সহকারী অধ্যাপক
০৩ জুন, ২০২৬ ০৯:৫৭ অপরাহ্ণ
আত্মীয়তার হক্ব (সূরা আন-নিসা ৩৬-এর আলোকে) -মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
আত্মীয়তার হক্ব
(সূরা আন-নিসা ৩৬-এর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
সৃষ্টির আদি প্রভাতবেলায়
যখন ছিল না কালের রেখা,
নিভৃত শূন্য মহাকাশ জুড়ে
ছিল না কোনো দিশা-দেখা,
তখন শুধু মহান স্রষ্টার
মহিমাময় একক সুর,
"আমারই ইবাদত করো,
আমিই চির অনন্ত নূর।"
তাঁরই আদেশে সূর্য ওঠে,
তাঁরই হুকুমে নামে রাত,
তাঁরই ইশারায় গ্রহ-নক্ষত্র
ঘোরে আপন কক্ষপথ।
সাগর জানে সীমারেখা,
পর্বত থাকে স্থির অটল,
পাখিরা গায় তাসবিহের গান,
বনানী জুড়ে সুবাস উজ্জ্বল।
বাতাস বয়ে আনে বারতা,
মেঘ ছড়ায় রহমতের জল,
প্রকৃতির প্রতিটি অণু
মানে তাঁরই বিধান অবিচল।
মানুষ তবে কেন ভুলে যায়
এই মহান সত্যবাণী?
কেন সে খোঁজে ক্ষণিক আশ্রয়,
ভুলে যায় চির কল্যাণী?
তাই তো নামে আসমানি ডাক—
“শুধু আমাকেই করো মান,
আমার সাথে কাউকে রেখো না,
আমিই তোমার পরম পাওয়া।”
তাওহীদের এই মহা-শপথ
হৃদয় জুড়ে জ্বালো আজ,
এই আলোতেই মুক্তি মেলে,
মুছে যায় সকল লাজ।
এরপর আসে মানবধর্মের
প্রথম মহৎ অধিকার—
পিতা-মাতার সেবা-শ্রদ্ধা,
জান্নাতের সে সোনার দ্বার।
মায়ের গর্ভে নয়টি মাস,
ব্যথার সাগর পাড়ি দিয়ে,
তিনি রাখেন সন্তানটিকে
অশেষ মমতা বুকে নিয়ে।
রাত্রির ঘুম বিসর্জন দিয়ে
জেগে থাকেন কত রাত,
নিজের সুখের প্রদীপ নেভে,
সন্তানেরই জ্বলে প্রভাত।
বাবা তখন সংগ্রামের পথে
রৌদ্র-বৃষ্টি মাথায় নেন,
নিজের আশা গোপন রেখে
সন্তানেরই স্বপ্ন বোনেন।
কপালের ঘাম নদীর মতো
বয়ে চলে দিনের পর দিন,
সন্তানেরই ভবিষ্যতের তরে
বুকে ধারণ করেন ঋণ।
তাই তো তাদের সম্মান করা
কেবল কর্তব্য নয়,
এ সম্মানের মাঝেই লুকায়
দুনিয়া-আখিরাতের জয়।
কখনো যেন কঠোর বাক্য
তাদের হৃদয় ভাঙতে না পারে,
স্নেহের ছায়া হয়ে থেকো
জীবনের অন্তিম প্রহরে।
এরপর আসে আত্মীয়তার
পবিত্র সোনালি বন্ধন,
রক্তের টানে গড়া সম্পর্ক
আল্লাহর দানের স্পন্দন।
চাচা-চাচী, মামা-খালা,
ফুফু, দাদা, ভাই,
সুখে-দুঃখে পাশে থাকার
মহৎ শিক্ষা দেয় যে তাই।
সম্পর্ক যখন জীবন্ত থাকে,
পরিবারে নামে নূর,
ভালোবাসার সেই আলোকেই
সমাজ হয় ভরপুর।
ইয়াতীম শিশুর নীরব চোখে
কত স্বপ্ন ঝরে যায়,
অভিভাবকহীন জীবনের ভার
কত বেদনায় ভাসায়।
তুমি যদি ধরো তার হাত,
মুছে দাও অশ্রুধারা,
তার জীবনে ফুটতে পারে
আশার নতুন তারা।
মিসকীনের ঘরে সন্ধ্যা নামে
ক্ষুধার দীর্ঘ ছায়া নিয়ে,
কত শিশু ঘুমিয়ে পড়ে
খালি পেট বুকে নিয়ে।
এক মুঠো ভাত, একটুকু স্নেহ,
একটু আন্তরিক দান,
অসহায়ের মুখে ফিরিয়ে আনে
জীবন জাগানিয়া গান।
প্রতিবেশীও আত্মীয়সম,
ধর্মের এ মহাশিক্ষা,
তার সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া
মানবতার সত্য দীক্ষা।
পাশের ঘরে কান্না উঠলে
নিজ ঘরে কি শান্তি রয়?
প্রতিবেশীর বেদনাতে
মানব হৃদয় সাড়া দেয়।
একটি সালাম, একটি হাসি,
একটু খোঁজখবর নেওয়া,
অসংখ্য দূরত্ব মুছে দিয়ে
সম্প্রীতির ফুল ফোটানো।
আত্মীয় হোক কিংবা না হোক,
প্রতিবেশী সবার আপন,
তার অধিকার রক্ষা করা
মুমিন হৃদয়ের ভূষণ।
সহযাত্রী, সহপাঠী, বন্ধু,
সহকর্মী কিংবা সাথী,
তাদের প্রতিও সদয় হও,
ভদ্রতার হোক জ্যোতি।
একই পথে যারা চলে,
একই কক্ষে বসে,
তাদের প্রতি মধুর আচরণ
মানবতার রত্নরসে।
মুসাফির আসে দূর দেশ হতে,
অচেনা পথে ক্লান্ত,
তার হৃদয়ে জাগে তখন
আপনজনের কান্তি।
তোমার সহায়তার হাত
তার জন্য আশ্রয় হয়,
অচেনা ভুবন আপন লাগে,
দুঃখের মেঘ দূরে সয়।
যারা শ্রমে গড়ে তোলে
সমাজ-সভ্যতার রথ,
শ্রমিক, কর্মী, সহায়ক সবাই
সম্মানেরই যোগ্য যথ।
তাদের ঘামে দাঁড়িয়ে থাকে
অট্টালিকা, নগর, দেশ,
তাদের প্রতি অবহেলা করা
মানবতার চরম ক্লেশ।
ন্যায্য প্রাপ্য দাও সময়মতো,
মধুর ভাষায় কথা বলো,
শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করে
ন্যায়ের পতাকা তলো।
তবে সবশেষে আছে এক
অদৃশ্য ভয়ংকর শত্রু—
অহংকার, আত্মগর্ব, দাম্ভিকতা,
মানবতার চির বৈরী রূপ।
ইবলিসও পথ হারিয়েছিল
এই অহমিকার আগুনে,
মানুষও ডুবে যায় আজ
একই অন্ধকার গহ্বরে।
ধানের শিষে দানা হলে
নত হয়ে যায় মাথা,
ফলভরা বৃক্ষ ঝুঁকে থাকে,
এ প্রকৃতিরই কথা।
যে যত বড়, সে তত বিনয়ী,
এটাই মহৎ রীতি,
বিনয়ের মাঝেই লুকিয়ে থাকে
সত্য মহত্ত্বের গীতি।
এসো তবে মানবজাতি,
শুনি আসমানি আহ্বান,
আল্লাহর হক আদায় করে
রাখি সকলের সম্মান।
পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন,
ইয়াতীম ও অভাবীজন,
প্রতিবেশী, সাথী, মুসাফির,
শ্রমজীবী সকল আপন।
ভালোবাসা, ন্যায় ও দয়ায়
গড়ি নতুন পৃথিবী,
যেখানে মানুষ মানুষের তরে
হবে অনন্ত সাথী।
তাওহীদের আলো ছড়িয়ে পড়ুক
প্রতিটি হৃদয়-ঘরে,
মানবতার এই মহাসনদ
জাগুক যুগে যুগান্তরে।
যেদিন মানুষ শিখবে আবার
মানুষকে ভালোবাসতে,
সেদিন ধরণী জান্নাত হবে
শান্তির ফুলে ভাসতে।
আল্লাহর হক, বান্দার হক—
দুইয়ের মাঝে সেতু গড়ি,
এই শিক্ষাতেই প্রস্ফুটিত হোক
মানবতার স্বর্ণভোরই।
***
আত্মীয়তার হক্ব
মানবতার এই মহাসনদ
নামল আসমান থেকে,
জীবনপথের দিশা দিতে
সত্যের দীপ্তি মেখে।
প্রথম বাণী—রবের ইবাদত,
তাঁরই কাছে নত,
এক আল্লাহর আনুগত্যে
জীবন হোক অবনত।
না থাকুক তাতে শিরকের ছায়া,
না থাকুক ভ্রান্ত পথ,
তাওহীদেরই দৃঢ় ভিত্তিতে
গড়ি ঈমানের রথ।
যিনি দিলেন জীবন, আলো,
আকাশ, বাতাস, জল,
তাঁরই নামে শুরু হোক সব,
তাঁরই দিকে চল।
ইবাদতের পরেই আসে
মাতা-পিতার স্থান,
তাঁদের ত্যাগের ঋণ শোধ করা
মানবধর্মের প্রাণ।
মায়ের কোলে প্রথম আশ্রয়,
বাবার ঘামে ভাত,
তাঁদের স্নেহের তুলনা কোথায়,
তাঁরাই জীবনের প্রভাত।
বয়স যখন নত করে দেয়
শক্তি আর সব বল,
সন্তানের হাত হয়ে উঠুক
তাঁদের ছায়াতল।
কঠোর কথা নয় কখনো,
নয় বিরক্তির সুর,
ভালোবাসায় ভরিয়ে দাও
তাঁদের জীবনপুর।
এরপর আসে আত্মীয়তার
বন্ধন অমূল্য ধন,
রক্তের টানে জড়িয়ে থাকে
জীবনের আপনজন।
খোঁজখবর নাও, পাশে দাঁড়াও,
দুঃখে হও সহায়,
আত্মীয়তার সেতুবন্ধন
ভালোবাসাতেই গড়ায়।
যত্নহারা ইয়াতীম শিশু,
চেয়ে থাকে পথ,
স্নেহের ছোঁয়া পেলে তারও
ফুটে হাসির রথ।
হারিয়েছে যে পিতার ছায়া,
নেই যে মায়ের কোলে,
মানবতার হাত বাড়িয়ে দাও
তার নিঃসঙ্গতার তলে।
অভাবগ্রস্ত মিসকীন যারা
নীরব কষ্টে রয়,
তাদের পাশে দাঁড়ানোতেই
মানবতার জয়।
ক্ষুধার্ত মুখে আহার দাও,
শুষ্ক মুখে হাসি,
দান নয় শুধু, সম্মান দাও—
এটাই মানববাসী।
প্রতিবেশীও আপনজন,
দেয়াল ভিন্ন হলেও,
সুখ-দুঃখ ভাগাভাগিতে
সম্পর্ক গড়ে চলে।
আত্মীয় যদি প্রতিবেশী হয়,
দ্বিগুণ তার হক,
আর অনাত্মীয় হলেও সে
পায় সমমর্যাদার লোক।
রান্নাঘরে ধোঁয়া উঠলে
স্মরণ করো তারে,
এক বাটি সুখ ভাগ করে দাও
মানবতার দ্বারে।
পাশের সাথী, সহযাত্রী,
কর্মস্থলের বন্ধু,
তাদের প্রতিও সদাচরণ
হোক জীবনের ছন্দ।
বাসের সিটে, পথের ধারে,
বিদ্যালয়ের কক্ষে,
সৌজন্যের একটুখানি
জ্বালুক আলো রক্ষে।
ভ্রমণপথের মুসাফিরও
মানবতার অংশ,
অচেনা সে, তবু তারও
রয়েছে অধিকার অশেষ।
একটু পানি, একটু আশ্রয়,
একটু মধুর বাণী,
কত ক্লান্ত প্রাণে জাগায়
নতুন দিনের টানি।
যারা করে সেবা আমাদের,
শ্রমে গড়ে সংসার,
তাদের প্রতিও ন্যায় ও মমতা
হোক সদা অবারিত দ্বার।
কর্মচারী হোক বা সহকারী,
শ্রমিক কিংবা ভৃত্য,
মানবিকতার আচরণে
পূর্ণ হোক কর্তব্য।
তাদের ঘামে চলে অনেক
জীবনের আয়োজন,
তাই সম্মানই হোক তাদের
প্রাপ্য শ্রেষ্ঠ ভূষণ।
এই সকল হকের মূলে আছে
একটি মহান শিক্ষা,
মানুষ যেন মানুষ থাকে,
না করে হৃদয় ভিক্ষা।
অহংকারের অন্ধকারে
নষ্ট হয় সব গুণ,
দাম্ভিকতার আগুন জ্বলে
পুড়িয়ে দেয় জীবন।
যে নিজেকে বড়ই ভাবে,
ছোট করে সবায়,
তার হৃদয়ে করুণা, মমতা
বেশিদিন স্থান না পায়।
তাই এসো আজ বিনয় দিয়ে
গড়ি অন্তরঘর,
নম্রতাতেই ফুটে ওঠে
মানবতার স্বর্ণভোর।
ইবাদতে হোক আল্লাহমুখী,
চরিত্র হোক নির্মল,
সেবায় হোক উদার হৃদয়,
আচরণ হোক উজ্জ্বল।
মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন,
ইয়াতীম আর গরিব,
প্রতিবেশী, পথিক, সহচর,
সবাই হোক হৃদয়-নিবিড়।
ভেদাভেদ নয়, হিংসা নয়,
নয় কোনো অবমান,
সকল হক আদায়ে গড়ে উঠুক
ন্যায়ভিত্তিক সম্মান।
মানবতার এই মহাসনদ
যদি করি ধারণ,
পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে
শান্তির সুবাস অনুক্ষণ।
তাওহীদের আলোয় আলোকিত
হোক সকল প্রাণ,
মানুষ হোক মানুষের আপন,
এ হোক চির আহ্বান।
আল্লাহর হক, বান্দার হক,
যখন হবে পূরণ,
তখনই হবে সুখময় ধরা,
তখনই সত্য জীবন।
এসো সবাই শপথ করি
রবের পথে চলি,
মানবতার মহাসনদে
নিজ জীবন গড়ি চলি।
ইবাদত, মমতা, ন্যায় ও প্রেমে
হোক পৃথিবী ভরা,
এই হোক মোদের চিরপ্রার্থনা—
হে রব, করো কবুল ধরা।
৭১
১৪৫ মন্তব্য