Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ মে, ২০২৬ ০৪:১৩ অপরাহ্ণ

শিক্ষার মানোন্নয়নে শ্রেণিতে প্রয়োজন সর্বোচ্চ ৩০ শিক্ষার্থী

বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার গত কয়েক দশকে যথেষ্ট চোখে পড়ার মতো। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির হার বেড়েছে, নারীশিক্ষা সম্প্রসারিত হয়েছে, এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও শিক্ষা পৌঁছে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিতভাবে দেশের শিক্ষার পরিসর সম্প্রসারিত করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতি সত্ত্বেও শিক্ষার গুণগত মানের বিষয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। অনেক বিদ্যালয়ে একটি শ্রেণিতে ৬০–৮০ শিক্ষার্থী থাকে, যা শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং শিক্ষকের জন্য কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। শিক্ষক চেষ্টা করলেও প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, আর শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশ একধরনের সীমিত অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ থাকে। 

শিক্ষাবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখায়, ছোট শ্রেণি শিক্ষার মান উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিনল্যান্ড এ প্রাথমিক স্তরে একটি শ্রেণিতে ১৮–২০ জন শিক্ষার্থী থাকে। জার্মানিতে ২১–২৪ জন শিক্ষার্থীই আদর্শ। যুক্তরাষ্ট্রের বহু অঙ্গরাজ্যে ক্লাস সাইজ সীমিত রাখা হয় ২০–২৬ জনের মধ্যে। এশিয়ার মধ্যে জাপানে ৩০-৩৫, দক্ষিণ কোরিয়াতে ২৫-৩০, ইন্ডিয়াতে ৩৫-৫০, নেপালে ৩৫-৪৫, কিন্তু বাংলাদেশে ৬০-৮০। আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) এর তথ্য অনুযায়ী উন্নত দেশগুলোতে গড়ে ২৩ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক এবং নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে কার্যকর শিক্ষার জন্য যথেষ্ট।

বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় ৩০ জন শিক্ষার্থী একটি স্বপ্নময় সংখ্যা হতে পারে, তবে ৩৫ শিক্ষার্থী হলো বাস্তবসম্মত সর্বোচ্চ সীমা। ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকলে শিক্ষক সহজেই সক্রিয় শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন। দলভিত্তিক কাজ আলোচনার সুযোগ, সমস্যা, সমাধান এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষণ সম্ভব হয়। এছাড়া শিক্ষক প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফিডব্যাক দিতে পারেন।

ছোট শ্রেণির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো- দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদা মনোযোগ। বড় শ্রেণিতে তারা সহজে পিছিয়ে পড়ে, প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করে বা শিক্ষকের কাছ থেকে আলাদা সহায়তা পায় না। কিন্তু ৩০ জন শিক্ষার্থীর শ্রেণিতে শিক্ষক প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারেন। ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ে না এবং শেখার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার এবং শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। এই বিশাল ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। যেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি, সেখানে নতুন সেকশন খোলা যেতে পারে। ধাপে ধাপে নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

এসডিজি ৪ বা এনশিউর ইনক্লুসিভ অ্যান্ড ইকুইটেবল কোয়ালিটি এডুকেশন অ্যান্ড প্রোমোট লাইফলং লার্নিং অপারচুনিটিজ ফর অল বাস্তবায়নের সাথে এই নীতি সরাসরি যুক্ত। অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমান এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শ্রেণিকক্ষে সীমিত শিক্ষার্থী সংখ্যা অত্যন্ত জরুরি। এটি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, চিন্তাশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। ছোট ক্লাস শিক্ষাকে আরও মানবিক এবং অংশগ্রহণমূলক করে, যা শুধুমাত্র পরীক্ষা নয় বরং জীবনের দক্ষতা তৈরিতেও সহায়ক।

শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় আমরা প্রায়ই কারিকুলাম, প্রযুক্তি বা পরীক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বলি। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা পরিবর্তন না করলে এসব উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না। একটি শ্রেণিতে ৬০–৮০ শিক্ষার্থী থাকলে শিক্ষক পাঠ শেষ করতে সক্ষম হলেও শিক্ষার্থীর সক্রিয় শেখার সুযোগ সীমিত থাকে। ৩০ শিক্ষার্থীর ক্লাসে শিক্ষক বাস্তব অর্থে শিক্ষা দিতে পারেন, শিক্ষার্থীর সমস্যা বুঝতে পারেন এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারেন।

সুতরাং, দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে ধাপে ধাপে প্রতি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ৩০ শিক্ষার্থী নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়; বরং শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি দৃঢ় ভিত্তি। ছোট ক্লাস, বড় শিক্ষা, এটাই বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত বিপ্লবের বাস্তব সূচনা।

মোঃ রফিকুল ইসলাম তালুকদার স্যারের পোষ্ট থেকে:-

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ

মন্তব্য করুন