সহকারী শিক্ষক
১০ নভেম্বর, ২০২৩ ০৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘সুলতানি আমলের ওয়াঝদারি ব্যবস্থা’
আরবি গ্রন্থ ‘মাসালিক-অল-অবসর’ থেকে জানা যায় যে, সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকাল থেকে ইকতা ব্যবস্থার চরিত্রগত পরিবর্তন ঘটেছিল। তখন সুলতানের সৈন্যবাহিনীর সব অফিসারেরা ইকতা পেলেও ইকতার সম্ভাব্য রাজস্বের যে হিসেব করা হত, বাস্তবে সেটা আদায় করা সম্ভব ছিল না। সেই সময়ে সৈন্যদের রাজকোষ থেকে নগদে বেতন দেওয়া হত। ফলে সৈন্যদের জন্য সুলতানি রাষ্ট্রে ইকতার যে অংশ নির্দিষ্ট ছিল, সেটা ইকতাদারদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে গিয়েছিল। শুধু ইকতাদারের বেতনের জন্য যেটুকু ইকতার প্রয়োজন ছিল, সেটুকুর নিয়ন্ত্রণই তাঁর হাতে থাকত। ইবন বতুতা ভারতে থাকাকালীন আমরোহাতে সেই ধরনের ইকতা বন্দোবস্ত লক্ষ্য করেছিলেন। মহম্মদ বিন তুঘলকের সঙ্গে তাঁর সৈন্যবাহিনীর অফিসারদের যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, সেটার একটি কারণ ছিল যে, তাঁরা সমগ্র ইকতার ওপরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। জিয়াউদ্দিন বারানি জানিয়েছিলেন যে, আমিরান-ই-সদার-এর সঙ্গে দৌলতাবাদে বিন তুঘলকের যে বিরোধ হয়েছিল, সেটার কারণ তাঁর আমলের ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের নতুন ব্যবস্থা ছিল। সুলতানি যুগের ভারতে ১৩৫১ খৃষ্টাব্দে সুলতান ফিরোজ তুঘলক একটি ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। দিল্লি সুলতানির দায়িত্ব নিয়েই তিনি সুলতানি রাজ্যের মোট ভূমি রাজস্ব (মাশুল) নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তী চার বছরের মধ্যে সুলতানি রাষ্ট্রে মোট ভূমিরাজস্বের পরিমাণ ৬.৭৫ থেকে ৬.৮৫ কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছিল। সেটাকে বলা হয়েছিল জমা, এবং সুলতান ফিরোজ তাঁর রাজত্বকালে সেই জমার আর কোনো পরিবর্তন করেননি। অর্থাৎ, তাঁর সময়ে মুকতিকে আর কখনো বাড়তি রাজস্ব রাজকোষে জমা দিতে হয়নি, এমনকি ইকতার হিসেব পরীক্ষা করা নিয়েও ফিরোজ কোন ধরণের কড়াকড়ি করেননি। ফিরোজ তাঁর অভিজাতদের বেতন ও ভাতা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেজন্য তাঁদের ইকতা ও পরগণা দেওয়া হয়েছিল।
আফিফ তাঁর লেখায় সুলতান ফিরোজ তুঘলকের রাজস্বব্যবস্থার যে বিস্তৃত বর্ণনা রেখে গিয়েছিলেন, সেটা থেকে জানা যায় যে, তখন মুকতির বেতনের জন্য ইকতার একাংশ নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। বাকি অংশের মধ্যে একাংশ সৈন্যদের বেতনের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। যেহেতু ফিরোজ কঠোরভাবে ইকতা নিয়ন্ত্রণ করতেন না, সেহেতু তাঁর সময়ে ইকতায় পৃথকীকরণ নামমাত্র থেকে গিয়েছিল। ফিরোজ ঈশ্বরের ইচ্ছায় ইকতা বন্দোবস্ত করেছিলেন, সুলতানি রাষ্ট্রের সব পরগণা ও ইকতা তাঁর কর্মচারীদের মধ্যে বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। ওই সময়ে খালিসার পরিমাণ অবশ্যই কমে গিয়েছিল। তবে তখনও যে খালিসা জমি তাঁর অধীনে ছিল, সেগুলোর মাধ্যমে তিনি তাঁর সৈনিকদের বেতনের পরিবর্তে গ্রামের রাজস্ব ‘ওয়াঝ’ হিসেবে দিয়েছিলেন। ফিরোজের সময়ে তাঁর অধিকাংশ সৈন্যরা ‘মাওয়াজিব’ বা বেতন পেতেন না। আফিফ জানিয়েছিলেন যে, তখন যেসব সৈনিক বেতনের পরিবর্তে গ্রামের রাজস্বের বরাত পেতেন, তাঁদের ওয়াঝদার বলা হত। তাঁরা ছাড়া সেই সময়কার অন্য সৈনিকদের বলা হত ‘ঘায়ির ওয়াঝ’, তাঁরা নগদে বেতন পেতেন। অথবা ইকতার উদ্বৃত্ত রাজস্বের ওপরে তাঁদের ‘ইলাক’ (বেতনপত্র) বা বরাত দেওয়া হতো। আফিফ আরও জানিয়েছিলেন যে, সেযুগে ইকতা থেকে যাঁদের বেতন দেওয়া হত, তাঁরা তাঁদের আসল বেতনের অর্ধেকমাত্র পেতেন। তাই তাঁরা তাঁদের ইতলাক ফাটকাবাজদের (speculators) কাছে বেতনের এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে বিক্রি করে দিতেন। কিন্তু সেই ফাটকাবাজরাও ইকতা থেকে সৈন্যদের বেতনের অর্ধেকের বেশি আদায় করতে পারতেন না।
ফিরুজ তুঘলক দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থায় বংশানুক্রমিক নীতির প্রবর্তন করেছিলেন। এর আগে খলজীদের শাসনের শুরু থেকেই (১২৯০ খৃষ্টাব্দ) সুলতানি রাষ্ট্রের অভিজাততন্ত্রের গঠনে মৌল পরিবর্তন ঘটেছিল। তখন বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সুলতানের অভিজাত শ্রেণীতে জায়গা পেয়েছিলেন। বারানি লিখেছিলেন যে, নিতান্ত সাধারণ মানুষেরা তখন সুলতানের অভিজাততন্ত্রে স্থান পেয়েছিলেন (to open its doors to plebian elements of all kinds)। সুলতান ফিরোজ নিজেই দাবি করেছিলেন যে তাঁর কর্মচারীদের সন্তানরা পিতার পদ পেতেন, আফিফও তাঁর লেখায় সুলতানের সেই নীতির কথা উল্লেখ করেছিলেন। এথেকে অনুমান করা যায় যে, তখন কোন কারণে ইকতাদারের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র পিতার ইকতার অধিকারী হতেন। দিল্লি সুলতানিতে তুঘলক বংশের যুগে ওয়াঝের ক্ষেত্রে সেই নীতি অনুসরণ করা হত। তখন কোন কারণে একজন ওয়াঝদারের মৃত্যু ঘটলে তাঁর পুত্র, জামাতা, ক্রীতদাস, এমনকি তাঁর বিধবাও ওয়াঝের অধিকারী হতে পারতেন। ওয়াঝ কোনো অবস্থাতে রাষ্ট্রের অধীনে স্থাপিত হত না। আফিফ বলেছিলেন যে, সুলতান সাধারণ সৈনিককে বেতনের পরিবর্তে গ্রামের রাজস্বের বরাত দিয়ে শুধু ওয়াঝদারি ব্যবস্থার বিস্তার করেননি; তখন যেসব সৈনিকেরা ইকতার রাজস্বের ওপরে ইতলাক (বেতনপত্র) পেতেন, তাঁদেরও তিনি ওয়াঝদার বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু ফিরোজ তুঘলকের সেই ব্যবস্থার ফলে সুলতানি রাষ্ট্রের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় অবশ্যই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। সেযুগে ফাটকাবাজ ও ইজারাদার ওয়াঝদারের হয়ে গ্রাম ও ইকতা থেকে রাজস্ব আদায় করতেন। সেটা কৃষকের ওপরে অবশ্যই বাড়তি চাপের সৃষ্টি করেছিল, এবং তাঁদের উপরে সুলতানি রাজস্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কমে গিয়েছিল। এর আগে সুলতান আলাউদ্দিন সুলতানি রাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগে যে কঠোর শৃঙ্খলা স্থাপন করেছিলেন, দিল্লিতে তুঘলক বংশীয়দের শাসনকালে সেটা আর বজায় ছিল না। অনুমান করা যেতে পারে যে, সেই সময়ে কৃষকের ওপরে ইজারাদারদের অত্যাচার বেড়ে গিয়েছিল। ওয়াঝদারি ব্যবস্থা সুলতানি রাষ্ট্রের ভূমি রাজস্ব ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা নিয়ে এসেছিল। সুলতানি প্রশাসনের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় ইজারাদার ও ফাটকাবাজদের অনুপ্রবেশ তখন তীব্র জটিলতার সৃষ্টিও করেছিল।
সুলতান ফিরোজ তুঘলকের রাজত্বকাল থেকে তুঘলক বংশের শাসনের শেষ অবধি (১৩৫১-১৪১৪) সুলতানি রাজ্যের ভূমি ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছিল। কৃষি উদ্বৃত্তের সংগ্রহ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে তখন সেই পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল। সেই সময়ে খালসা ও ইকতা জমির একাংশে ওয়াঝ দেওয়া হয়েছিল। আগেই বলা হয়েছে যে, তুঘলক বংশীয় সুলতানদের শাসনকালে সৈনিকদের নগদ বেতন দেওয়া হত না, বেতনের বদলে একটি গ্রামের রাজস্বের ওপরে সৈনিকদের বরাত দেওয়া হত। তখন সম্ভবতঃ একটি গ্রামের রাজস্বের ওপরে একাধিক সৈনিককে ওয়াঝ দেওয়া হয়। সেযুগে শুধু খালসা জমিতে নয়, ইকতা জমির একাংশে চিহ্নিত অংশেও সৈনিকদের ওয়াঝ দেওয়া হত। ওই ব্যবস্থার নাম ছিল ওয়াঝদারি ব্যবস্থা। সেকালে খালসা ও ইকতা জমিতে সৈনিকেরা ওয়াঝ পেলেও তাঁরা কিন্তু সেখান থেকে রাজস্ব আদায় করতেন না। সেটার বদলে তাঁরা ইজারাদার বা ফাটকাবাজদের সেখান থেকে রাজস্ব আদায় করবার অধিকার দিতেন। ইজারাদারেরা তাঁদের কাছ থেকে ইতলাক বা বেতনপত্রে উল্লিখিত বেতনের এক-তৃতীয়াংশ দামে সেগুলি কিনে নিত। কিন্তু তাঁরা বরাতী অঞ্চল থেকে বেতনের মাত্র পঞ্চাশ শতাংশ আদায় করতে করতে পারতেন। সুতরাং দেখা যায় যে, তখন একজন সৈনিক তাঁর নির্দিষ্ট বেতনের মাত্র ৩৩ শতাংশ পেতেন, এবং তাতে অবশ্যই তাঁর অসুবিধা হত। সেই কারণে সুলতান ফিরোজের সৈন্যবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আবার ইজারাদারি ব্যবস্থার পত্তন হওয়ার ফলে ভূমিব্যবস্থায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল, এবং কৃষকের ওপরে বাড়তি চাপ পড়েছিল। সেকালে ইজারাদারেরা সাধারণতঃ ভূমি রাজস্বের সঙ্গে বাড়তি কিছু আদায় করে নিতেন। সেই ব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তখন বংশানুক্রমিকভাবে ওয়াঝগুলি ভোগ করা যেত। আলোচ্য সময়ে কোনো সৈনিক মারা গেলে তাঁর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এমনকি ক্রীতদাসও তাঁর ওয়াঝের অধিকারী হতে পারতেন। এর ফলে সুলতানি রাষ্ট্রের ভূমিব্যবস্থায় কায়েমী স্বার্থের সৃষ্টি হয়েছিল, এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। সুলতান আলাউদ্দিনের প্রশাসনের অধীনে ভারতের সুলতানি রাষ্ট্রে যে সুশৃঙ্খল ভূমি ও রাজস্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তাতে তখন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। রাষ্ট্র ও কৃষকের মাঝে ওয়াঝদার ও ইজারাদাররা ভূমির সঙ্গে যুক্ত হয়ে উদ্বৃত্তের একাংশ দাবি করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে সুলতান ফিরোজ তুঘলক প্রবর্তিত ওয়াঝদারি ব্যবস্থা কৃষি ও কৃষক কারও পক্ষে মঙ্গলের হয়নি, উল্টে সেই ব্যবস্থার জন্য রাষ্ট্র বর্ধিত রাজস্বের অংশ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। সমকালীন সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে, ফিরোজ তুঘলকের শাসনকালে ভারতের সুলতানি রাষ্ট্রে চাষ-আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছিল, এবং কৃষিজ উৎপাদন বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই বাড়তি উৎপাদনের বেশিরভাগই তখন ফাটকাবাজ ও ইজারাদারেরা গ্রাস করে নিয়েছিলেন, রাষ্ট্র বা ওয়াঝাদার সেটার কোন ভাগ পাননি।
তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:
১- দিল্লি সুলতানি, রমেশচন্দ্র মজুমদার।
২- The Foundation Of Muslim Rule In India, A. B. M. Habibullah.
৩- The Legacy of Muslim Rule In India, K. S. Lal.
৪- State & Culture In Medieval India, Khaliq Ahmad Nizami.
৫- Tarikh-i-Firoz Shahi: An English Translation by Ishtiyaq Ahmad Zilli.
৬- Tughlaq Naamah, Kusro Dehalvi, Edited by Hashmii Faridabadii Sayyed.
৭- Khaza Inul Futuh, Kusro Dehalvi, Edited by Muhammad Habib.
৮- Futuhu’s-Silatin, Edited by AGHA MAHDI HUSAIN.
৯- History Of Medieval India, Satish Chandra.
১০- History of Medieval India from 647 A.D. to the Mughal Conquest, Ishwari Prasad.
১১- A Comprehensive History of India: The Delhi Sultanate (A.D. 1206-1526), Edited by Mohammad Habib and Khaliq Ahmad Nizami.
১২- The Rehla of Ibn Battuta.
১৩- Shams Siraj Afifâ’s Tarikh-i-Firoz Shahi.
১৪- Tughlaq Dynasty, Agha Mahdi Husain.
১৫- Tughlaq Dynasty; Lambert M. Surhone, Miriam T. Timpledon & Susan F. Marseken.
১৬- The Tarikh-i-mubarak shahi, Translated by K. K. Basu.
১৭- Futuhat-I-Firoz Shahi, English translation, Cambridge University.
১৮- History of The Qaraunah Turks in India, Ishwari Prasad.
১৯- Agrarian System Of Moslem India, W. H. Moreland.
২০- A Short History Of India, W. H. Moreland.
২১- Cambridge Economic History Of India: 1200 1750 Ed., Edited by Tapan Raychaudhuri & Irfan Habib.
২২- মধ্যযুগে ভারতের অর্থনৈতিক জীবন, সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়।
২৩- masalik-al absar, Ibn Fadlallah al-Umari.
৫
৫ মন্তব্য