উদ্ভিদের নামঃ তাল
ইংরেজি নামঃ Doub palm/ Palmyra palm/ Tala palm/ Toddy palm/ Wine palm/ Ice apple.
বৈজ্ঞানিক নামঃ Borassus flabellifer
আদিনিবাসঃ মধ্য আফ্রিকা।
তাল
এশিয়া ও আফ্রিকার অঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ। তাল গাছ পাম গোত্রের অন্যতম দীর্ঘ গাছ যা উচ্চতায় ৩০ মিটার বা ১০০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। তাল ভারতীয় উপমহাদেশীয় অনেক অঞ্চলেরই জনপ্রিয় গাছ, কারণ এর প্রায় সব অঙ্গ থেকেই কিছু না কিছু কাজের জিনিস তৈরী হয়, প্রায় কিছুই ফেলা যায় না। তাল পাতা দিয়ে ঘর ছাওয়া, হাতপাখা, তালপাতার চাটাই, মাদুর, আঁকার পট, লেখার পুঁথি, কুণ্ডলী, পুতুল ইত্যাদি বহুবিধ সামগ্রী তৈরী হয়। তালের কাণ্ড দিয়েও বাড়ি, নৌকা, হাউস বোট ইত্যাদি তৈরী করা হয়।
ভাদ্র-আশ্বিন মাসের রোদে তাল পাকে। তাল গাছ বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। তাল গাছে শৈল্পিক বাসা বাঁধে চিরায়ত বাংলার বাবুই পাখি। তাদের জন্যও নিরাপদ আবাসস্থল হবে এই তাল গাছ।
তালের ফল এবং বীজ দুইই আমরা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করি। কচি অবস্থায় তালের বীজও খাওয়া হয় যা তালশাঁস নামে পরিচিত। এই তাল পাকলে এর ঘন নির্যাস দিয়ে তালসত্ব, পিঠা, কেক তৈরী করা হয়। এগুলো অনেক সুস্বাদুও বটে। তাল গাছের কাণ্ড থেকেও রস সংগ্রহ হয় এবং তা থেকে গুড়, পাটালি, মিছরি, তাড়ি ইত্যাদি তৈরি হয়।
তালে রয়েছে ভিটামিন এ, বি ও সি, জিংক, পটাসিয়াম, আয়রন ও ক্যালসিয়াম সহ আরও অনেক খনিজ উপাদান। এর সঙ্গে আরও আছে অ্যান্টি অক্সিজেন ও অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান।
কচি তালের শাঁস খেতে ভারী মজা, পাশাপাশি এর উপকারিতাও কম নয়।
কচি তালের শাঁসের পুষ্টি গুনঃ
১০০ গ্রামের তালের শাঁসের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশই থাকে জলীয় অংশ, ক্যালরি থাকে ২৯, শর্করা ৬ দশমিক ৫ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৪৩ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৩০ মিলিগ্রাম, আয়রন ১ মিলিগ্রাম, থায়ামিন ০.০৪ গ্রাম, রিবোফ্লাভিন ০.০২ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ০.৩ মিলিগ্রাম, খনিজ শূন্য দশমিক ৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪ মিলিগ্রাম।
১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেঃ
তালে শাঁসে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় এটি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে থাকে। এছাড়াও তালের শাঁস খেলে লিভারের সমস্যা দূর হয়। এতে থাকা ভিটামিন সি ও বি কমপ্লেক্স আমাদের পানি পানের তৃপ্তি বাড়িয়ে দেয় এবং খাবারে রুচি বাড়াতে সাহায্য করে।
২. স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতেঃ
তালের শাঁস আমাদের স্মৃতিশক্তি ভালো রাখে এবং শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষা করে থাকে। একই সাথে এটি বমি ভাব আর বিস্বাদ দূর করতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩. ক্যান্সার প্রতিরোধেঃ
তালে শাঁসে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় এটি ক্যান্সারের মত রোগও প্রতিরোধ করে।
৪. দন্ত রক্ষায়ঃ
তালে শাঁসে ক্যালসিয়াম থাকায় এটি আমাদের দাঁতের জন্য অনেক ভালো । এটি আমাদের দাঁতের এনামেল ভালো রাখে এবং দাঁতের ক্ষয় রোধ করে।
৫. হাড়ের সুরক্ষায়ঃ
তালের শাঁসে থাকা ক্যালসিয়াম আমাদের আমাদের হাড়কে শক্তিশালী করে তোলে। কচি তালের শাঁস রক্তশূন্যতা দূরীকরণে ভাল কাজ করে।
৬. দৃষ্টি শক্তি বাড়াতেঃ
তালে শাঁসে আছে পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, আয়রন, সালফার, সেলেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপার এবং ম্যাগনেসিয়ামের মত বেশ কিছু উপকারী উপাদান। যা আমাদের চোখের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তাই তালের শাঁস খেলে আমাদের দৃষ্টিশক্তির অনেক উন্নতি হয় এবং রাতকানা রোগ থেকে চিরতরে রেহাই পাওয়া যায়। এছাড়াও চোখের এনার্জি সহ অন্যান্য চোখের রোগের প্রকোপ কমাতে তালে অনেক কার্যকরী।
৭. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেঃ
তালের শাঁস আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এটি খেলে আমাদের শরীরের ভেতরে নাইট্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা প্রাকৃতিক উপায়ে আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এছাড়াও এতে থাকা পটাশিয়াম আমাদের কোষ ও রক্তরসের জন্য দরকারি উপাদান হিসেবে কাজ করে। একই সাথে এটি আমাদের হৃৎস্পন্দনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
পাকা তালের পুষ্টি উপাদানঃ
প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যযোগ্য পাকা তালে রয়েছে- খাদ্যশক্তি ৮৭ কিলোক্যালরি, জলীয় অংশ ৭৭.৫ গ্রাম, আমিষ .৮ গ্রাম, চর্বি .১ গ্রাম, শর্করা ১০.৯ গ্রাম, খাদ্য আঁশ ১ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৭ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৩০ মিলিগ্রাম, আয়রন ১ মিলিগ্রাম, থায়ামিন .০৪ মিলিগ্রাম, রিবোফ্লাভিন .০২ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন .৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৫ মিলিগ্রাম।
১. তাল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণসমৃদ্ধ হওয়ায় ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম। এ ছাড়া স্বাস্থ্য রক্ষায়ও তাল ভূমিকা রাখে। স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে।
২. তাল ভিটামিন বি-এর আধার। তাই ভিটামিন বি-এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধে তাল ভূমিকা রাখে।
৩. তালে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস আছে, যা দাঁত ও হাড়ের ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়ক।
৪. কোষ্ঠকাঠিন্য ও অন্ত্রের রোগ ভালো করতে তাল ভাল ভূমিকা রাখে।
৫. পুরোনো কাশি সারাতে ৩-৪ চামচ তালের রস দুধের সাথে মিশিয়ে সকাল বিকাল কয়েকদিন খেলে পুরোনো কাশি ভাল হয়ে যায়।
৬. বমি বমি ভাবে ৩-৪ চামচ তালের রস দুধের সাথে মিশিয়ে সকাল বিকাল কয়েকদিন খেলে বমি বমি ভাব চলে যায়।
৭. বুক ধরফর করলে ৩-৪ চামচ তালের রস দুধের সাথে মিশিয়ে সকাল বিকাল কয়েকদিন খেলে বুক ধরফরানী কমে যায় ।
৮. তালের রস খেলে কৃমি রোগ ভাল হয়ে যায়।
৯. তালে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম। এ ছাড়া স্বাস্থ্য রক্ষায়ও তাল ভূমিকা রাখে।
১০. তালের শাঁস এবং তালের রস আমাদের স্মৃতি শক্তিতে ভালো রাখতে সাহায্য করে।
১১. তাল শরীরের ভিটামিন বি এর অভার দূর করে। নিয়মিত তাল খেলে সর্দি, মাথা ব্যথা, অনিদ্রার মত রোগ দূর করতে সাহায্য করে।
সাবধানতাঃ অতিরিক্ত তাল খেলে পেটে গ্যাসের আধিক্য ও পেটের পীড়া হতে পারে।
৭১
১৪৫ মন্তব্য