Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ মে, ২০২৩ ০৪:৪৮ অপরাহ্ণ

কমরেড বা নকশাল কী? ইতিহাসটা বিস্তারিত জানাবেন কি?

মানব সমাজের বিকাশ কখনো সরলরেখায় চলে না। তার পথ আঁকাবাঁকা। পথ ঠিক থাকলে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, অনেক পাকদণ্ডি অতিক্রম করতে হলেও সে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে ঠিক এসে পৌঁছবেই , আর পথ ভুল হলে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে । নকশালবাড়ি আন্দোলনের ইতিহাসও এর ব্যাতিক্রম নয়। নকশালবাড়ি একটি আন্দোলনের নাম। নকশালবাড়ি একটি আদর্শের নাম। একটি লড়াইয়ের নাম। এই লড়াই শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি থানা এলাকায়। নকশালবাড়ি নেপাল সীমান্তঘেঁষা সীমান্ত নদী মেচির ভারতীয় তীরের একটি শহর।

নকশালবাদ বা বামপন্থী উগ্রবাদ বলতে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অনুসরণ করে বিভিন্ন কমিউনিস্ট গেরিলা গোষ্ঠীর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে সহিংসতার ব্যবহার বোঝায়।যারা এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং এই মতাদর্শে বিশ্বাসী তাদেরকে সংক্ষেপে নকশাল বলা হয়।

main-qimg-f5689eee552798accfb807d41faff86d-lq

নকশালবাদ নামটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি গ্রাম থেকে উদ্ভূত যা ষাটের দশকে স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি উপজাতি কৃষক বিদ্রোহের কেন্দ্র ছিল। পরবর্তীতে এই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। শীঘ্রই উগ্রবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে নকশালবাড়ি নামটি মিশে যায়।

  • নকশাল আন্দোলন এর সূচনা:

১৯৬৫/৬৬ সাল নাগাদ সদ্য গঠিত CPIM–এর “শিলিগুড়ি গ্রুপ” ৫/৬টা সাইক্লোস্টাইল করা লিফলেট পায় যেখানে আগামী ছয় মাসের মধ্যে তরাই অঞ্চলে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়া ছিল। সমগ্র ১৯৬৬ সাল জুড়ে ক্ষেত মজুর/কৃষকরা তীর-ধনুক, রাইফেল প্রভৃতি সংগ্রহ করতে থাকেন। পাশাপাশি পাশের দেশ নেপালের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সাথে চলতে থাকে যোগাযোগ। ১৯৬৬-র শেষের দিকে কৃষকরা নিজেদের মধ্যে একটি মিটিং করেন।

১৯৬৭ সালের মে মাসে দার্জিলিং এর নকশালবাড়ি নামের এক গ্রামের জনৈক বিমল/বিগুল কিষান আদালত থেকে তার নিজের জমি চাষ করার অনুমতি পান। কিন্তু স্থানীয় জোতদারদের গুন্ডারা সেই জমি ছিনিয়ে নেয়। চারু মজুমদার এবং কানু স্যান্যালের নেতৃত্বে গ্রামের নিম্নবর্গ মানুষ জোতদারদের আক্রমন করে জমি ফিরিয়ে দেবার দাবি জানায়। বেঙ্গাইজোত গ্রামে ১৯৬৭ সালের ২৫ মে চারু মজুমদারের নেতৃত্বে জড়ো হয়েছিলেন ভূমিহীন কৃষকেরা। হুংকার তুলেছিলেন লাঙল যার জমি তার, নকশালবাড়ির পথ বিপ্লবের পথ, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস ইত্যাদি স্লোগানে। বেঙ্গাইজোত গ্রামকে আজ বলা হয় নকশালবাড়ি আন্দোলনের আঁতুড়ঘর।

২৩শে মার্চ তারিখে নকশালবাড়ির ঝারুগ্রামে কৃষকরা এক পুলিশ ইন্সপেক্টরকে গুলি করে খুন করে পুলিশের আক্রমণের পাল্টা হিসাবে। ২৫শে মার্চ পুলিশ পাল্টা আক্রমণ করে। বেপরোয়া গুলি চালনায় মহিলা ও শিশু সমেত ৯ জন শহীদ হন। এতে করে কৃষকদের লড়াই আরও ঘনীভূত হয়। জুন মাসে গিয়ে কৃষকরা আরও বেশ কিছু জোতদারদের আক্রমণ করে ও তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু অস্ত্র লুঠ করে। গণআদালত তৈরি করা হয় ও সেখানে জোতদারদের বিচার করা হয় ও শাস্তি বিধান করা হয়। জুলাই মাস অবধি এই কৃষকদের এই লড়াই প্রবাল ভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে পাশের অঞ্চলগুলিতে বিশেষত খড়িবাড়ি ও ফাঁসিদেওয়াতে। চা বাগানের শ্রমিকেরাও একাধিক ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে কৃষকদের এই লড়াইকে সমর্থন জানায়। ১৯শে জুলাই একটি বিশাল প্যারামিলিটারির দলকে এইসব অঞ্চলে পাঠানো হয় আন্দোলনকে কব্জা করবার জন্য। ব্যাপক ধরপাকড় ও অত্যাচার শুরু হয়। কয়েকশো মানুষ আহত হন এবং হাজারের ওপর গ্রেপ্তার হন। জঙ্গল সাঁওতাল গ্রেপ্তার হন, চারু মজুমদার আত্মগোপন করেন। ত্রিবেণী কানু, শোভন আলি, গোর্খা মাঝি, তিরকা মাঝি প্রভৃতি শহীদ হন।

main-qimg-841031b1afa07177bee68180585e95db-lq

আন্দোলন দমানোর জন্য তৎকালীন স্বরাস্ট্রমন্ত্রী জ্যোতি বসুর পুলিশ আসে নকশালবাড়ি থানা থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে বেঙ্গাইজোত গ্রামে। গ্রামের নেতারা পুলিশ আসার খবর পেয়ে নারীদের সামনে ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেন। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আটজন নারী। ছিলেন একজন পুরুষ আর দুই শিশু।তারপর পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায় আন্দোলনকারীদের ওপর। রক্তাক্ত হয় বেঙ্গাইজোত গ্রাম। দুই মাসের মধ্যেই পুলিশ এই আন্দোলনকে চাপা দিয়ে ফেললেও এর আদর্শ খুব শিঘ্রিই পুরো বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নকশালবাড়ি আন্দোলনের সূচনা করে যা পরবর্তী পাঁচ বছর স্থায়ী হয়।

অবশ্য ১৯৬৭ এর দু'বছর পূর্ব থেকেই, নকশালবাড়িতে বিদ্রোহের বীজ রোপন করছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্কসবাদী (সিপিআই-এম) এর কর্মীরা, যা সিপিআই এর একটি বিভক্ত গোষ্ঠী। সিপিআই-এম এর অনুগতরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিল যে যখন শ্রমিক এবং কৃষকরা বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করবে তখনই প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব হবে। ২৫ মার্চ নকশালবাড়ির ঘটনার পরে তারা ভেবেছিল, সেই মুহুর্তটি এসে গেছে। সিপিআই-এম এর অন্যতম নেতা চারু মজুমদারের মতে, "সকল ক্লাসিক্যাল বার্তা নিয়ে দেশে একটি চমৎকার বৈপ্লবিক পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল।"

  • নকশালবাড়ি আন্দোলনকে চীনের স্বীকৃতি :

২৮শে জুন, ১৯৬৭। পিকিং রেডিও ঘোষণা করে – “A phase of peasants’ armed struggle led by the revolutionaries of the Indian Communist Party has been set up in the countryside in Darjeeling district of West Bengal state of India. This is the front paw of the revolutionary armed struggle launched by the Indian people……”

৫-ই জুলাই ‘পিপলস ডেইলি’-র লিখল, “A peal of spring thunder has crashed over the land of India. Revolutionary peasants in Darjeeling area have risen in rebellion. Under the leadership of a revolutionary group of the Indian Communist Party, a red area of rural revolutionary armed struggle has been established in India….. The Chinese people joyfully applaud this revolutionary storm of the Indian peasants in the Darjeeling area as do all the Marxist-Leninists and revolutionary people of the world.

  • নকশাল আন্দোলনের মতাদর্শ:

বামপন্থী মতাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বেশিরভাগ কৃষক এবং অবাঞ্ছিত শ্রেণীর দ্বারা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হিংসার ঘটনা বারবার ঘটেছে, এটা ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে। কৃষক ও দরিদ্রদের এই হিংসাত্মক আন্দোলন এবং বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিচ এঙ্গেলসের লেখা দ্বারা সরবরাহ করা হয়েছিল। এই মতাদর্শকে সাধারণত কমিউনিজম বা মার্কসবাদ বলা হয়। পরে যথাক্রমে লেনিন এবং মাও সেতুং তাদের রাশিয়া এবং চীনে স্ব স্ব আন্দোলনের মাধ্যমে এটি সমর্থন করেছিলেন।

বামপন্থী মতাদর্শগুলি ধরেই নিয়েছে যে কোনও উচ্চবিত্ত বা পুঁজিবাদী সমাজে বিদ্যমান সমস্ত সামাজিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রকৃতির দ্বারা শোষণজনক এবং হিংসাত্মক উপায়ে বিপ্লবী পরিবর্তনই এই শোষণকে শেষ করতে পারে। মার্কসবাদ হিংস্র শ্রেণিবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে পুঁজিবাদী বুর্জোয়া উপাদানগুলির অপসারণের পক্ষে।
মাও সেতুংয়ের আদর্শের ভিত্তিতে মাওবাদ হ’ল আরও একটি মতবাদ যা গণআন্দোলন এবং কৌশলগত জোটের পাশাপাশি একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের সংমিশ্রনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে শেখায়। মাও এই প্রক্রিয়াটিকে বলেছিলেন, ‘‘ দীর্ঘায়িত জনগণের যুদ্ধ ’’। মাওবাদী আদর্শ সহিংসতার ব্যবহারকে মহিমান্বিত করে এবং অতএব, মাওবাদী বিদ্রোহের মতবাদ অনুসারে ‘অস্ত্র বহন অ-আলোচনাযোগ্য’। মূলত, মাওবাদ শিল্প-গ্রামীণ বিভাজনকে পুঁজিবাদের দ্বারা শোষিত একটি প্রধান বিভাগ হিসাবে বিবেচনা করে।

main-qimg-93587affad9e7a9fea15088906235c88-lq

মাওবাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ‘শোষণকারী শ্রেণি এবং তাদের রাষ্ট্র কাঠামোর বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক মানুষের বিপ্লবী সংগ্রাম’ জোর দিয়েছে। এর সামরিক কৌশলগুলি গেরিলা যুদ্ধ কৌশলগুলি গ্রামাঞ্চল থেকে শহরগুলি ঘিরে ফেলার উপর জড়িত রয়েছে, সমাজের নিম্ন শ্রেণীর জনগণের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে রাজনৈতিক রূপান্তরকে জোর দিয়েছিল।

মাওবাদীদের মূল স্লোগান হ’ল ‘বন্দুকের নল থেকে রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়’। তারা প্রায়শই গেরিলা যুদ্ধে জড়িত হয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের (সরকার ও আইন প্রয়োগকারী) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য পল্লী জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশকে জোর করে জড়ো করে তোলে। আজ মাওবাদ কেবল আদর্শিক আন্দোলন নয়। মাওবাদীরা এখন একটি ভীতি মানসিকতা তৈরি করছে এবং আদিবাসীদের গণতন্ত্র এবং বিকাশকে অস্বীকার করছে।

main-qimg-5f16680daf2f0dc166e8d7b894e25caa-lq

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সহিংস নিয়ন্ত্রণের সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক গণআন্দোলনের মত নয়, নকশালরা তাদের নিজস্ব একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে সরে আসার চেষ্টা করে না তবে তাদের লক্ষ্য , একটি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা এবং তথাকথিত ‘জনগণের সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা

  • নকশাল আন্দোলনের নেতৃত্ববৃন্দ:

নকশাল আন্দোলনের প্রানপুরুষ চারু মজুমদার ছিলেন চিরকালীন বিপ্লবী। এছাড়াও কানু সান্যাল, জঙ্গল ইত্যাদি নেতারাও এতে যোগদান করেন। গনতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ে গেরিলা পদ্ধতির প্রতিই তার ঝোঁক বেশি ছিল।রাতারাতি চারু মজুমদার পশ্চিমবঙ্গই না শুধু, গোটা ভারতের বিশেষ করে তরুন সমাজের নায়কে পরিনত হন। গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষ এই আন্দোলনকে তাদের দুর্দশাগ্রস্থ জীবন থেকে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র পথ হিসেবে দেখতে শুরু করে। ভোটের রাজনীতি যেহেতু স্বাধীনতার বিশ বছর পরও তাদের তেমন কোন কাজে আসেনি, তাই এই সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে বিভোর হয় ভারতের প্রায় অর্ধেকের বেশি জনসাধারন।

main-qimg-ae2187b0ea8293d7ce84e33cffe3bc13-lq

এদিকে চারু মজুমদার নিজে চীনের মাও সে তুংয়ের সাফল্য ও কর্মকৌশল দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। মাও ক্ষমতাসীন অভিজাতদের উৎখাত করে চীনের সাধারণ ও শোষিত জনগণকে সংগঠিত এবং নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে চমৎকার দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। চারু মজুমদার পশ্চিম বাংলার প্রেক্ষাপটে মাও-এর মতবাদ প্রচার করেন। তিনি ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার সাথে মানানসই কৌশল প্রণয়ন করেন। তার ঐতিহাসিক 'আট নথি' নকশাল মতাদর্শ উৎসাহিত করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক বিদ্রোহীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।

নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বিখ্যাত নাট্যকার উৎপল দত্ত। মানুষটি বরাবরই খাপখোলা তলোয়ার। টিনের তলোয়ার নয়, সত্যিকারের ইস্পাতের ফলার মতো তাঁর ধার। নিজের থিয়েটার হোক বা রাজনৈতিক জীবন—সবখানেই তিনি স্পষ্টবক্তা। তাঁর থিয়েটার নিয়ে যেমন চর্চার শেষ নেই, তেমনই তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কও অন্তহীন। নিজেকে ‘প্রোপাগান্ডিস্ট’ বলতে তিনি দ্বিধা করেন না। থিয়েটার তাঁর কাছে দিন বদলের হাতিয়ার। সেই বিশ্বাস থেকেই একটা সময়ে প্রত্যক্ষভাবে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শুধুমাত্র নৈতিক সমর্থন বা নাটক লিখে নয়, ছদ্মনামে অস্ত্রশস্ত্রের কনসাইনমেন্ট ডেলিভারির দায়িত্ব পর্যন্ত নিয়েছিলেন তিনি। যার পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর ‘Towards a Revolutionary Theatre’ গ্রন্থে।

  • নকশাল আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা:

নকশাল আন্দোলন থেকে নারীকে একপ্রকার ব্রাত্য করে দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি না নকশালবাড়ির শহীদ নারী ধনেশ্বরীর জীবনের গল্প। জানি না নকশাল আন্দোলনের নারী কর্মী শান্তি মুণ্ডার কথা। মধ্যবিত্ত আরবান পুরুষ , মিডলক্লাস নকশাল আন্দোলনের উপখ্যান থেকে তাদের হটিয়ে দিয়ে নিজেরা জায়গা করে নিয়েছে। নকশাল আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ হলেন চারু মজুমদার বা সংক্ষেপে ‘সিএম’। সিএম-এর স্ত্রী ছিলেন লীলা মজুমদার সেনগুপ্ত। লীলা মজুমদার নিজে পার্টি মেম্বার ছিলেন,আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আবার সংসার সামলেছেন। শুধু তাই নয় অসুস্থ শ্বশুরের সেবা থেকে শুরু করে পার্টি ও পরিবারের মধ্যমণি ছিলেন লীলা মজুমদার। পার্টি কমরেডরা লীলা মজুমদারকে লীলাদি বলে জানতেন; সেই লীলাদি বা লীলা মজুমদার কিন্তু ইতিহাসে নেই। এরকম ভাবেই একপ্রকার ব্রাত্য হয়ে আছেন, আরজা বেগম, ঝর্না খাতুন, ফুলি গোলদার, হেমলতা রায়, অরুনা চৌধুরী ,আরিফা বেগম, শেখরের মা, ইভা, দীপ্তি, মনোয়ারা সিদ্দিকী ছবি প্রভৃতি নারীরা। এই নিয়ে আরো জানতে, ভারতীয় ইতিহাস গবেষক শ্রীলা রায়ের ‘রিমেম্বারিং রেভল্যুশন’ বইটি প সেখানে নকশাল আন্দোলনে নারীর কথা জানতে পারবেন।

  • নকশাল আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য :

তাদের উদ্দেশ্য ছিল সেসব বড় জমিদারদের কাছ থেকে জমি ছিনিয়ে নেওয়া এবং কৃষক ও ভূমিহীন শ্রমিকদের মধ্যে তা বিতরণ করা। এরই প্রেক্ষিতে নক্সালবাদের জন্ম হয়। এছাড়াও, নকশাল আন্দোলনের পেছনের কারণ হিসেবে অনেক পর্যবেক্ষক অসম্পূর্ণ কৃষি সংস্কারকে চিহ্নিত করেন। চরম দারিদ্র্য, ভূমিহীন চাষীদের শোষণ, যাদের অধিকাংশই দলিত ও উপজাতি সম্প্রদায়ের অংশ, এবং প্রশাসনের কর্তৃক সামাজিক ন্যায়বিচারের বঞ্চনা জনসাধারণ এবং বামপন্থী নেতাদের মধ্যে চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পরে সরকার কৃষি সংস্কারের অংশ হিসেবে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে। তবে কিছু দলের প্রতিবাদের কারণে জমি পুনঃবিতরণ করা সম্ভব হয়নি।

main-qimg-2936e8c55ffb70d2d608b7c61ae39d8a-lq

বিপ্লবীদের নীতি ছিল জমির মালিকানা তথাকথিত মালিকপক্ষ থেকে কেড়ে নিয়ে সেখানে চাষীদের পূনর্বাসন করা এবং পুলিশ বা প্রশাসন মালিকের পক্ষ নিলে তাদেরকেও সশস্ত্র হামলা করা। বাংলার বেশ কিছু জায়গা নকশালদের পুরোপুরি দখলে চলে যায়। সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহন করে উপজাতি সম্প্রদায় যারা বছরের পর বছর যাবৎ শুধু নিগৃহিতই হয়েছে।

  • নকশালি ভাবধারার বিস্তার:

নকশালিজমের উত্থানকে বিস্তৃতভাবে তিনটি পর্যায়ে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে।

প্রথম স্তর: ১৯৬৭-১৯৭৫
দ্বিতীয় স্তর: ১৯৭৫-২০০৪
তৃতীয় স্তর: ২০০৪ – বর্তমান

নকশালবাদী দলগুলো সাধারণত ভারতীয় সমাজের দরিদ্রতম এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক সদস্যদের, বিশেষ করে উপজাতি জনগোষ্ঠী এবং দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। কয়েক দশক ধরে এখনও তারা ভূ-স্বামী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মতো লক্ষ্যবস্তুদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। নকশালবাদী গোষ্ঠীগুলো পূর্ব ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে, বিশেষ করে অন্ধ্র প্রদেশ, বিহার, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল এবং তাদের প্রভাব এই অঞ্চল ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত আকারে পুরো ভারতেই ছড়িয়ে পড়ে।

main-qimg-77ecb3e04aa7c84d4c894e4f14d6ee56-pjlq

১৯৬৮ সালে এই আন্দোলন আরও বেড়ে যায় যখন কৃষকদের একদল পুলিশ অফিসারদের আক্রমণ করার জন্য গেরিলা স্কোয়াডে নিজেদের সংগঠিত করে। নকশাল আন্দোলনের শিকড় জড়িয়ে ছিল তেলেঙ্গানা সংগ্রাম এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সাথে। ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ের মধ্যে দক্ষিণ ভারতের ২,৫০০টি গ্রাম মিলে কৃষক আন্দোলনের অংশ হিসাবে 'কম্যুন' গঠন করা হয়, যা তেলেঙ্গানা সংগ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করে। বিখ্যাত অন্ধ্র থিসিসও এর একটি অংশ।

  • শিক্ষিত সমাজ ও ছাত্র-ছাত্রীদের যোগদান:

অবিশ্বাস্যভাবে কলকাতার শীর্ষস্থানীয় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির ছাত্রছাত্রীরাও সমাজ বদলের রোমান্টিসিজমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বই-খাতা ফেলে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। কলকাতার প্রায় সমস্ত কলেজ-এ নকশালবাড়ির সমর্থনে ছাত্ররা Progressive Students Coordination Committee-র ব্যানারে ছাত্র ইউনিয়নগুলি দখল করে নিল। প্রেসিডেন্সী কলেজ, হিন্দু কলেজের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিদিন রাজপথের দখল নিতে শুরু করল; অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর মেডিক্যাল কলেজ নকশালবাড়ির আন্দোলনকে সমর্থন করল। গড়ে তোলা হল Naxalbari Solidarity Committee.

ষাটের দশকে সারা পৃথিবী জুড়েই তরুন সমাজের মধ্যে একটা অস্থিরতা চলছিল। নিয়ম রীতিকে ভেঙ্গে চুড়ে নিজের মত করে তৈরী করার একটা প্রবনতা সেসময় ইউরোপ, আমেরিকায় প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। বাংলার যুবসমাজও এই নিয়মভাঙ্গার উচ্চাশায় নকশালবাদী দলে যোগ দেয়। ছাত্র এবং কৃষকদের সমন্বয়ে গঠিত এই নব্যবিপ্লবীর দল ধনিক শ্রেনীর মূর্তিমান আতঙ্কে পরিনত হয়।

  • আন্দোলনের তীব্রতা ও সরকারের দমন নীতি ও আন্দোলনের দূর্বলীকরণ:

১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়টি ছিল নকশালদের সহিংস কর্মকাণ্ডের শীর্ষ সময়। সরকারও সহিংসতা ও নির্মমভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ওড়িশার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলগুলিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানের ফলে আন্দোলনের প্রায় সব শীর্ষ নেতার গ্রেপ্তার ও মৃত্যু হয়েছিল। চারু মজুমদার ধরা পড়ে ১৯৭২ সালে পুলিশ হেফাজতে মারা যান। ১৯৭৫ সালে প্রায় ৪০,০০০ কর্মীকে কারাবন্দী করা হলে জরুরি অবস্থার সময়ে এই আন্দোলন মারাত্মক ধাক্কা খায়।

পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারন করলে কেন্দ্রের সরকার যেকোন উপায়ে নকশালদের দমননীতি গ্রহন করে। হাজার হাজার বিপ্লবীকে কোনরকম বিচার ছাড়াই পুলিশ সরাসরি গুলি করে বা থানায় এনে নির্মম অত্যাচার করে হত্যা করা হয়। ১৯৭০ সালে শীর্ষনেতা কানু স্যানাল পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। গোটা একাত্তর জুড়ে চলতে থাকে এই দমন এবং সরকার চারু মজুমদার ছাড়া প্রায় সব নেতাকে গ্রেফতার বা হত্যা করতে সক্ষম হয়। নেতা-কর্মী দুই দিকেই এত বেশি ক্ষতিসাধন হয় যে চারু মজুমদারের একার পক্ষে আর এই আন্দোলন চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। যেসব নব্যবিপ্লবী তখনও ধরা পড়েনি, তারাও পুলিশের ভয়ে গা ঢাকা দেয়া শুরু করে।

main-qimg-289a928db5bc7f216af9b196d0c8c6c9-lq

প্রশাসনের এই অত্যাচার ছাড়াও পার্টির অন্তর্কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। চারু মজুমদারের অনেক কমরেডও তার শ্রেনীশত্রু খতম নীতির বিরোধীতা করেন। শুধুমাত্র ধনী হবার কারনেই হত্যা করার যে পরিকল্পনা কমরেড চারু নিয়েছিলেন, সেটা সমালোচিত হয়। ফলে পার্টি বহুধাবিভক্ত হয়ে যায়। এই বিভক্তি সরকারকে নকশাল দমনে সাহায্য করে

  • নকশাল আন্দোলনের পরিসমাপ্তি:

অবশেষে আন্দোলনের প্রধান নেতা, চারু মজুমদার ১৯৭২ সালের ১৬ই জুলাই তার সহকর্মী দীপক বিশ্বাসের বিশ্বাসঘাতকতার কারনে ধরা পড়েন। ১২ দিনের প্রচন্ড পুলিশ নির্যাতনের পর জুলাইয়ের ২৮ তারিখে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর সাথে সাথে আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পতন ঘটে।

main-qimg-de53e3bec33dc317507ae4a711de7b00-lq

এরপরও বিভিন্ন জায়গায় ছোটখাট কিছু গ্রুপ তাদের আন্দোলন চালানোর চেষ্টা করলেও সফলতা পায়নি। সাতের দশকের শেষভাগে নকশাল আন্দোলনের পুরোপুরি মৃত্যু ঘটে। অপর শীর্ষনেতা কানু স্যান্যাল জ্যোতি বসুর সরাসরি হস্তক্ষেপে ১৯৭৭ সালে জেল থেকে মুক্তি পান এবং নির্বাচনভিত্তিক গনতান্ত্রিক রাজনীতি শুরু করেন। বিষ্ময়করভাবে ২০১০ সালে ৭৮ বছর বয়সী কানু গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার তেমন কোন কারন জানা যায় নি। মোটামুটি ১৯৭২ সালের মধ্যে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়।

  • নকশাল আন্দোলনের ব্যর্থতার সম্ভাব্য কারণসমূহ:

নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, তা সে ধরে রাখতে পারে নি। একাধিক কারন আছে তার। সংক্ষেপে সেগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে।

• তৎকালীন বিপ্লবের স্তর ও বিপ্লবী শক্তির ক্ষমতা সম্পর্কে বোঝাপড়ায় ভুল;
• জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থা সম্পর্কে ভুল বিশ্লেষণ,
• Subjective Factor সম্পর্কে ভুল বিশ্লেষণ;
• মূল্যায়নের নামে মনীষীদের অপমান ও তাদের মূর্তি ভাঙ্গার রাজনীতি,
• দেশের মনীষী ফেলে “চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান” জাতীয় ভুল শ্লোগানের ব্যবহার;
• ব্যক্তি হত্যার রাজনীতিও এই আন্দোলনের বড় ক্ষতি করেছিল। এ প্রসঙ্গে পরবর্তীতে করা একটি সমালোচনার উল্লেখ প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

All forms of struggle are subordinate to, and are guided by the concrete political line. If the concrete political line deviates from the mass line, the forms of struggle cannot but be otherwise….. So in order to negate the line of annihilation, we have to negate the wrong ideology which is alien to Marxism and its consequential political and organisational manifestations….. The problem is not whether the class enemy will be annihilated or not ….. Rather the problem is, whether the party should adopt the mass line or not …. Every Marxist-Leninist Party must propagate revolutionary violence which may express itself in various forms of struggle; one of which may be annihilation of class enemies.”

• গণআন্দোলন ইত্যাদিতে গুরুত্ব না দেওয়া;
• ছোট সাফল্যকে অতিরিক্ত বড় করে দেখানো;
• যুক্তফ্রন্ট গড়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা;
• ভুল পদ্ধতিতে শহরে গেরিলা আন্দোলন গড়ে তোলা;
• সংগঠনের ভিতর আমলাতান্ত্রিক ঝোঁক।

  • নকশাল আন্দোলনের প্রভাব:

চারু মজুমদার বলেছিলেন, “”Hundreds of Naxalbaris are smoldering in India……. Naxalbari has not died and will never die.”

যদিও এই বিদ্রোহ খুব দ্রুতই দমন করা হয়, তবু এটি বেশ কিছু কমিউনিস্ট-নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে যা প্রাথমিকভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতে এবং পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে এটি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের রূপ নেয়। এই আন্দোলন দ্রুত রাজ্য সরকারের ক্ষোভের মুখোমুখি হয় এবং পুলিশ নির্মমভাবে বিদ্রোহীদের দমন করতে শুরু করে। তা সত্ত্বেও, আগামী দশকগুলোতে নকশালবাড়ি বিদ্রোহ ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়।

main-qimg-4a2d15c3699b68fd8c2ae4c521cf9736-lq

ভারতের জাতীয় ও রাজ্য সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে নকশাল গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং এদের অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী গেরিলা আক্রমণ মোকাবেলা এবং বিদ্রোহীদের তাদের অভয়ারণ্য থেকে বের করে দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। যদিও এই অভিযানগুলোর সাফল্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

নকশালবাড়ি আন্দোলন বছরখানেকের মধ্যে অনেকটা স্তিমিত হয়ে এলেও অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, আজ পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পরও সেই আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা এবং তাৎপর্য বিন্দুমাত্র হারিয়ে যায়নি। এটি স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে আমূলভাবে বদলে দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: রোর মিডিয়া, প্রথম আলো, সামহোয়্যার ব্লগ, বঙ্গদেশ ব্লগ, ফিরে দেখা ব্লগ, নকশাল আন্দোলন এর ইতিকথা, ইত্যাদি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ