সহকারী শিক্ষক
২৯ মে, ২০২৬ ০৩:৫৩ অপরাহ্ণ
ডিজিটাল জগতের অন্ধকার গলি: সাইবার বুলিং এবং আমাদের করণীয়
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সকালের ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এই ভার্চুয়াল জগৎ যেমন আমাদের যোগাযোগকে সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহারের ফলে তৈরি হয়েছে কিছু কালো অধ্যায়। তার মধ্যে অন্যতম একটি মারাত্মক সমস্যা হলো 'সাইবার বুলিং'। এটি এমন এক অদৃশ্য বিষাক্ত আচরণ, যা স্ক্রিনের আড়াল থেকে একজন মানুষের মানসিক জগতকে চুরমার করে দিতে পারে।
সহজ কথায়, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেনস্তা, অপমান, হুমকি বা নিগৃহীত করাই হলো সাইবার বুলিং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারো ছবিতে আপত্তিকর মন্তব্য করা, ভুয়ো আইডি খুলে বিভ্রান্তি ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা ইনবক্সে গালিগালাজ করা—এসবই এর অন্তর্ভুক্ত। বাস্তব জীবনের হিংস্রতা যেমন মানুষকে আঘাত করে, তেমনি অনলাইনের এই মানসিক অত্যাচারও একজন মানুষকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। দুঃখের বিষয় হলো, অনেকেই বিষয়টিকে স্রেফ ‘মজা’ বা ‘ট্রোল’ হিসেবে দেখে হালকাভাবে নেন, কিন্তু ভুক্তভোগীর কাছে এটি এক চরম মানসিক ট্রমা।
সাইবার বুলিংয়ের শিকার যারা হন, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীরা, তাদের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। প্রথমত, এটি একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, যার ফলে তার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে মারাত্মক স্থবিরতা নেমে আসে। প্রতিনিয়ত এক অজানা ভয় ও বিষণ্ণতা তাদের গ্রাস করে, যা অনেক সময় তীব্র মানসিক অবসাদ বা অ্যানজাইটিতে রূপ নেয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকেই আত্মহননের মতো চরম পথও বেছে নেন।
এই অদৃশ্য মহামারীর হাত থেকে আমাদের সমাজকে রক্ষা করতে হলে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা জরুরি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোনো কিছু শেয়ার বা মন্তব্য করার আগে আমাদের ভাবা উচিত—আমার এই কথাটা অন্য কারো কষ্টের কারণ হচ্ছে না তো? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ট্রোল বা কাদা ছড়াছড়ির জায়গা না বানিয়ে, এটিকে জ্ঞানচর্চা ও ইতিবাচক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
পাশাপাশি, যদি কেউ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েই যান, তবে ভয় পেয়ে চুপ করে থাকা যাবে না। মনে রাখতে হবে, অন্যায় সহ্য করাও এক ধরনের অপরাধ। এই ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত স্ক্রিনশট বা প্রমাণ সংগ্রহ করে পরিবারের নির্ভরযোগ্য সদস্য, শিক্ষক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার (যেমন সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইন) সাহায্য নেওয়া উচিত। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট নাগরিক গড়ে তোলার মূল শর্তই হলো একটি সুস্থ ও নিরাপদ সাইবার পরিবেশ। আসুন, আমরা নিজে সচেতন হই এবং আমাদের চারপাশের মানুষদেরও সচেতন করি। স্ক্রিনের ওপারে থাকা মানুষটিও আমাদের মতোই একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, তারও আবেগ ও সম্মান আছে—এই বোধটুকু জাগ্রত রাখলেই সাইবার বুলিংমুক্ত একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
৭১
১৪৫ মন্তব্য