সিনিয়র শিক্ষক
১৯ মে, ২০২৬ ০২:১৪ অপরাহ্ণ
হাম (Measles): একটি ভয়াবহ সংক্রামক রোগ ও তার প্রতিকার
হাম (Measles): একটি ভয়াবহ সংক্রামক রোগ ও তার প্রতিকার
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং প্রতিরোধযোগ্য কিন্তু অসচেতনতায় প্রাণঘাতী রোগ। একসময় এই রোগে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিশুর মৃত্যু হতো। বর্তমানে টিকার কারণে মৃত্যুর হার অনেক কমলেও, অসচেতনতা এবং টিকাবিহীন এলাকায় এটি এখনও মহামারির রূপ নিতে পারে। নিচে হামের জীবাণু, বিস্তার, লক্ষণ, ভয়াবহতা এবং এর প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. জীবাণুর পরিচয় ও বংশবৃদ্ধি
হামের জন্য দায়ী জীবাণুটি হলো একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস, যার নাম মরবিলিভাইরাস (Morbillivirus)। এটি প্যারামিক্সোভিরিডি (Paramyxoviridae) পরিবারের একটি আরএনএ (RNA) ভাইরাস।
নির্দিষ্ট হোস্ট: এই ভাইরাসটি শুধুমাত্র মানুষের শরীরেই বংশবৃদ্ধি এবং বেঁচে থাকতে পারে। কোনো প্রাণী বা পোকামাকড়ের মাধ্যমে এটি ছড়ায় না।
সংক্রমণ ক্ষমতা: ভাইরাসটি এতটাই শক্তিশালী যে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে সেখানে উপস্থিত টিকা না নেওয়া ১০ জন সুস্থ মানুষের মধ্যে প্রায় ৯ জনই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
২. যেভাবে ছড়ায় (সংক্রমণ প্রক্রিয়া)
হাম মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো অন্যতম দ্রুততম সংক্রামক রোগ। প্রধানত যেভাবে এটি ছড়ায়:
হাঁচি-কাশি ও ড্রপলেট: আক্রান্ত ব্যক্তি যখন কথা বলে, হাঁচি বা কাশি দেয়, তখন তার মুখ ও নাক থেকে ক্ষুদ্র ভাইরাসযুক্ত জলকণা (droplets) বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সুস্থ মানুষ শ্বাসের মাধ্যমে সেই বাতাস গ্রহণ করলে ভাইরাসটি তার শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে।
বাতাসে ভেসে থাকা: আক্রান্ত ব্যক্তি ঘরের ভেতর থেকে চলে যাওয়ার পরও ঘরের বাতাসে এই ভাইরাস প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় এবং সংক্রামক অবস্থায় ভেসে থাকতে পারে।
প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ: রোগীর লালা, সর্দি বা ব্যবহৃত জিনিসপত্র (রুমাল, কাপড়, থালা-বাসন) স্পর্শ করে হাত না ধুয়ে চোখ, নাক বা মুখে দিলে এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে।
৩. দেহে ভাইরাসের প্রতিক্রিয়া ও লক্ষণ
শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করার পর সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের একটি সুপ্তাবস্থা (Incubation period) থাকে, যখন বাইরে থেকে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এই সময়ে ভাইরাসটি প্রথমে শ্বাসতন্ত্রে আক্রমণ করে এবং পরে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর ক্রমান্বয়ে লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
ক. প্রাথমিক লক্ষণ
তীব্র উচ্চ জ্বর এবং প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা।
অনবরত সর্দি লাগা এবং শুকনো কাশি।
চোখ লাল হওয়া, চোখ ফুলে যাওয়া এবং চোখ দিয়ে জল পড়া (কনজেক্টিভাইটিস)।
খ. কোপলিক্স স্পট (Koplik's Spots)
জ্বর শুরুর ২-৩ দিন পর মুখের ভেতরের অংশে, বিশেষ করে মাড়ির বিপরীতে গালে ছোট ছোট সাদাটে বা ধূসর রঙের (লবণের দানার মতো) দাগ দেখা যায়। এটি হামের একটি অন্যতম প্রধান সনাক্তকারী লক্ষণ।
গ. হামের র্যাশ বা ফুসকুড়ি (Rash)
জ্বর আসার ৩-৫ দিন পর শরীর জুড়ে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেয়।
এটি সাধারণত কান ও মুখের চারপাশ (হেয়ারলাইন) থেকে শুরু হয়ে ক্রমান্বয়ে ঘাড়, বুক, পিঠ এবং পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে শরীরের তাপমাত্রা আরও তীব্র হতে পারে।
মনে রাখবেন: হাম ভাইরাস শরীরের শ্বেত রক্তকণিকার কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ত্বক, ফুসফুস, অন্ত্র ও মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে।
৪. হামের ক্ষতি ও জটিলতাসমূহ (Complications)
হাম শুধু একটি সাধারণ র্যাশ বা জ্বর নয়; এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীর অন্য যেকোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে নিচের মারাত্মক জটিলতাগুলো দেখা দেয়:
নিউমোনিয়া: ফুসফুসে তীব্র সংক্রমণ ঘটে। হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো এই নিউমোনিয়া।
ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতা: অন্ত্রের ভেতরের স্তর ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তীব্র ডায়রিয়া হয়, যা শিশুকে মারাত্মক পুষ্টিহীনতা ও ডিহাইড্রেশনের (পানিশূন্যতা) দিকে ঠেলে দেয়।
কানের ইনফেকশন (Otitis media): ভাইরাসের কারণে কানের ভেতরের নালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা থেকে কান পাকা এবং পরবর্তীতে স্থায়ী বধিরতা বা কালা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
মস্তিষ্কের ক্ষতি (Encephalitis): প্রতি ১,০০০ জন আক্রান্ত শিশুর মধ্যে একজনের মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে, যা থেকে খিঁচুনি, অন্ধত্ব বা বুদ্ধিমত্তা লোপ পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
অন্ধত্ব: চোখ মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলে কর্নিয়ার ক্ষতি হয়ে শিশু চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
৫. এই জীবাণুর বিশেষ ভয়াবহতা
তীব্র সংক্রমণ হার: একজন হামের রোগী তার আশেপাশের টিকা না নেওয়া প্রায় ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
ইমিউন অ্যামনেসিয়া (Immune Amnesia): এটি হামের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক। এই ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার "স্মৃতি" মুছে দেয়। অর্থাৎ, অতীতে শরীর যেসব রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল, হামের আক্রমণের পর শরীর সেগুলো ভুলে যায়। ফলে সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন (কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর) শিশুটি অন্যান্য সাধারণ রোগে আক্রান্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে থাকে।
দীর্ঘমেয়াদী মারাত্মক রোগ (SSPE): হাম হওয়ার কয়েক বছর পর স্নায়ুতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার মতো একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক রোগ হতে পারে, যার নাম SSPE (Subacute Sclerosing Panencephalitis)। এই রোগের কোনো নিরাময় নেই এবং এর শেষ পরিণতি মৃত্যু।
উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী: অপুষ্ট শিশু, গর্ভবতী নারী, টিকা না নেওয়া শিশু এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা এই রোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
৬. চিকিৎসা ও প্রতিকারের উপায়
হাম যেহেতু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এর সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক এবং রোগীকে আরাম দেওয়া ও জটিলতা থেকে রক্ষা করার জন্য সহায়ক:
জ্বর ও ব্যথার উপশম: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দিতে হবে।
সতর্কতা: শিশুদের হামের জ্বরে কখনোই অ্যাসপিরিন (Aspirin) জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে না, এতে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
তরল খাবার ও পুষ্টি: ডিহাইড্রেশন রোধ করতে প্রচুর পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, বুকের দুধ (শিশুদের ক্ষেত্রে) এবং পুষ্টিকর তরল খাবার খাওয়াতে হবে। রোগমুক্তির পরও কিছুদিন শিশুকে বাড়তি পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।
ভিটামিন-এ (Vitamin A): বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনা অনুযায়ী, হামের কারণে চোখের ক্ষতি ও অন্ধত্ব রোধ করতে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শে টানা দুই দিন নির্দিষ্ট ডোজে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পরিবেশ: রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে। আলো নেভানো বা মৃদু আলোর ঘরে রাখা ভালো, কারণ হামের সময় চোখে আলো লাগলে তীব্র অস্বস্তি হয়।
হাসপাতালে স্থানান্তর: নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে এবং প্রয়োজনে অক্সিজেন বা বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. প্রতিরোধের একমাত্র উপায়: টিকাদান
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর, নিরাপদ এবং একমাত্র উপায় হলো সঠিক সময়ে টিকা (Vaccination) নেওয়া।
এমআর (MR) বা এমএমআর (MMR) ভ্যাকসিন: সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী শিশুদের যথাসময়ে এই টিকা দেওয়া হয়।
টিকার ডোজ ও কার্যকারিতা: সাধারণত শিশুদের ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ (হাম ও রুবেলা বা MR টিকা) দেওয়া হয়। এই দুটি ডোজ সম্পূর্ণ করলে প্রায় ৯৭% ক্ষেত্রে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অন্যান্য সাধারণ প্রতিরোধ: আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার (রুমাল বা কনুই ব্যবহার করা) মেনে চলা।
৮. সমাজ ও আমাদের করণীয়
পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব
১. শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা: আপনার নিজের পরিবারের এবং আশেপাশের প্রতিটি শিশুর যেন সঠিক সময়ে হামের টিকা নেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করা।
২. আইসোলেশন বা আলাদা রাখা: পরিবারের কারও হাম হলে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার পর অন্তত ৪ থেকে ৫ দিন তাকে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরে রাখতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে কোনোভাবেই স্কুল, মাদরাসা বা খেলার মাঠে পাঠানো যাবে না।
৩. আক্রান্তের পরিচর্যা ও পরিচ্ছন্নতা: রোগীর ব্যবহৃত কাপড়, থালা-বাসন আলাদা করা এবং গরম পানি ও সাবান দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করা।
৪. কুসংস্কার পরিহার করা: "হাম হলে জল দেওয়া যাবে না", "গায়ে পানি ছোঁয়ানো যাবে না" বা "ডাক্তার দেখানো যাবে না"—এই জাতীয় কবিরাজি বা লোকজ কুসংস্কার সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। হামকে "সাধারণ জ্বর" ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে।
রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব
দেশের প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলে (যেমন চরাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকা) গণটিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা।
অপুষ্টি দূরীকরণে জাতীয় পর্যায়ে প্রকল্প গ্রহণ করা।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হামের ভয়াবহতা এবং টিকার গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।
উপসংহার
হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও কেবল অসচেতনতার কারণে এটি একটি শিশুর জীবন কেড়ে নিতে পারে বা তাকে চিরতরে পঙ্গু ও অন্ধ করে দিতে পারে। "একটি টিকা, একটি শিশুর জীবন"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি হামমুক্ত সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব।
মুফিদুল আলম
সিনিয়র শিক্ষক
রামু,কক্সবাজার।
৭৩
১৪৬ মন্তব্য