সহকারী অধ্যাপক
৩১ মে, ২০২৬ ১০:১৩ অপরাহ্ণ
ঈমানের কষ্টিপাথর (সূরা আল-বাকারা (:১৩)-এর আলোকে) — মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
ঈমানের কষ্টিপাথর
(সূরা আল-বাকারা (:১৩)-এর আলোকে)
— মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যখন বলা হলো তাদের,
"এসো ঈমান আনো সবাই
যেমন করে সত্যপথে
ঈমান এনেছে মানুষ তাই।
যেমন করে সাহাবিগণ
রবের ডাকে সাড়া দিল,
প্রাণের চেয়ে প্রিয় বস্তু
আল্লাহর তরে উৎসর্গ করল।
যেমন করে দুঃখ-শোকে
হাসিমুখে ছিল অটল,
তেমনি করে তোমরাও হও
সত্যের পথে অবিচল।"
কিন্তু তারা হাসল শুনে,
তাচ্ছিল্যের সুরে কয়,
"আমরা কি আর নির্বোধদের
মত বিশ্বাসী হতে যাই?
যারা ছেড়ে ধন-সম্পদ,
যারা ছেড়ে মান-সম্মান,
অদেখা এক প্রতিশ্রুতির তরে
করল জীবনের অবসান!
তারা কি আর জ্ঞানী মানুষ?
তারা তো সব সরল প্রাণ,
আমরা কেন তাদের মত
করব এমন আত্মদান?"
তখন নেমে এলো বাণী,
আসমান হতে মহিমান্বিত,
"শোনো, তারাই নির্বোধ নয়,
বরং তোমরাই পথভ্রষ্টচিত।
সত্যকে দেখে অস্বীকার,
আলো পেয়ে ভালোবাসো রাত,
নিজের ক্ষতিকে লাভ ভেবে
করছো জীবনের বরবাদ।
ক্ষণিক সুখের মোহে পড়ে
ভুলে যাও অনন্তকাল,
মরুভূমির মরীচিকাতে
খুঁজে ফেরো জীবনের জল।
দুনিয়ার এই ক্ষুদ্র লাভে
বিকিয়ে দাও চির সুখ,
এমন বেচাকেনার চেয়ে
আর কি আছে বড় দুঃখ?"
সাহাবিগণ ছিলেন তারা
ঈমানের উজ্জ্বল নক্ষত্র,
তাদের ত্যাগের আলো আজও
আলোকিত করে বিশ্বভূমি সর্বত্র।
যখন মক্কার পথে পথে
নেমেছিল নির্যাতনের ঢেউ,
তখন তারা ভয় পায়নি,
কাঁপেনি তাদের হৃদয় কেউ।
কেউ হারিয়েছে ঘর ও পরিবার,
কেউ হারিয়েছে ধন,
কেউবা সহ্য করেছে কষ্ট
রক্ষায় ঈমানের পবিত্র মন।
তবু তারা বলেনি কখনও,
"ফিরে যাই পুরনো পথে",
বরং দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিল,
"রব আছেন আমাদের সাথে।"
আবু বকর সত্যের ডাকে
উৎসর্গ করলেন সব,
উমরের ন্যায়ের দীপ্ত আলো
ছড়িয়ে পড়ল নব নব।
উসমানের দানের ধারা
বহে চলে ইতিহাসে,
আলীর জ্ঞান দীপ্যমান আজও
মানবতার আকাশে।
বিলাল যখন উত্তপ্ত বালুতে
সহ্য করেন দুঃসহ ব্যথা,
তবু তাঁর মুখে ধ্বনিত হয়—
"আহাদ! আহাদ!" একমাত্র প্রভু তথা।
সুমাইয়ার শাহাদাত রাঙায়
ইসলামের প্রথম প্রভাত,
ত্যাগের রক্তে লেখা হলো
সত্যের চিরন্তন জাগ্রত গান।
তবু যারা তাদের দেখে
বলে গেল "নির্বোধ" নাম,
তারা বুঝল না নিজেদেরই
অজ্ঞতার ভয়ংকর পরিণাম।
মানুষ যখন অহংকারে
ঢেকে ফেলে বিবেকচক্ষু,
তখন সত্যও মিথ্যা লাগে,
হারায় নৈতিক শক্তি।
যে নিজেকে জ্ঞানী ভাবে,
অন্য সবাইকে করে তুচ্ছ,
সে-ই অধিক পথ হারায়,
যদিও মনে করে নিজে পবিত্র।
কুরআনের শিক্ষা স্পষ্ট,
সত্যের পথে যার অবস্থান,
সেই মানুষই প্রজ্ঞাবান,
সেই সফল, সেই মহান।
বুদ্ধি শুধু মুখের কথা নয়,
নয় কেবল যুক্তির খেলা,
বুদ্ধি হলো সত্য চিনে
সেই অনুযায়ী জীবন গড়া।
জ্ঞান যদি না আনে ঈমান,
না আনে রবের ভয়,
সে জ্ঞান কেবল অহংকার বাড়ায়,
মুক্তির পথ দেখায় না কভু কই।
আজও পৃথিবীর বুকে দেখি
একই ইতিহাস ফিরে,
সত্যবাদীকে বলে সরল,
ত্যাগীকে বলে বোকা নীরে।
যে ঘুষ খায় না, তাকে বলে
"সে তো বড্ড অচল মানুষ",
যে অন্যায়ের সাথে আপস করে না,
তাকে বলে "অতি সরল বেহুঁশ"।
যে হালাল পথে চলতে চায়,
তাকে বলে "জীবন বোঝে না",
যে রবের ভয়ে পাপ ত্যাগ করে,
তাকে বলে "সে আধুনিক না"।
কিন্তু কুরআনের ঘোষণা আজও
সুস্পষ্ট, চির অম্লান,
সত্যপথের যাত্রীগণই
প্রকৃত জ্ঞানী, প্রকৃত মহান।
যারা দুনিয়ার স্বার্থের চেয়ে
আখিরাতকে দেয় প্রাধান্য,
তারাই লাভ করে শেষপর্যন্ত
সম্মান, সফলতা, কল্যাণ।
তাই এসো আমরা শিখি
সাহাবিদের জীবন থেকে,
ঈমান যেন থাকে অটুট
প্রতিটি সুখে, প্রতিটি দুঃখে।
সত্যকে সত্য বলার শক্তি,
ন্যায়ের পথে থাকার সাহস,
আল্লাহ যেন দান করেন
প্রতিটি হৃদয়ে ঈমানের সুবাস।
অহংকারের অন্ধকার হতে
রক্ষা করুন দয়াময় রব,
সাহাবিদের মত ঈমান দিয়ে
আলোকিত করুন অন্তর সব।
কুরআনের এই শিক্ষা হোক
জীবন গড়ার মূল ভিত্তি,
সত্যের পথে অবিচল থেকে
অর্জন করি চিরমুক্তি।
জেনে রাখো, ঈমানদার
কখনও নির্বোধ নয়,
আল্লাহর পথে চলাই হলো
প্রকৃত জ্ঞানীর পরিচয়।
আমিন।
***
ঈমানের কষ্টিপাথর
যখন বলা হলো তাদের,
"এসো সত্যের ছায়ায়,
যেমন করে মুমিনেরা
ঈমান এনেছে মায়ায়।
যেমন করে সাহাবিগণ
রবের ডাকে সাড়া দিল,
জীবনের সব প্রিয় বস্তু
আল্লাহর তরে উৎসর্গ করিল।
যেমন করে কষ্টের পথে
হাসিমুখে ছিল অবিচল,
যেমন করে ঝড়ের মাঝেও
রাখল ঈমান অটল।
তেমনি তোমরাও হও আজ
সত্যের পতাকাবাহী,
আল্লাহর প্রেমে গড়ে তোলো
জীবনখানি চিরসাথী।"
কিন্তু তারা হেসে বলে,
"আমরা কি সেই দলে যাই?
যারা ধন-সম্পদ বিসর্জন দিয়ে
অদেখা সুখের আশায় রয়?
যারা ত্যাগ করে দুনিয়াকে,
হারায় সুযোগ, মান ও যশ,
তাদের মতো নির্বোধ হয়ে
করব কেন জীবন নষ্ট?"
তখন এলো আসমানি বাণী,
সত্যের দীপ্ত ঘোষণা,
"জেনে রাখো, তোমরাই মূর্খ,
তোমাদেরই ভুল ধারণা।
যারা দেখে ক্ষণিক লাভ,
ভুলে যায় অনন্তকাল,
তারা কেমন জ্ঞানী হবে,
যাদের চোখে মরীচিকা-জল?
যারা মানুষকে ভয় করে,
রবের ভয় রাখে না প্রাণে,
তারা কি করে পথ খুঁজে পায়
অন্ধকারের কারাগারে?
যারা জান্নাতের চির সুখ ছেড়ে
দুনিয়ার ক্ষণিক মোহে মাতে,
তারা যেন শিশুর মতো
রঙিন কাঁচে হীরা হারাতে।"
সাহাবিরা ছিলেন তারা,
ঈমানের দীপ্ত নক্ষত্র,
তাদের ত্যাগের আলোকধারা
জ্বলে যুগে যুগে সর্বত্র।
মক্কার পথে নির্যাতনের
যখন উঠল কালো ঢেউ,
কেউ ভাঙেনি, কেউ হারেনি,
ঈমান ছাড়েনি কভু কেউ।
কেউ হারাল ঘর ও পরিবার,
কেউ হারাল ধন-সম্পদ,
তবু তাদের মুখে ফুটল
সন্তুষ্টির অমল পদ।
তারা জানত—রবের কাছে
এক ফোঁটা অশ্রুও বৃথা নয়,
যে কষ্ট তাঁর রাস্তায় আসে,
সেটাই প্রকৃত সৌভাগ্য হয়।
উত্তপ্ত বালুর প্রান্তরে
শৃঙ্খলবন্দী এক দাস,
তবু তার মুখে উচ্চারিত—
এক রবেরই পবিত্র শ্বাস।
শাহাদাতের লাল রক্তে
লেখা হলো ইতিহাস,
ত্যাগের মহিমা ছড়িয়ে দিল
বিশ্বজুড়ে সুবাতাস।
একদল মানুষ ভাবল তখন,
"এরা বুঝি সরল খুব!"
কিন্তু তাদের সরলতাতেই
লুকিয়েছিল জ্ঞানের ধ্রুব।
কারণ বুদ্ধি শুধু নয়
লাভ-ক্ষতির হিসাব জানা,
বুদ্ধি হলো সত্যের তরে
নিজেকে রাখা নিবেদনা।
বুদ্ধি হলো মিথ্যার সাথে
না করা কোনো আপস,
বুদ্ধি হলো রবের ডাকে
দেওয়া আন্তরিক বিশ্বাস।
আজও দেখি সেই ইতিহাস
নতুন রূপে ফিরে আসে,
সত্যবাদীকে বলা হয়
"সে তো চলে পুরোনো ভাসে।"
ঘুষ যে খায় না, বলে সবাই,
"সে তো বড় বোকা মানুষ!"
অন্যায় দেখে চুপ না থাকলে
মেলে উপহাসের ফাঁস।
হালাল পথে চলতে চাইলে
শুনতে হয় কত কথা,
সত্যের পথে অবিচল হলে
বাড়ে পরীক্ষা ও ব্যথা।
তবু কুরআনের শিক্ষা আজও
অম্লান, উজ্জ্বল, মহান—
ত্যাগী মুমিন নির্বোধ নয়,
সেই তো প্রকৃত জ্ঞানী প্রাণ।
যে নিজেকে বড় মনে করে,
অন্য সবাইকে করে তুচ্ছ,
তার হৃদয়ে অহংকারের
অন্ধকারই হয় সুস্পষ্ট।
অহংকার এক কালো মেঘ,
ঢেকে ফেলে বিবেক-সূর্য,
সত্যকে তখন মিথ্যা মনে হয়,
মিথ্যাকে লাগে সৌভাগ্য-সূর্য।
তাই হে মানুষ, চিনে নাও আজ
কিসে রয়েছে সফলতা,
ধন-সম্পদে নয় যে মর্যাদা,
মর্যাদা রবের আনুগত্যে যথা।
দুনিয়াটা ক্ষণিক সফর,
আখিরাত চিরস্থায়ী ঘর,
বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি,
যে করে রবের হুকুমের কদর।
সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি, যশ
একদিন হবে ধূলিসাৎ,
রয়ে যাবে কেবল আমল,
রয়ে যাবে ঈমানের প্রভাত।
তাই এসো আমরা সকলে
সত্যের পথে রাখি পা,
ঈমান যেন থাকে অটুট
জীবনের প্রতিটি প্রহরা।
ত্যাগের মাঝে খুঁজি মহিমা,
ধৈর্যের মাঝে খুঁজি জয়,
আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে
বড় সম্পদ আর কিছু নয়।
কুরআনের এই মহাবাণী
রাখি হৃদয়ের অন্তরে,
ঈমান হোক জীবনের আলো
সকল কাজের প্রেরণায় ভরে।
যেন কিয়ামতের মহাময়দানে
লজ্জিত না হই কোনো দিন,
বরং শুনি করুণাময়ের ডাক—
"এসো, হে আমার মুমিন।"
সত্যকে যারা আঁকড়ে ধরে,
তাদের জীবন বৃথা নয়,
ঈমানদার কখনও নির্বোধ নয়—
এটাই কুরআনের পরিচয়।
আল্লাহ আমাদের অন্তরে দান করুন
সাহাবিদের মতো দৃঢ় ঈমান,
সত্যের প্রতি অটল ভালোবাসা,
আর হিদায়াতের মহাদান।
আমিন।
৭০
১৪৪ মন্তব্য