Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ মে, ২০২৬ ০৮:০০ অপরাহ্ণ

দুর্বল হয়ে পড়েছে সুন্দরবনের পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনরুদ্ধার ক্ষমতা কমে যাওয়ার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মূলত একটি ধীরগতির কিন্তু স্থায়ী পরিবেশগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণার সূত্র ধরে এই সংকটের বিস্তারিত বিবরণ নিচে কয়েকটি প্রধান ভাগে আলোচনা করা হলো।
১. ‘ক্রিটিক্যাল স্লোয়িং ডাউন’ (Critical Slowing Down) কী?বাস্তুবিদ্যায় (Ecology) কোনো বনের সুস্থতা পরিমাপ করা হয় তার স্থিতিস্থাপকতা বা রেজিলিয়েন্স (Resilience) দিয়ে। অর্থাৎ, একটি বড় ঝড় বা দুর্যোগের পর বন কত দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারছে।
আগের অবস্থা: অতীতে সুন্দরবনে কোনো ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে বন কয়েক বছরের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই তার ক্ষত সারিয়ে তুলত; নতুন চারা গজাত এবং গাছের সবুজ পাতা ও ডালপালা দ্রুত বৃদ্ধি পেত।
বর্তমান সংকট: গবেষণায় উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৫ বছরে বনের অন্তত ১৫% এলাকার গাছপালার সবুজ হয়ে ওঠার গতি মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে গেছে। বনবিজ্ঞানীরা একে বলছেন 'ক্রিটিক্যাল স্লোয়িং ডাউন'। এর মানে হলো, সুন্দরবনের ভেতরের গাছ ও মাটির জীবনীশক্তি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তারা স্বাভাবিক নিয়মে আর নিজেদের ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারছে না। এটি বাস্তুতন্ত্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার (Ecological Tipping Point) পূর্বলক্ষণ।
২. দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততা ও 'টপ ডাইং' রোগউজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের পানিতে ও মাটিতে লবণের পরিমাণ সহনশীলতার বাইরে চলে গেছে।
সুন্দরী গাছের বিপর্যয়: সুন্দরবনের প্রধান এবং সবচেয়ে মূল্যবান গাছ 'সুন্দরী' লোনাপানি সহ্য করতে পারে না। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরী গাছের আগা মরে যাওয়ার রোগ বা 'টপ ডাইং' (Top-Dying Disease) মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রজাতির পরিবর্তন: মিষ্টি পানির অভাবে বনের ভেতরের অংশে সুন্দরী ও গোলপাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। সেই জায়গা দখল করছে কম উচ্চতার গেওয়া ও গরান গাছ, যা বনের সামগ্রিক ঘনত্ব ও উচ্চতা কমিয়ে দিচ্ছে।
৩. কার্বন সিঙ্ক থেকে কার্বন উৎসে রূপান্তরসুন্দরবনকে পৃথিবীর অন্যতম বড় 'ব্লু কার্বন' (Blue Carbon) সিঙ্ক বা কার্বন শোষক বলা হয়। এই বন বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমায়।
ভয়াবহ উলটপুরাণ: বর্তমানে বনের যে ১৫% এলাকা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেখানে গাছের মৃত্যুর হার নতুন চারা গজানোর হারের চেয়ে বেশি। মৃত গাছপালা যখন পচে যায়, তখন তারা নতুন করে কার্বন শোষণ তো করেই না, বরং আগে জমা থাকা কার্বন বাতাসে ছেড়ে দেয়। ফলে সুন্দরবনের একটি বড় অংশ এখন কার্বন শোষণের বদলে কার্বন নিঃসরণকারী বা 'কার্বন সোর্স' হিসেবে কাজ করছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
৪. ভৌগোলিক ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ধাক্কাসুন্দরবনের এই ক্ষয় সব জায়গায় সমান নয়। 
ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন:খুলনা ও শরণখোলা রেঞ্জ: এই দুটি রেঞ্জের সমুদ্রের কাছাকাছি থাকা দক্ষিণ ও পূর্ব অংশ সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। বঙ্গোপসাগরের সরাসরি ঝাপটা এবং জোয়ারের লোনাপানি এই অঞ্চলের মাটির ভেদ্যতা ও পুষ্টিগুণ পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি: গাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং সুন্দরী গাছের মৃত্যুর কারণে প্রতি বছর বনের কাঠ ও বনজ সম্পদ থেকে প্রায় ১৬.৭২ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া, প্রাকৃতিকভাবে বন উজাড় হতে থাকায় সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ বাওয়ালি (গোলপাতা সংগ্রহকারী), মৌয়ালি (মধু সংগ্রহকারী) এবং জেলেদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
৫. রক্ষাকবচ হারানো বাংলাদেশের উপকূলসুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জন্য একটি প্রাকৃতিক দেয়াল বা গ্রিন শিল্ড (Green Shield)। সিডর বা আইলার মতো মহাপ্রলয়ংকরী ঝড়ের গতিবেগ সুন্দরবনের গাছপালা নিজের গায়ে মেখে উপকূলকে রক্ষা করেছে। কিন্তু বনের ভেতরের গাছপালা এভাবে দুর্বল ও পাতলা হয়ে পড়লে, ভবিষ্যতে যেকোনো মাঝারি ধরনের ঘূর্ণিঝড়ও সরাসরি লোকালয়ে আঘাত হানবে। এতে বাঁধ ভেঙে প্লাবন, ফসলের ক্ষতি এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যাবে।সুন্দরবনের এই ক্ষয় রুখতে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানো এবং বনের ওপর মানুষের অত্যাচার বন্ধ করা প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন