Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ মে, ২০২৬ ০৮:২৪ অপরাহ্ণ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর শুভ জন্মবার্ষিকী

দ্রোহ ও প্রেমের কবি: নজরুল

বাঙালির আবেগ, চেতনা আর সংস্কৃতির আকাশে কাজী নজরুল ইসলাম এক চিরভাস্বর নক্ষত্র। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ একটি জাতিকে যিনি ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছিলেন তাঁর কলমের ধার দিয়ে, তিনিই আবার ভালোবাসার মায়াবী সুর বুনেছিলেন মানুষের হৃদয়ে। আজ থেকে শত বছরেরও বেশি সময় আগে আবির্ভূত হওয়া এই কবি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে যে পদাঙ্ক রেখে গেছেন, তা আজও সমানে দীপ্তিময়।

দুঃখমিয়াঁ থেকে মহাবিদ্রোহী

১৮৯৯ সালের ২৫ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেন এই মহাপুরুষ। শৈশবেই পিতৃহারা হয়ে চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হন তিনি। কষ্টের সেই দিনগুলোতে তাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল 'দুঃখু মিয়াঁ'। কিন্তু দুঃখ তাঁকে দমাতে পারেনি। লেটোদলের গান, রুটির দোকানে কাজ, আর মক্তবের শিক্ষা—সব মিলিয়ে এক বৈচিত্র্যময় শৈশব পার করে তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই সৈনিক জীবনই তাঁর ভেতরের কবিসত্তাকে এক ভিন্ন রূপ দেয়।

১৯২১ সালে তাঁর বিখ্যাত 'বিদ্রোহী' কবিতাটি প্রকাশিত হলে বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কবি গর্জে ওঠেন:

"বল বীর— বল উন্নত মম শির! শির নেহারি' আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!"

তিনি হয়ে ওঠেন পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল ভাঙার গান গাওয়া এক অবিনাশী কণ্ঠস্বর। ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এই কবিকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে, কিন্তু তাঁর কলমকে স্তব্ধ করা যায়নি।

সাম্য ও মানবতার দূত

নজরুলের মূল দর্শন ছিল মানুষ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণির ঊর্ধ্বে তিনি স্থান দিয়েছিলেন মানুষের মর্যাদাকে। তাঁর 'সাম্যবাদী' কবিতায় তিনি গেয়েছেন—"গাহি সাম্যের গান— যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।" তিনি নারীর অধিকার, কৃষকের মুক্তি এবং শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে আজীবন কথা বলেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল আপসহীন। একই হাতে তিনি যেমন সৃষ্টি করেছেন ‘শ্যামাসংগীত’ ও ‘কীর্তন’, ঠিক তেমনি বাংলা সাহিত্যে সংযোজন করেছেন ‘ইসলামী গজল’ ও ‘হামদ-নাত’। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা আজীবন তাঁকে অনন্য করে রেখেছে।

সুরের মহাসমুদ্রে নজরুল

কেবল কবিতায় নয়, বাংলা সংগীত জগৎ নজরুলের কাছে ঋণী। তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। প্রায় চার হাজার গান রচনা করে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন, যা 'নজরুল গীতি' নামে পরিচিত। ঠুমরি, গজল, টপ্পা থেকে শুরু করে ধ্রুপদী রাগপ্রধান গান এবং উদ্দীপনামূলক কুচকাওয়াজ বা রণসংগীত—সবখানেই তাঁর সুরের জাদু ছড়িয়ে আছে। তাঁর রচিত 'চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল' গানটি বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে আমাদের প্রতিটি জাতীয় মুহূর্তে প্রেরণা জোগায়।

বাংলাদেশের নজরুল ও তাঁর চিরবিদায়

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরম শ্রদ্ধায় কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং তাঁকে 'জাতীয় কবি'র মর্যাদায় ভূষিত করেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) এই মহান কবি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁরই একটি গানের ইচ্ছা অনুযায়ী—"মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই"—তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

প্রাসঙ্গিকতা

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একটি যুগের কবি নন; তিনি সর্বকালের, সব বয়সের। অন্যায়, অবিচার আর বৈষম্য যতদিন পৃথিবীতে থাকবে, নজরুলের কবিতা আর গান ততদিন মানবজাতিকে লড়ার সাহস জোগাবে। তিনি আমাদের অহংকার, আমাদের চিরকালের দ্রোহ ও প্রেমের অফুরন্ত উৎস।


মন্তব্য করুন