Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ নভেম্বর, ২০২২ ০৯:৩০ পূর্বাহ্ণ

ডলারের রিজার্ভ বনাম বাংলাদেশি টাকা এবং মুদ্রাস্ফীতি

ডলারের রিজার্ভ বনাম বাংলাদেশি টাকা এবং মুদ্রাস্ফীতি


ইউএস ডলার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা। এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রাও বটে।  টাকা বা বিডিটি হলো বাংলাদেশের মুদ্রা।  দেশের অভ্যন্তরীণ লেনদেন,  বাজার সদাই, যাতায়াত,  শিক্ষা স্বাস্থ্য সহ যাবতীয় সেবা পেতে ও নিতে টাকা প্রয়োজন। এটি আমাদের স্থানীয় মুদ্রা।  একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের অক্ষরজ্ঞানহীন কোনো এক দোকানদারকেও যদি আপনি টাকা দেন তিনি এটা রেখে আপনাকে পণ্য দিবেন। ডলার বিশেষ করে ইউএসডি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা,  বিদেশে বাজার সদাই, বিভিন্ন সেবা পেতে হলে এটি প্রয়োজন।  যেমন দরুন আপনি দেশের আনাচে কানাচে যেখানেই যান বাংলায় কথা বলেন। কারণ এটা আমাদের ভাষা, স্থানীয় ভাষা এটি, সবাই এটা বুঝেন। কিন্তু আপনি যদি সৌদি আরব যান তাহলে  একজন আরবীয়কে বাংলায় কিছু বুঝাতে পারবেন? পারবেন না, তখন হয় আপনাকে আরবি বলতে হবে নয় ইংরেজি কারণ ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। একই ভাবে আপনি যদি সৌদি আরব হতে তেল কিনতে চান, সৌদির বাজার হতে খেজুর কিনতে চান তাহলে আপনাকে হয় সৌদি মুদ্রা দিতে হবে, না হয় ডলার দিতে হবে।  কারণ ডলার আন্তর্জাতিক মুদ্রা।  


এই সৌদি মুদ্রা রিয়েল বা ইউএস ডলার ছাপানোর কোনো ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই।  এগুলো নিজ নিজ দেশের সরকার ছাপায়। আমেরিকা ডলার ছাপায় আর সৌদি রিয়েল ছাপায়। এখন বিদেশে সব রাষ্ট্রের মুদ্রা কে সহজে ডলার দিয়ে কেনা যায় কারণ এটি সর্বজনীন গৃহীত মুদ্রা।  সৌদি আপনার টাকা নিয়ে তার রিয়েল আপনাকে দিবে না। কারণ এই টাকা দিয়ে সে কিছু করতে পারবে না! 


এবার আসুন ডলার আমরা কিভাবে পাই। বাংলাদেশ বিদেশে মালমাল বিক্রি তথা রপ্তানি করে ডলার পায়, আমাদের বিদেশি প্রবাসীরা ডলার কামায়। ধরেন একজন সৌদি তে আছেন তিনি রিয়েল কামাই করলেন। সেই রিয়েলকে সৌদি মানি চেঞ্জারে জমা দিয়ে তিনি ডলার নিয়ে দেশে আসেন। তাহলে রিয়েলে সেলারী পেলেও তিনি মূলত ডলারই কামাই করলেন। এছাড়া বিদেশ হতে ঋণ,  বিনিয়োগ,  বা সাহায্য হিসেবে দেশে ডলার আসে। যেহেতু ডলার ছাপানোর কোনো ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই তাই এই পাঁচ উপায়ে ডলারকে সংগ্রহ করতে হয়। আর টাকা আমরা নিজেরা ছাপাতে পারি। ছাপানোর গল্প বা মানি সাপ্লাই প্রসেস আরেক দিন বলবো।


এবার আসুন রিজার্ভ বুঝি। সহজ ভাষায় আপনি যা আয় করেন তা হতে ব্যয় শেষে অবশিষ্ট যা থাকে তা হলো আপনার সঞ্চয়।  বাংলাদেশ সরকার উল্লিখিত পাঁচ উপায়ে ডলার আয় বা সংগ্রহ করেন। আর ডলার ব্যয় হয় কিভাবে? বিদেশ হতে মালামাল কিনতে ডলার লাগে, বিদেশে পড়তে গেলে, ঘুরতে গেলে, চিকিৎসা করতে গেলে, কোন রাষ্ট্রে বিনিয়োগ করলে, ঋণ বা সাহায্য দিলে ডলার খরচ হয়। বাংলাদেশও এভাবেই ডলার খরচ করেন। আয় ও ব্যয় শেষে যা থাকে তাহলো রিজার্ভ।  আমাদের রিজার্ভ কেবল ডলারে নয়, আরো কয়েকটি মুদ্রায় ও স্বর্ণে আছে।  


প্রতি মাসেই আমাদের ডলার আয় হয় ও ব্যয় হয়। ব্যয় বেশি হলে রিজার্ভ হতে সেই ডলার খরচ করে সমন্বয় করা হয়। যেমন আপনার মাসিক আয় ৫০০০, ব্যয় ৭০০০ তাহলে আয় ও ব্যয়ের ঘাটতি দুই হাজার।  এটি আপনার সঞ্চয়, বা সম্পদ বিক্রি বা ঋণ করে সমন্বয় করবেন এটিই স্বাভাবিক।  সরকারও তাই করেন। হয় রিজার্ভ হতে সমন্বয় করেন নয় তো ঋণ করে ঘাটতি পূরণ করেন। রিজার্ভ বেশি হলে বিদেশ হতে বেশি বেশি পণ্য রিলাক্সে আমদানি করা যায় মানে বিদেশি মালামাল কেনা যায়।  যেমন আপনার টাকা বেশি হলে খরচ বেশি করতে পারেন!


এবার আসি ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার বিষয়ে। অনেকেই আতংকে আছেন সরকার দেউলিয়া হলে ব্যাংকের টাকা সব নিয়ে নিবে! এটি আসলে ভুল ধারণা।  দেউলিয়া কাকে বলে? ধরেন শ্রীলঙ্কা এখন দেউলিয়া।  শ্রীলঙ্কা তে কি শ্রীলঙ্কান রুপির অভাব আছে?  বিদেশ হতে ঋণ নিলে, বা পণ্য কিনলে, বা সেবা নিলে সেটার মূল্য ডলারে দিতে হয়। ডলার ঘাটতি থাকলে ঋণ পরিশোধ করা যায় না,  পণ্যের দাম তথা এলসি দায় মেটানো যায় না তখনই দেউলিয়া হতে হয়। তর্কের খাতিরে বলি ধরেন দেশ যদি ডলারের অভাবে বিদেশিদের পাওনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় তারপর আপনার ব্যাংকের টাকা বিদেশিদের দিলে তারা নিবেন??? তারা আপনার টাকা নিবেন না। আর যদি টাকা নিতো বা নেয় তাহলে সরকার আপনার টাকা নয়, বরং তা ছাপিয়েই বিদেশিকে দিতে পারবে।  কিন্তু বিদেশী টাকা নিবেন না কারণ এই টাকা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও কাজে লাগাতে পারবে না কিন্তু ডলার হলে তা সারা দুনিয়ায় কাজে লাগাতে পারবে।  কাজেই বিদেশী ডলার চাইবে। সরকারকেও ডলারই দিতে হবে। সুতরাং আপনার টাকা সরকার নিবে না। 


আরেকটু ক্লিয়ার করি। আমাদের দেশে সবাই বলি টাকা পাচার হয়েছে।  এই ভয়েই সবাই ভাবছে ব্যাংকের টাকাও সরকার বিদেশিদের দিয়ে দিবে! আসলেই কি টাকা পাচার হয়েছে?  পাচার হয়েছে তবে তা টাকা নয়, ডলার!  আমাদের টাকা আমাদের বর্ডারের বাহিরে টাকা নামক কাগজ! বাংলাদেশের টাকা আমাদের সীমান্তের বাহিরে যায়নি, যা গিয়েছে তা হলো ডলার। তাহলে টাকা কেন বলেন? টাকার কথা বলে বুঝানো হয় এই পরিমাণ টাকার সমমূল্যের ডলার পাচার হয়েছে।  টাকা দিয়ে দেশের বাজার হতে ডলার কিনে তা বিদেশে পাঠানো হয়। প্রবাসীদের আয় তথা ডলার কে টাকা দিয়ে কিনে সেই ডলার দেশে না ঢুকিয়ে বিদেশে রাখাকে বলে হুন্ডি। ধরুন 'ক' নামক জেলার একজন সৌদি থাকেন। য নামক জেলার একজন সেই ব্যক্তির উপার্জিত ডলার কে সৌদিতে কিনলো আর বললো ক নামক জেলায় তোমার আত্মীয় বা পরিবারকে সেই ডলারের মূল্য আমি ( য জেলার ব্যক্তি) টাকায় পরিশোধ করবো। এবং তাই হলো কিন্তু য জেলার ব্যক্তির খরিদ করা ডলার দেশে আসলো না। তবে ক জেলার প্রবাসীর পরিবার ডলারের মূল্য টাকা পেয়েছে।  এখন বলা হলো টাকা পাচার হয়েছে,  আসলে ডলার পাচার হলো। এটাকে বলে হুন্ডি। এখানে ক জেলার ব্যক্তি যদি তার ডলারকে য জেলার লোকের নিকট বিক্রি না করে ব্যাংকে পাঠাতো তাহলে সরকার এই ডলার রিজার্ভ রাখতো এবং ডলারের মূল্য টাকায় পরিশোধ করতো ও সেই ডলার আবার বিদেশের কেনাকাটায় ব্যবহার করতো। রিজার্ভের বিপরীতে টাকা ছাপানো হয়। 

তাহলে কি দাঁড়ালো। মূল চাহিদা কি টাকার? না ডলারের? ডলারের। রিজার্ভ বাড়াতে হলে, বা সারা দুনিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি থাকায় চড়াদামে পণ্য কিনে দেশীয় বাজারে পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে হলে ডলার দরকার।  টাকা নয়। 


ডলার বাড়ানোর জন্য সরকার ইতোমধ্যে আইএমএফ হতে ঋণ নিচ্ছে,  প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আরো বাড়াতে হবে, দেশপ্রেমিক নাগরিকের কর্তব্য তার উপার্জিত আয়কে হুন্ডিতে না পাঠিয়ে ব্যাংকে পাঠানো এতে সরকারের রিজার্ভ তথা ডলার বাড়বে ফলে আমদানি বাড়বে ফলে দেশের মুদ্রাস্ফীতি কমবে ফলে জিনিসের দাম কমবে। পাশাপাশি ব্যয় কমাতে হবে। ডলারের ব্যয় কমাতে সরকার ইতোমধ্যে বিদেশ গমন বন্ধ করেছে।  একেবারে প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ নয়। এখন সচেতন নাগরিকদের কাজ দুটি, এক ডলার বাড়াতে ডলারের ব্যয় কমাতে হবে অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় বিদেশ গমন বন্ধ করতে হবে, আর ডলারের বাড়াতে প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করতে হবে।


দ্বিতীয়ত যেহেতু আমাদের অনেক কিছু বিদেশ হতে কিনতে হয়। আর কেনার জন্য দরকার ডলার, বিদেশে দাম বাড়তি থাকায় ডলার বেশি লাগছে, ফলে একজন আমদানিকারক বেশি দামে কিনছেন ফলে বেশি দামে বিক্রি করছেন ফলে আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।  যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রাস্ফীতি এভাবে চললে জিনিসের দাম আরো বাড়বে। কাজেই সারা দুনিয়ার বিষয় আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না, ধরে নিচ্ছি অবস্থা খারাপ তাই খারাপ পরিস্থিতিতে যেন বেশিদামে পণ্য কিনে বাঁচা যায় তাই এখন টাকার খরচ কম করতে হবে। 


সংক্ষেপে বললে টাকার খরচ কমিয়ে সঞ্চয় বাড়ান, ডলারের খরচ কমান প্লাস ডলারের যোগান বাড়ান। হুন্ডি নয় ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার আসুক। আর আবারো বলছি ডলার ছাড়া বিদেশীদের সাথে কোনো ধরনের লেনদেন হয় না তাই আপনার টাকা ব্যাংকে বা বাসায় থাকলে তা সরকার বা ব্যাংকাররা নিবে না। টাকা নিয়ে শঙ্কা নয়। শঙ্কা বাড়লে এবং ব্যাংকিং চ্যানেল হতে টাকা বের হয়ে গেলে বরং বিপদ বাড়বে, দেশ বাঁচাতে গুজব নয়, সচেতন হই। একেবারে স্বাভাবিক থাকুন, ব্যাংকের টাকা নিয়ে কোনো ভয় নয়। শুধু হিসাব করে খরচ করুন এতেই মঙ্গল। 

মন্তব্য করুন