প্রভাষক
২৮ মে, ২০২৬ ০৪:৫৯ অপরাহ্ণ
প্রাণ ও পরিবেশের সুরক্ষায় ইসলামের ১০ শিক্ষা
ইসলামে প্রাণ ও পরিবেশের সুরক্ষা কেবল একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি ইবাদতের অংশ। মহান আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।নিচে প্রাণ ও পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাআল্লাহ তাআলা এই মহাবিশ্বকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাপ ও নিখুঁত ভারসাম্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "আমি প্রত্যেকটি বস্তু নির্দিষ্ট পরিমাপে সৃষ্টি করেছি।" (সূরা কামার: ৪৯)। মানুষের কোনো কর্মকাণ্ডের কারণে যেন এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না হয়, ইসলাম সে বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
২. বৃক্ষরোপণ ও বনায়নইসলামে গাছ লাগানো এবং তার যত্ন নেওয়াকে সদকায়ে জারিয়া বা চলমান সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যদি কোনো মুসলিম একটি গাছ লাগায় অথবা শস্য বুনে, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খাবার খায়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।" (বুখারি)।
যুদ্ধকালীন নির্দেশনা: যুদ্ধের চরম মুহূর্তেও শত্রুভাবাপন্ন দেশের ফলবান গাছ কাটতে ইসলাম নিষেধ করেছে।
৩. অপচয় ও দূষণ রোধসম্পদের অপচয় এবং পরিবেশের ক্ষতি করাকে ইসলাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইসলামে পরিমিতিবোধের শিক্ষা রয়েছে। প্রবাহিত নদী থেকে ওজু করার সময়ও পানি অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে।
৪. প্রাণীদের প্রতি দয়া ও অধিকার রক্ষাইসলামে অবলা প্রাণীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম এবং তাদের ওপর নির্যাতন জাহান্নামের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষমা লাভ: এক তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক পাপী ব্যক্তিকে আল্লাহ ক্ষমা করে জান্নাত দিয়েছিলেন।
শাস্তি: একটি বিড়ালকে আটকে রেখে না খাইয়ে মেরে ফেলার কারণে এক মহিলাকে জাহান্নামে যেতে হয়েছিল।
অধিকার: প্রাণীদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপানো এবং কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তীর ধনুকের নিশানা অনুশীলন করা নিষিদ্ধ।
৫. পানি ও বায়ু দূষণমুক্ত রাখাপাবলিক প্লেস বা উন্মুক্ত পরিবেশ দূষণ করা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা অভিশাপের দুটি কাজ থেকে বেঁচে থাকো— মানুষের চলাচলের রাস্তায় এবং ছায়াদার স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করা।" (মুসলিম)। একইভাবে স্থবির বা আবদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করে তা দূষিত করতে নিষেধ করা হয়েছে।
৬. প্রাকৃতি সম্পদকে আমানত মনে করাপৃথিবীর সব উপাদান— মাটি, পানি, বাতাস, আলো, পাহাড় ও বন জঙ্গল— আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের কাছে আমানত। মানুষ এগুলো নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করবে, কিন্তু ধ্বংস বা অপব্যবহার করার অধিকার তার নেই। আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকের লক্ষণ।
৭. দয়া ও ইহসান (উত্তম আচরণ)ইসলামের মূল কথাই হলো সৃষ্টিজগতের প্রতি দয়া করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানের মালিক (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।" (তিরমিজি)। এই দয়া কেবল মানুষের জন্য নয়, এটি গাছপালা, কীটপতঙ্গ এবং সমস্ত জীবকুলের জন্য প্রযোজ্য।
৮. ভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করাঅনাবাদী বা পরিত্যক্ত জমি ফেলে না রেখে তা চাষাবাদ বা গাছ লাগানোর মাধ্যমে উৎপাদনশীল করার ওপর ইসলাম জোর দিয়েছে। হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি কোনো মৃত (অনাবাদী) ভূমিকে জীবিত করবে (চাষোপযোগী করবে), সেটার মালিক সে নিজেই হবে।" (আবু দাউদ)। এটি পরোক্ষভাবে পরিবেশের সবুজায়ন নিশ্চিত করে।
৯. প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করাআল্লাহ তাআলা সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। পাহাড়, নদী, সাগর ও বনাঞ্চল পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আল্লাহর জীবন্ত নিদর্শন। এগুলো ধ্বংস করা বা কলুষিত করা আল্লাহর নিদর্শনের অবমাননা করার শামিল। ইসলাম সবসময় পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখার তাগিদ দেয়।
১০. ফেতনা ও বিপর্যয় সৃষ্টি না করাপবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, "মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।" (সূরা রুম: ৪১)। শিল্পায়ন বা আধুনিকায়নের নামে পরিবেশের ক্ষতি করা, নদী দখল করা বা নির্বিচারে বন উজাড় করা ইসলামের দৃষ্টিতে বড় অপরাধ (ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি)। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।
২
২ মন্তব্য