সিনিয়র শিক্ষক
০৪ জুন, ২০২৬ ০৭:৩১ অপরাহ্ণ
আদল ও ন্যায়বিচার: রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি
আদল ও ন্যায়বিচার: রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি
ভূমিকা
মানব সভ্যতার ইতিহাস এই সত্যকে বারবার প্রমাণ করেছে যে, কোনো রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সম্পদ বা ভৌগোলিক বিস্তৃতির ওপর ভর করে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে ন্যায়বিচারের ভিত্তির ওপর। আরবি ‘আদল’ শব্দটি শুধু ন্যায় নয়, বরং ভারসাম্য, সাম্য এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করার ধারণাকে বহন করে। ইসলামী দর্শনে ‘আদল’ একটি নৈতিক গুণের চেয়েও বেশি—এটি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক স্তম্ভ।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে শান্তি, আস্থা ও উন্নয়ন স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। আর যেখানে জুলুম, বৈষম্য ও বিচারহীনতা প্রতিষ্ঠা লাভ করে, সেখানে অস্থিরতা ও পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ন্যায়বিচার তাই কেবল আদালতের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি এবং জনগণের আস্থার প্রধান উৎস।
ইসলামে আদল ও ন্যায়বিচার
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।”
— (সূরা আন-নাহল: ৯০)
অন্যত্র তিনি বলেন:
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”
— (সূরা আল-মায়িদা: ৮)
মহানবী (সা.)-এর জীবন এই নীতির জীবন্ত প্রমাণ। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-ও যদি চুরি করেন, তাহলে তাঁর হাতও কাটা হবে। এই ঘোষণা ইসলামে ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ আদর্শ—যেখানে ক্ষমতা, সম্পর্ক বা বংশ কোনো ছাড় পায় না।
রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হিসেবে ন্যায়বিচার
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রাগারে নয়, জনগণের আস্থায় নিহিত। যখন নাগরিকরা বিশ্বাস করেন যে আইন সবার জন্য সমান, তখনই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও দায়িত্ববোধ জন্মায়। পক্ষান্তরে, বিচারহীনতা আস্থার বন্ধন ছিন্ন করে এবং রাষ্ট্রকে দুর্বল করে।
দার্শনিক ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি
পশ্চিমা দর্শনেও এই সত্য স্বীকৃত। জন লক রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হিসেবে নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষাকে চিহ্নিত করেছেন। মন্টেস্কু ক্ষমতার বিভাজনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার অনিবার্য। জিন-জ্যাক রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি’ তত্ত্ব বলে, রাষ্ট্রের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে।
আধুনিক যুগে জন রলস তাঁর A Theory of Justice-এ ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রথম গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, ন্যায়বিচার শুধু আইনি বিষয় নয়, এটি মানুষের সুযোগ ও মর্যাদার সাথে গভীরভাবে জড়িত। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা এবং ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু-জেমস রবিনসনের গবেষণা আরও স্পষ্ট করে যে, অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করে, আর শোষণমূলক (Extractive) প্রতিষ্ঠান তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
ধর্ম, দর্শন ও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান—সবকিছুই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়: ন্যায়বিচার ছাড়া রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব অসম্ভব।
বিচারহীনতার পরিণতি
বিচারহীনতা যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, তখন:
অপরাধ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়
জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে এবং স্ব-বিচারের প্রবণতা বাড়ে
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গু করে
সামাজিক বিভাজন গভীর হয় এবং অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে
ইতিহাসের শিক্ষা
বাংলার ইতিহাসে সিলেটের রাজা গৌরগোবিন্দের পতন এর উজ্জ্বল উদাহরণ। শেখ বুরহানউদ্দিনের পরিবারের প্রতি অন্যায় আচরণ জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমনের মাধ্যমে সেই শাসনের অবসান হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, জুলুমের ওপর কোনো শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
একই সত্য প্রতিফলিত হয় আধুনিক মিয়ানমারে। দীর্ঘদিনের জাতিগত বৈষম্য, গণতন্ত্র দমন এবং ২০২১-এর সামরিক অভ্যুত্থান দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক শক্তি সাময়িক নিয়ন্ত্রণ দিতে পারে, কিন্তু আস্থা ও ন্যায়বিচার ছাড়া স্থিতিশীলতা আসে না।
উত্তরণের পথ
রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ করতে হলে আমাদের অবশ্যই:
বিচারবিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে
ধনী-গরিব নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে
প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে
মানবাধিকার ও নাগরিক মর্যাদার সুরক্ষা দিতে হবে
ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করে জুলুমের পথ পরিহার করতে হবে
উপসংহার
ন্যায়বিচার কোনো রাষ্ট্রের অলংকার নয়, এটি তার অস্তিত্বের ভিত্তি। বাহ্যিক উন্নয়ন—সড়ক, সেতু, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—ন্যায়বিচারহীন হলে বালুর বাঁধের মতো ভঙ্গুর।
ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় স্পষ্ট: ইনসাফ বিজয়ী হয়, জুলুম পরাজিত হয়। যে রাষ্ট্র এই সত্যকে উপলব্ধি করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, সেই রাষ্ট্রই টিকে থাকে এবং সমৃদ্ধ হয়।
— মুফিদুল আলম
শিক্ষক,
রামু, কক্সবাজার
৭০
১৪৪ মন্তব্য