতন্ত্র্য চেতনাপ্রসূত। তাই মানুষ মিলতে পারছে না কোথাও।’ ‘যৌবনে আর বার্ধক্যে হৃদয়ঘটিত সমস্যা দেখা দেয়। দুটোই অস্থির রাখে। তবে স্বাদ আলাদা এই যা। একটি বেদনামধুর অপরটি বেদনাবিধুর। আর বেদনামাত্র লঘুগুরু যন্ত্রণার নামান্তর মাত্র।’

ব্যক্তিত্ব

ড. আহমদ শরীফের জীবনকালে বঙ্গের যারা স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে সমাজ-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে আছেন, তাদের মধ্যে বিশেষ কয়েকজনের ওপর তার মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো : ‘আত্মমর্যাদাবোধই চরিত্র অটল-অটুট রক্ষার প্রধান খুঁটি। আত্মসত্তার মূল্য ও মর্যাদা চেতনাই রাখে মানুষকে সততার, সরলতার, সৌজন্যের, সহানুভূতির, কৃপার, করুণার, দয়া-দক্ষিণের, সত্য ভাষণের, সত্যকে আঁকড়ে থাকার আধার করে। নির্ভীক ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাবোধেরই প্রসূন মনুষ্যত্বের ফল। বিদ্যাসাগর শির উঁচু রাখতে পেরেছিলেন- এ মর্যাদাবোধের পুঁজির শক্তিতেই। তাই তিনি রায়বাহাদুর, রাজা, স্যার, সি-আই-ই হননি।’

‘রাজা রামমোহন রায় মগজে ছিলেন অসাধারণ এবং চরিত্রে ছিলেন সব দোষে দুষ্ট।’ ‘বিদ্যাসাগর চরিত্রে ছিলেন অতুল্য, মেধায়-মনীষায় ছিলেন সাধারণ, তবে নিরীশ্বর হওয়ার মতো যুক্তিবাদী ও সাহসী আর সংযমে, পরমতসহিষ্ণুতায় ও সৌজন্যে ছিলেন উঁচুমানের সংস্কৃতিমান।’ ‘মধুসূদন ছিলেন এক কথায় আরবি তাজি।’ ‘বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন দেশ-জাতি মানুষের কল্যাণ ভাবনায় চিরনিষ্ঠ। আর মেধা-মনীষায় উনিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ।’

‘স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন হিন্দুর দেবাদর্শনের গৌরবগর্বী, কালিসাধক, রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেও তার মধ্যে কালিভুক্তি কিংবা ধর্মানুরাগ প্রবল ছিল না। তিনি ছিলেন সমকাল সচেতন একজন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি বোদ্ধা, মনীষী ও মনস্বী মানবসেবী। রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠাতেই এ মানবপ্রেম সুপ্রকট।’ ‘রবীন্দ্রনাথের বিপুল রচনার প্রতিটি হরফ নিজের হাতে লেখা, প্রতিটি শব্দ তার চেতনার, চিন্তার ও বক্তব্যের প্রতীক ও প্রতিম। প্রতিটি শব্দে জড়িয়ে রয়েছে তার মন, মগজ, মনন, অনুভব ও উপলব্ধি আর শ্রম ও সময়, হয়তো আনন্দও। সে আনন্দ রচনার, সৃষ্টির, নির্মাণের ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে মনের, মগজের ও মর্মের উদ্বেগ-আবেগমুক্তির।’

‘নজরুল ইসলাম বড় কবি নন, প্রিয় ও প্রয়োজনের কবি। সুরস্রষ্টা হিসাবে তিনি অনন্য, বাণীস্রষ্টারূপে নিতান্ত সাধারণ। প্রয়োজন ফুরালে অর্থাৎ সমাজ পরিবর্তন হলে কবি হিসাবে প্রিয় থাকবেন না। সুরস্রষ্টা হিসাবে হয়তো শতেক বছর টিকতেও পারেন।’ ‘নীরদ চৌধুরী রক্ষণশীল দাম্ভিক; কিন্তু প্রচণ্ড আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব। জ্ঞান-গুণী-মনন-মনীষাসম্পন্নও তিনি।’ ‘রণেশ দাস গুপ্ত ছিলেন বিদ্যায়, আদর্শ নিষ্ঠায়, জ্ঞানচর্চায়, লেখায়, ভোগ বিমুখতায় অনন্য চরিত্রের লোক।’ ‘গোটা উনিশ শতকে বঙ্কিম চন্দ্র ছিলেন একজন অনন্য, অসামান্য, অসাধারণ ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব, রামমোহন রায়কে স্মরণে রেখেও এ কথা বলা চলে।’

প্রত্যাশা

প্রত্যাশার অন্ত নেই। সবাই প্রত্যাশা করে এবং সবারই প্রত্যাশা থাকে। তেমনি আমাদের জাতি, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ড. আহমদ শরীফের প্রত্যাশ সংকলন করা হলো : ‘আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা মানুষ। আমাদের শেষ পরিচয় আমরা মানুষ।’ ‘গুণীর প্রতি শ্রদ্ধা মনুষ্যত্বে¡র লক্ষণ, আর ক্ষমতাবানের প্রতি আনুগত্য আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মপ্রত্যয়হীনতার প্রমাণ। পেশাগতভাবে উন্নতি করা, মহৎ ব্যক্তি নয়।

স্বার্থবাজ সাধারণ শ্রেণি মাত্র। রাজনীতিতেও তাই দেখি বুদ্ধিমান-শক্তিমান সাহসী ব্যক্তিত্বও ধূর্ত হয়ে পদোন্নতির বা পদপ্রার্থীর দিকে ছোটে। গুণে-ত্যাগে-গণসেবায় মহৎ হয়ে শ্রদ্ধেয় নেতা হওয়ার প্রয়াসী হয় না। দূরদৃষ্টির অভাবের ফলে এরা আশু প্রাপ্তি লিপ্সু হয়।’ ‘ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনে ধর্মশাস্ত্র, ধর্মবিশ্বাস ধর্মীয় পালা-পার্বন অবশ্যই থাকবে এবং ভাব-চিন্তাকর্ম আচরণে ধর্মভাবের অভিব্যক্তি দেওয়ার স্বাধীনতাও থাকবে প্রত্যেক ধর্ম-মতবাদ জাতির সম্প্রদায়ের বা গোষ্ঠীর। ... ধর্ম বিশ্বাস নিতান্ত ব্যক্তিক, পারিবারিক ও সামাজিক লৌকিকতা ও আচার-আচরণ রূপেই স্বীকৃত থাকবে মাত্র। আমাদের ভাবি সংবিধানের উপক্রমে এ কথাগুলো বড় হরফে মুদ্রিত থাকা আবশ্যিক।’

উপরে সংকলিত বাক্যগুলো আমাদের ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন, রাষ্ট্রীয় জীবনে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আগামীতে আরও বেশি করে প্রভাবিত করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস। এ কথা বলার প্রয়োজন হয় না যে, সমাজের বিকাশ ও ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনের জন্য প্রগতিনিষ্ঠ চিন্তার চর্চা আবশ্যক। মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ, স্বদেশ অন্বেষা, বিজ্ঞানমনস্কতা, গণকল্যাণ, কুসংস্কার মুক্তি, মনুষ্যত্ববোধ বিকাশই সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

ড. নেহাল করিম : সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোঃ মেহেদুল ইসলাম
১৫ ফেব্রুয়ারি , ২০২১ ০৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষক বাতায়নের সকল শিক্ষক- শিক্ষিকা ও আইসিটি জেলা অ্যাম্বাসেডর স্যারদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা https://teachers.gov.bd/content/details/864897