আজ ২৫শে বৈশাখ। বাঙালির হৃদস্পন্দন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ জন্মজয়ন্তী। উৎসবের এই আলোকময় দিনে যখন আমরা তাঁর জয়গান করি, তখন সেই মানুষটির জীবনের শেষ বেলাকার এক বিষাদময় অথচ উজ্জ্বল অধ্যায় আমাদের সামনে গভীর জীবনদর্শনের দুয়ার খুলে দেয়। ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হলেও, জীবনের সেই শেষ দিনগুলো ছিল জরা আর ব্যাধির বিরুদ্ধে এক অনন্য সৃজনশীল লড়াইয়ের ইতিহাস।
রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ বছরটি ছিল বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ঘেরা। বিশেষ করে কিডনি ও মূত্রাশয়ের সংক্রমণে তিনি যে অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন, তা সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত। কালিম্পং থেকে অসুস্থ অবস্থায় কলকাতায় ফিরে আসার পর জোড়াসাঁকোর নির্জন ঘরে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, শরীরের এই অবর্ণনীয় কষ্টের মাঝেও তাঁর কৌতুকপ্রিয় মন হারায়নি। চিকিৎসকদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে থেকে তিনি নিজের এবং চারপাশের মানুষের মনের ভার লাঘব করতেন। এই সময় তাঁর কলম যেন আরও ক্ষুরধার হয়ে ওঠে; যখন নিজে লিখতে পারতেন না, তখন অন্যের হাতে লিখে নিতেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সব পঙক্তিমালা।
কবির ব্যক্তিগত জীবন ছিল প্রিয়জন হারানোর এক দীর্ঘ মিছিলে ভরা। তাঁর পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিন সন্তান—রেণুকা, শমীন্দ্রনাথ এবং বেলা—তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তাঁর জীবদ্দশাতেই। বিশেষ করে কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের অকাল প্রস্থান কবির মনে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, তা কোনোদিন নিরাময় হয়নি। স্ত্রীর বিয়োগও ঘটেছিল জীবনের অনেক আগে। শেষ বয়সে যখন শরীরের অসুস্থতা বাড়তে থাকে, তখন একজন চিরস্থায়ী অন্তরঙ্গ সঙ্গীর অভাব তিনি গভীরভাবে বোধ করতেন। এছাড়া শান্তিনিকেতনের প্রশাসনিক জটিলতা এবং কাছের মানুষদের সংকীর্ণতা অনেক সময় তাঁকে ব্যথিত করত। তবুও তিনি তাঁর সমস্ত জাগতিক শোক ও অভিমানকে বিশ্বজনীন রূপ দিয়ে গেছেন তাঁর কালজয়ী সাহিত্যে।
জীবনের শেষ জন্মদিনে (১৯৪১) কবি উপহার দিয়েছিলেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’। যুদ্ধের উন্মাদনায় যখন বিশ্ব সভ্যতা টালমাটাল, তখন অসুস্থ শয্যায় শুয়েও তিনি মানবতার জয়ের গান গেয়েছিলেন। তাঁর জীবনের অন্তিম কাব্যগ্রন্থ ‘শেষ লেখা’-র কবিতাগুলো ছিল আড়ম্বরহীন ও পরম সত্যের সন্ধানে মুখর। মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পেয়েও তিনি সত্যের কঠিন রূপকে স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি, বরং লিখেছিলেন—
“রূপনারায়ণের কূলে / জাগিয়া উঠিলাম, / জানিলাম এ জগৎ / স্বপ্ন নয়।”
১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট (২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) বাংলার রবি চিরতরে অস্তমিত হয়। কিন্তু নশ্বর শরীরের বিনাশ থাকলেও তাঁর আত্মার যে ব্যাপ্তি এবং সৃষ্টির যে জ্যোতি, তা আজও আমাদের প্রতিটি দিনকে আলোকিত করে। রবীন্দ্রনাথের শেষ দিনগুলোর কষ্ট কেবল তাঁর একার ছিল না, তা ছিল সমগ্র জাতির এক পরম বেদনা। কিন্তু সেই যন্ত্রণার সাগর মন্থন করেই তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর গান গাইতে হয়।
জন্মদিন উপলক্ষে এই বিশেষ দিনটিতে কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর জীবনের সেই অমোঘ সত্যটি আবারও মনে পড়ে:
“মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান।
মেঘবরণ তুঝ, মেঘজটাজুট,
রক্ত উৎপলকর, রক্ত-অধরপুট,
তাপবিমোচন করুণকরুণ মুখ,
মৃত্যু অমৃত করে দান।”
(মৃত্যু এক পরম বন্ধু বা প্রেমাস্পদ। জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া এবং যন্ত্রণার শেষে মৃত্যু যেন এক স্নিগ্ধ শীতল পরশ, যা মানুষকে অমৃতের সন্ধান দেয়। এতো রঙিন জীবন পাড়ি দিয়ে এমন বিষাদময় কিন্তু অমোঘ সমর্পন, কতো স্নিগ্ধ ও পবিত্র।)
১০
১২ মন্তব্য