সহকারী শিক্ষক
০২ মার্চ, ২০২৩ ০৬:৩৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলার ভূমি ও ভূমি-রাজস্ব’
(১৭০০-১৭৬৫)
(প্রথম পর্ব)
দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মুঘলসম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭০০ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর বিশ্বস্ত ও সুদক্ষ কর্মচারী মুর্শিদকুলিকে খাঁকে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন। ওই সময়ে যুদ্ধরত সম্রাটের টাকার খুব প্রয়োজন ছিল। সেই সময়ে বাংলা ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী প্রদেশ (জিন্নাতুল বিলাদ) ছিল। কিন্তু ওই একই সময়ে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার বিভিন্ন ত্রুটি বিচ্যুতি এবং নানারকম আর্থিক বিশৃঙ্খলার কথাও সম্রাটের কর্ণগোচর হয়েছিল। সেই অভিযোগগুলি ছিল - (১) উক্ত সময়ে বাংলার প্রায় সমস্ত ‘খালসা জমি’গুলিকে উচ্চ রাজকর্মচারীরা নিজেদের জায়গীর হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন; এর ফলে ওই সমস্ত জমি থেকে রাষ্ট্রের কোনো আয় হচ্ছিল না। তখন শুধুমাত্র বাণিজ্য শুল্ক ‘সায়ির’ই বাংলা থেকে রাষ্ট্রীয় আয়ের একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই প্রসঙ্গে অবশ্য উল্লেখ্য যে, মুঘল ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় জমি দু’ভাগে বিভক্ত ছিল - খালসা ও জায়গীর। খালসা জমি থেকে প্রাপ্য রাজস্ব যেমন সম্রাটের জন্য নির্দিষ্ট (Imperial tribute) ছিল, তেমনি জায়গীর জমি প্রশাসনিক ব্যয়, উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বেতন ও বিভিন্ন জনহিতকর কাজের জন্য নির্দিষ্ট থাকত। (২) তখন অন্য প্রদেশ থেকে টাকা নিয়ে এসে মাঝে মাঝেই বাংলার প্রশাসনিক আয় ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে হত। (৩) সম্রাট আওরঙ্গজেবের পৌত্র বাংলার তৎকালীন সুবাদার ‘আজিম-উস-সান’ (১৬৯৭-১৭১২) ‘সওদা-ই-খাস’ বা ব্যক্তিগত ব্যবসা করে বাংলার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ তছরূপ এবং জবরদস্তি টাকা আদায়ের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছিল। মুর্শিদকুলির রাজস্ব, ভূমি ও ভূমি-রাজস্ব সংস্কার ও বন্দোবস্ত সম্পর্কে সমস্ত ধরণের ঐতিহাসিক তথ্যের উৎস হল তিনটি - (১) ‘সলিমুল্লাহ’ লিখিত ‘তারিখ-ই-বাঙ্গালা’ (১৭৬৩), (২) ‘ইনায়েতুল্লাহ খান’ লিখিত ‘আহকাম-ই-আলমগিরী’, এবং (৩) ‘জেমস গ্রান্ট’ লিখিত ‘এ্যানালিসিস অব দি ফিনান্সেস অব বেঙ্গল’ (১৭৮৬)। সলিমুল্লাহর লেখা ইতিহাস মূলতঃ রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক ঘটনাবলী নিয়ে হলেও, সেইসবের মাঝে মাঝেই তিনি বিক্ষিপ্তভাবে মুর্শিদকুলির ভূমিসংস্কার ব্যবস্থা এবং রাজস্ব নীতি সম্পর্কেও লিখেছিলেন। ইনায়েতুল্লাহ খানের ‘আহকাম’ আদতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আদেশ ও পত্রাবলীর একটি সংকলন। আওরঙ্গজেবের পত্রাবলীতে মুর্শিদকুলি ও আজিম-উস-সানকে লেখা কয়েকটি পত্র পাওয়া যায়, যেগুলিতে বাংলার তৎকালীন ভূমি ও ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রধান সেরিস্তাদার জেমস গ্রান্টের প্রতিবেদন (এ্যানালিসিস) মুর্শিদকুলি তথা অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার একটি অতি জটিল ও বিস্তৃত, অথচ অতিমূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল। বাংলার দেওয়ানি কার্যভার গ্রহণ করে মুর্শিদকুলি প্রথমেই রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছিলেন। সেই কাজের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে, তিনি ওই সময়ের বঙ্গদেশের মুঘল অফিসারদের সমস্ত জায়গীরকে খালসায় পরিণত করেছিলেন, এবং ওই ভাবে খালসা খাতে তিনি রাষ্ট্রীয় আয় বাড়িয়ে দশ লক্ষ একুশ হাজার চারশো পনেরো টাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। (হিস্টোরিক্যাল এন্ড কম্পারেটিভ এ্যানালিসিস অব দ্য ফিনান্সেস অব বেঙ্গল: ১৭৮৬, ফিফথ রিপোর্ট, ২য় খণ্ড, জেমস গ্রান্ট, পৃ- ১২০) বাংলায় জায়গীরচ্যুত অফিসারদের তিনি উড়িষ্যার অনাবাদী, অনুন্নত এবং অনধিকৃত অঞ্চলে নতুন করে জায়গীর দিয়েছিলেন। বাংলার রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাটা মুর্শিদকুলির জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করে থাকেন। এরপরেই আয়-ব্যয়ের হিসাবে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি তৎপর এবং মনোযোগী হয়েছিলেন। তৎকালীন সুবাদার আজিম-উস-সান রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ করতেন; তাঁর অলিখিত নির্দেশে বাংলার জনগণের কাছ থেকে অন্যায় ও জবরদস্তি করে টাকা আদায় করা হত। এমনকি সুবাদার নিজের বেতন খাতেও সরকারিভাবে বরাদ্দ নির্ধারিত অর্থের থেকে বেশি বেতন নিতেন। (হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, ২য় খণ্ড, যদুনাথ সরকার সম্পাদিত, অধ্যায় একুশ) তাছাড়া বঙ্গদেশ জুড়ে তাঁর সওদা-ই-খাস বা ব্যক্তিগত একচেটিয়া ব্যবসাও ছিল। মুর্শিদকুলি সেসব বন্ধ করবার চেষ্টা করাতে সুবাদার ঢাকার নগদী সেনাবাহিনীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টাও করেছিলেন। এরপরেই মুঘল সম্রাটের অনুমতি নিয়ে মুর্শিদকুলি তিনপ্রদেশের (বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা) মধ্যস্থল ‘মুকসুদাবাদে’ (বর্তমান মুর্শিদাবাদ) তাঁর দেওয়ান বিভাগের সদর কার্যালয় স্থানান্তরিত করেছিলেন (১৭০৪)। সেখানে প্রায় স্বাধীনভাবে কাজ করে তিনি ধীরে ধীরে বাংলার আর্থিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। উক্ত সময়ে হাট, বাজার, ঘাট, উৎপন্ন পণ্য ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে ধার্য শুল্ক সায়ির, সেই সময়ের রাষ্ট্রীয় আয়ের অন্যতম উৎস ছিল। সুবাদারের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে সেই খাতে আয়ও তখন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দুর্নীতিপরায়ণ মুঘল অফিসার ও কর্মচারীরা ব্যক্তিগত উৎকোচ ও পারিতোষিক নিয়ে রাষ্ট্রীয় আয়ের ক্ষতি করেছিলেন। সেই অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য মুর্শিদকুলি তাঁর প্রশাসনে দক্ষ ও সৎ অফিসার এবং কর্মচারীদের নিয়োগ করেছিলেন। তাছাড়া দুর্নীতি ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি দিয়েও তিনি সায়ের খাতে আয় বৃদ্ধি ঘটিয়েছিলেন। প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস, হিসাবের তদারকি এবং প্রতিরক্ষা খাতে খরচ কমিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় বাজেটে উদ্বৃত্তের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। তাঁর অর্থনীতির একটি মৌলিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যয় সংকোচ (retrenchment)। সেদিকে লক্ষ্য রেখে তিনি প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে দিয়েছিলেন। অসৎ সরকারি কর্মচারীরা যাতে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করতে না পারেন, সেজন্য তিনি হিসাবের খাতা আগে নিজে পরীক্ষা করে তারপরেই সই করতেন। বাংলার বিশাল সেনাবাহিনীকে হ্রাস করে তিনি মাত্র দু’ হাজার অশ্বারোহী এবং চার হাজার পদাতিকে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। সেই ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী নিয়েই তিনি তৎকালীন বাংলার অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষা এবং বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছিলেন। ওই সময়ে প্রতিরক্ষা খাতে তাঁর ব্যয় সংকোচের নীতিকে অবশ্য বাংলা তথা ভারতের তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে অদূরদর্শিতার পরিচায়ক বলেই মনে হয়। সলিমুল্লাহ জানিয়েছিলেন যে, মুর্শিদকুলি বঙ্গদেশে জমি জরীপ করে বিস্তৃত ‘হস্তবুদ’ (অতীত ও বর্তমান রাজস্বের বিস্তৃত হিসাব বা rent roll) তৈরী করিয়েছিলেন। (তারিখ-ই-বাঙ্গালা, সলিমুল্লাহ, পৃ: ৩১-৩৭; মুর্শিদকুলি এ্যান্ড হিজ টাইমস, আবদুল করিম, পৃ: ৭৬-৭৮) ওই সময়ের বাংলার জমিকে তিনভাগে, যথা - আবাদী, অনাবাদী ও বন্ধ্যা - ভাগ করে তিনি প্রাক্তন ও বর্তমান অবস্থা, উৎপন্ন ফসলের হিসাব, এবং কৃষকের ক্ষমতা বিচার করে তবেই ভূমি-রাজস্ব ধার্য করেছিলেন। তবে তখন সারা বঙ্গদেশে অবশ্য জমি জরীপ করা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন বীরভূমে কোন জরীপ একেবারেই হয়নি; কারণ, সেখানকার ধর্মপ্রাণ মুসলমান জমিদার ‘আসাদুল্লাহ খান’ ধর্মীয় কাজকর্মেই সমস্ত জমি দান করে দিয়েছিলেন। বিষ্ণুপুর অঞ্চল তখন অত্যন্ত দুর্গম ছিল বলে সেখানেও কোন জরীপ করা সম্ভব হয়নি। আর ওই সময়ে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অধীনে থাকা কলকাতাতেও কোন জমি জরীপ করা হয়েছিল বলে ইতিহাস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় না। ১৭২২ সালে মুর্শিদকুলির ভূমি-রাজস্ব বন্দোবস্তে (revenue settlement) বাংলার মোট ভূমি-রাজস্ব হয়েছিল এক কোটি বিয়াল্লিশ লক্ষ অষ্টাশি হাজার একশো ছিয়াশি টাকা। অর্থাৎ, এর আগের সুবাদার ‘শাহ সুজা’র সময়কার বন্দোবস্তের (১৬৫৮) উপরে এগারো লক্ষ বাহাত্তর হাজার দু’শো ঊনআশি টাকা রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। অঙ্কের হিসেবে ওই ৬৪ বছরে (১৬৫৮-১৭২২) বাংলা থেকে ১৩.৫ শতাংশ রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। মনে রাখতে হবে যে, মুর্শিদকুলির আগে শাহ সুজার সময়ে (১৬৩৯-১৬৫৮) ১৬৫৮ সালে বাংলার ভূমি-রাজস্বের শেষ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। ইতিহাস থেকে মুঘল ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থায় চাষআবাদ, ফসলের পরিমাণ ও লোকসংখ্যা বাড়লে ভূমি-রাজস্ব বাড়ানোর রীতি দেখতে পাওয়া যায় ৷ ১৬৫৮ সাল থেকে ১৭২২ সালের মধ্যে বঙ্গদেশে চাষআবাদ, লোকসংখ্যা, রাজ্যের আয়তন, বাণিজ্য ইত্যাদি প্রভূত পরিমানে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সুতরাং ১৭২২ সালে বাংলার ভূমি-রাজস্ব বৃদ্ধি মোটেই অস্বাভাবিক কিছু ছিল না বলেই ঐতিহাসিকেরা মনে করে থাকেন। তাছাড়া সেই আয়ের মধ্যে দু’লক্ষ আটান্ন হাজার আটশো সাতান্ন টাকার ‘সুবাদারি আবওয়াব’ বা ভূমি-রাজস্বের উপরে বাড়তি করও ছিল। মুর্শিদকুলির সময়ে খালসা খাতে আসল জমা (original assessed rent) ছিল ৮৭,৬৭,০১৫ (১২৫৬ পরগনা) টাকা; বাড়তি রাজস্ব ছিল ১১,৭২,২৭৯ টাকা; ও জায়গীর অধিগ্রহণের ফলে বর্ধিত আয় হয়েছিল ১০,২১,৪১৫ টাকা। সব মিলিয়ে মোট আয়ের পরিমাণ ছিল ১,০৯,৬০,৭০৯ টাকা। শুধুমাত্র জায়গীর খাতে আয় কমে (শাহ সুজার সময়কার ৪৩,৪৮,৮৯২ থেকে) ৩৩,২৭,৪৭৭ (৪০৪ পরগনা) টাকা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, আকবরের রাজস্বমন্ত্রী ‘রাজা টোডরমল’ ১৫৮২ সালে বঙ্গদেশে প্রথমবারের জন্য ভূমি-রাজস্বের বন্দোবস্ত করেছিলেন। তাঁর সেই বন্দোবস্ত ইতিহাসে ‘আসল জমা’ বা ‘’তুমার জমা’ নামে পরিচিত। সেই সময়ে ১৯টি সরকার ও ৬৮২টি পরগনায় বিভক্ত বাংলায় তিনি খালসা (৬৩,৪৪,২৬০), এবং জায়গীর (৪৩,৪৮,৮৯২) এই দুই খাতে মোট ১,০৬,৯৩,১৫২ টাকার রাজস্ব ধার্থ করেছিলেন। এরপরে ১৬৫৮ সালে শাহ সুজা বঙ্গদেশে খালসা (৭,৬৭,০১৫) ও জায়গীর (৪৩,৪৮,৮১২) মিলিয়ে মোট ১,৩১,১৫,৯০৭ টাকা রাজস্ব ধার্য করেছিলেন। সলিমুল্লাহ আরো জানিয়েছিলেন যে, মুর্শিদকুলি ‘আমিল’ বা কালেক্টরদের তখনকার অনাবাদী-জমিগুলিকে চাষের আওতায় আনবার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। তখন কৃষির উন্নতির জন্য কৃষকদের কৃষি-ঋণ (তাকাবি) দেওয়ারও ব্যবস্থা ছিল। কৃষকেরা বীজ শস্য এবং চাষের বলদ কেনবার জন্য সেই ঋণ পেতেন। তবে মুর্শিদকুলির ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় জমির জন্য কৃষকের দেয় রাজস্বের হার ঠিক কত ছিল, সেটা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। ‘আবদুল করিম’ তাঁর ‘মুর্শিদকুলি এ্যান্ড হিজ টাইমস’ গ্রন্থে সেই দিকটির বিস্তৃত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন যে, মুর্শিদকুলির সময়ের বঙ্গদেশে বিঘা বা কানি প্রতি ভূমি-রাজস্বের হার ছিল আট থেকে দশ আনা। (মুর্শিদকুলি এ্যান্ড হিজ টাইমস, আবদুল করিম, পৃ: ৮৫-৮৮), অর্থাৎ তৎকালীন বাজার দাম অনুযায়ী দুই থেকে আড়াই মণ চাল। এর অর্থ হল যে, সেই সময়ে রাষ্ট্র কৃষকদের কাছ থেকে উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ ভূমিকর হিসাবে গ্রহণ করত। তখনকার হিসেবে ওই হারকে কোনমতেই বেশী বলা যায় না; কারণ, আওরঙ্গজেবের সময়ে বাকি ভারতে ভূমি-রাজস্বের হার বেড়ে গিয়ে উৎপন্ন ফসলের ৫০ শতাংশ হয়েছিল। (এগ্রেরিয়ান সিস্টেম অব মোসলেম ইণ্ডিয়া, ডব্লিউ. এইচ. মোরল্যাণ্ড, পৃ: ১৩৫) মুর্শিদকুলির সময়ের ধার্য রাজস্ব আসলে বাংলার রাজস্বের হিসাব (valuation or aggregate) নাকি ওই সময়ের প্রকৃত আদায় যোগ্য রাজস্বের (demand) হিসাব, তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে বেশ মতভেদ প্রচলিত রয়েছে। জেমস গ্রান্টের মতে তখন ধার্য রাজস্ব আদায় করা হত, অর্থাৎ সেটা ‘demand’ ছিল; আবার মোরল্যাণ্ডের মতে তখন নির্ধারিত রাজস্ব ছিল ‘valuation or aggregate’, অর্থাৎ রাজস্বের মোট হিসাব - যেটার পুরোটা কখনোই আদায় করা সম্ভব হত না। আবদুল করিম এই প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে, মুর্শিদকুলির সময়ে ধার্য রাজস্ব কখনোই পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব হত না। (মুর্শিদকুলি এ্যান্ড হিজ টাইমস, আবদুল করিম, পৃ: ১৯৬-৯৭) মুর্শিদকুলি দক্ষতা ও ব্যয় সংকোচের দিকে লক্ষ্য রেখেই বাংলার ভূমি রাজস্ব-ব্যবস্থার প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। শাহ সুজার সময়ে ভূমি রাজস্ব বন্দোবস্তে বাংলাকে ৩৪টি সরকার ও ১,৩৫০টি পরগনায় ভাগ করা হয়েছিল। মুর্শিদকুলি সারা বঙ্গদেশকে ১৩টি ‘চাকলা’ এবং ১,৬৬০টি পরগনা বা ‘মহালে’ ভাগ করেছিলেন। তাঁর সময়কার সেই তেরোটি চাকলা ছিল (১) বন্দর বালাশোর বা বালেশ্বর, (২) হিজলি, (৩) মুর্শিদাবাদ, (৪) বর্ধমান, (৫) হুগলী বা সপ্তগ্রাম, (৬) ভূষণা, (৭) যশোহর, (৮) আকবরনগর (রাজমহল), (৯) ঘোড়াঘাট (রংপুর), (১০) কুরিবাড়ি (কুচবিহার এবং আসামের কতকাংশ), (১১) জাহাঙ্গীর-নগর (ঢাকা), (১২) শ্রীহট্ট, এবং (১৩) ইসলামাবাদ (চট্টগ্রাম)। গ্রান্টের মতে মুর্শিদকুলির চাকলাগুলি আয়তনে দরকার অপেক্ষা অধিক বিস্তৃত, সীমানা চিহ্নিত, সুগঠিত, এবং সেগুলির রাজস্ব সুনির্দিষ্ট ছিল। তখন প্রত্যেক চাকলায় একজন করে ফৌজদার ও একজন আমিলদার নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাঁরা দু’জনেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বাধীন ছিলেন। তবে বৃহৎ জমিদারেরা যাতে অধিক ক্ষমতাশালী না হয়ে ওঠেন, সেদিকে লক্ষ্য রেখে প্রাচীন মুঘল ব্যবস্থা অনুযায়ী মুর্শিদকুলি তাঁদেরকে একাধিক চাকলার অধীনে স্থাপন করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওই সময়ের রাজশাহী জমিদারি আটটি চাকলার মধ্যে অবস্থিত ছিল। তখন সমস্ত রাজস্ব বন্দোবস্ত মুর্শিদাবাদে হলেও, কোন ধরণের বিশৃঙ্খলা এড়ানোর জন্য প্রতি চাকলা ও পরগনার রাজস্ব কিন্তু আলাদা- ভাবে চিহ্নিত থাকত। (হিস্টোরিক্যাল এন্ড কম্পারেটিভ এ্যানালিসিস অব দ্য ফিনান্সেস অব বেঙ্গল: ১৭৮৬, ফিফথ রিপোর্ট, ২য় খণ্ড, জেমস গ্রান্ট, পৃ- ৩১১) মুর্শিদকুলির রাজস্ব সংগ্রহ পদ্ধতি নিয়ে ইতিহাসবিদ মহলে জোর বিতর্ক দেখতে পাওয়া যায়। যদুনাথ সরকারের মতে মুর্শিদকুলি বাংলার প্রাচীন জমিদারদের সরিয়ে দিয়ে ইজারাদারদের হাতে রাজস্ব আদায়ের ভার তুলে দিয়েছিলেন। (হিস্ট্রি অব বেঙ্গল, ২য় খণ্ড, যদুনাথ সরকার সম্পাদিত, অধ্যায় একুশ) তাঁর মতে মুর্শিদকুলি প্রবর্তিত ব্যবস্থাটি ছিল ‘কন্ট্রাক্ট সিস্টেম’ বা ‘মালজামিনী ব্যবস্থা’। সেই ব্যবস্থায় ইজারাদাররা রাজস্ব (মাল) আদায়ের অধিকার পাওয়ার জন্য, ফরাসীদেশের ফারমিয়ের জেনারেলদের মত, জামিন বা খত দিতেন, এবং আদায়ীকৃত রাজস্ব থেকে তাঁদের পারিশ্রমিক হিসাবে একটা নির্দিষ্ট অংশ পেতেন। যেহেতু বাংলার জমিদারদের উপরে ইজারাদারদের স্থাপন করা হয়েছিল, সেহেতু তাঁদের চাপে বাংলার ঐতিহ্যবাহী জমিদারেরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলেন, এবং এর দুই বা তিন পুরুষ পরে লর্ড কর্ণওয়ালিশের সময়ে তাঁরা জমিদার বা রাজা উপাধি পেয়েছিলেন। যদুনাথ সরকারের মতে, ওভাবেই বাংলার ঐতিহ্যবাহী বংশানুক্রমিক জমিদার পরিবারগুলি মুর্শিদকুলি ও কর্ণওয়ালিশ ব্যবস্থায় ধংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। কিন্তু আবদুল করিম যদুনাথ সরকারের সেই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। (মুর্শিদকুলি এ্যান্ড হিজ টাইমস, আবদুল করিম, পৃ: ৯১-৯২) তাঁর মতে - প্রথমতঃ, ইনায়েতুল্লাহ খানের ‘আহকামে’ মুর্শিদকুলির সময়ের ইজারা ব্যবস্থার উল্লেখ থাকলেও, ওই সময়ের বঙ্গদেশে সেই ব্যবস্থা আদৌ চালু ছিল কিনা, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর অনেক পরে ১৭২২ সালে বঙ্গদেশে মুর্শিদকুলির ভূমি-রাজস্ব বন্দোবস্ত হয়েছিল। সুতরাং, ঐ সময়ে ইজারা ব্যবস্থা চালু ছিল একথা কিছুতেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়তঃ, যদি তর্কের খাতিরে এটা ধরে নেওয়াও হয় যে, মুর্শিদকুলির সময়ে ইজারা ব্যবস্থা চালু ছিল, তাহলেও বলা যায় যে, তখন ইজারাদার দের অবস্থা (status) অনেকটা সরকারি কর্মচারীদের মতই ছিল। মুর্শিদকুলির হস্তবুদে নির্ধারিত রাজস্ব অনুযায়ী তাঁদের রাজস্ব আদায় করতে হত, এবং সেজন্য তাঁরা নির্ধারিত পারিশ্রমিক পেতেন। তবে কিভাবে তাঁরা সেই পারিশ্রমিক পেতেন, সেটা সঠিকভাবে জানা যায় না। তাই যদি জায়গীর দেওয়া হয়েও থাকে, তাহলে তাঁরা আমিলদের মতই সরকারি কর্মচারী ছিলেন, আর নানকর বা জীবনধারণের ভাতা পেলে তাঁরা জমিদার ছাড়া অন্য কিছু ছিলেন না। তৃতীয়তঃ, মুর্শিদকুলি পরবর্তীকালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মত (১৭৬৫-১৭৮৯) জমি নিলামে উঠিয়ে দিয়ে সর্বোচ্চ করদাতার সঙ্গে ভূমি-রাজস্বের বন্দোবস্ত (farming system) করেননি। তবে এটা সম্ভব যে, মুর্শিদকুলির সময়কার ইজারাদাররা কেউ কেউ পরবর্তীকালেও বংশানুকুমিকভাবে জমিদারির ইজারা নিয়েছিলেন, এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই তখন জমিদার হয়ে গিয়েছিলেন। চতুর্থতঃ, মুর্শিদকুলি বাংলার জমিদারদের ধ্বংস করেননি। বাংলার ঐতিহাসিক জমিদার পরিবারগুলিও, যথা - বীরভূম, বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, নদীয়া প্রভৃতি তাঁর সময়ে দিব্যি টিকে ছিল। এছাড়া তিনি নিজেও কয়েকটি নতুন জমিদারি গড়ে তুলেছিলেন। সেগুলি ছিল - নাটোর, দীঘাপাতিয়া, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ প্রভৃতি। মুঘল ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থায় বাকী খাজনার দায়ে জমিদারি বাজেয়াপ্ত করা হত না। তখন জমিদারকে বন্দী করে তাঁর জমিদারিতে ‘সাজোয়াল’ নিয়োগ করে বাকী রাজস্ব আদায় করা হত। ওই সময়ে শুধুমাত্র বিদ্রোহ করলে তবেই জমিদারের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব ছিল। মুর্শিদকুলির সময়ে ভূষণার জমিদার সীতারাম, এবং রাজশাহীর জমিদার দর্পনারায়ণ বিদ্রোহ করেই নিজেদের জমিদারি হারিয়েছিলেন। পঞ্চমতঃ, মুর্শিদকুলি জমিদারিকে স্থায়ী সম্পত্তি বলে মনে করতেন। সেই কারণেই তিনি তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সরফরাজ খাঁয়ের জন্য চুনাখালিতে জমিদারি কিনেছিলেন। সেটার পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে যদি সরফরাজের কোন ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে, তাহলেও তাঁর জীবিকার ক্ষেত্রে যেন কোনো অসুবিধা না হয়। অর্থাৎ, মুর্শিদকুলি জমিদারির স্থায়িত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। ষষ্টতঃ, সলিমুল্লাহ তাঁর গ্রন্থে মুর্শিদকুলির সময়ে কর সংগ্রাহক হিসাবে একই সঙ্গে আমিল ও জমিদারদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তখন প্রত্যক্ষ কর সংগ্রহের জন্য আমিল, এবং পরোক্ষ সংগ্রহের জন্য বাংলার জমিদারেরা ছিলেন। সুতরাং ইতিহাস থেকে এটাই দেখা যায় যে, মুর্শিদকুলি রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমিল ও জমিদারদের নিয়ে গঠিত একটি মিশ্র পদ্ধতিকে অনুসরণ করেছিলেন। সলিমুল্লাহর বিবরণী থেকে জানতে পারা যায় যে, মুর্শিদকুলি প্রতি বছর ১লা বৈশাখ তারিখে তাঁর অধীনস্থ রাজস্ব বিভাগে ‘পুন্যাহ’ অনুষ্ঠান করতেন। তখন চৈত্র মাসের মধ্যে বাংলার রাজস্ব আদায়ের কাজ শেষ করতে হত। ১লা বৈশাখ তারিখে বকেয়া রাজস্বের হিসাব নিকাশ করা হত, এবং জমিদারদের বাকী রাজস্বের জন্য জামিন দিতে হত। তারপরে আগামী বছরের জন্য জমিদারি সনদ ঐ সময় থেকেই দেওয়া শুরু হত। তখন অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টির জন্য ফসলের কোন ক্ষতি হলে, রাজস্বের একাংশ মকুব করবারও ব্যবস্থা ছিল। ওই পুন্যাহ অনুষ্ঠানে দক্ষ ও নিয়মিত রাজস্ব প্রদানকারী জমিদারদের অশ্ব ও খেলাত (জমকালো পোশাক) দিয়ে উৎসাহিত করা হত। ঐতিহাসিকদের মতে মুর্শিদকুলির প্রবর্তিত ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার প্রকৃতি বা চরিত্র অনেকটাই রায়তওয়ারি ধরনের ছিল। জমির প্রাক্তন ও বর্তমান অবস্থা, উৎপন্ন ফসল, কৃষকের আর্থিক অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ করবার পরেই তিনি হস্তবুদ গড়ে তুলেছিলেন। প্রায় সারা বঙ্গদেশের জমি জরীপ করে তিনি সেগুলোর শ্রেণীবিভাগ করেছিলেন। সলিমুল্লাহ মুর্শিদকুলির ভূমি-রাজস্ব বর্ণনা করতে গিয়ে এমন একটি ধারণার সৃষ্টি করেছিলেন যে, তা থেকে তাঁর ব্যবস্থা মূলতঃ রায়তওয়ারি ছিল বলেই মনে হয়। তাঁর ভুমি-রাজস্ব ব্যবস্থায় কর সংগ্রাহক হিসাবে জমিদারেরা থাকতেন। তাঁর প্রবর্তিত ব্যবস্থায় মধ্যে থেকে তাঁরা নির্দিষ্ট হারে কর সংগ্রহ করতেন। মুর্শিদকুলির ভূমি-রাজস্ব বন্দোবস্ত সেদিক থেকে রায়ত, আমিল ও জমিদারদের নিয়ে গঠিত একটি মিশ্র ব্যবস্থা ছিল বলা যেতে পারে। (মুর্শিদকুলি এ্যান্ড হিজ টাইমস, আবদুল করিম, পৃ- ৮৩)
বাংলার কৃষি অর্থনীতির উপরে মুর্শিদকুলির ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা গভীর প্রভাব ফেলতে পেরেছিল। রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে তিনি খুবই কঠোরতা অবলম্বন করতেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে রাষ্ট্রের প্রাপ্য শেষ দামটিও তিনি করদাতার কাছ থেকে আদায় করে নিতেন। সলিমুল্লাহ তাঁর গ্রন্থে সেই বিষয়ে মুর্শিদকুলির কঠোরতার বিস্তৃত বর্ণনা লিখে গিয়েছেন। তখন কোন কারণে রাজস্ব বাকী পড়লে রাজস্ব বিভাগের কর্মচারী - আমিল, কানুনগো, মুৎসুদ্দি এবং জমিদারদের বন্দী করে রেখে তাঁদের উপরে দৈহিক নির্যাতন চালানো হত। সেই ব্যাপারে তিনি খানিকটা সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর দু’জন বিশ্বস্ত কর্মচারী - ‘নাজির আহমেদ’ ও ‘রেজা খাঁ’ - কঠোরভাবে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁকে সাহায্য করতেন। মুর্শিদকুলি রাজস্ব আদায় করবার জন্য প্রশাসনিক কাঠামোর উপর দিকে চাপ সৃষ্টি করবার ফলে জমিদারেরাও যে কঠোরভাবে তাঁদের প্রাপ্য রাজস্ব আদায় করতেন, এমন অনুমান করাটা খুব একটা অসঙ্গত হবে না। এই প্রসঙ্গে ১৭২২ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কলকাতা কর্তৃপক্ষ একটি চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে, “টাকার জন্য মুর্শিদকুলি দেশটাকে ছিঁড়ে টুকরো করছে।” (মুর্শিদকুলি এ্যান্ড হিজ টাইমস, আবদুল করিম, পৃ- ৮২) দ্বিতীয়তঃ, মুর্শিদকুলি একখাতে (ওয়াজাসাৎ খাসনোবিশী) ২,৫৮,৮৫৭ টাকার বাড়তি ভূমি-রাজস্ব আবওয়াব ধার্য করেছিলেন। এছাড়া দিল্লীতে মুঘল সম্রাটের তখতে আরোহণ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত বার্ষিক অনুষ্ঠানেও তখন বাংলা থেকে সোনার মোহর যেত। সেজন্যও তিনি রায়তদের কাছ থেকে কর নিতেন। তখন সাধারণতঃ খালসা জমিতেই আবওয়াব ধার্য করা হত, এবং মুর্শিদিকুলির সময়ে সেই ধার্য করা আবওয়াবের অঙ্কটাও তেমন বিশাল কিছু ছিল না। তবে তাঁর ওই বাড়তি ভূমিকরের দৃষ্টান্ত তৎকালীন বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির পক্ষে মোটেও শুভ হয়নি। সেক্ষেত্রে মুর্শিদকুলির উত্তরসুরীরা তাঁর পদাংক অনুসরণ করে আরো অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। তৃতীয়তঃ, মুর্শিদকুলি রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে ব্যয় সংকোচের নীতিকে অনুসরণ করেছিলেন। তাতে কর সংগ্রাহকগণ প্রজাদের উপরে অত্যাচার করবার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে একবার অভিযোগ গিয়েছিল যে, বাংলার “ইজারাদারেরা দরিদ্র প্রজা ও কৃষকদের উপর অত্যাচার করেন। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং সেই সঙ্গে কৃষকদেরও সর্বনাশ ঘটবে।” উক্ত অভিযোগের ভিত্তিতে সম্রাটের জিজ্ঞাসার উত্তরে মুর্শিদকুলি তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, রাজস্বের জামিন হিসাবে তিনি কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে খত (security bonds) নিয়েছেন। কৃষকদের সুবিধার্থে, এবং বাংলার পূর্ববর্তী দেওয়ান ‘কিফায়েত খানের’ (Kifayat Khan) ব্যবস্থা অনুযায়ী তিনি ইজারাদারদের দেয় রাজস্বকে বিভিন্ন সময়ে আংশিকভাবে (periodical instalments) জমা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। সম্রাট তাঁর সেই ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেছিলেন। এর থেকে এই সিদ্ধান্ত করা অসঙ্গত হবে না যে, মুর্শিদকুলির ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থায় কৃষকদের উপরে তেমন কোন অত্যাচার করা হত না। চতুর্থতঃ, মুর্শিদকুলি শুধু নির্ধারিত রাজস্বই আদায় করতেন। বাকি সমস্ত রকমের বেআইনি করকে তিনি রহিত করেছিলেন। তাঁর দাপটে বাংলার আগের সুবাদারদের বেআইনি ব্যক্তিগত একচেটিয়া ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পঞ্চমতঃ, নিজের রাজস্ব বিভাগে মুর্শিদকুলি শুধুমাত্র বাঙালি হিন্দুদেরই নিয়োগ করতেন। এর কারণ হিসেবে সলিমুল্লাহ লিখেছিলেন যে, তখনকার মুসলমান রাজস্ব আদায়কারীরা ইচ্ছামত সরকারি অর্থ তছরূপ করতেন, এবং তাঁদের কাছ থেকে সেই অর্থ উদ্ধার করা মোটেও সহজ ছিল না। সেই তুলনায় ওই সময়ের বাঙালি হিন্দুরা শান্ত, নিরীহ ও ভীরু হওয়ার জন্য, তাঁদের কাছ থেকে আত্মসাৎ করা অর্থ সহজেই উদ্ধার করা সম্ভব ছিল। তাছাড়া তাঁদের কাছ থেকে মুর্শিদকুলির কর্তৃত্বের উপরে কোন ধরণের আঘাত আসবার সম্ভাবনাও ছিল না। তাঁর সময় থেকেই বাংলার রাজস্ব বিভাগে বাঙালি হিন্দুদের চাকরি একচেটিয়া হয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলার অবসান এবং শৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠাই সামগ্রিকভাবে তৎকালীন বাংলার আর্থিক জীবনে মুর্শিদকুলির শাসনকালের সর্বাপেক্ষা বড় অবদান ছিল। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে তখন সাধারণভাবে সারা বঙ্গদেশের আর্থিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল। এর আগে চন্দননগরের ফরাসি বণিকেরা আজিম-উস-সানের শাসনকালে (১৭০০-১৭০৬) বঙ্গদেশে আর্থিক সন্ত্রাস ও জবরদস্তি টাকা আদায় করবার ঘটনা উল্লেখ করে লিখেছিলেন, “প্রদেশে জনবসতি কমছে, রূপো দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে, এবং বাণিজ্য চালানো কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।” মুর্শিদকুলির সময় থেকেই বাংলার আর্থিক সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলার যুগের অবসান ঘটেছিল। দ্বিতীয়তঃ, মুর্শিদকুলির ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থাকে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার ভূমি সংক্রান্ত ব্যবস্থার ভিত্তি বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালেও বাংলার নবাবেরা সেই ব্যবস্থাই বজায় রেখেছিলেন। তাঁদের পরে ইংরেজ শাসকেরা সামান্য কিছু পরিবর্তন করে ওই একই ব্যবস্থাকেই চালু রেখে দিয়েছিলেন। তাঁর আসল জমা (original assessed rent), হস্তবুদ (rent roll), চাকলা (পরবর্তীকালের জেলা সদর), পরগনা বা মহাল সবই পরবর্তী সময়েও টিকে ছিল। তৃতীয়তঃ, মুর্শিদকুলি প্রতিবছর কঠোরভাবে খালসা রাজস্ব আদায় করে নিয়মিতভাবে সম্রাটের প্রাপ্য রাজস্ব (imperial tribute) এককোটি টাকা দিল্লীতে পাঠাতেন। তাঁর সময়ে হুণ্ডির মাধ্যমে সেই টাকা পাঠানোর কোন ব্যবস্থা ছিল না। তখন সিক্কাটাকায় সম্রাটের রাজস্ব পাঠানোর ফলে বাংলার বাজারে টাকার যোগান কম যেত, এবং এর ফলে স্থানীয় বাজারে জিনিসপত্রের দাম খুব কম থাকত। ‘সেবাস্টিয়ান ম্যানরিক’ ১৬৩২ সালে মুর্শিদাবাদ বাজারে চালের দাম টাকায় ৪-৫ মণ দেখেছিলেন। সলিমুল্লাহ জানিয়েছিলেন যে, এর ঠিক নব্বই বছর পরে মুর্শিদকুলির সময়ে মুর্শিদাবাদে চালের দাম ছিল টাকায় ৪ মণ। এথেকে বোঝা যায় যে, তখন বাণিজ্য ও উৎপাদন বাড়া সত্ত্বেও বাজারে টাকার যোগান কম থাকবার জন্য জিনিসের দাম তেমনভাবে বাড়তে পারেনি। তখন অন্তর্বতীকালে চাষ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কৃষকদের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি কিন্তু তেমনভাবে হয়নি; কারণ, নিজেদের উৎপন্ন ফসলের বিনিময়ে তাঁরা টাকা যোগাড় করতে না পারবার জন্য তাঁদের হাতে পুঁজিও গড়ে ওঠেনি। নবাব তখন কঠোরভাবেই রাজস্ব আদায় করেছিলেন, এবং কৃষক ও কারিগরদের উদ্বৃত্ত উৎপাদন রাজকোষে জমা পড়েছিল। জেমস গ্রান্টের হিসাব অনুযায়ী মুর্শিদকুলি যেখানে মোট এক কোটি পঁচানব্বই লক্ষ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন, সেখানে দিল্লীতে রাজস্ব হিসাবে মোট পঁচিশ কোটি টাকা পাঠিয়েছিলেন। আর তাঁর সময়ে বাংলার মানুষ ক্ষেতে ও তাঁতে শ্রমের বিনিময়ে কোন আর্থিক সম্পদ গড়ে তুলতে পারেন নি। এই প্রসঙ্গে যদুনাথ সরকার মন্তব্য করেছিলেন যে, ওই সময়ের বাংলার মানুষ দুর্দিনে সঞ্চয়ের অভাবে মেষপালের মত শুধু দলে দলে মৃত্যুর সম্মুখীন হতেন। চতুর্থতঃ, মুর্শিদকুলির শাসনকাল থেকে বাংলার আর্থিক জীবনে নতুন ধারার সূত্রপাত ঘটেছিল। তখন প্রাদেশিক শাসন কাঠামোর দুই প্রধান - সুবাদার ও দেওয়ান - উভয়েই বাংলাকে শোষণ করতেন। যদুনাথ সরকার তাঁদেরকে তৎকালীন বাংলার জনগণের রক্ত শোষক দু’ দল জোঁক বলে অভিহিত করেছিলেন। মুর্শিদকুলির আগে অস্থায়ী সুবাদারেরা বাংলা ছাড়বার আগেই নিজেদের জন্য দ্রুত টাকা জমানোর চেষ্টা করতেন। (এভাবেই শায়েস্তা খাঁ ১৮ বছরে ১ কোটি, খানজাহান বাহাদুর এক বছরে দুই কোটি, এবং আজিম-উস-সান ৯ বছরে ৮ কোটি টাকা জমিয়েছিলেন বলে ইতিহাস পাওয়া যায়। হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, ২য় খণ্ড, যদুনাথ সরকার সম্পাদিত, অধ্যায় একুশ) এর ফলে তাঁর অনুগত দেওয়ান যেভাবেই হোক সরকারের প্রাপ্য শেষ পয়সাটিও আদায় করেই ছাড়তেন। মুর্শিদকুলি বাংলায় প্রায়-স্বাধীন নবাবী প্রতিষ্ঠা করবার ফলে. তাঁর সময় থেকে নবাবই একাধারে বাংলার সুবাদার ও দেওয়ান হয়ে উঠেছিলেন। আর তখন থেকেই বাংলার কর্তা হিসেবে তিনি যেমন বেআইনি কর সংগ্রহ বন্ধ করেছিলেন, তেমনি শান্তি-শৃঙ্খলাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুতরাং তাঁর পূর্বর্তী সুবাদারদের শাসনকালের সঙ্গে তুলনায় মুর্শিদকুলির শাসনকালকে অবশ্যই ‘an illustrious era of finance’ হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। ঐতিহাসিকদের মতে তাঁর সময় থেকেই বাংলার আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নতির সূচনা হয়েছিল। পঞ্চমতঃ, মুর্শিদকুলির সময়ে ত্রিপুরা, কুচবিহার, জয়ন্তিয়া ও কাছাড় বাংলার করদ রাজ্য ছিল। বাংলার অনুন্নত, বিশেষতঃ বন্য, জঙ্গলাকীর্ণ (যেমন ময়মনসিংহ) অঞ্চলে তিনি জমিদারি বন্দোবস্ত দিয়ে বসতি স্থাপন এবং চাষবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। ময়মনসিংহের ‘শ্রীকৃষ্ণ হালদার’, এবং মুক্তাগাছার ‘শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী’ ঐ অঞ্চলে চাষ, রাস্তাঘাট, বাজার ও লোক বসতি স্থাপন করে রাজ্যের আয় বৃদ্ধি করেছিলেন। ষষ্ঠতঃ, মুর্শিদকুলি স্থানীয় বাজারের উপরে কড়া নজর রাখতেন। বাজারের ওজন ও জিনিসপত্রের দামের ক্ষেত্রে তিনি সরকারি কর্মচারী মারফৎ তদারকি ব্যবস্থা চালু রেখেছিলেন। তাঁর সময়ে কেউ ওজনে কম দিলে, কোনভাবে ক্রেতাদের ঠকালে বা বেশি দাম নিলে তিনি সেই ব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তি দিতেন। তাঁর সময়ে ১৭১১ সালে বঙ্গদেশে একবার অল্পকালের জন্য খাদ্যশস্যের কিছুটা ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। তখন মুর্শিদকুলি তৎক্ষণাৎ বাংলা থেকে খাদ্যশস্যের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে, এবং মজুদ শস্য উদ্ধার করে কঠোরভাবে সেই সমস্যার মোকাবিলা করেছিলেন। এর ফলে ওই খাদ্যাভাব স্থায়ী হতে পারেনি।
(তথ্যসূত্র:
১- হিস্টোরিক্যাল এন্ড কম্পারেটিভ এ্যানালিসিস অব দ্য ফিনান্সেস অব বেঙ্গল: ১৭৮৬, ফিফথ রিপোর্ট, ২য় খণ্ড, জেমস গ্রান্ট।
২- হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, ২য় খণ্ড, যদুনাথ সরকার সম্পাদিত।
৩- তারিখ-ই-বাঙ্গালা, সলিমুল্লাহ।
৪- মুর্শিদকুলি এ্যান্ড হিজ টাইমস, আবদুল করিম।
৫- এগ্রেরিয়ান সিস্টেম অব মোসলেম ইণ্ডিয়া, ডব্লিউ. এইচ. মোরল্যাণ্ড।)
৪
৪ মন্তব্য