প্রভাষক
৩১ মে, ২০২৬ ০৯:০৭ অপরাহ্ণ
বৃষ্টি এলে ঘুম পাওয়ার কারণ
বৃষ্টির দিনে ঘুম পাওয়ার পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো। এটি মূলত আমাদের হরমোন, পরিবেশের শব্দতরঙ্গ এবং প্রকৃতির কিছু ভৌত পরিবর্তনের একটি সম্মিলিত ফলাফল।
১. মেলাটোনিন হরমোনের প্রভাব ও অন্ধকারের সংকেতআমাদের মানবদেহে সার্কাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm) বা একটি ২৪ ঘণ্টার জৈবিক ঘড়ি রয়েছে, যা সূর্যের আলোর ওপর ভিত্তি করে ঘুম ও জাগরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
মেলাটোনিন (Melatonin) বৃদ্ধি: চোখের রেটিনা যখন সূর্যালোক পায় না, তখন মস্তিষ্ক ধরে নেয় যে দিন শেষ হয়ে রাত নেমে এসেছে। বৃষ্টির দিনে ঘন মেঘের কারণে আকাশ অন্ধকার থাকে। এর ফলে মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থি (Pineal Gland) থেকে 'মেলাটোনিন' হরমোনের ক্ষরণ বহুগুণ বেড়ে যায়। এই হরমোনটি শরীরকে শিথিল করে এবং সরাসরি ঘুমের ভাব তৈরি করে।
সেরোটোনিন (Serotonin) হ্রাস: সূর্যের আলো ত্বকে পড়লে শরীরে 'সেরোটোনিন' নামক হরমোন তৈরি হয়, যা আমাদের চনমনে ও আনন্দিত রাখে। বৃষ্টির দিনে আলো না থাকায় এই হরমোনের উৎপাদন কমে যায়। ফলে অলসতা ও বিষণ্ণতার অনুভূতি তৈরি হয়, যা ঘুমের দিকে ঠেলে দেয়।
২. পিংক নয়েজের জাদুকরী মনস্তত্ত্ববৃষ্টির শব্দ শুধু শুনতে ভালো লাগে তা-ই নয়, এর পেছনে গভীর শব্দবিজ্ঞান লুকিয়ে আছে। বৃষ্টির একটানা রিনিঝিনি শব্দকে বিজ্ঞানীরা 'পিংক নয়েজ' (Pink Noise) বা গোলাপি শব্দ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।মস্তিষ্কের তরঙ্গ ধীর হওয়া: পিংক নয়েজ এমন এক ধরনের শব্দ, যেখানে সব কম্পাঙ্কের (Frequency) তীব্রতা সমান থাকে না, বরং উচ্চ কম্পাঙ্কগুলো মৃদু হয়। এই ধরনের ছন্দময় শব্দ মানুষের মস্তিষ্কের আলফা ও থিটা তরঙ্গকে উদ্দীপ্ত করে, যা গভীর ধ্যান বা ঘুমের ঠিক আগের মুহূর্তে তৈরি হয়।
অ্যালার্মিং সাউন্ড ব্লক করা: হুট করে কোনো গাড়ির হর্ন বা দরজার আওয়াজ শুনলে মস্তিষ্ক চমকে ওঠে এবং ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু বৃষ্টির একটানা শব্দ এই তীব্র ও আকস্মিক আওয়াজগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ডে ঢেকে ফেলে (Sound Masking)। ফলে মস্তিষ্ক কোনো হুমকি অনুভব করে না এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ করে শান্ত হয়ে যায়।৩. থার্মোরেগুলেশন বা শরীরের তাপমাত্রা হ্রাসমানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বা কোর বডি টেম্পারেচার ঘুমের সাথে সরাসরি জড়িত।
শরীরের রেডি সিগন্যাল: ঘুমানোর ঠিক আগমুহূর্তে মানুষের শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা প্রাকৃতিকভাবে ১ থেকে ২ ডিগ্রি কমে যায়। বৃষ্টির সময় চারপাশের বাতাস শীতল হয়ে আসে। এই বাহ্যিক ঠান্ডা পরিবেশ শরীরের অতিরিক্ত তাপ দ্রুত কমিয়ে দেয়। মস্তিষ্ক এটিকে ঘুমানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত (Ready) করে তোলে।
৪. ওজোন গ্যাসের সুগন্ধ এবং নেতিবাচক আয়নবৃষ্টির সময় এবং ঠিক তার আগে প্রকৃতির বায়ুমণ্ডলে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে।পেট্রিচোর ও ওজোন: বৃষ্টির সময় বাতাসে একধরনের মিষ্টি মাটির সুবাস পাওয়া যায়, যাকে 'পেট্রিচোর' (Petrichor) বলা হয়। এর পাশাপাশি বজ্রপাতের কারণে বাতাসে ওজোন গ্যাস তৈরি হয়, যার গন্ধ বেশ চনমনে। এই সুগন্ধ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং মানসিক চাপ বা উদ্বেগ কমায়।
নেতিবাচক আয়ন (Negative Ions): জলকণা যখন বাতাসে ভেঙে পড়ে (যেমন ঝরনা বা বৃষ্টির সময়), তখন বাতাসে প্রচুর পরিমাণে নেতিবাচক আয়ন বা অ্যানায়ন তৈরি হয়। এই আয়নগুলো রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছালে অক্সিজেনের প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক প্রশান্তি আসে, যা আরামদায়ক ঘুমের জন্য সহায়ক।
৫. বায়ুমণ্ডলের নিম্নচাপ ও অক্সিজেনের তারতম্যআবহাওয়াবিদ্যা এবং মানবদেহের ফিজিওলজি বা শারীরবিদ্যার মধ্যেও একটি সম্পর্ক রয়েছে।
রক্তচাপ কমে যাওয়া: বৃষ্টির দিনে বায়ুমণ্ডলের চাপ বা ব্যারোমেট্রিক প্রেসার (Barometric Pressure) কমে যায়। বাতাসের চাপ কমলে মানুষের রক্তচাপও সামান্য কমে যেতে পারে। রক্তচাপ কমলে শরীরে এক ধরনের ঝিমুনি ভাব আসে।অক্সিজেনের ঘনত্ব: মেঘলা ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব সাধারণ রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের তুলনায় সামান্য কমে যায়। ফলে প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় শরীর যে পরিমাণ অক্সিজেন পায়, তা কিছুটা কম হওয়ায় মস্তিষ্ক ও পেশিগুলো কিছুটা অলস হয়ে পড়ে, যাকে আমরা ক্লান্তি বা ঘুম ঘুম ভাব বলি।
৬. বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্ব (Evolutionary Psychology)মানব সভ্যতার শুরুর দিকের ইতিহাসও এর পেছনে ভূমিকা রাখে। আদিম যুগে মানুষ যখন গুহায় বা বনে বাস করত, তখন তীব্র রোদ বা হিংস্র প্রাণীর ভয়ে তারা সবসময় সতর্ক থাকত। কিন্তু বৃষ্টি এলে বন্য প্রাণীরাও আত্মগোপন করত। ফলে আদিম মানুষ বৃষ্টিকে একটি নিরাপদ সময় হিসেবে দেখত, যখন কোনো শিকারী প্রাণীর আক্রমণ করার ভয় থাকত না। এই জিনগত ও বিবর্তনীয় ধারণার কারণে আজও বৃষ্টির শব্দ শুনলে মানুষের অবচেতন মন সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ করে এবং সহজে ঘুমে তলিয়ে যায়।
২
২ মন্তব্য