Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ মে, ২০২৬ ০৮:৩৩ অপরাহ্ণ

অর্থনীতির নীরব চালিকাশক্তি: অনানুষ্ঠানিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান

বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় সাধারণত বড় শিল্প, ব্যাংকিং ব্যবস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু এসব দৃশ্যমান খাতের আড়ালে এমন একটি শক্তিশালী খাত কাজ করে, যা নীরবে অর্থনীতিকে সচল রাখে। এই খাতই হলো অনানুষ্ঠানিক খাত। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেমন বাংলাদেশ, অনানুষ্ঠানিক খাত লাখো মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।

অনানুষ্ঠানিক খাত বলতে মূলত সেইসব অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বোঝায়, যেগুলো সরকারি নিবন্ধন, নির্ধারিত কর ব্যবস্থা, শ্রম আইন বা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হয়। রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রাস্তার পাশের খাবার বিক্রেতা, গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক, হস্তশিল্পী কিংবা ফ্রিল্যান্স ভিত্তিক ছোটখাটো সেবাদানকারী—সবাই এই খাতের অন্তর্ভুক্ত।

একটি দেশের কর্মসংস্থান তৈরিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের উচ্চশিক্ষা বা বিশেষ কারিগরি দক্ষতা নেই। তাদের জন্য এই খাত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে বেকারত্ব কমে এবং পরিবারগুলো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়।

দারিদ্র্য হ্রাসেও অনানুষ্ঠানিক খাত কার্যকর ভূমিকা রাখে। কারণ এই খাতে কাজ শুরু করতে অধিক পুঁজি বা জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। একজন ব্যক্তি অল্প মূলধন নিয়ে ছোট দোকান, খাবার ব্যবসা বা বিভিন্ন সেবামূলক কাজ শুরু করতে পারেন। এতে নিম্ন আয়ের মানুষও নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হন।

স্থানীয় অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রেও এই খাতের অবদান অনেক। শহর ও গ্রামের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা, খাদ্য সরবরাহ এবং ক্ষুদ্র উৎপাদন কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ বজায় থাকে।

অনানুষ্ঠানিক খাত নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সফল ব্যবসায়ী প্রথমে ছোট আকারে ব্যবসা শুরু করেন, যা পরবর্তীতে বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। তাই এই খাতকে উদ্যোক্তা বিকাশের প্রাথমিক ধাপ বললেও ভুল হবে না।

নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতেও অনানুষ্ঠানিক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গৃহভিত্তিক কাজ, সেলাই, হস্তশিল্প, খাবার প্রস্তুত ও বিক্রয়—এসব কাজের মাধ্যমে অনেক নারী আয় করছেন এবং পরিবারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখছেন।

তবে এই খাতের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা সাধারণত সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নির্দিষ্ট মজুরি বা শ্রমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাদের আয় অনিশ্চিত এবং অনেক সময় সরকারি সহায়তাও পাওয়া যায় না।

এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা। সরকার যদি সহজ নিবন্ধন ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ঋণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা নিশ্চিত করে, তাহলে অনানুষ্ঠানিক খাত আরও শক্তিশালী হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

সবশেষে বলা যায়, অনানুষ্ঠানিক খাত অর্থনীতির এমন এক নীরব শক্তি, যা সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থান, আয় এবং উন্নয়নের সুযোগ করে দেয়। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য এই খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ