প্রভাষক
১৪ মে, ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ণ
হান্টাভাইরাস (Hantavirus)
হান্টাভাইরাস (Hantavirus) হলো মূলত বুনিয়াবিরিডি (Bunyaviridae) গোত্রের একটি একসূত্রক আরএনএ (single-stranded RNA) ভাইরাস। নিচে এই ভাইরাসের উৎস, সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়া, মানবদেহে এর রোগের ভিন্ন রূপ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি বিস্তারিত ও বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দেওয়া হলো। ভাইরাসের গঠন ও উৎস আবিষ্কারের ইতিহাস: ১৯৭০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদী (Hantan River)-র অববাহিকায় কোরিয়ান যুদ্ধের সময় প্রথম এই ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয় এবং নদীর নামানুসারেই এর নামকরণ হয়।
প্রাকৃতিক বাহক: এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো বন্য ইঁদুর, ফিল্ড মাউস (field mouse), ভোল (vole) এবং হরিণ ইঁদুর (deer mouse)।
লক্ষণহীন বাহক: ভাইরাসটি ইঁদুরের শরীরে কোনো রোগ বা ক্ষতি সৃষ্টি করে না। এরা আজীবন এই ভাইরাস নীরবে শরীরে বহন করে এবং তাদের লালা, মল ও প্রস্রাবের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া (Transmission Dynamics)মানুষ সাধারণত তিনটি প্রধান উপায়ে হান্টাভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারে:
[সংক্রামিত ইঁদুরের বর্জ্য] ──> [শুকিয়ে ধুলোয় রূপান্তর] ──> [বাতাসে ভাসমান কণা] ──> [শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ]
অ্যারোসোলাইজেশন (Aerosolization): এটি সংক্রমণের সবচেয়ে সাধারণ পথ। আবদ্ধ ঘর, শস্যাগার, চিলেকোঠা বা জাহাজের কেবিনে যেখানে ইঁদুরের মলমূত্র শুকিয়ে ধুলোর সাথে মিশে যায়, সেখানে ঝাড়ু দিলে বা নাড়াচাড়া করলে ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ওড়ে। শ্বাসের মাধ্যমে এই কণা ফুসফুসে প্রবেশ করলে মানুষ আক্রান্ত হয়।ক্ষত বা মিউকাস মেমব্রেন: ভাইরাসবাহী বর্জ্য স্পর্শ করার পর হাত না ধুয়ে চোখ, নাক বা মুখে হাত দিলে।
মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানো (বিরল ব্যতিক্রম): সাধারণত হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। তবে দক্ষিণ আমেরিকায় প্রাপ্ত 'অ্যান্ডিজ ভাইরাস' (Andes virus) স্ট্রেনটির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেছে। এটি আক্রান্ত ব্যক্তির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা পরিবারের সদস্য বা পার্টনারদের মধ্যে লালা বা শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
দুটি ভিন্ন ক্লিনিক্যাল সিনড্রোম ও তাদের প্যাথলজিহান্টাভাইরাস মূলত মানবদেহের রক্তনালীর ভেতরের কোষগুলোকে (endothelial cells) আক্রমণ করে, যার ফলে রক্তনালী লিক বা ফুটো হয়ে যায় এবং অণুচক্রিকা (platelets) দ্রুত কমে যায়। এর ভৌগোলিক অবস্থান ও ভাইরাসের স্ট্রেন অনুযায়ী রোগটি দুটি প্রধান রূপ নেয়:
১. হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (HPS)এটি প্রধানত আমেরিকা মহাদেশে দেখা যায় (বাহক: হরিণ ইঁদুর বা Deer Mouse)। এর তীব্রতা তিনটি ধাপে প্রকাশ পায়:ইনকিউবেশন পিরিয়ড: সংক্রামিত হওয়ার ১ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়।প্রাথমিক ধাপ (১-৫ দিন): তীব্র জ্বর, শরীর ও মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং পেটে ব্যথা। (এই ধাপে সাধারণত কাশি থাকে না)।কার্ডিওপালমোনারি বা চূড়ান্ত ধাপ: ফুসফুসের কৈশিক জালিকা (capillaries) ফুটো হয়ে উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত তরল ফুসফুসের অ্যালভিওলাইতে (বাতাস থলিতে) জমা হতে শুরু করে। এর ফলে তীব্র শ্বাসকষ্ট (ARDS), রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগী দ্রুত শকে চলে যায়। এর মৃত্যুহার প্রায় ৩০% থেকে ৬০% এবং লক্ষণ গুরুতর হওয়ার প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই অধিকাংশ রোগীর মৃত্যু ঘটে।
২. হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (HFRS)এটি মূলত এশিয়া এবং ইউরোপ মহাদেশে দেখা যায় (যেমন: সিউল বা পুউমালা ভাইরাস স্ট্রেন)। এটি মানুষের কিডনি এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে। এর লক্ষণগুলো পর্যায়ক্রমিক ৫টি ধাপে প্রকাশ পায়:
জ্বর ও প্রাথমিক পর্যায়: হঠাৎ তীব্র জ্বর, পিঠ ও পেটে ব্যথা, চোখ লাল হওয়া এবং ঝাপসা দেখা।
হাইপোটেনসিভ পর্যায়: অণুচক্রিকা কমে যাওয়ার কারণে ত্বকের নিচে এবং শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং রক্তচাপ মারাত্মক কমে যায়।
অলিগুরিক (Oliguric) পর্যায়: কিডনি বিকল হতে শুরু করে এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়। এই ধাপে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
পলিউরিক ও পুনরুদ্ধার পর্যায়: কিডনি পুনরায় সচল হতে শুরু করে এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। এর সামগ্রিক মৃত্যুহার ১% থেকে ১৫%।
রোগ নির্ণয় (Diagnosis)সাধারণ ফ্লুর সাথে মিল থাকায় প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয় করা কঠিন। তবে ল্যাবরেটরিতে নিম্নলিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়:সেরোলজি টেস্ট: রক্তে হান্টাভাইরাস-নির্দিষ্ট আইজিএম (IgM) বা আইজিজি (IgG) অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে।RT-PCR: রক্তের নমুনা থেকে ভাইরাসের আরএনএ (RNA) সরাসরি শনাক্তকরণের মাধ্যমে। বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনাএখনো পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বা এফডিএ (FDA) অনুমোদিত কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ভ্যাকসিন এই ভাইরাসের জন্য নেই। চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে লক্ষণভিত্তিক এবং সাপোর্টিভ:
যান্ত্রিক শ্বসন সহায়তা: HPS রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত আইসিইউ-তে নিয়ে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর বা উন্নত লাইফ সাপোর্ট Extracorporeal Membrane Oxygenation (ECMO) ব্যবহার করা হয়, যা ফুসফুসকে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করে।রেনাল ম্যানেজমেন্ট: HFRS রোগীদের ক্ষেত্রে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখা হয় এবং তীব্র কিডনি বিকলের ক্ষেত্রে রক্তের বর্জ্য অপসারণের জন্য ডায়ালাইসিস দেওয়া হয়।
পরীক্ষামূলক ড্রাগ: কিছু ক্ষেত্রে HFRS-এর প্রাথমিক পর্যায়ে 'রিবাভাইরিন' (Ribavirin) নামক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ব্যবহারে আংশিক উপকার পাওয়া গেছে, তবে এটি HPS-এর জন্য কার্যকর নয়।
৫৩
৯২ মন্তব্য