সহকারী অধ্যাপক
২২ মে, ২০২৬ ০৮:০৪ অপরাহ্ণ
বাম দল - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
বাম দল
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বাম দিকের দল — কত ভয়াবহ সেই পরিণাম!
হিসাবের দিনে যারা হারাবে চিরশান্তির ঠিকানা,
যাদের হৃদয় ছিল গাফেল, অহংকারে ভরা,
দুনিয়ার মোহে ডুবে গিয়ে ভুলেছিল রবের ডাকা।
তারা হাসত সত্য শুনে, ঠাট্টা করত হিদায়াত নিয়ে,
বলত— “মৃত মানুষ কি আবার ফিরে আসে জীবনে?”
হাড় হয়ে গেলে, মাটি হয়ে গেলে,
কে আবার ডাকবে আমাদের কবরের গভীরতা ছেড়ে?
কিন্তু সেদিন আসবেই,
যেদিন আকাশ কেঁপে উঠবে রবের হুকুমে,
পাহাড়গুলো উড়ে যাবে ধূলিকণার মতো,
সমুদ্র জ্বলে উঠবে আগুনের শিখায়।
মানুষ দলে দলে ছুটবে হাশরের ময়দানে,
কারো মুখ উজ্জ্বল নূরের আলোয়,
কারো চেহারায় ভয় আর অন্ধকারের ছাপ।
ডান হাতে আমলনামা পাওয়া সৌভাগ্যবানরা
হাসিমুখে চলবে জান্নাতের পথে,
আর বাম হাতে পাওয়া হতভাগারা
কাঁদবে দীর্ঘশ্বাসে, অনুতাপের আগুনে।
হায়! সেদিন তারা বলবে—
“হে আমাদের রব!
আমাদের আবার ফিরিয়ে দাও পৃথিবীতে,
আমরা এবার নেক আমল করব!”
কিন্তু সে আর ফিরে পাওয়ার সময় নয়,
সে তো প্রতিদানের দিন,
কর্মফলের নিষ্পত্তির দিন।
তখন তাদের জন্য থাকবে
তীব্র উত্তপ্ত বাতাস,
যেন আগুনের নিশ্বাস এসে
চামড়া ভেদ করে অন্তরে পৌঁছে যায়।
থাকবে ফুটন্ত পানি,
যা ঠোঁট ছুঁতেই গলিয়ে দেবে অন্তর,
তবুও তৃষ্ণা মিটবে না এক ফোঁটাও।
কালো ধোঁয়ার ছায়া ঘিরে ধরবে চারদিক,
কিন্তু সে ছায়ায় নেই শান্তি, নেই শীতলতা,
নেই প্রশান্তির একটুকরো পরশ।
শুধু হতাশা, দীর্ঘশ্বাস আর সীমাহীন আফসোস।
তারা খাবে যাক্কূমের ফল,
যার স্বাদ বিষের চেয়েও তিক্ত,
যার গন্ধে আতঙ্কিত হবে হৃদয়।
ক্ষুধায় কাতর হয়ে পেট ভরবে তা দিয়ে,
অতঃপর উত্তপ্ত পানি পান করবে
তৃষ্ণার্ত উটের মতো অবিরাম।
এই হবে তাদের আপ্যায়ন,
যারা দুনিয়ায় রবকে ভুলে ছিল,
নামাজ ছেড়ে গিয়েছিল অহংকারে,
মানুষের হক মেরেছিল নির্দ্বিধায়,
পাপকে খেলাধুলা ভেবে
দিনরাত মগ্ন ছিল গুনাহের অন্ধকারে।
হে মানুষ!
এ দুনিয়া তো ক্ষণিকের সফর,
আজ যে হাসছে দম্ভে,
কাল সে কাঁদবে নিঃস্ব হয়ে।
আজ যে অন্যায় করে বুক ফুলিয়ে চলে,
কাল সে দাঁড়াবে বিচারের কাঠগড়ায়।
তাই এখনও সময় আছে,
ফিরে এসো রবের পথে।
তওবার অশ্রু ঝরাও নির্জন রাতে,
সিজদায় বলো—
“হে আল্লাহ!
আমাকে বাম দিকের দলভুক্ত কোরো না।
আমাকে ডান দিকের সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করো।”
কারণ জান্নাতের বাতাস বড়ই শান্তিময়,
সেখানে নেই ভয়, নেই মৃত্যু, নেই দুঃখের ছায়া।
আর জাহান্নামের আগুন—
তা সহ্য করার শক্তি কারও নেই।
হে রবুল আলামিন!
আমাদের অন্তরকে হিদায়াতের আলোয় ভরিয়ে দিন,
গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফিক দিন,
হাশরের ময়দানে ডান হাতে আমলনামা দান করুন।
আমাদেরকে সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন
যারা বলবে—
“আলহামদুলিল্লাহ!
আজ আমাদের রব আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট।”
আমিন।
বাম দিকের দল — আহা! কত ভয়ংকর তাদের ঠিকানা,
হাশরের ময়দানে তারা হবে লাঞ্ছিত, অপমানিত, বেদনায় ভরা।
না থাকবে আশ্রয়, না থাকবে শান্তি,
না থাকবে মুক্তির কোনো আলো, কোনো প্রশান্তি।
দুনিয়ার ক্ষণিক সুখে যারা ছিল বিভোর,
অহংকারে ভুলে গিয়েছিল আসমানের মহান রব।
হারামকে করেছিল আনন্দের খেলা,
গুনাহকে ভেবেছিল জীবন সাজানোর মেলা।
তারা বলত—
“মাটি হয়ে গেলে কে আবার জীবিত করবে?”
“হাড় গুঁড়ো হলে কে আমাদের উঠাবে?”
সত্যের আহ্বান শুনে তারা হাসত,
নবীদের সতর্কবাণী উপহাসে ভাসত।
কিন্তু হায়!
সেদিন যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে,
মৃত কবরগুলো বিদীর্ণ হয়ে যাবে।
মানুষ উঠবে আতঙ্কিত চোখে,
কারো মুখে নূর, কারো মুখ শোকে।
সেদিন সূর্য হবে অতি নিকটে,
ঘামে ডুবে যাবে মানুষ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে।
পাহাড় হবে উড়ন্ত পশমের মতো,
আকাশ ফেটে যাবে বিকট শব্দে অবিরত।
মা ভুলে যাবে তার শিশুকে,
বন্ধু পালাবে বন্ধুকে ছেড়ে,
স্বামী ভুলবে স্ত্রীকে,
সবাই ব্যস্ত শুধু নিজের হিসাব নিয়ে।
বাম হাতে আমলনামা পেয়ে
কাঁদবে তারা হাহাকারে,
বলবে—
“হায়! আজ যদি মাটিই হয়ে থাকতাম!”
“হায়! আজ যদি কোনো হিসাব না থাকত!”
কিন্তু সেদিন আর ফেরার পথ নেই,
তওবার দরজাও আর খোলা নয়।
দুনিয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে,
আজ শুধু প্রতিদান, শুধু বিচার।
তাদের জন্য থাকবে
তীব্র উত্তপ্ত হাওয়া,
যেন আগুনের নিশ্বাস
চামড়া ভেদ করে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ফুটন্ত পানি পান করানো হবে,
যা পেট ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে,
তবুও পিপাসা কমবে না একটুও।
তৃষ্ণার্ত উটের মতো পান করবে তারা,
তবুও শান্তি পাবে না বিন্দুমাত্র।
আর মাথার উপরে থাকবে
কালো ধোঁয়ার ছায়া,
যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়,
বরং দমবন্ধ করা যন্ত্রণার আবরণ।
যাক্কূম গাছের ফল হবে খাদ্য,
যার স্বাদ বিষের চেয়েও কঠিন,
যার গন্ধে অন্তর কেঁপে উঠবে।
ক্ষুধায় বাধ্য হয়ে তা খাবে,
অতঃপর উত্তপ্ত পানি দিয়ে
পেট ভরাবে সীমাহীন কষ্টে।
এই হবে সেইসব মানুষের মেহমানদারি,
যারা নামাজ ছেড়েছিল অলসতায়,
মানুষের হক মেরেছিল নির্দয়তায়,
অহংকারে সত্যকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
হে মানুষ!
আজও সময় আছে,
আজও রাতের অন্ধকারে
সিজদায় কেঁদে তওবা করা যায়।
আজও বলা যায়—
“হে আল্লাহ!
আমাদের অন্তরকে হিদায়াত দিন,
গুনাহ থেকে বাঁচার শক্তি দিন।
আমাদেরকে ডান দিকের সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন।”
কারণ জান্নাতের ছায়া কত শান্তিময়!
সেখানে নেই মৃত্যু, নেই ভয়, নেই অশ্রু।
সেখানে থাকবে অনন্ত সুখ,
রবের সন্তুষ্টি আর অফুরন্ত নূর।
আর জাহান্নাম—
তা শুধু আগুন নয়,
তা অনুতাপের অতল সাগর,
যেখানে এক মুহূর্তও অসহনীয়।
তাই হৃদয় জাগাও ঈমানের আলোয়,
জীবন সাজাও তাকওয়ার ছায়ায়।
আজ যে কাঁদবে আল্লাহর ভয়ে,
কাল সে হাসবে জান্নাতের বাগানে।
হে পরম দয়াময় রব!
আমাদের কবরকে প্রশান্তিময় করুন,
হাশরের ভয় সহজ করুন,
পুলসিরাত নিরাপদে পার করুন।
আমাদের ডান হাতে আমলনামা দিন,
নেককারদের সাথী করুন,
জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন।
আর আমাদের অন্তিম বাক্য যেন হয়—
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”
আমিন, ইয়া আরহামার রাহিমিন।
***
বাম দিকের দল — কত করুণ সেই সমাবেশ!
হাশরের প্রান্তরে তারা হবে লাঞ্ছিত, অপদস্থ, নিঃশেষ।
চোখে থাকবে আতঙ্কের ছাপ,
মুখে থাকবে অন্ধকার, হৃদয়ে জ্বলবে অনুতাপ।
দুনিয়ার রঙিন মেলায় যারা ছিল বিভোর,
রবের ডাকে ফিরেনি, ছিল গাফেল ও অহংকারে ভরপুর।
নামাজের সময় কেটে যেত হাসি-তামাশায়,
হারামকে তারা সাজিয়ে নিত জীবনের আশায়।
তারা বলত—
“কবর কি আবার মানুষকে জাগাবে?”
“মাটি হয়ে গেলে কে আবার ফিরিয়ে আনবে?”
সত্যের বাণী শুনে ঠোঁটে আনত বিদ্রূপের হাসি,
গুনাহের পথেই কাটত তাদের দিন ও রাতবাসি।
কিন্তু একদিন—
শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে ভীষণ শব্দে,
আকাশ বিদীর্ণ হবে মহা কম্পনে।
পাহাড় ভেঙে যাবে উড়ন্ত তুলোর মতো,
সমুদ্র জ্বলবে আগুনের উত্তপ্ত শিখার মতো।
সেদিন রাজা-প্রজা সব হবে সমান,
কারও হাতে থাকবে না ক্ষমতার মান।
মা ভুলবে সন্তানকে,
বন্ধু পালাবে বন্ধুকে ফেলে,
সবাই শুধু বলবে—
“আজ আমি কীভাবে বাঁচব এই বিচারময় কালে?”
ডান দিকের দল হাসবে নূরের আলোয়,
ফেরেশতারা সালাম দেবে সম্মানের ছোঁয়ায়।
আর বাম দিকের দল কাঁদবে হাহাকারে,
অন্তর জ্বলবে ভয়ংকর আগুনের আঁচে।
তারা বলবে—
“হায়! যদি আজ আমাকে হিসাব না দেয়া হতো!”
“হায়! যদি দুনিয়ার জীবনেই সব শেষ হয়ে যেত!”
কিন্তু আজ আর ফেরার কোনো পথ নেই,
আজ শুধু প্রতিদান, আর কোনো অবকাশ নেই।
তাদের জন্য থাকবে উত্তপ্ত ঝড়ো হাওয়া,
যেন আগুনের নিঃশ্বাস এসে দেহ পোড়ায় অবিরাম।
ফুটন্ত পানি দেয়া হবে পান করতে,
যা গলা ভেদ করে পেট ছিন্ন করবে।
তৃষ্ণায় তারা পান করবে অবিরত,
তবুও শান্তি পাবে না বিন্দুমাত্র।
তৃষ্ণার্ত উটের মতো পান করেও
তাদের অন্তর থাকবে শুষ্ক ও ক্লান্ত।
কালো ধোঁয়ার ছায়া ঢেকে দেবে চারদিক,
কিন্তু সে ছায়ায় নেই আরামের কোনো দিক।
না আছে শীতলতা, না আছে প্রশান্তি,
শুধু জ্বলন্ত কষ্ট আর সীমাহীন ক্লান্তি।
যাক্কূম গাছের ফল হবে তাদের খাদ্য,
যা বিষের চেয়েও কঠিন ও ভয়াবহ স্বাদযুক্ত।
ক্ষুধায় কাতর হয়ে তা খাবে তারা,
অতঃপর ফুটন্ত পানি দিয়ে ভরাবে উদরখানা।
এই হবে সেইসব মানুষের আপ্যায়ন,
যারা দুনিয়ায় ভুলেছিল আখিরাতের জ্ঞান।
যারা মানুষকে কষ্ট দিয়েছিল অহংকারে,
হক নষ্ট করেছিল নিষ্ঠুর আচরণে।
হে মানুষ!
এ দুনিয়া তো কয়েক দিনের পথ,
আজ যার হাসি, কাল তার কান্নার রথ।
আজ যার অট্টালিকা আকাশ ছোঁয়,
কাল সে কবরে একা পড়ে রয়।
আজও সময় আছে ফিরে আসার,
আজও সুযোগ আছে চোখের জল ঝরার।
নির্জন রাতে সিজদায় পড়ে বলো—
“হে আল্লাহ!
আমার অন্তরকে নরম করুন,
আমার গুনাহ ক্ষমা করুন।
আমাকে হিদায়াতের পথে রাখুন,
বাম দিকের দল থেকে হেফাজত করুন।”
হে পরম করুণাময়!
আমাদের কবর আলোকিত করুন,
হাশরের ভয় সহজ করুন।
ডান হাতে আমলনামা দিন,
নেককারদের সঙ্গ দান করুন।
আমাদের পা পুলসিরাতে স্থির রাখুন,
জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন।
যেখানে থাকবে অফুরন্ত শান্তি,
রবের সন্তুষ্টি আর অনন্ত প্রশান্তি।
আর আমাদের শেষ নিশ্বাসে যেন উচ্চারিত হয়—
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
সূরাঃ আল-ওয়াকিয়া আয়াতঃ ৪১-৫৬ মাক্কী
৭১
১৪৫ মন্তব্য