প্রভাষক
২৩ মে, ২০২৬ ০৮:১৮ অপরাহ্ণ
বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন
মে ২০২৬-এ চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট (The Lancet)-এ প্রকাশিত গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (GBD) ২০২৩ গবেষণাটি বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (IHME) এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের গবেষকদের যৌথ পরিচালনায় এটি এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত বিশ্লেষণ।১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের ২৫টি বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক গোষ্ঠীর ডেটা বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। নিচে গবেষণার মূল বিষয়গুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
১. রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি ও অক্ষমতার প্রধান কারণ১.১৭ বিলিয়ন আক্রান্ত: ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাপী মানসিক রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ কোটি (৫৯.৯ কোটি)। ২০২৩ সাল নাগাদ তা ৯৫.৫% বৃদ্ধি পেয়ে ১১৭ কোটিতে (প্রায় ১২০ কোটি) গিয়ে ঠেকেছে।
অক্ষমতার শীর্ষ কারণ: হৃদরোগ বা ক্যানসারের মতো মারাত্মক শারীরিক ব্যাধিকে পেছনে ফেলে মানসিক সমস্যা এখন বিশ্বজুড়ে অক্ষমতার (Disability) প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মোট শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতার ১৭%-এরও বেশির জন্য দায়ী কেবল মানসিক রোগ।
২. সাধারণ রোগসমূহের ভয়াবহ প্রকোপগবেষণায় ১২ ধরনের মানসিক ব্যাধি পর্যালোচনা করা হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি পেয়েছে দুটি রোগে:
উদ্বেগজনিত ব্যাধি (Anxiety Disorders): ২০১৯ সালের তুলনায় উদ্বেগজনিত সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৭%।
ক্লিনিক্যাল বিষণ্ণতা (Major Depressive Disorder): ২০১৯ সালের তুলনায় এটি বেড়েছে প্রায় ২৪%।গবেষকদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির পরবর্তী সময়ে এই দুটি সমস্যা তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং ২০২৩ সাল পর্যন্ত এর রেশ বজায় ছিল।রোগীর সংখ্যা কম হলেও, তীব্রতা ও ভয়াবহতার দিক থেকে সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)-কে অন্যতম প্রধান গুরুতর রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৩. কিশোর ও নারীদের ওপর সর্বোচ্চ আঘাত১৫-১৯ বছর বয়সীরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে: গবেষণায় দেখা গেছে যে মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সের মধ্যে মানসিক রোগের বোঝা সবচেয়ে বেশি। এই বয়সে সব ধরনের মানসিক রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়, যা পরবর্তী সময়ে শিক্ষা ও কর্মজীবনকে ব্যাহত করে।
লিঙ্গভিত্তিক অসমতা: পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি আক্রান্ত। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ৬২ কোটি নারী মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, যেখানে পুরুষ রোগীর সংখ্যা ৫৫ কোটি ২০ লাখ। পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, অতিরিক্ত পারিবারিক দায়িত্ব এবং কাঠামোগত লিঙ্গ বৈষম্যকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে শৈশব ও শুরুর বয়সে ছেলেদের মধ্যে অটিজম এবং এডিএইচডি (ADHD)-র মতো নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যা বেশি দেখা গেছে।
৪. ভৌগোলিক চিত্র ও চিকিৎসার বিশাল ঘাটতি (Treatment Gap)উন্নত বনাম অনুন্নত দেশ: আশ্চর্যজনকভাবে নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে মানসিক রোগের হার অনেক বেশি দেখা গেছে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহারা আফ্রিকার দেশগুলোতেও এই হার দ্রুত বাড়ছে।চিকিৎসার চরম অভাব: গবেষণার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো—বিশ্বব্যাপী তীব্র বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মাত্র ৯% মানুষ ন্যূনতম সঠিক চিকিৎসা পান। বিশ্বের ৯০টি দেশে এই চিকিৎসার সুযোগ ৫%-এরও নিচে। শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার মতো অল্প কিছু উন্নত দেশে এই হার ৩০%-এর ওপরে।
৫. এই সংকটের মূল চালিকাশক্তিগবেষকরা বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ উল্লেখ করেছেন:
দীর্ঘস্থায়ী মহামারিজনিত মানসিক চাপ (যেমন কোভিড-১৯)।যুদ্ধ-বিগ্রহ, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা।অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও তীব্র দারিদ্র্য।সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মানুষের পারস্পরিক সংযোগ কমে যাওয়া।গবেষণার প্রধান লেখক ড. ড্যামিয়ান সান্টোমাউরো সতর্ক করে বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্যের এই মহামারি প্রতিরোধে বিশ্বের দেশগুলোকে দ্রুত তাদের বাজেট বাড়াতে হবে এবং স্কুল স্তর থেকেই মানসিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫
৫ মন্তব্য