সহকারী শিক্ষক
১৭ জুলাই, ২০২৩ ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘সুভাষচন্দ্রের জাতীয় পরিকল্পনার পটভূমিকা’
(প্রথম পর্ব)
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২১ সালে দেশের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে ১৯২১ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী তারিখে কেমব্রিজ থেকে সুভাষচন্দ্র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আপনি বাংলাদেশে আমাদের সেবাযজ্ঞের প্রধান ঋত্বিক - তাই আপনার কাছে আমি আজ উপস্থিত হয়েছি - আমার যৎসামান্য বিদ্যা, বুদ্ধি, শক্তি ও উৎসাহ নিয়ে মাতৃভূমির চরণে উৎসর্গ করবার আমার বিশেষ কিছুই নাই - আছে শুধু নিজের মন এবং নিজের তুচ্ছ এই শরীর। আপনাকে এই পত্র লেখার উদ্দেশ্য - শুধু আপনাকে জিজ্ঞাসা করা আপনি আমাকে এই বিপুল সেবাযজ্ঞে কি কাজ দিতে পারেন। ... আমি আজ প্রস্তুত - আপনি শুধু কর্মের আদেশ দিন।” যে সেবাযজ্ঞের প্রতিজ্ঞা নিয়ে সুভাষচন্দ্র ‘I. C. S. Probationer’-এর পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেটার সার্থক রূপায়ণ পরবর্তী সতেরো বছরের মধ্যে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসে সভাপতির ভাষণে স্বাধীন ভারতের অর্থ নৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা সম্পর্কে সুভাষচন্দ্রের সুচিন্তিত কর্মসূচী এটাই প্রমাণ করে যে, আক্ষরিক অর্থে একজন অর্থনীতিবিদ না হয়েও এই অমর দেশপ্রেমিক ও নেতা দেশের অর্থনীতি নিয়ে যা ভেবেছিলেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও সেটার প্রাসঙ্গিকতা খুবই বেশী। এই প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্রের সমকালীন ভারতে দেশের অর্থনৈতিক চিন্তা প্রবাহ কিভাবে প্রবাহিত হয়েছিল, সে সম্পর্কে একটি সাময়িক ধারণা থাকবার দরকার রয়েছে। ১৯২১ সালের পর থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ভিত্তিতে পরাধীন ভারতে পুরোপুরিভাবে ‘গান্ধীযুগ’ আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। গান্ধীজী যেভাবে দেশের অর্থনীতিকে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন সেটার মূল সূত্রগুলি ছিল – (১) স্বদেশী আন্দোলন, ঘরে ঘরে খাদি ও চরকার প্রবর্তন এবং গ্রামীণ কুটির শিল্পের পুনরুজ্জীবন; (২) বৃহৎ শিল্পের উন্নয়নের প্রতি অনীহা; (৩) শিল্পক্ষেত্রে অছি নীতির (Principle of Trusteeship) প্রবর্তন, অর্থাৎ ধনী ব্যক্তিদের মনের পরিবর্তন ঘটিয়ে অর্থনৈতিক সম্পদের যাতে কেন্দ্রীয়করণ (concentration of economic power) না হয় সেই ব্যবস্থা করা; (৪) শোষণের অভাব; (৫) অপরিগ্রহ (Non-possession); (৬) মূলধন নিবিড় উৎপাদন পদ্ধতির প্রতি অনীহা; (৭) অর্থনীতির উপরে সরকারী নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা; ও (৮) আধুনিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতি উৎসাহের অভাব। এই প্রসঙ্গে অছি ব্যবস্থা সম্পর্কে গান্ধীজীর উক্তিটি অবশ্য উল্লেখ্য। গান্ধীজী ধনী ব্যক্তিদের সমাজের অছি করতে চেয়েছিলেন। একদা সেই প্রসঙ্গে গান্ধীজীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “Q. You have asked rich men to be trustees. Is it implied that they should give up private ownership in their property and create out of it a trust valid in the eyes of the law and managed democratically? How will the successor of the present incumbent be determined on his demise? In answer Gandhiji said that he adhered to the position taken by him years ago that everything belonged to God and was from God. Therefore it was for His people as a whole not for a particular individual. When an individual had more than his proportionate portion he became a trustee of that portion for God’s people. God who was all-powerful had no need to store. He created from day to day and did not stock things. If this truth was imbibed by the people generally, it would become legalized and trusteeship would become a legalized institution. He wished it would become a gift from India to the world ... As to the successor, the trustee in office would have the right to nominate his successor subject to legal sanction.” (Harijan, 23-2-1947) শিল্পক্ষেত্রে যন্ত্রের প্রবর্তন সম্পর্কে গান্ধীজীর উক্তিটিও এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, “There is no room for machines that would displace human labour and that would concentrate power in a few hands. Labour has its unique place in a cultured human family. Every machine that helps every individual has a place. But I must confess that I have never sat down to think about what that machine could be.” (M. K. Gandhi, Harijan, July 28th, 1946) স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি সুভাষচন্দ্রের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। কিন্তু গান্ধীজীর অছি ব্যবস্থা সম্পর্কিত নীতি, বৃহদায়তন শিল্পগুলির উন্নয়নে অনীহা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সরকারী ক্ষেত্র সম্প্রসারণের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রভৃতিকে সুভাষচন্দ্র গ্রহণ করতে পারেননি। গান্ধীজী অর্থনীতিকে নীতিশাস্ত্রের (Ethics) সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত করতে চেয়েছিলেন। আধুনিক কল্যাণধর্মী অর্থশাস্ত্রে কিছু নৈতিক মূল্যবোধ স্বীকৃত হলেও সেই মূল্যবোধ গান্ধীজীর চিহ্নিত মূল্যবোধ থেকে আলাদা বলে দেখতে পাওয়া যায়। তবে বিদেশী দ্রব্য বর্জন ও বিদেশী বস্ত্রের বহ্ন্যুৎসবের ক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীকে সমর্থন করে বলেছিলেন, “দেশের মুক্তির জন্য যে শক্তি প্রয়োগের দরকার, সেই শক্তির প্রয়োগের ক্ষমতাই বর্জন আন্দোলনের অন্তর্নিহিত প্রকৃত স্বরূপ। দেশের তরুণ দলেরই এই কাজে সর্বাগ্রে অগ্রসর হওয়া উচিত। তাঁরা দেশের সর্বত্র ঘুরে বিদেশী বস্ত্র বর্জনের বাণী প্রচার করুন। প্রত্যেক বছর বিদেশী বস্ত্র আমদানির জন্য ১২০ কোটি টাকা ভারত থেকে বিদেশে চলে যাচ্ছে। যদি বিদেশী বস্ত্র বর্জন আন্দোলন সফল হয় তাহলে ম্যাঞ্চেষ্টারের মিলগুলি বন্ধ হয়ে যাবে। যাঁরা এতদিন ভারতের অর্থ শোষণ করছিল তাঁরাই সরকারকে ভারতের দাবি রক্ষা করার জন্য বাধ্য করবে।” তিনি আরও বলেছিলেন, “আমরা নিরস্ত্র হলেও সমাজ শক্তি আমাদের হাতে আছে। ইংরেজের জীবিকা নির্ভর করে আমাদের হাতে। প্রতি বছর ১২০ কোটি টাকার বিলাতী দ্রব্য আমাদের দেশে আমদানি হয় তার অর্ধেকই কাপড়। শাসনের নামে এই শোষণ চলছে। যদি আমরা এই শোষণের পথ রুদ্ধ করে দিই তবেই আমাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হবে। কামান-বন্দুকের চেয়েও বড়ো অস্ত্র অর্থনীতি।” স্বদেশী আন্দোলন বা বিদেশী দ্রব্য বর্জন, খাদির প্রচলন, গ্রামীণ শিল্পের পুনরুদ্ধার, কৃষকদের অবস্থার উন্নয়ন - এসব ক্ষেত্রে গান্ধীজীর সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের কোন মতভেদ ছিলনা। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা অত্যন্ত ব্যাপক ছিল। দেশের সর্বাঙ্গীন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দ্রুত শিল্পোন্নয়ন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবার চেষ্টা, শ্রমিক আন্দোলনের সম্প্রসারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে - সর্বোপরি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি কি হবে, অথবা স্বাধীনতালাভের পর দেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে - এসব নিয়েই সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে গান্ধীজীর মতভেদের সৃষ্টি হয়েছিল।
সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বে সুভাষচন্দ্রকে অর্থশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে হয়েছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের আগে থেকেই ভারতের মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা ও বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল। ‘লর্ড কেইস’ তাঁর প্রথম বইটি ‘Indian Currency System’-এর উপরে লিখেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ইংল্যাণ্ডে মুদ্রাসংকট দেখা দিয়েছিল, এবং সেটার প্রভাব ভারতের উপরেও দেখা গিয়েছিল। ১৯২০-২১ সালে টাকা ও পাউণ্ডের হার প্রথমে ৩৩ পেনি (২ শিলিং ১ পেনি) ও পরে ২০ পেনিতে (১ শিলিং ৮ পেনি) ঠিক রাখবার চেষ্টা করা হয়েছিল; কিন্তু, ইতিমধ্যে ষ্টার্লিং-এর দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য সেই চেষ্টা সম্ভবপর হয়নি। পরবর্তী পাঁচ বছরে চাহিদা ও যোগানের ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে ভারতীয় মুদ্রার সঙ্গে ব্রিটিশ মুদ্রার বিনিময় হার ক্রমশঃ নীচের দিকে নামতে শুরু করেছিল। তখনকার সেই সমস্যাটি সুভাষচন্দ্রের দৃষ্টি এড়ায়নি। সেই কারণে, ১৯২১ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের কাছে লেখা প্রথম চিঠিতে (১৬ই ফেব্রুয়ারী তারিখে) সুভাষচন্দ্ৰ লিখেছিলেন, “আমি যতদূর জানি Indian Currency and Exchange সম্বন্ধে আমাদের কংগ্রেসের কোনও definite Policy নেই।” (তরুণের স্বপ্ন, সুভাষচন্দ্র বসু, গোপাললাল সান্যাল সম্পাদিত, পৃ- ৩) একই বছরে দেশবন্ধুর কাছে লেখা দ্বিতীয় চিঠিতে (২রা মার্চ তারিখে) তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, “গত দশ বছরে ভারতবর্ষের অবস্থা আয় ও ব্যয় (Revenue and Expenditure) কত হয়েছে - কোন, কোন, দিক থেকে আয় হয়েছে এবং কোন, কোন, দিকে ব্যয় হয়েছে সে সম্পর্কে একটি বই প্রকাশ করতে হবে।” সেই চিঠিতেই তিনি আরও লিখেছিলেন, “Currency and Exchange সম্বন্ধে আমাদের Congress- এর কোন বিশিষ্ট Policy নেই। তারপর Labour and factory legislation সম্বন্ধেও কংগ্রেসের কোন বিশিষ্ট policy নেই। Vagrancy and Poor Relief সম্বন্ধে আমাদের কংগ্রেসের কোনও বিশিষ্ট Policy নেই। তারপর স্বরাজ পেলে আমাদের Constitution কি রকম হবে সে সম্বন্ধেও বোধ হয় কংগ্রেসের কোন বিশিষ্ট policy নেই। ... স্বরাজের ভিত্তির উপর আমাদের এখন ভারতের Constitution তৈরি করতে হবে।” (তরুণের স্বপ্ন, সুভাষচন্দ্র বসু, গোপাললাল সান্যাল সম্পাদিত, পৃ: ৫-৬) সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বার আগে থেকেই সুভাষচন্দ্র দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা ও সেটার সমাধান-কল্পে সম্ভাব্য নীতি সম্পর্কে নিজের চিন্তা-ভাবনা আরম্ভ করে দিয়েছিলেন।
স্বাধীনতা লাভের পরে ভারতে অর্থশাস্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণার মান অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছে, এবং সেসব ক্রমাগত আরো উন্নত হয়ে চলেছে। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের আমলে সেই গবেষণার মান প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। তারও আগে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ‘দাদাভাই নওরোজী’, ‘মহাদেব গোবিন্দ রানাড়ে’, এবং ‘রমেশচন্দ্র দত্ত’ তাঁদের গবেষণার দ্বারা ভারতের জাতীয় আন্দোলনের পথিকৃৎদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, দাদাভাই নওরোজী এবং রমেশচন্দ্র দত্ত উভয়েই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। দাদাভাই নওরোজী (১৮২৫-১৯১৭) ‘ড্রেন থিয়োরী’-র (Drain theory, অর্থাৎ, ভারত থেকে কিভাবে অর্থ ইংল্যাণ্ডে পাচার হচ্ছে) প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁর প্রধান বইটি ছিল ‘Poverty and UnBritish Rule in India’; তাঁর মতবাদের তিনটি বিশেষ ধারা ছিল - (১) ভারতীয়দের দারিদ্র্য, এবং সেই দারিদ্র্য মোচন করবার ক্ষেত্রে সরকারী চেষ্টার অভাব; (২) সরকারের ব্যয় বাহুল্য, ও সেই সঙ্গে গরীব জনগণের উপরে করের বোঝা চাপানো; এবং (৩) ভারত থেকে ব্রিটেনে একতরফাভাবে সম্পদ নির্গমন বা রপ্তানি যা ‘ড্রেন থিয়োরী’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। তখন ভারত থেকে বিদেশে ‘Home Charges’ বাবদ যে টাকা চলে যেত, সে সম্পর্কে নওরোজী প্রথমবারের জন্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সেযুগে ভারতীয়দের কাছ থেকে যে রাজস্ব আদায় করা হত, সেটার একটা বড় অংশ ইংরেজ প্রশাসকদের বেতন ও পেনশন দেওয়ার জন্য, অথবা তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি বিলাত থেকে কিনে আনবার জন্য খরচ করা হত। ইংরাজরা এদেশে যে টাকা খরচ করতেন, সেটা তাঁরা ভারতীয়দের কাছ থেকেই আদায় করতেন, এবং সেই আদায়ীকৃত রাজস্ব সোজা ইংল্যাণ্ডের রাজকোষে গিয়ে জমা হত। সেগুলিকে তখন বলা হত ‘Home Charges’, সেটার মাধ্যমেই তখন ভারতের সম্পদ বিদেশে চলে যেত। পরাধীন ভারতের দারিদ্র্য নিয়েও দাদাভাই নওরোজী একটি বিস্ময়কর গবেষণা করেছিলেন। তখনকার দিনে তথ্য সংগ্রহে অসম্পূর্ণতা থাকাটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দাদাভাই নওরোজী-ই প্রথম ভারতের জাতীয় আয়ের সমীক্ষা করেছিলেন। ১৮৭০ সালে নওরোজীর হিসাব অনুযায়ী, তখন ভারতের ১৫ কোটি জনসংখ্যার মোট জাতীয় আয় ছিল ৩০০ কোটি টাকা, এবং মাথাপিছু বাৎসরিক আয় ছিল ২০ টাকা।
১৯৩০ সালে সুভাষচন্দ্র একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যা থেকে সুভাচন্দ্রের অর্থনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়। সেই প্রবন্ধটির নাম ছিল - ‘ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্যের পঞ্চাশ বৎসর: ১৮৭৫-১৯২৫’ (সুভাষ রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ড, জয়শ্রী প্রকাশন, পৃ: ২৮৭-২৯৯); তেরো পৃষ্ঠা ব্যাপী সেই প্রবন্ধে সুভাষচন্দ্র ভারতের বাণিজ্যে ব্রিটেনের শতকরা অংশের ক্রমহ্রাসমান ধারা (১৯১৫-১৬ সাল বাদে, কেননা যুদ্ধকালে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণের জন্য সেই বছর ভারতীয় কাঁচামালের রপ্তানি বেড়ে গিয়েছিল), এবং গ্রেট ব্রিটেনের রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যে ভারতের শতকরা অংশ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছিলেন। উক্ত প্রবন্ধটিকে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ হিসাবে অভিহিত করলে কিছু অত্যুক্তি করা হয় না; এক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্রের বক্তব্যের উপরে দাদাভাই নওরোজীর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া সুভাষচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে তখনকার যে সব অর্থনীতিবিদের গবেষণামূলক আলোচনার উল্লেখ করেছিলেন, সেগুলি ছিল - ডক্টর বালকৃষ্ণের ‘Commercial Relations Between India and England’, অধ্যাপক সি. জি. হ্যামিলটনের ‘Trade Relation between England and India’, ডক্টর এস. জি. পানানডিকারের ‘Economic Consequences of the War for India’, এবং অধ্যাপক আর. এম. যোশীর ‘Indian Export Trade’। বলা বাহুল্য যে, বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে তাঁরা সবাই সুপরিচিত অর্থনীতিবিদ ছিলেন, এবং তাঁদের লেখার সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বেশ ভালভাবেই পরিচিত ছিলেন। উক্ত প্রবন্ধে সুভাষচন্দ্রের বক্তব্য পরীক্ষা করলে দেখা যায় যে, ১৯২১ সালে ইংরেজ সরকার ভারতে যে প্রভেদমূলক শিল্প সংরক্ষণের নীতি (Policy of Discriminating Protection) চালু করেছিল, ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপরে সেই নীতির প্রতিক্রিয়া তিনি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। সুভাষচন্দ্রের উক্ত প্রবন্ধ থেকে কয়েকটি অনুচ্ছেদ এখানে উদ্ধৃত করলে ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তিনি লিখেছিলেন -
“ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যে গ্রেট ব্রিটেনের শতকরা অংশ হ্রাসের কারণ খুঁজতে বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথম দিকে ওই দেশটির প্রাধান্যের কারণ ছিল সে ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্কের দরুণ যে সব অদ্ভুত সুবিধা ভোগ করত সেইগুলি। রাজনৈতিক দিক থেকে সে ছিল এ-দেশে অপ্রতিহত প্রভাবের অধিকারী। আমাদের বাণিজ্যকে প্রায় পুরোপুরি ব্রিটিশ জাহাজের উপর নির্ভর করতে হত; অধিকাংশ রপ্তানিকারী ও আমদানিকারী সংস্থা ছিল ব্রিটিশ; তেমনই ছিল বিনিময় ব্যাংকগুলি ও বীমা কোম্পানিগুলি। ভারতের রেলওয়ে বহুলাংশে ব্রিটিশ মূলধনের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং ব্রিটিশ বাণিজ্যের স্বার্থের পরিবর্ধক ব্রিটিশ জাহাজগুলির দ্বারা পরিচালিত হত। … কৃষিবিষয়ক শিল্পগুলির (তাদের কতকগুলির পেছনে ছিল ব্রিটিশ মূলধন) অনেকগুলির ব্রিটিশ বাজারে (যেমন চা, কফি) সরবরাহের উদ্দেশ্যে আরম্ভ ও উন্নয়ন করা হয়েছিল। সরকারের কৃষিনীতিও ব্রিটেনের রপ্তানি করার উদ্দেশ্যে পাট, তুলা, গম ও তৈলবীজের মতো কাঁচামাল ও খাদ্যশস্য উৎপাদনের উৎসাহদানের প্রতি নিবদ্ধ ছিল। পক্ষান্তরে উৎপন্ন পণ্যে ভারতের দাবি মেটানোর জন্য ব্রিটেন ছিল পৃথিবীর সর্বাগ্রগণ্য শিল্পোন্নত দেশ। কয়েকটি উৎপন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে (যেমন তুলাজাত পণ্য) ভারত সরকারের শুল্ক-বিষয়ক আইন আমদানিকে সরাসরি উৎসাহিত করত। ভারতের যে সব উৎপাদনকারী শিল্প ওই দেশের সঙ্গে আমাদের আমদানি বাণিজ্যের অগ্রগতি ব্যাহত করতে পারত, এই ধরনের আইন সেই-সব শিল্পের বৃদ্ধি পরোক্ষভাবে সীমিত করত। সুতরাং আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যে গ্রেট ব্রিটেনের আধিপত্য ছিল দুটি কারণের সম্মিলিত ফল: ওই দেশটির কাছে ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থ নৈতিক দাসত্ব এবং পৃথিবীর দেশগুলির মধ্যে গ্রেট ব্রিটেনের শিল্পগত শ্রেষ্ঠত্ব।”
‘মহাদেব গোবিন্দ রানাডে’ ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে তত্ত্ব ও বাস্তবের সংমিশ্রণের উপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। রানাডে বিশ্বাস করতেন যে, আপেক্ষিকতার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলিকে বিশ্লেষণ করতে হবে। তাঁর মত ছিল যে, সরকারী তত্ত্বাবধান ও সাহায্যে দেশের মোট সম্পদ বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। রানাডে ভারতের জন্য - “রাষ্ট্রীয় অভিভাবকত্বে ব্যক্তি-প্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা” - চেয়েছিলেন। (অর্থনীতির পথে, ভবতোষ দত্ত, পৃ- ৪৪) তাঁর মত ছিল যে, সরকারী সাহায্যে (সরকারী মালিকানায় নয় স্বল্পায়তন কৃষিক্ষেত্র বৃহদায়তন কৃষিক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে, কৃষির অনুপাতে যন্ত্রশিল্পের প্রাধান্য বাড়তে পারে, গ্রামের লোক জীবিকার আশায় শহরে আসতে পারেন, এবং গ্রামকে যথাসম্ভব শহরে রূপান্তরিত (urbanisation) করা যেতে পারে। একই সাথে তিনি আরো জানিয়েছিলেন যে, আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ কমিয়ে বহির্বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে, এবং ভারতীয় শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে। রানাডে মনে করতেন যে, ওই ভাবে দেশের সম্পদ বাড়ানো সম্ভব। তবে সম্পদ বেড়ে যাওয়ার পরে সেটার বণ্টন কিভাবে হবে সে সম্পর্কে রানাডে বিশেষ কিছুই বলেননি। পরাধীন ভারতে যন্ত্রশিল্পের উন্নতির জন্য রানাডে সরকার কর্তৃক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, গ্যারান্টি বা অর্থসাহায্য করে নতুন কারখানা প্রতিষ্ঠা করা, শ্রমিকদের চলাচলের সুবিধা করা, কারিগরী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রভৃতির উপরে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। রানাডে যদিও জার্মাণ লেখক ‘ফ্রেডরিক লিস্ট’ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তবুও তিনি লিস্টের শিল্প সংরক্ষণ নীতির খুব একটা সমর্থক ছিলেননা। তবে ১৮৯৯ সালের মে ও জুন মাসে ‘Indian Economics’ পত্রিকায় ছদ্মনাম ব্যবহার করে তিনি বিদেশী চিনির উপরে কর বসিয়ে দেশের চিনি শিল্পকে সাহায্য করবার কথা বলেছিলেন। (অর্থনীতির পথে, ভবতোষ দত্ত, পৃ- ৪৭) সুভাষচন্দ্রও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্পোন্নয়ন, সরকারী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ এবং গ্রামাঞ্চলকে শিল্পোন্নত অঞ্চলে ও শহরে রূপান্তরিত করবার (urbanisation) প্রচেষ্টার উৎসাহী সমর্থক দিলেন। সেক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্রের উপরে রানাডে-র প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়।
রমেশচন্দ্র দত্ত একজন আই. সি. এস. অফিসার ছিলেন; পরবর্তীকালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতিও হয়েছিলেন। যদিও রমেশচন্দ্র দত্ত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে কিছু বলেননি, তবুও দুটি ক্ষেত্রে তিনি ইংরেজ শাসনের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, এবং তখনকার দিনে কোন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীর পক্ষে ওই ধরনের সমালোচনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। তাঁর প্রথম সমালোচনা ছিল, ভারতবর্ষের সরকারী ঋণের বোঝা অন্যায়ভাবে ভারতীয়দের উপরে চাপানো হয়েছিল; এবং দ্বিতীয় সমালোচনা ছিল, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ভারতে কর্মরত ইংরেজ শাসকরা ভারতে নিজেদের ব্যবসায়ের দিকে এত বেশী নজর দিয়েছিলেন যে, সেটার ফলে ভারতীয় শিল্পের দুর্দশা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল, এবং ভারতে শিল্পায়নের পথ যে রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল - সেদিকে তাঁরা তাকাননি। সেক্ষেত্রে দাদাভাই নওরোজীর ‘ড্রেন থিয়োরী’ এবং রমেশচন্দ্রের সিদ্ধান্তর মধ্যে সাদৃশ্য বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। রমেশচন্দ্র দত্ত ভারতে ইংরেজ শাসনের যে দুটি সমালোচনা করেছিলেন, অনুরূপ সমালোচনা সুভাষচন্দ্রের বক্তব্যের মধ্যেও দেখতে পাওয়া যায়। তবে সুভাষচন্দ্রের চিন্তাধারার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে যাঁরা জাতীয় চেতনায় ধারক ও বাহক ছিলেন, তাঁরা সবাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তবে সুভাষচন্দ্র সবচেয়ে বেশী অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের দ্বারা। স্বামী বিবেকানন্দের অর্থনৈতিক চিন্তা এবং সুভাষচন্দ্রের অর্থনৈতিক চিন্তার মধ্যে অফুরন্ত সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। সুভাষচন্দ্র যখন বলেছিলেন যে, দেশ থেকে যে কোন মূল্যে দাসত্ব ও দারিদ্র্য দূর করতে হবে, তখন স্বামীজীর বাণীই তাঁর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল। স্বামীজীর ‘man-making mission’, দেশকে শিল্পোন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান, দেশ থেকে অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার অভাব দূর করা - এগুলি সবই সুভাষচন্দ্র তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। বিবেকানন্দ সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে গিয়ে লিখেছিলেন, “বিবেকানন্দ সম্বন্ধে কিছু লিখতে গিয়ে আমি আত্মহারা হয়ে যাই, খুব কম লোকের পক্ষে - এমনকি তাঁর সংস্পর্শে থাকবার সুবিধা যাঁদের হয়েছিল তাঁদের পক্ষেও তাঁর সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করা বা তাঁকে গভীরভাবে বুঝতে পারা অসম্ভব বলেই মনে করি। সুগভীর জটিল ও ঋদ্ধি-সমন্বিত ব্যক্তিত্ব তাঁর বক্তৃতা ও লেখা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল, অথচ তাঁর এই লেখা ও বক্তৃতার দ্বারাই তিনি তাঁর আশ্চর্য প্রভাব দেশবাসীর উপরে বিশেষতঃ বাঙ্গালীর উপরে বিস্তার করেছিলেন। এই রকমের বলিষ্ঠ মানুষ বাঙ্গালীর মনকে যেমন আকৃষ্ট করে এমন আর কেউ করেনা ৷ ত্যাগে বে-হিসাবী, কর্মে বিরামহীন, প্রেমে সীমাহীন, স্বামীজীর জ্ঞান যেমন গভীর তেমনি বহুমুখী ছিল। ভাবাবেগে উচ্ছ্বসিত স্বামীজী মানুষের ত্রুটি-বিচ্যুতির নির্মম সমালোচক ছিলেন অথচ তাঁর সারল্য ছিল শিশুর মতো - আমাদের জগতে এরূপ ব্যক্তিত্ব বাস্তবিকই বিরল। … পুরোহিত, উচ্চবর্গ, এবং বনিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে তিনি তাঁর লেখায় যে আক্রমণ চালিয়েছেন - আপনারা তা পড়েছেন। যে সব কথা বলা একজন সর্বশ্রেষ্ঠ গোঁড়া সমাজতান্ত্রিকের পক্ষে বিশেষ প্রশংসার বিষয়। … আজ তিনি জীবিত থাকলে আমি তাঁর চরণে আশ্রয় নিতাম।” (মধ্যপ্রদেশের সিওনি সাবজেল থেকে ‘মারহাট্টা’ পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মিঃ এ আর ভাটকে লিখিত চিঠি, ৬ই মে, ১৯৩২ সাল)
সুভাষচন্দ্রের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা তৎকালীন জাতীয় নেতাদের মধ্যে তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে গান্ধীজীর সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য, এবং ত্রিপুরী কংগ্রেসের পরে সুভাষচন্দ্রের প্রতি জহরলাল নেহেরুর বিরূপ মনোভাবকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে বিবেচনা করা হয়। যদিও অর্থনৈতিক চিন্তাধারার পরিপ্রেক্ষিতে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে জওহরলালের মধ্যে কিছুটা নৈকট্য ছিল, কিন্তু গান্ধীজীর সঙ্গে সুভাষচন্দের চিন্তাধারার বিস্তর পার্থক্য ছিল। জাতীয় পরিকল্পনা কমিটির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে পণ্ডিত নেহরুর চিন্তার পার্থক্য সম্বন্ধে একটা ধারণা করা সম্ভব। যদিও সুভাষচন্দ্রই পণ্ডিত নেহরুকে জাতীয় পরিকল্পনা কমিটির সভাপতি রূপে বরণ করে নিয়েছিলেন, কিন্তু গান্ধীজীর সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের চিন্তাধারার পার্থক্য বিংশ শতকের ত্রিশের দশকেই বিশেষভাবে প্রতিভাত হয়েছিল, যদিও সেটার সূচনা ঘটেছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের তিরোধানের পরে, এবং বিশেষ করে ১৯২৮ সালের কলকাতা কংগ্রেসে। হরিপুরা কংগ্রেসে সভাপতি হিসাবে সুভাষচন্দ্রের ভাষণের পরে গান্ধী-সুভাষ বিরোধের চরম পরিণতি দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে রূপরেখা সুভাষচন্দ্র তাঁর ভাষণে এঁকেছিলেন, গান্ধীজীর সেটা মনঃপূত হয়নি; এবং ত্রিপুরী কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে সেটার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেখানে সুভাষচন্দ্র যখন বিপুল ভোটাধিক্যে ডক্টর পট্টভি সীতারামিয়াকে পরাজিত করেছিলেন, তখন গান্ধীজীকে বলতে হয়েছিল, “Sitaramia’s defeat is my defeat.”
সুভাষচন্দ্রের অর্থনৈতিক চিন্তার বিশ্লেষণে অন্য যে নামটি গভীরভাবে জড়িত, তিনি হলেন বৈজ্ঞানিক ‘ডক্টর মেঘনাদ সাহা’। জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠনের সময়ে মেঘনাদ সাহা সুভাষচন্দ্রের সর্বপ্রধান সাহায্যকারী ছিলেন, সেই সঙ্গে আরও একজন ছিলেন - ‘স্যার এম. বিশ্বেশ্বরায়া’ - যাঁর নাম ভারতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ থেকে লদ্ধ প্রেরণা, এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের উৎসাহও সুভাষচন্দ্রের সাথে ছিল। যদিও এই বিষয় নিয়ে ‘শঙ্করীপ্রসাদ বসু’ তাঁর ‘সুভাষচন্দ্র ও ন্যাশনাল প্ল্যানিং’ গ্রন্থে (অধুনাবিলুপ্ত) বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন, তবুও সুভাষচন্দ্রের অর্থনৈতিক চিন্তার একটি দিক হিসাবে, এবং গান্ধীজীর উপরে সেটার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করবার জন্য জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠনের একটি পূর্বাভাস দেওয়া এক্ষেত্রে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবেনা।
সুভাষচন্দ্র কর্তৃক জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠিত হওয়ার আগেই, বিংশ শতকের ত্রিশের দশকের গোড়ার দিকে ভারতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা নিয়ে চিন্তা ভাবনা আরম্ভ হয়েছিল। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পরে পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রীয় সাম্যবাদ (State Communism), এবং নয়া অর্থনৈতিক নীতি (New Economic Policy) দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সাম্যবাদে কৃষকদের ফসল বাধ্যতামূলকভাবে সংগ্রহ করবার নীতি (compulsory procurement) জনসাধারণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। লেনিন সেটা বুঝতে পেরেছিলেন, এবং তাড়াহুড়ো করে একটি সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির পরিকাঠামোয় সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করবার ঝুঁকি নেওয়া যে কঠিন, সেটাও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। তখন তিনি নয়া অর্থনৈতিক নীতি (New Economic Policy) প্রবর্তন করেছিলেন। সেই নীতিতে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে কিছু পরিমাণ খোলাবাজারের লেনদেন প্রবর্তিত হয়েছিল বলে, সেটাকে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ (State Capitalism) বলা হয়েছিল, পরবর্তী পর্যায়ে রাশিয়ায় ‘Collective Farming’ বা সমষ্টিগত চাষ ব্যবস্থা নিয়ে বিরাট বিতর্কের (The Great Debate) সৃষ্টি হয়েছিল। সেই বিরাট বিতর্কে সমষ্টিগত আবাদ (Collective Farming) নিয়ে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছিল। ওই বিতর্কে দক্ষিণপন্থীদের নেতা (Right Wing) ছিলেন ‘বুখারিন’ (Bukharin), এবং প্রথমে বামপন্থীদের নেতা ছিলেন ‘ট্রটস্কি’ (Trotsky) ও তাঁর তাত্ত্বিক সমর্থক ‘প্রিয়ব্র্যাজেনস্কি’ (Preobrazhensky)। শেষপর্যন্ত ‘স্ট্যালিন’ পুরোপুরিভাবে ক্ষমতায় আসবার পরে সেই বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। রাশিয়ায় স্ট্যালিন ক্ষমতায় আসবার পরে পুরোপুরিভাবে সেদেশে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা চালু হয়েছিল। বলা বাহুল্য যে, আধুনিক বিশ্বে রাশিয়াই প্রথম দেশ ছিল, যেখানে প্রথমবারের জন্য আধুনিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রবর্তিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তখন সেদেশে পরিকল্পনার কর্মযজ্ঞ কবি স্বচক্ষে দেখেছিলেন। ‘রাশিয়ার চিঠি’তে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “আপাততঃ রাশিয়ায় এসেছি - না এলে এ জন্মের তীর্থদর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত। এখানে এরা যা কাণ্ড করছে তার ভালোমন্দ বিচার করবার পূর্বে সর্বপ্রথমেই মনে হয় কী অসম্ভব সাহস। ... এই যে বিপ্লবটা ঘটল এটা রাশিয়াতে ঘটবে বলেই অনেক কাল থেকে অপেক্ষা করছিল। ... যাঁদের হাতে ধন যাঁদের হাতে ক্ষমতা তাঁদের হাত থেকে নির্ধন ও অক্ষমেরা এই রাশিয়াতেই অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেছে। দুই পক্ষের মধ্যে একান্ত অসাম্য সবশেষে প্রলয়ের মধ্যে দিয়ে এই রাশিয়াতেই প্রতিকার সাধনের চেষ্টায় প্রবৃত্ত।” (রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্ররচনাবলী জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, দশম খণ্ড, পৃ- ৬৭১) রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ায় চাষীদের অবস্থার উন্নতি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কবি আরও লিখেছিলেন, “সেদিন মস্কো কৃষি আবাসে গিয়ে স্পষ্ট করে স্বচক্ষে দেখতে পেলুম, দশ বছরের মধ্যে রাশিয়ার চাষীরা ভারতবর্ষের চাষীদের কত বহুদূরে ছাড়িয়ে গেছে। কেবল বই পড়তে শেখেনি; ওদের মন গেছে বদলে, ওরা মানুষ হয়ে উঠেছে, শুধু শিক্ষার কথা বললে সব কথা বলা হল না, চাষের উন্নতির জন্যে সমস্ত দেশ জুড়ে যে প্রভূত উদ্যম সেও অসাধারণ। ভারতবর্ষেরই মতো এ দেশ। এইজন্যে কৃষিবিদ্যাকে যতদূর সম্ভব এগিয়ে দিতে না পারলে দেশের মানুষকে বাঁচানো যায়না। এরা সে কথা ভোলেনি। এরা অতি দুঃসাধ্য সাধন করতে প্রবৃত্ত।” (রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্ররচনাবলী জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, দশম খণ্ড, পৃ- ৬৯২) রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ায় শিক্ষা, কৃষি ও শিল্প - এই তিনটির উন্নতি ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “এরা তিনটে জিনিস নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত আছে - শিক্ষা, কৃষি এবং যন্ত্র। এই তিন পথ দিয়ে এরা সমস্ত জাতি মিলে চিত্ত, অন্ন এবং কর্মশক্তিকে সম্পূর্ণতা দেবার সাধনা করছে। আমাদের দেশের মতোই এখানকার মানুষ কৃষিজীবী, কিন্তু আমাদের দেশের কৃষক এক দিকে মূঢ় আর-এক দিকে অক্ষম, শিক্ষা এবং শক্তি দুই থেকেই বঞ্চিত।” (রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্ররচনাবলী জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, দশম খণ্ড, পৃ- ৬৯৩) রবীন্দ্রনাথের মতে রাশিয়ার মূল সাফল্য ছিল সর্বশ্রেণীর মানুষের মধ্যে সাম্য, সৃষ্টি ও সর্বশ্রেণীর মানুষের নৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন। রবীন্দ্রনাথ যখন রাশিয়ার সেই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রশংসা করেছিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভারতের শিক্ষিত শ্রেণীর একাংশ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা আরম্ভ করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল যে, গান্ধীজীর কাছে রাশিয়ার সেই রূপান্তর বিশেষ কোন গুরুত্ব পায়নি। রাশিয়ার অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অনুরূপ ভারতেও কোন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা যেতে পারে কিনা, সে বিষয়ে গান্ধীজী নীরব ছিলেন। সুভাষচন্দ্র কিন্তু সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা আরম্ভ করে দিয়েছিলেন। পরাধীন ভারতে যে শিক্ষা বিস্তার, কৃষি সংস্কার এবং ব্যাপক শিল্পায়নের প্রয়োজন রয়েছে, এবং সেজন্য যে একটি সর্বাঙ্গীন পরিকল্পনার দরকার - সুভাষচন্দ্রের কাছে সেটা জরুরী প্রয়োজন ছিল। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় যে ব্যাপক শিল্পায়নের প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেটার প্রশংসা শুধু কবির ভাবাবেগ ছিল না, তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল। রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের অকুণ্ঠ প্রশংসা করলেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় সেই দেশের রাজনৈতিক মতবাদ ও জীবনধারার অসম্পূর্ণতার কথাও কিন্তু উল্লেখ করেছিলেন।
এই প্রসঙ্গে ১৯২৮ সালের ২রা অক্টোবর তারিখে, সুভাষচন্দ্র ‘Independence League of India’-র বাংলা শাখার যে ইস্তাহারটি প্রকাশ করেছিলেন, সেটার উল্লেখ করা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ায় শিক্ষাবিস্তার, কৃষি-সংস্কার ও ব্যাপক শিল্পায়ন সম্পর্কে যে উদ্যোগ দেখেছিলেন, সুভাষচন্দ্র কর্তৃক প্রণীত সেই ইস্তাহারে সেই উদ্যোগের চিহ্নই দেখতে পাওয়া যায়। ওই ইস্তাহারে সুভাষচন্দ্র অসহযোগ কর্মসূচীর সম্ভাবনা যে সীমাবদ্ধ, সেকথা স্বীকার করে নিয়ে বলেছিলেন, “যদি ভারতের জনসাধারণের অন্তরাত্মাকে আলোড়িত করতে হয়, যদি সামাজিকভাবে অত্যাচারিত ও অর্থনৈতিকভাবে পিষ্ট জনসাধারণকে অজ্ঞতা ও জড়ত্ব থেকে জাগ্রত করতে হয় তবে একটি স্পষ্টতর বাণী ও আরো প্রত্যক্ষ আবেদন দরকার। তাঁদের কাছে এমন স্বাধীন ভারতের চিত্র তুলে ধরতে হবে যেখানে পূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকবে, সামাজিক অসাম্য ও অর্থনৈতিক দাসত্ব থাকবে না।” সেই ইস্তাহারে যে অর্থনৈতিক কর্মসূচী ঘোষিত হয়েছিল সেটা নিম্নরূপ ছিল -
অর্থনৈতিক গণতন্ত্ৰ
মূলনীতি: অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করা, সম্পত্তির সমবণ্টন, সকলের জন্য সমান সুযোগের ব্যবস্থা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
শিল্প সম্পর্কে:
১. যন্ত্রশিল্পের মাধ্যমে বৃহদাকার উৎপাদন ব্যবস্থায় লীগ বিশ্বাস করে। কিন্তু সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্পকেও উৎসাহ দেওয়া হবে।
২. মূল শিল্পগুলির জাতীয়করণ করা হবে।
৩. রেল, জাহাজ ও বিমান পরিবহনের জাতীয়করণ করা হবে।
৪. শিল্পের পরিচালনা, কর্মচারী নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের বিষয়ে শ্রমিকদের মতামতের স্থান থাকবে।
৫. শিল্পে মুনাফার অংশ বণ্টনের ব্যবস্থা করা হবে।
৬. শ্রমিক, মালিক ও পরিচালকের মধ্যে সকল বিবাদই নিরপেক্ষ সালিশী বোর্ডের কাছে পেশ করতে হবে। তার উদ্দেশ্য হবে ধর্মঘট ও লকআউট যেন অনাবশ্যক হয়ে যায়।
৭. উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সকল সম্পত্তির উপর করধার্য সহ কর আরোপ ও আইন প্রনয়ণের সাহায্যে ব্যক্তিগত পুঁজির সীমা বেঁধে দেওয়া হবে।
৮. সমবায়ের মাধ্যমে ও অন্যভাবে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে ও স্থদের উচ্চতম হার বেঁধে দিয়ে মহাজনী কারবার নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
৯. কারখানার শ্রমিকদের জন্য আট ঘণ্টার কর্মদিবস করা হবে।
১০. রাষ্ট্র বেকার ভাতা ও বার্ধক্য ভাতা দেবে।
১১. শ্রমিকদের সুবিধার জন্য এসব ব্যবস্থা করা হবে; (ক) অসুস্থতা ও দুর্ঘটনার জন্য বীমা, (খ) প্রসূতি কল্যাণ ব্যবস্থা, (গ) শিশুদের জন্য ক্রেশ, (ঘ) শ্রমিকদের বাসগৃহ, (ঙ) পর্যাপ্ত ছুটি ইত্যাদি।
কৃষি সম্পর্কে:
১. একই রকম ভূমি প্ৰথা।
২. রাষ্ট্র সমহারে করের ব্যবস্থা করবে।
৩. রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে কৃষি ঋণ বাতিল করা হবে।
৪. ক্ষতিপূরণের সাহায্যে জমিদারি প্রথা বিলোপ করা হবে।
তাছাড়া উক্ত ইস্তাহারের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচীও ছিল। ইণ্ডিয়ান ইণ্ডিপেণ্ডেন্স লীগের যে অর্থনৈতিক কর্মসূচী ১৯২৮ সালে তৈরি হয়েছিল, সেটাকে বাস্তবায়িত করতে গেলে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না। ইস্তাহারে মূল শিল্পগুলির জাতীয়করণ, এবং সর্বপ্রকার পরিবহন ব্যবস্থার জাতীয়করণ, ব্যাপক শ্রমিক কল্যাণের ব্যবস্থা, শিল্পের ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ সবই কল্যাণধর্মী পরিকল্পিত অর্থনীতির পূর্বাভাস ছিল। এখানেই সুভাষচন্দ্রের দূরদৃষ্টি সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কার্যক্রম তাঁকে সেক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছিল। অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করা, সম্পত্তির সম-বণ্টন করা, সকলের জন্য সমান সুযোগের ব্যবস্থা করা, এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা, পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে স্বীকৃত ও অনুসৃত হয়েছিল। সেক্ষেত্রে গান্ধীজীর কল্পিত অছি ব্যবস্থা (Trusteeship System) অবাস্তব ছিল বলেই পরিত্যক্ত হয়েছিল।
সুভাষচন্দ্রের সমসাময়িকদের মধ্যে যে বাঙালী বৈজ্ঞানিক গভীরভাবে অর্থ নৈতিক পরিকল্পনার কথা ভেবেছিলেন, তিনি ছিলেন ডক্টর মেঘনাদ সাহা। সুভাষচন্দ্র যে জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠন করেছিলেন, মেঘনাদ সাহা সেটার অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন, এবং সেক্ষেত্রে তাঁর অবদানও কম কিছু ছিল না। যেহেতু সুভাষচন্দ্র জাতীয় পরিকল্পনার প্রবর্তক ছিলেন, সেজন্য তিনি যাতে কংগ্রেসের সভাপতি হতে পারেন, সেই কারণে মেঘনাদ সাহা রবীন্দ্রনাথের সমর্থন আদায় করবার জন্য ১৯৩৮ সালে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন। সেবারে শান্তিনিকেতনে মেঘনাদ সাহা তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে একটি ছাত্র সভায় বলেছিলেন যে, জীবন সমস্যার সমাধানের জন্য শহর থেকে গ্রামে ফিরে গিয়ে কুটিরশিল্পের উন্নতি করে ও চরকা ঘুরিয়ে কোন লাভ হবে না। ১৯৩৮ সালের ১৪ই নভেম্বর তারিখে শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত সেই ছাত্রসভায় মেঘনাদ সাহা এমন কয়েকটি বেপরোয়া উক্তি করেছিলেন, যেগুলো নিয়ে তখন যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ডক্টর সাহার তেমন একটি উক্তিকে এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে - “I have no glamour for villages and do not think they are ideal places for living … Ruralisation will only lead to continuous exploitation of the poor by a few capitalists.” (শঙ্করী প্রসাদ বসুর ‘সুভাষচন্দ্র ও ন্যাশন্যাল প্ল্যানিং’ থেকে উদ্ধৃত, পৃ- ২৭) মেঘনাদ সাহা তখন যা বলতে চেয়েছিলেন সেটা ছিল, গ্রামীণ জীবনের পূর্ণ রূপান্তর করতে হবে, কারণ ভারত চিরকালই কৃষি-নির্ভর থাকবে - সেটা হতে পারে না। সেই ব্যবস্থার বিকল্প হল দেশের দ্রুত শিল্পায়ন, যেটা দিয়ে বেকার সমস্যার মোকাবিলা করা যাবে। সেজন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শিল্প সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। মেঘনাদ সাহা তাঁর ওই বক্তৃতার জন্য তখন ‘জড়বাদী’ বলে অনেকের দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিলেন; সেটা অবশ্য এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। (পণ্ডিচেরী আশ্রম থেকে ‘অনিলবরণ রায়’, ডক্টর মেঘনাদ সাহা তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে হিন্দুধর্মের উপরে আঘাত হেনেছেন বলে প্রতিবাদ পত্র পাঠিয়েছিলেন; সুভাষচন্দ্র ও ন্যাশন্যাল প্ল্যানিং, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, পৃ- ২৭) মেঘনাদ সাহা কৃষির উন্নতি ও আধুনিকীকরণ চেয়েছিলেন; কিন্তু গান্ধীজীর গ্রামীণ শিল্পনীতি যে দেশের কোন উন্নতি ঘটাতে পারবেনা, সেই বিষয়ে তিনি একজন নির্ভীক প্রবক্তা ছিলেন। সেই কারণে, তখনকার গান্ধীবাদী নেতা ‘কুমারাপ্পা’ মেঘনাদ সাহার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ডক্টর সাহার মত ছিল যে, দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করতে হলে এবং দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ব্যাপক শিল্পোন্নয়ন প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে মেঘনাদ সাহা ‘Science and Culture’ পত্রিকায় ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেগুলি ছিল - (i) Irrigation Research in India, December, 1936; (ii) Industries and Scientific Research, March, 1937; (iii) Problems of Industrial Development in India, May, 1937; (iv) On the National Supply of Electricity, August, 1937; (v) Indian National Reconstruction and Soviet Example, October 1937; (vi) Need for Power Research and Investigation Board in India, February, 1938; (vii) The Intelligent Man’s Guide to the Production and Economics of Electrical Power, May, 1938; (viii) Symposium on India’s Power Supply, May 1938; (ix) The Next Twenty-five years of Science in India, July, 1938; (x) Congress President on National Reconstruction, September, 1938; (xi) Technical Assistance to Indian Industry by the Govt. of India, September, 1938; এবং (xii) Industrial India, January, 1939. তাছাড়া ১৯৩৮ সালের ‘Modern Review’ পত্রিকাতেও তাঁর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল, যেটার নাম ছিল ‘Philosophy of Industrialisation’। প্রবন্ধগুলিতে মেঘনাদ সাহা ধারাবাহিকভাবে গান্ধীজীর অর্থনৈতিক নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, এবং শিক্ষিত মানুষদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, ভারতের দ্রুত উন্নয়নের জন্য ব্যাপক শিল্পোন্নয়নের দরকার রয়েছে। চীনে ‘সান ইয়াত সেন’ (Sun Yat Sen) শিল্পোন্নয়নের জন্য যে ব্যবস্থা করেছিলেন, ভারতের ক্ষেত্রে সেটা প্রবর্তন করবার পক্ষেও তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন। ‘Indian National Reconstruction and the Soviet Example’ (1937, oct.) প্রবন্ধে মেঘনাদ সাহা জোরের সঙ্গে বলেছিলেন যে, ভারতের ক্ষেত্রে সোভিয়েত পরিকল্পনাই অবলম্বনীয়। বিপ্লব-পূর্ব রাশিয়া, এবং বিংশ শতকের ত্রিশের দশকের ভারতবর্ষের মধ্যে তুলনা করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, রাশিয়া যদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে ভারতবর্ষ সেটা করতে পারবে না কেন? তাঁর মত ছিল যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে রাশিয়ার অবস্থা নানা দিক দিয়ে ভারতের অনুরূপ ছিল। সেখানকার কৃষকেরা মোট জনসংখ্যার ৯৪ শতাংশ ছিলেন, দেশে তখন দুর্ভিক্ষ ও মহামারী লেগেই ছিল, এবং শিল্পব্যবস্থাও একেবারে অনুন্নত ছিল। অথচ ক্ষমতা লাভ করবার সঙ্গে সঙ্গেই রাশিয়া কৃষি, শিল্প, পরিবহন, জলসম্পদ, সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রবর্তন করেছিল। কৃষি, খনিজ শিল্প, নদী-ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি বিদ্যুৎ উৎপাদন - সর্বক্ষেত্রে রাশিয়ার দ্রুত উন্নতিতে মেঘনাদ সাহা বুঝতে পেরেছিলেন যে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া ভারতের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা কখনোই দূর করা সম্ভব হবে না। কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন প্রধান নেতা মহাত্মা গান্ধীর কাছে মেঘনাদ সাহার সেই যুক্তি তো গ্রহণযোগ্য হয়ইনি, উল্টে গান্ধীবাদীদের কাছ থেকে মেঘনাদ সাহাকে বিস্তর সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে তখন সুভাষচন্দ্র মেঘনাদ সাহার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন।
(আগামী পর্বে সমাপ্ত)
©️রানা©️
(তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:
১- সুভাষ রচনাবলী, প্রথম খণ্ড থেকে পঞ্চম খণ্ড, জয়শ্রী প্রকাশন।
২- Selected Speeches of Subhas Chandra Bose.
৩- সুভাষচন্দ্র ও ন্যাশনাল প্ল্যানিং, শঙ্করীপ্রসাদ বসু।
৪- সুভাষচন্দ্রের জীবন ও চিন্তায় স্বামী বিবেকানন্দ, শঙ্করীপ্রসাদ বসু।
৫- অর্থনীতির পথে, ডঃ ভবতোষ দত্ত।
৬- তরুনের স্বপ্ন, সুভাষচন্দ্র বসু।)
৩
৩ মন্তব্য