প্রধান শিক্ষক
২৮ মে, ২০২৬ ১১:৩৯ অপরাহ্ণ
পরিবারে দীনি পরিবেশ সৃষ্টি কুরবানির অন্যতম শিক্ষা
পরিবারে দীনি পরিবেশ সৃষ্টি কুরবানির অন্যতম শিক্ষা
কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য, তাকওয়া এবং পারিবারিক ঐক্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে এমন এক আদর্শ পরিবারব্যবস্থা তুলে ধরে, যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টিই ছিল সবার একমাত্র লক্ষ্য, আর সেই লক্ষ্য অর্জনে পরিবারের প্রত্যেকে ছিলেন এক ও অভিন্ন চেতনার ধারক।পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানি করার নির্দেশ দেন। এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও হৃদয়বিদারক এক পরীক্ষা। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি এই বিষয়ে ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করেন। একজন পিতা হিসেবে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি; বরং সন্তানের মতামত জানতে চেয়েছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে পারিবারিক সম্পর্ক কেবল কর্তৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও পরামর্শের ভিত্তিতেও গড়ে ওঠে।
হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর উত্তর ছিল ঈমান ও আনুগত্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তিনি বলেছিলেন, “হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ! আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” একজন সন্তানের পক্ষ থেকে এমন আত্মসমর্পণ ও সহযোগিতা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি পিতার সিদ্ধান্তকে কেবল পারিবারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
অন্যদিকে হজরত হাজেরা (আ.)-ও ছিলেন অনন্য ধৈর্য ও ঈমানের প্রতীক। তিনি যখন জানতে পারলেন, এটি আল্লাহর নির্দেশ, তখন তিনি কোনো আপত্তি করেননি। বরং স্বামীকে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছেন। এভাবেই আমরা দেখতে পাই—একটি পরিবার, এক লক্ষ্য, এক বিশ্বাস এবং একমুখী আনুগত্য।
কুরবানির এই ঘটনায় পরিবারে সমমনা হওয়ার যে শিক্ষা নিহিত রয়েছে, তা আজকের সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবার তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার সদস্যরা মূল্যবোধ, নীতি ও আদর্শের ক্ষেত্রে একে অপরের সহযাত্রী হয়। পরিবারের কর্তা দীনের পথে চলতে চান, অথচ সন্তানরা ভিন্ন পথে থাকে, অথবা স্ত্রী দীনমুখী কিন্তু স্বামী উদাসীন থাকেন—তবে সেই পরিবারে আদর্শিক ঐক্য গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগেই থেমে যায়।
বর্তমান সময়ে এই সমন্বয়হীনতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। আধুনিকতার নামে অনেক পরিবারে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মূল্যবোধের জায়গায় এসেছে বিচ্ছিন্নতা। সংসার এক হলেও চিন্তা ও আদর্শ যেন ভিন্ন ভিন্ন জগতের। বাবা-মা এক চিন্তায়, সন্তান অন্য চিন্তায়; স্বামী একদিকে, স্ত্রী আরেকদিকে। এর ফলে পরিবারে অশান্তি যেমন বাড়ে, তেমনি দীনি পরিবেশও দুর্বল হয়ে পড়ে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কেবল সাধারণ পরিবারেই নয়; বহু দীনদার পরিবারেও এই সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। পরিবারের সদস্যদের মাঝে দীনি চেতনা, লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য থাকে। কেউ দীনের কাজে আগ্রহী, কেউ দুনিয়াবিমুখ নয়; কেউ ইসলামি পরিবেশ চান, কেউ উদাসীন। ফলে পরিবারে একটি সুন্দর ইসলামি আবহ গড়ে ওঠে না। অথচ একটি পরিবার যদি সত্যিকার অর্থে এক আদর্শে উজ্জীবিত হয়, তবে সেই পরিবার সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি আদর্শ পরিবার কেবল অর্থ-সম্পদ বা বাহ্যিক আভিজাত্যে গড়ে ওঠে না। বরং পারস্পরিক ঈমানি সম্পর্ক, আল্লাহভীতি, পরামর্শ, সহযোগিতা ও একমুখী লক্ষ্যই একটি পরিবারকে সফল ও শান্তিময় করে তোলে। কুরবানির শিক্ষা আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়—পরিবারের সবাই যদি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে সবচেয়ে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়।
আজ আমাদের প্রয়োজন পরিবারে দীনি পরিবেশ সৃষ্টি করা, সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, পারিবারিক সিদ্ধান্তে পরামর্শের সংস্কৃতি চালু করা এবং সর্বোপরি আল্লাহর হুকুমকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। তাহলেই কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত হবে।
লেখক: মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদরাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা
৫
৫ মন্তব্য