সহকারী অধ্যাপক
২৮ মে, ২০২৬ ১২:৩৫ অপরাহ্ণ
দুই বন্ধুর কবিতা - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
দুই বন্ধুর কবিতা
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বন্ধু আমার টাকা কড়ি,
নিয়ে গেল চালাকি করি,
বিশ্বাস দিয়ে গড়লাম সেতু,
ভাঙল সে তা ধোঁকা ধরি।
মুখে ছিল মিষ্টি বুলি,
ভেতরজুড়ে বিষের ঝুলি,
হাসিমুখে কসম খেয়ে
করল শেষে হৃদয় চুরি।
দিন যায় আর মাস যে ফুরায়,
আশার প্রদীপ নিভু নিভু জ্বলে,
কাগজ লিখে সইও দিল,
টাকা ফেরার খবর না মেলে।
বৈঠকখানায় কত কথা,
“ভাই রে, দেব”—মিথ্যা ব্যথা,
আজকে কালকে করতে করতে
শেষ করিল বিশ্বাসগাঁথা।
ঈদ এলো রঙিন সাজে,
ওরা হাসে নতুন মাঝে,
মোটাতাজা গরু কিনে
ছবি তোলে লোকসমাজে।
আমি তখন শূন্য হাতে,
ঘুরি শুধু পথের সাথে,
মনের ভেতর জমে আছে
কষ্টভরা দীর্ঘ রাতে।
ওদের ঘরে আলোর মেলা,
আমার চোখে কান্না খেলা,
নিজের টাকা চাইতে গিয়েও
হই যে যেন দোষের বেলা।
উল্টো আবার কটু ভাষা,
চাবুকসম কঠিন আশা,
মানুষ হয়ে মানুষ কেন
মানুষেরে দেয় নিরাশা?
বিশ্বাস ছিল অমূল্য ধন,
হারিয়ে গেল সেই আপন,
টাকার চেয়ে দুঃখ বড়—
ভাঙল যখন হৃদয়-বন্ধন।
রাতের শেষে তাহাজ্জুদে,
হাত তুলেছি নীরব সুরে,
“আল্লাহ তুমি বিচার করো,
রাখো আমায় সত্য নূরে।”
যে টাকা মোর হক্বের ধন,
ফিরিয়ে দাও হে পরমজন,
অন্যায়ের এই আঁধার ভেঙে
দাও ন্যায়ের আলোকবরণ।
লোভ মানুষে অন্ধ করে,
পাপের পথে ধীরে ধীরে,
হাসির আড়াল ভেঙে একদিন
দাঁড়াবে সে বিচার তীরে।
কেউ যদি আজ কাঁদায় মানুষ,
অহংকারে করে ফানুস,
সময় হলে সেই মানুষই
খুঁজে ফেরে শান্তির বাতাস।
জীবন শুধু ধনের নয়,
মানবতাই আসল জয়,
পরের হক্ব মেরে খেলে
শান্তি কভু হৃদয়ে রয়?
বন্ধুত্বের নামে যারা
স্বার্থ দেখে বারেবারা,
তাদের থেকে দূরে থাকাই
জীবনপথের ভালো ধারা।
তবু আমি ঘৃণা নয়,
সত্যপথেই রাখি ভয়,
আল্লাহ আছেন ন্যায়ের মালিক—
এই বিশ্বাস হৃদয়ময়।
একদিন সব হিসাব হবে,
সত্য তখন সামনে রবে,
কারো চোখের কান্নাধারা
বৃথা কভু নাহি যাবে।
তাই বলি হে মানবজাতি,
লোভে করো না ক্ষতি,
অন্যের হক্ব ফিরিয়ে দাও—
এতেই মেলে শান্তিগাঁথি।
ঈদের খুশি সবার হোক,
দুঃখ যেন দূরে লোক,
কারো চোখের অশ্রুধারা
না হোক কারো সুখের শোক।
আল্লাহ তুমি দয়া করো,
অভাবীদের পাশে ধরো,
প্রতারিত সব মানুষের
ভাঙা হৃদয় জোড়া ধরো।
যে নিয়েছে অন্যের ধন,
জাগুক তার বিবেকমন,
ফিরে এসে বলুক আবার—
“ভাই, মাফ করো, এই নাও পণ।”
ক্ষমার মাঝে মহত্ত্ব থাকে,
মানবতা হৃদয়ে ডাকে,
ন্যায় আর সত্যের আলো
অন্ধকারকে দূরে রাখে।
বন্ধু যদি সত্যি হয়,
কষ্টে পাশে দাঁড়ায় সয়,
স্বার্থ শেষে পালায় না সে—
ভালোবাসাই তার পরিচয়।
এই পৃথিবী ক্ষণিক ভ্রমণ,
টাকাই নয় জীবনের ধন,
সততা আর ন্যায়ের পথে
রয় মানুষের চিরজয়গান।
***
সর্বহারা বন্ধুর আর্তনাদ
বন্ধু আমার টাকা কড়ি,
নিয়ে গেল চালাকি করি,
বিশ্বাস ছিল বুকের মাঝে,
সেই বিশ্বাস ভাঙল ঝড়ি।
মুখে ছিলো আপন কথা,
ভালোবাসার মিথ্যে ব্যথা,
ভেতর জুড়ে লোভের আগুন—
সেটাই ছিল আসল গাথা।
কত রাতে বসে দুজনে
স্বপ্ন বুনেছি গোপন মনে,
আজ সে বন্ধু দূরে সরে
চলে গেল স্বার্থের টানে।
কাগজ লিখে দিল সই,
বলল আমায়—“ভাইরে কই,
কয়টা দিন ধৈর্য ধরো,
সবই দেবো নিশ্চয়ই।”
দিন যে গেল, মাসও গেল,
বছর ঘুরে সময় ফেল,
টাকার কথা তুললেই সে
রাগের আগুন জ্বালায় খেল।
উল্টো আবার কঠিন বুলি,
চাবুকসম বিষের ঝুলি,
নিজের হক্ব চাইতে গিয়েও
হই যে আমি দোষের বুলি।
ঈদ এলো আনন্দ নিয়ে,
মানুষ হাসে খুশি পেয়ে,
ওদের ঘরে কোরবানির
গরু দাঁড়ায় মাথা দুলিয়ে।
মোটাতাজা গরু কিনে
ছবি তোলে রঙিন ঋণে,
ফেসবুকে দেয় বাহাদুরি
আলোকসাজের ঝলক বুনে।
আমি তখন শূন্য হাতে,
দীর্ঘশ্বাস বুকের সাথে,
ঘুরি যেন বনেবাদাড়
হারিয়ে যাওয়া পথের প্রাতে।
সন্তানের চোখে প্রশ্ন জাগে,
“আব্বু, ঈদ কি আমাদের লাগে?”
কথা খুঁজি উত্তর দেবো—
কষ্ট এসে বুকটা ভাগে।
স্ত্রীর চোখে নীরব পানি,
লুকিয়ে রাখে সংসারখানি,
অভাব ঢাকে হাসির আড়াল—
ভাঙা ঘরে বিষাদ টানি।
টাকা শুধু টাকা নয়,
ঘামের দামে কেনা হয়,
দিনের শেষে শ্রমিক মানুষ
স্বপ্ন বুকে ঘুমিয়ে রয়।
সেই টাকাতে ছিল আশা,
ছিলো সুখের ভালোবাসা,
ছিলো মায়ের ওষুধ কেনা,
ছিল সন্তানের পড়ার খাতা।
লোভ যে মানুষ অন্ধ করে,
মানবতাকে দূরে সরায়,
অন্যায়ের সেই কালো ছায়া
আত্মাটাকেও পুড়িয়ে মারে।
মানুষ যদি মানুষ হতো,
পরের দুঃখ বুঝতে যত,
তবে কি আর বন্ধুর নামে
এমন ছলনা করতো?
তবু আমি অভিশাপ নাই,
আল্লাহর কাছেই বিচার চাই,
কারণ তিনিই ন্যায়ের মালিক,
তার আদালত মিথ্যা নাই।
রাতের শেষে তাহাজ্জুদে
কাঁদি আমি নীরব সুরে,
“হে আল্লাহ তুমি ফিরিয়ে দাও
হারানো সুখ জীবনের তরে।”
যে নিয়েছে হক্বের ধন,
জাগাও তার বিবেকমন,
লোভের নেশা দূরে সরিয়ে
দাও তাকে সত্য জ্ঞান।
কারো হক্ব মেরে খেলে
সুখ কি কভু ঘরে মেলে?
অন্যায়ের সেই আগুন একদিন
নিজেকেই যে ছাইয়ে ফেলে।
আজ যে হাসে অহংকারে,
কাল সে কাঁদে অন্ধকারে,
সময়ের এই বিচারচক্র
ঘুরে ফিরে সকল দ্বারে।
বন্ধুত্ব মানে পাশে থাকা,
দুঃখ এলে হাতটা রাখা,
স্বার্থ শেষে পালিয়ে যাওয়া
বন্ধুত্বের নয়তো ভাষা।
বিশ্বাস একটি অমূল্য রতন,
ভাঙলে জাগে বিষাদগাথন,
সোনা হারালে পাওয়া যায়,
হারায় না কি ভাঙা মন?
আইনের পথে ন্যায়ের আশা,
সত্যের মাঝে মুক্তি ভাসা,
প্রতারকের মুখোশ খুলে
জাগুক ন্যায়ের সূর্যভাষা।
যে কাঁদিয়েছে নিরীহ জন,
ফিরে পাক সে উপলব্ধি মন,
ক্ষমা চেয়ে ফিরিয়ে দিক
অন্যায়ের সব অর্জন।
ঈদ হোক সব মানুষের,
ধনী-গরিব এক কাতারের,
কারো ঘরে হাসির আলো,
কারো ঘরে কান্না কেন রে?
শিশুর মুখে ফুটুক হাসি,
ভালোবাসায় কাটুক বাসি,
অভাব যেন গ্রাস না করে
কোনো ঘরের সুখের বাতি।
আল্লাহ তুমি রহম করো,
অসহায়ের পাশে ধরো,
প্রতারিত সব হৃদয়ের
ভাঙা স্বপ্ন জোড়া ধরো।
মানবতার জয় হোক আজ,
সততারই উঠুক সাজ,
লোভ-অহংকার দূরে যাক—
ন্যায়ের হোক নতুন সমাজ।
এই দুনিয়া ক্ষণিক ভ্রমণ,
রবে না তো ধন-সম্পদগণ,
ভালো কাজ আর সততাই
মানুষেরে করে অমরজন।
তাই হে মানুষ মনে রেখো,
পরের হক্ব কখনো দেখো,
অন্যায়ের সুখ ক্ষণিক শুধু—
শেষে কাঁদায় জীবনেরেখো।
বন্ধু যদি সত্যি হও,
ভাঙা মনে সান্ত্বনা দাও,
মানুষ হয়ে মানুষের তরে
মায়া-মমতার প্রদীপ জ্বালাও।
***
সর্বহারা বন্ধুর আর্তনাদ ২
অন্যায়ের এই দুনিয়াতে
সত্য মানুষ কাঁদে রাতে,
মিথ্যার মালা গলায় পরে
প্রতারকেরা চলে সাথে।
হাসির আড়াল দেখে লোকে,
কেউ কি দেখে বুকের শোকে?
নীরব মানুষ কত যে কাঁদে
অশ্রু ঝরে চোখের কোণে।
যার ছিল না লোভের নেশা,
ছিল না কোনো মিথ্যে আশা,
সেই মানুষই আজকে কেন
দুঃখ বুকে করে বাসা?
যে বন্ধু একসাথে খেত,
সুখ-দুঃখে গল্প গাঁথত,
টাকার লোভে সেই মানুষই
সম্পর্কটা ভেঙে দিল হঠাৎ।
বুকের মাঝে জমা ক্ষত,
বলতে গেলে বাড়ে ব্যথা,
নিজের মানুষ আঘাত দিলে
নিভে যায় সুখের প্রদীপটা।
তবু জীবন থেমে না রয়,
দুঃখ পেরিয়ে সকাল হয়,
কালো মেঘের আড়াল ভেঙে
সূর্য আবার আলো কয়।
আল্লাহ যারে ভালোবাসেন,
পরীক্ষাতে তারে রাখেন,
সবর করে সত্য পথে
চলতে যারা ভয় না পান।
হয়তো আজকে শূন্য ঘরে,
অভাব নাচে অন্তরে,
তবু আশা হারাবো না—
রহমত আছে স্রষ্টার দ্বারে।
মানুষ যদি দয়া শিখত,
পরের ব্যথা বুঝতে পারত,
তবে কি আর এই সমাজে
এত প্রতারণা জন্ম নিত?
আইনের ভয়, বিবেকের ডাক—
দুটো যদি থাকত ঠিক,
অন্যায়ের এই কালো পথে
মানুষ যেত না আর ঠিক।
যে কাঁদিয়েছে নিরীহ প্রাণ,
ভুলে যেও না হে মানবজান,
একদিন ঠিক হিসাব হবে
রহিবে না কোনো গোপন টান।
ধন-সম্পদ ক্ষণিক ছায়া,
সাথে নাহি যাবে মায়া,
মানুষ শুধু কর্ম নিয়েই
চলে যায় পরপারের পায়া।
তাই তো বলি বন্ধু আমার,
ভালোবাসা হোক অধিকার,
প্রতারণার কালো ছায়া
ঢেকে না দিক সংসার।
ঈদের খুশি ভাগ হোক সবে,
দুঃখ যেন না থাকে ভবে,
অভাবীরও হাসি ফুটুক
নতুন দিনের উৎসবে।
ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগে
স্নেহ-মমতার মিষ্টি রাগে,
মানুষ যদি মানুষ হয়
শান্তি নামে পৃথিবিভাগে।
হিংসা-লোভের আগুন নিভে
সততারই আলো জ্বলে,
মানবতার সুবাস ছড়িয়ে
ভালোবাসা ফুটুক ফলে।
যে দিয়েছে চোখে পানি,
তারও খুলুক শুভ জ্ঞানি,
ফিরে এসে বলুক একদিন—
“ভাই, ভুল ছিল, ক্ষমা জানি।”
সত্য কখনো হারায় না,
অন্যায় কভু টিকায় না,
সময় হলে সত্যের আলো
মিথ্যার দেয়াল মানে না।
দুঃখ কষ্ট জীবনের সাথী,
তবু আশা হারায় নাতি,
সবর যার অন্তরে থাকে
সফল হয় সেই মহাজাতি।
শেষ প্রহরে এই প্রার্থনা—
ঘুচুক সবার বেদনা,
ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠাতে
জাগুক মানব চেতনা।
৭০
১৪৪ মন্তব্য