সিনিয়র শিক্ষক
০২ জুন, ২০২৬ ০৬:২৪ অপরাহ্ণ
মেধার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নয়, শিক্ষার পুনর্জন্ম চাই
মেধার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নয়, শিক্ষার পুনর্জন্ম চাই
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক ছুঁইছুঁই সময়ে এসে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যে শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতির মেরুদণ্ড, মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি এবং সভ্যতার অগ্রযাত্রার দিশারি হিসেবে গড়ে তোলার কথা ছিল, সেখানে এখন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, জাল সনদের বিস্তার, প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাগামহীন বাণিজ্যিকীকরণ, কোচিং বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং গ্রামীণ-শহুরে বৈষম্য একসঙ্গে জমাট বেঁধেছে।
মুফিদুল আলমএকটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষে নির্ধারিত হয়। কিন্তু আজ সেই শ্রেণিকক্ষই অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোর অভাব এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়নের প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
১. নিয়োগে স্বচ্ছতার শিকড় ও ডিজিটাল প্রহরা
শিক্ষক নিয়োগে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা না হলে শিক্ষাব্যবস্থার কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। যেকোনো ধরনের অনিয়ম, তদবির ও অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ মূলত একটি জাতির মেধা ও ভবিষ্যতের সাথে আপস করার শামিল।
তাই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়, ডিজিটাল ও জনপর্যবেক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। আবেদন গ্রহণ, মেধাতালিকা প্রণয়ন, প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, সুপারিশ ও চূড়ান্ত নিয়োগ—প্রতিটি ধাপ একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণ দৃশ্যমান রাখতে হবে। নিয়োগের প্রতিটি সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকলে মেধা কখনো অন্যায়ের কাছে পরাজিত হবে না।
২. জাল সনদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance)
যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সত্য ও নৈতিকতার পাঠ দেবেন, তাঁর নিজের পরিচয় যদি মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে শিক্ষার মূল ভিত্তিই ধসে পড়ে।
দেশব্যাপী সকল স্তরের শিক্ষকের একাডেমিক ও প্রশিক্ষণ সনদ পুনরায় নিখুঁতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংযুক্ত করে একটি সমন্বিত 'জাতীয় শিক্ষক ডাটাবেজ' গড়ে তুলতে হবে। একই সাথে, জাল সনদধারীদের তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি, সরকারি তহবিলের অর্থ পুনরুদ্ধার এবং জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. শিক্ষকতার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন নিয়োগ কমিশন
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকতা একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় পেশা। কিন্তু আমাদের দেশে কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে মেধাবীদের বড় অংশ এখন শিক্ষকতাকে তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করছেন না।
সরকারি কর্ম কমিশনের (PSC) আদলে একটি স্বাধীন, সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত 'জাতীয় শিক্ষক নিয়োগ কমিশন' গঠন করা এখন সময়ের দাবি। আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো, কর্মদক্ষতাভিত্তিক পদোন্নতি, গবেষণার সুযোগ ও উচ্চতর আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে শিক্ষকতা পেশাটি আবার দেশের সেরা মেধাবীদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।
৪. আইনি জটিলতার অবসান ও সময়নিষ্ঠ নিয়োগব্যবস্থা
নিয়োগসংক্রান্ত নানা আইনি জটিলতা ও মামলার কারণে বছরের পর বছর শত শত শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষায়িত আইনি সেল ও দ্রুত নিষ্পত্তি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি একটি 'জাতীয় নিয়োগ ক্যালেন্ডার' চালু করতে হবে, যাতে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল প্রকাশ ও চূড়ান্ত নিয়োগের কাজ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
৫. যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ সংস্কার ও শিক্ষক তৈরির কারিগরি ভিত্তি
শিক্ষকদের জন্য প্রি-সার্ভিস (চাকরি-পূর্ব) ও ইন-সার্ভিস (চাকরিকালীন) প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি (Pedagogy), শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো কারণে পদ শূন্য হলে, শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সাময়িকভাবে যোগ্য ও দক্ষ অতিথি শিক্ষক নিয়োগের আইনি ফ্রেমওয়ার্ক থাকা দরকার।
৬. শিক্ষাক্রমে জাতীয় ঐকমত্য, প্রযুক্তির অগ্রাধিকার ও নৈতিকতার পুনর্জাগরণ
শিক্ষাক্রম কোনো সাময়িক প্রকল্প নয়, এটি একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বপ্নপত্র। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞ শিক্ষাবিদ, অভিজ্ঞ শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ ও অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি টেকসই ও স্থিতিশীল জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যা দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত থাকবে।
এই শিক্ষাক্রমের মূল স্তম্ভ হবে চারটি:
ক. প্রযুক্তির অগ্রাধিকার: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স ও ডেটা সায়েন্সের মতো যুগোপযোগী বিষয়ের হাতে-কলমে শিক্ষা।
খ. নৈতিক মূল্যবোধ: সততা, দেশপ্রেম, নাগরিক দায়িত্ব ও মানবিকতার বিকাশ।
গ. দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন: মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতার সনদায়ন।
ঘ. বৈশ্বিক নাগরিকত্ব: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো মানসিকতা গঠন।
৭. শিক্ষাব্যবস্থার বহুমুখী সংকট: অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বৈষম্য
শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে নিচের মৌলিক সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান প্রয়োজন:
অবকাঠামোগত সংকট: বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের তীব্র অভাব রয়েছে, যা দ্রুত দূর করা দরকার।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ: বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাগামহীন ফি ও অতিরিক্ত খরচ নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষার অধিকারকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
কোচিং সংস্কৃতির ওপর অতি-নির্ভরতা: কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের চেয়ে কোচিং বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে নষ্ট করছে। শ্রেণিকক্ষেই যেন সম্পূর্ণ পাঠদান সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: অতিরিক্ত জিপিএ-কেন্দ্রিক মানসিক চাপ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ঘটছে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পেশাদার 'কাউন্সেলিং' বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা এখন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
গ্রামীণ-শহুরে বৈষম্য: উন্নত সুযোগ-সুবিধা, দক্ষ শিক্ষক ও ল্যাবরেটরি কেবল শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় গ্রামীণ মেধা বিকশিত হওয়ার সমান সুযোগ পাচ্ছে না। এই বৈষম্য দূর করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
উপসংহার: যৌথ সংকল্পেই জাগবে শিক্ষার নতুন ভোর
আমাদের সামনে আজ দুটি পথ খোলা আছে—একটি হচ্ছে অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্য দিয়ে মেধার অপচয় ঘটানো; অন্যটি হচ্ছে মেধা, সততা, প্রযুক্তি ও সমতার ভিত্তিতে একটি বৈশ্বিক নাগরিক সমাজ গড়ে তোলা।
এখনই উপযুক্ত সময় শিক্ষক নিয়োগে পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা, জাল সনদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া, স্বাধীন শিক্ষক কমিশন গঠন করা এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি দূরদর্শী শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা। আমরা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা দেখতে চাই, যেখানে মেধা তার সঠিক মূল্যায়ন পাবে, সততা সম্মানিত হবে এবং টেকসই শিক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বিশ্বমানের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
মেধার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নয়—আমরা দেখতে চাই বাংলাদেশের শিক্ষার এক গৌরবময় পুনর্জন্ম।
লেখক:
মুফিদুল আলম
শিক্ষক
রামু, কক্সবাজার।
৭০
১৪৪ মন্তব্য