Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ মার্চ, ২০২১ ০৮:০৮ পূর্বাহ্ণ

25 মার্চ গণহত্যা দিবস(বাংলাদেশের কালো রাত্রি)

প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান অত্যাধুনিক কাল পর্যন্ত বিশ্বের বহু প্রান্তে অনেক রকমের এবং বহু ডাইমেনশনের গণহত্যা হয়েছে, যার কোনোটাই লিখিত সামরিক আদেশ জারি করে করা হয়নি। যেখানে যা ঘটেছে তা করা হয়েছে ক্ল্যানডেস্টাইন পন্থায় এবং গোপনীয় বা বিশেষ বাহিনীর দ্বারা। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। 

আজ ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এইদিনে মধ্যরাতে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য ছিল, বাঙালিদের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। এভাবে রাতের আঁধারে ঘুমন্ত মানুষের ওপর অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত কোন বাহিনীর আক্রমণের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

ওই সেনা অভিযানের কোড নেম বা সাংকেতিক নাম ছিল অপারেশন সার্চলাইট। ২৫শে মার্চ শুরু হওয়া গণহত্যার অন্যতম কালপ্রিট পাকিস্তানের ১৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা কর্তৃক লিখিতA Stranger in my own Country গ্রন্থের ভূমিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেWe exploited East Pakistan and when the people rose demanding their right of self determination, the Pakistan military, then in power retaliated with genocide.

ব্রিগেডিয়ার ইকবালুর রহমান তাঁর জবানবন্দিতে বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল গুল হাসান পূর্ব পাকিস্তানের সেনা ইউনিট পরিদর্শনের সময় সৈনিকদের জিজ্ঞাসা করতেন, তুমি কয়জন বাঙালিকে মেরেছ? আরেকজন অফিসার লে. কর্নেল আজিজ আহমদ খান সাক্ষ্যে বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁর ইউনিটে গিয়ে জেনারেল নিয়াজি জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কত হিন্দু মেরেছ? জেনারেল নিয়াজি তাঁর নিজের লেখাThe betrayal of East Pakistan গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন জেনারেল টিক্কা খান তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।’ নিয়াজি তাঁর বইয়ে লিখেছেন টিক্কা খান পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করেন এবং সে অনুসারে জেনারেল রাও ফরমান আলী ও ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জানজেব আরবাব হুকুম পালন করেন। জেনারেল ফরমান আলী তাঁর টেবিল ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূমি বাঙালির রক্তে লাল করা হবে।’

নিয়াজি তাঁর বইয়ে আরো লিখেছেন‘২৫শে মার্চ রাতে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় ছিলেন এবং তিনি দেখেছেন সেদিন রাতে টিক্কা খান কী করেছেন। সারা রাত ট্যাংক, কামান, মেশিনগানের শব্দ ভেদ করে ভেসে এসেছে ঢাকার অসহায় মানুষের আর্তনাদ।’

আরেক পাকিস্তানি অফিসার ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক Witness to Surrender গ্রন্থের ৭৭ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ সকালে শেরেবাংলানগরে অবস্থিত নিজের কমান্ড পোস্ট থেকে বাইরে এসে শহরের দিকে তাকিয়ে জেনারেল টিক্কা খান বিদ্রূপের হাসিতে বলেছিলেন, ঢাকা শহরে কয়েকটি নেড়ি কুত্তা ছাড়া মানুষজন আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।’ এত বড় নিষ্ঠুর-নির্মম উপহাস যে ব্যক্তি করতে পারেন তাঁর জন্য কসাই উপাধিই যথার্থ হয়। বেলুচিস্তানে নির্বিচারে নিরীহ মানুষ হত্যার জন্য এই উপাধি টিক্কা খান পেয়েছিলেন।

 এ কারণেই একাত্তরে যুদ্ধের সময়ে শিল্পী কামরুল হাসান এঁকেছিলেন সেই বিখ্যাত ইয়াহিয়া খানের রাক্ষসরূপী ছবি, যার নিচে লেখা ছিলএই দানবদের হত্যা করুন।’ জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ আছে, মার্চ মাসে ঢাকায় উত্তাল আন্দোলন শুরু হওয়ার অনেক আগেই একাত্তরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সামরিক অ্যাকশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

 

বিদেশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের রিপোর্টেও ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ সাংবাদিক সায়মন ড্রিংয়ের সেই বিখ্যাত প্রতিবেদন ছাপা হয় লন্ডনের দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। ওই রিপোর্টের একাংশের বাংলা করলে দাঁড়ায়‘পাকিস্তান ও ধর্ম রক্ষার নামে ঢাকা নগরীকে ধ্বংস করে একটা ভয়ংকর ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত করা হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ডে ২৪ ঘণ্টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে কম করে হলেও শুধু ঢাকায়ই সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ঢাকার অনেক এলাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় নিযুক্ত আমেরিকান কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড তাঁর নিজের লিখিত ‘ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ২১৩ পৃষ্ঠায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাছাই করা গণহত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। তার গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হওয়ার সময় মেশিনগানের গুলি চালিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল। ২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথোপকথন হয় তার রেকর্ড থেকে আরো জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই অগণিত ছাত্রছাত্রী নিহত হয়েছিলেন। এই গণহত্যার রিপোর্ট তিনি ২৮ মার্চ ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। একই রকম বাছাইকৃত গণহত্যার বর্ণনা পাওয়া যায় তখন দিল্লিতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত কেন কিটিংয়ের প্রতিবেদনে, যার বর্ণনা রয়েছে আর্চার ব্লাডের বইয়ের ২১৫ পৃষ্ঠায়।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল৷ বাংলাদেশিদের স্বাধীকার আন্দোলন, এমনকি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের আইনসঙ্গত অধিকারকেও রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শুরু করেছিল সারাদেশে গণহত্যা৷ সেইরাতে হানাদাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হল, শিক্ষকদের বাসা, পিলখানার ইপিআর সদরদপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে একযোগে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে হত্যা করে অগণিত নিরস্ত্র দেশপ্রেমিক ও দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ৷ পাকহানাদার বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একাধিক গণকবর খুঁড়ে সেখানে শত শত লাশ মাটি চাপা দিয়ে তার ওপর বুলডোজার চালায়৷ নগরীর বিভিন্ন স্থানে সারারাত ধরে হাজার হাজার লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়৷ পুরানো ঢাকার বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়া হয় নিহতদের লাশ৷

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একাত্তরের মার্চ মাসের ২৫ তারিখ দিবাগত রাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পরেই  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  কে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার  হওয়ার পূর্ব মূহুর্তে (26 মার্চ প্রথম প্রহরে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।   

 “This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh, wherever they might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from Bangladesh. Final victory is ours.”

- Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, 26th March 1971.

 

বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হ্যান্ডবিল আকারে ইংরেজি ও বাংলায় ছাপিয়ে চট্টগ্রামে বিলি করা হয়৷ আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামের ইপিআর সদর দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়্যারলেস মারফত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন৷

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ ৷ ২৫শে মার্চের মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া হত্যাযজ্ঞের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশিরা এই দিন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ স্বাধীন করার শপথ গ্রহণ করে৷ ঐ রাতেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা শুরু করে প্রতিরোধ যুদ্ধ, সঙ্গে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ ৷ ৯ মাসের যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় স্বাধীনতা৷ জন্ম হয় বাংলাদেশের৷ ধন্যবাদ সবাইকে।

মন্তব্য করুন