সিনিয়র শিক্ষক
০৫ মে, ২০২৬ ০৩:০৬ অপরাহ্ণ
অবাধ্য প্রাণ: শৃঙ্খলা নাকি সৃজনশীল রূপান্তর?
অবাধ্য প্রাণ: শৃঙ্খলা নাকি সৃজনশীল রূপান্তর?
শ্রেণিকক্ষের এক কোণে সব সময়ই কিছু শিক্ষার্থী থাকে যাদের আমরা সাধারণ ভাষায় “ডানপিটে”, “চঞ্চল” বা একটু “অতিরিক্ত সক্রিয়” বলে অভিহিত করি। তাদের শাসন বা দমন করে স্থির করার চেষ্টা — ঠিক ঝড়ের গতিকে দেয়াল দিয়ে থামানোর মতো ব্যর্থ। একজন প্রজ্ঞাবান শিক্ষক জানেন, এই আপাত অস্থিরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অদম্য কৌতূহল, মুক্তোমণি সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্বের সুপ্ত বীজ। আমাদের কাজ আগল দিয়ে তাদের বেঁধে ফেলা নয়, বরং সেই বিপুল প্রাণশক্তিকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করা।
নিচে এই অমিত সম্ভাবনাময় চঞ্চল প্রাণদের দিশা দেখানোর কিছু শিল্পসম্মত ও কার্যকর কৌশল তুলে ধরা হলো।
১. অন্তরের উৎস সন্ধান (Root Cause Analysis)
প্রতিটি আচরণের আড়ালে একটি অব্যক্ত গল্প থাকে। কঠোর হওয়ার আগে বোঝার চেষ্টা করুন: সে কি মনোযোগের কাঙাল? নাকি পাঠের দুর্বোধ্যতা তাকে অস্থির করছে? হয়তো কোনো পারিবারিক বিষাদ অথবা সহপাঠীরা তাকে ঠাট্টা করে — কারণ না জেনে বিচার করা অন্ধের চিকিৎসার মতো।
২. হৃদয়ের সেতুবন্ধন (Relational Connect)
ডানপিটে শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষকের কাছেই মাথা নত করে, যিনি তাদের শাসনের আগে ভালোবাসতে জানেন। তাদের শখ, স্বপ্ন আর ছোট ছোট ভালোলাগার খবর নিন। যখন সে বুঝবে আপনি তাকে ‘চেনেন’ এবং ‘জানেন’, তখন আপনার নির্দেশ তার কাছে আর বোঝা মনে হবে না।
৩. ইতিবাচকতার উন্মেষ (Positive Reinforcement)
ছোট ছোট প্রাপ্তিকেও উদযাপন করুন। সামান্যতম ভালো কাজ জনসম্মুখে স্বীকৃতি দিন। প্রশংসার সেই মিষ্টতা অবাধ্য শিক্ষার্থীর মনে দায়িত্ববোধের গভীর বীজ রোপণ করে।
৪. নেতৃত্বের দায়ভার অর্পণ
চঞ্চল শিক্ষার্থীদের ভেতরে সহজাতভাবেই নেতা হওয়ার প্রবণতা থাকে। তাদের দমন না করে বরং দায়িত্বের জালে বাঁধুন। শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা রক্ষা, দলগত আয়োজনের নেতৃত্ব বা দুর্বল সহপাঠীদের সহায়তার ভার তাদের ওপর দিন। যখন সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাববে, তখন সে নিজেই নিজের আচরণের অভিভাবক হয়ে উঠবে।
৫. পাঠদানে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া
একঘেয়েমি চঞ্চলতাকে উসকে দেয়। ক্লাসকে কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশ্নোত্তর, দলগত কাজ, ভূমিকা-পালন ও আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডে ভরিয়ে দিন। শিখনের প্রকৃত আনন্দ যখন তাকে আচ্ছন্ন করবে, তখন অস্থিরতা উবে গিয়ে একাগ্রতা আসবে।
৬. সুনির্দিষ্ট সীমানা ও মূল্যবোধ
স্বাধীনতার অর্থ বিশৃঙ্খলা নয়। ক্লাস শুরুর সময়ই পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কিছু নিয়ম নির্ধারণ করুন। শৃঙ্খলা ভাঙলে কী পরিণাম হতে পারে, তা আগেভাগেই স্নিগ্ধ কিন্তু দৃঢ় ভাষায় বুঝিয়ে দিন। স্পষ্ট সীমানা বিভ্রান্তি কমায়।
৭. দণ্ড নয়, সংশোধনমুখী সংস্কার
শাস্তি অনেক সময় জেদ বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু হৃদয় ছুঁয়ে সংশোধন মানুষকে বদলে দেয়। ২০১৫ সালের একটি সত্য গল্প বলি:
দশম শ্রেণির এক ছাত্র সহকারী প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে বেয়াদবি করেছে। প্রধান শিক্ষক বসে সিদ্ধান্ত নিলেন — তাকে বহিষ্কার করা হোক। আমাকে শ্রেণি শিক্ষক হিসেবে ডাকা হলো। আমি ‘সরাসরি ভেটো’ দিলাম। সহকারী প্রধানের সঙ্গে আমার তর্ক হলো।
শান্তভাবে বললাম, “আমাকে এক মাস সময় দিন। তারপর আপনারাও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন।”
সময় পেলাম।
আমি ছেলেটিকে ঘুরতে নিয়ে গেলাম, পাশাপাশি তার ঘনিষ্ঠ কয়েক বন্ধুকেও। ঘুরতে ঘুরতে তার মনের দরজা খুলে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“স্যার, আমার বাবা আমাকে ফসলের মাঠে সঙ্গে নিয়ে যান। পড়তে দেন না। স্কুলে না আসতে চাপ দেন। কারণ তিনি গরিব। আমি বাবার কথা না শুনে স্কুলে আসি। স্যার যখন স্কুলে না আসার অপরাধে আমাকে বকাবকি করছিলেন, আবেগের বশে খারাপ শব্দ ব্যবহার করলেন — আমি অপমান সহ্য করতে পারিনি। সেটাই আমার শুধু অপরাধ।”
আমি তাকে বোঝালাম, পাশে দাঁড়ালাম। তার বাবার সঙ্গেও কথা বললাম। ছেলেটিকে স্বশরীরে বাসায় এনে পড়ার ব্যবস্থা করলাম। একমাস পর শিক্ষক সভায় সবাই অবাক — “সে আগের মতো নেই। এখন ভালো রেজাল্ট করবে।”
আজ সেই ছেলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করছে।
হ্যাঁ, কঠোর হওয়ার চেয়ে বোঝার হাত বাড়িয়ে দেওয়া বেশি কার্যকর। প্রয়োজনে আসন পরিবর্তন করুন, নিভৃতে ডেকে বুঝিয়ে বলুন। লক্ষ্য হবে আচরণ সংশোধন — কখনোই শিক্ষার্থীর সম্মানহানি নয়।
৮. অভিভাবকের সঙ্গে সহমর্মী সংলাপ
শিক্ষার্থী দীর্ঘসময় অস্থির থাকলে অভিযোগ নয়; বরং উদ্বেগের সুরে অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলুন। গৃহপরিবেশ ও মানসিক অবস্থা জানুন। শিক্ষক আর অভিভাবকের যৌথ যত্নই এক চারাগাছকে মহীরুহ করে তোলে।
৯. সুপ্ত প্রতিভার সৃজনশীল বহিঃপ্রকাশ
এই শিশুদের ভেতরে অফুরন্ত তেজ। খেলাধুলা, বিতর্ক, আবৃত্তি, উপস্থাপনা বা সাংস্কৃতিক কাজে সেই তেজকে প্রবাহিত করুন। যখন তাদের সৃজনশীল সত্তা পথ পাবে, তারা ক্লাসের বিঘ্নকারী না হয়ে হয়ে উঠবে অমূল্য সম্পদ।
১০. অটল ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা
মানুষ গড়ার কারিগরের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ধৈর্য। পরিবর্তন কোনো জাদুমন্ত্রে আসে না, এটি এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা। আপনার সহানুভূতি ও অবিচল নিষ্ঠাই একদিন সেই চঞ্চল কিশোরকে তৈরি করবে দায়িত্বশীল মানুষে।
উপসংহার
শ্রেণিকক্ষের সেই চঞ্চল শিশু কোনো ‘সমস্যা’ নয়, বরং এক অনাবিল ঝরনাধারা। বাঁধ দিয়ে বন্ধ করলে প্লাবন ঘটায় — সঠিক পথ করে দিলে মরুভূমিতেও সবুজ আনে। আসুন, আমরা তাকে দমন না করে আগলে রাখি; তবেই সে হয়ে উঠবে আগামীর যোগ্য সারথি।
লেখক:
মুফিদুল আলম
শিক্ষক
রামু, কক্সবাজার।
৩
৩ মন্তব্য