সহকারী অধ্যাপক
০১ জুন, ২০২৬ ০৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
ঈদুল আজহার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো কুরবানি। প্রতি বছর এই মহান ইবাদত আমাদের সামনে নবী ইবরাহিম (আ.) ও নবী ইসমাইল (আ.)-এর অবিস্মরণীয় ত্যাগ, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, তাকওয়া এবং মানবিক মূল্যবোধ অর্জনের এক মহান প্রশিক্ষণ।
কুরবানির উৎসব শেষ হয়ে যায় কয়েক দিনের মধ্যেই, কিন্তু এর শিক্ষা সারা বছরের জন্য। একজন মুমিন যদি কুরবানির প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন, তবে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে বাধ্য। কুরবানির মাধ্যমে একজন মুমিন যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করেন, তা নিম্নে তুলে ধরা হলো—
১. আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য
কুরবানি আমাদের শেখায়, আল্লাহ তাআলার আদেশের সামনে নিজের ইচ্ছা, আবেগ ও স্বার্থকে বিসর্জন দিতে হবে। তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে সকল হুকুম-আহকাম মেনে চলাই প্রকৃত বান্দার পরিচয়।
কুরবানির ইতিহাসে আমরা দেখি, নবী ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে তার প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে জবাই করতে দেখেন। নবীদের স্বপ্ন ওহির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তিনি বুঝতে পারেন যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নির্দেশ।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও দোয়ার পর প্রাপ্ত একমাত্র সন্তান ছিলেন ইসমাইল (আ.)। কিন্তু আল্লাহর আদেশ তার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল। তাই তিনি বিনা দ্বিধায় সেই নির্দেশ পালন করতে প্রস্তুত হন। কারণ তিনি জানতেন, সন্তান যেমন আল্লাহর দান, তেমনি তার সন্তুষ্টির জন্য সেই দান উৎসর্গ করাও একজন মুমিনের সৌভাগ্য।
২. তাকওয়া ও বিশুদ্ধ নিয়তের গুরুত্ব
কুরবানি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর কাছে বাহ্যিক চাকচিক্য বা লোক দেখানো আমলের কোনো মূল্য নেই; তিনি দেখেন বান্দার অন্তর এবং নিয়ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ
‘আল্লাহর কাছে তাদের গোশত পৌঁছে না এবং তাদের রক্তও পৌঁছে না; বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা আল হাজ্জ: আয়াত ৩৭)
অতএব, কুরবানি হোক একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে; মানুষের প্রশংসা বা সামাজিক মর্যাদা লাভের জন্য নয়।
৩. ইবাদতে বিনয় ও অহংকারমুক্ত থাকার শিক্ষা
কোনো ইবাদত বা নেক আমল করার তৌফিক লাভ করলে একজন মুমিনের উচিত অহংকার না করা। কারণ ইবাদত করার সামর্থ্যও আল্লাহরই অনুগ্রহ। অনেক সময় মানুষ নিজের আমল নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগে বা অন্যদের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করে। অথচ প্রকৃত মুমিন উপলব্ধি করেন যে, আল্লাহর সাহায্য ও তৌফিক ছাড়া কোনো নেক কাজই সম্ভব নয়।
কুরবানি আমাদের এই বিনয় শিক্ষা দেয় যে, ইবাদতের পর আত্মপ্রশংসা নয়; বরং আল্লাহর কাছে কবুলিয়াতের জন্য বিনম্র প্রার্থনাই হওয়া উচিত।
৪. সন্তানকে দ্বীনের পথে গড়ে তোলার শিক্ষা
কুরবানির ঘটনা শুধু ইবরাহিম (আ.)-এর আনুগত্যের নয়; এটি একজন আদর্শ সন্তানেরও অনন্য দৃষ্টান্ত। নবী ইবরাহিম (আ.) যখন তাঁর স্বপ্নের কথা ইসমাইল (আ.)-কে জানালেন, তখন তিনি অবিশ্বাস্য ধৈর্য ও ইমানের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন—
يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ
‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ১০২)
এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি সফলতার জন্য নয়, বরং আল্লাহভীরু, দ্বীনদার ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যও সচেষ্ট হতে হবে।
৫. কুরবানির মাধ্যমে সহমর্মিতা ও মানবিকতা
কুরবানির অন্যতম সৌন্দর্য হলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা। কুরবানির গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করার মাধ্যমে একজন মুমিন উপলব্ধি করেন যে, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরও তার সম্পদের ওপর অধিকার রয়েছে।
এই শিক্ষা কেবল ঈদুল আজহার কয়েক দিনের জন্য নয়; বরং সারা বছর মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অভাবীদের সহায়তা করা এবং মানবিক দায়িত্ব পালন করার প্রেরণা জোগায়।
কুরবানি নিছক একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একজন মুমিনের চরিত্র গঠন, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক মহান শিক্ষা। আনুগত্য, তাকওয়া, বিনয়, পারিবারিক দ্বীনদারিতা এবং মানবিক সহমর্মিতার যে বার্তা কুরবানি আমাদের দেয়, তা যদি আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ— সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
আসুন, কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি এবং ত্যাগ, তাকওয়া ও বিনয়ের আলোয় নিজেদের জীবনকে আলোকিত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন ও বাস্তবায়নের তৌফিক দান করুন। আমিন।
৭০
১৪৪ মন্তব্য