Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ মে, ২০২৬ ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

বিদ্রোহী কবির ১২৭ তম জন্মদিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

"ফুল ফোটানোই আমার ধর্ম।তরবারি হয়তো আমার হাতের বোঝা, কিন্তু তাই বলে তাকে আমি ফেলে দেইনি।আমি গোধূলি বেলায় রাখাল ছেলের সাথে বাঁশি বাজাই।ফজরে মুয়াজ্জিনের সুরে সুর মিলিয়ে আজান দেই,আবার দীপ্ত মধ্যাহ্নে খর তরবার নিয়ে রণভূমে ঝাঁপিয়ে পড়ি।তখন আমার খেলার বাঁশি হয়ে ওঠে যুদ্ধের বিষাণ,রণশিঙ্গা। সুর আমার সুন্দরের জন্য, আর তরবারি সুন্দরের অবমাননা করে যে-সেই অসুরের জন্য। "- কাজী নজরুল ইসলাম 


স্বকীয় ধারায় আপন গতিপথে কাব্যস্রোত প্রবাহিত করে রবীন্দ্রোত্তর যে কজন কবি বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। অভাব -অনটনের নিষ্ঠুর জাতাঁকলে নিষ্পেষিত হয়েও স্বচেষ্টায় নিজেকে তিনি অধিষ্ঠিত করেছিলেন বিরল কৃতিত্বের অনন্য উচ্চতায়। নজরুল ইসলাম ছিলেন মানবতার কবি। মানবতাবোধের পূর্ণ প্রভায় দীপ্ত ছিল তাঁর মন।"হিউম্যান ভ্যালুজ" বা মানবিক মূল্যবোধ যখন অবলুপ্তির পথে তখনই নজরুল প্রেম ও বিদ্রোহের কেতন উড়িয়ে সকলকে বিস্মিত করে দিয়ে আচমকা আবির্ভূত হলেন বাংলা সাহিত্যাকাশে।যুগ যুগ ধরে বাংলার নিরীহ মানুষের পুঞ্জিভূত বন্দিত্বের গ্লানি,বঞ্চনার গাত্রদাহ,পীড়নের মর্মজ্বালা তাকে ক্ষুব্ধ করেছে, করেছে বিদ্রোহী।পরাধীনতার নাগপাশ ছিঁড়ে মুক্ত স্বাধীন আকাশে কোটি বাঙালিকে নিয়ে ভেসে বেড়ানোর স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তিনি। এজন্য তিনি জাত-পাতের ভেদাভেদকে পিষ্ট করে হিন্দু -মুসলিম এ দু বৃহৎ ও বিরোধী শক্তিকে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ঐক্য -প্রীতির মিলনমেলায়। বস্তুত কবি নজরুল ছিলেন মনে প্রাণে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক।তাঁর কবি সত্তায় রেখাপাত করেছিল এদেশের নিপীড়িত, অধিকার হারা নিঃস্ব-বঞ্চিত অগণিত মানুষের আর্তনাদ। তিনি মাটিতে কান পেতে শুনতে পেয়েছিলেন বঞ্চিতের আর্তচিৎকার।তিনি হৃদয়ের ক্যানভাসে দেখতে পেয়েছিলেন নিরন্ন মানুষের অসহায় পান্ডুর মুখচ্ছবি। কবি মর্মে  মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন ভিন দেশীয় চক্রান্ত আর জুলুম শোষণে এদেশের কোমল প্রাণ মানুষেরা কিভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সে কারণেই কবি অধিকার হারা মানুষকে উঠে দাঁড়াবার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন মানুষকে জাগাতে হবে অধিকার আদায়ে রক্ত ও ঘাম ঝড়াতে হবে। অনাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরণ প্রবল প্রতিবাদী কন্ঠস্বর,দ্রোহ ও সংগ্রামের তূর্যবাদক কবি নজরুল পুরাতন ও জরাজীর্ণতাকে ভাঙতে চেয়েছিলেন। তাঁর এ ভাঙা ছিল নতুন দেশ-সমাজ -জাতি গড়ে তোলার তীব্র প্রত্যয়েরই প্রতিভাস।নজরুল ধর্মীয় উর্দি পড়া ভন্ডের মুখোশ উন্মোচন করে, নারী অধিকারকে সমুন্নত রেখে সকল মানুষকে আহ্বান করেছিলেন সাম্যের পতাকাতলে। তাঁর বিদ্রোহী সত্ত্বার পরিচয় পাওয়া যায় "বিদ্রোহী" কবিতায় যা কবির সবচেয়ে বিখ্যাত ও সাড়া জাগানো কবিতা ও তাকে "বিদ্রোহী কবি" হিসেবে অমরত্ব দান করে।


"আমি চিরদুর্দ্দম,দুর্বিনীত, নৃশংস, 

মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস, 

আমি মহাভয়,আমি অভিশাপ পৃথ্বী! 


শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিয়ে লেখা অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি কবিতা " কুলি-মজুর"-


"তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর,মুটেও কুলি

তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি

তারাই মানুষ, তারাই দেবতা,গাহি তাহাদেরি গান"।


মানবতার জয়গান ও ধর্মীয় সম্প্রীতির উপর ভিত্তি করে রচিত কালজয়ী কবিতা -


গাহি সাম্যের গান-

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান

যেখানে মিশেছে হিন্দু -বৌদ্ধ -মুসলিম -ক্রীশ্চান।


সমাজের নারীদের অবদান ও মর্যাদাকে সম্মান  জানিয়ে লেখা এক অনবদ্য সৃষ্ট কবিতা "নারী"-


"বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর"


তারুণ্যের জাগরণ ও অন্যায় ধ্বংসের মন্ত্রে দীক্ষিত একটি বিখ্যাত কবিতা "প্রলয়োল্লাস"- 


" ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? -প্রলয় নূতন সৃজন -বেদন!

আসছে নবীন -জীবন -হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!"


কাজী নজরুল ইসলামের "বিদ্রোহী" কবিতা পড়ার পর কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন "তোমরা ওর কবিতায় রস অনুসন্ধান করো না,কেবল দৃষ্টি বোলাও"। নজরুল বাংলা সাহিত্যকে তারুণ্যের শক্তিতে উজ্জীবিত করেছেন মনে করে কবি গুরু তার "বসন্ত "গীতিনাট্যটি উৎসর্গ করেছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা সবসময়ই বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য এক বড়ো অনুপ্রেরণা। 

 তাই বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে কাজী নজরুল ইসলাম এক ভিন্ন বীণার ঝংকার। 


মোহাম্মদ জিয়াদ হোসেন 

প্রভাষক,বাংলা

সরকারি হিজলা ডিগ্রি কলেজ 

হিজলা,বরিশাল।


মন্তব্য করুন