সহকারী শিক্ষক
০৫ জুন, ২০২৬ ০৭:৩০ অপরাহ্ণ
প্রকৃতির অনুপ্রেরণায়, জলবায়ুর সুরক্ষায়, গড়ব ভবিষ্যৎ
প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস মানবসভ্যতার সামনে পরিবেশ, জলবায়ু এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে গভীর আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ নিয়ে হাজির হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য— 'প্রকৃতির অনুপ্রেরণায়, জলবায়ুর সুরক্ষায়, গড়ব ভবিষ্যৎ' (Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.)— বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আহ্বান। এ বছর দিবসটির বৈশ্বিক আয়োজক দেশ হিসেবে আজারবাইজানের রাজধানী বাকু পরিবেশগত সংকট নিরসনে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আজকের পৃথিবী এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশের সুস্থতা ছাড়া মানবজাতির নিরাপদ অস্তিত্ব আর কল্পনা করা সম্ভব নয়।
বৈশ্বিক সংকটঃ প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) বর্তমান পরিস্থিতিকে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং দূষণ— এই 'ত্রিমুখী বৈশ্বিক সংকট' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, দ্রুত নগরায়ণ এবং বনভূমি ধ্বংসের কারণে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত।
বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পায়, তবে পৃথিবীর বহু বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি অপরিবর্তনীয় হয়ে যাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র দাবানল, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা এবং খরা প্রমাণ করছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি এখন রূঢ় বাস্তবতা। প্রকৃতি তার আপন নিয়মে চলতে ভালোবাসে, কিন্তু মানবজাতি যখন সেই নিয়মে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেছে, প্রকৃতি তার নির্মম প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটঃ খাদের কিনারায় বিপন্ন বদ্বীপ
বিশ্বের জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের অবদান ১ শতাংশেরও কম হলেও, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বাধিক খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদেরই।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এর ফলে কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমছে এবং সংকুচিত হচ্ছে সুপেয় পানির উৎস। উপকূলীয় নারীদের এক কলসি বিশুদ্ধ পানির জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটতে হচ্ছে। একইসঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় মানুষ প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছে। বসতভিটা ও জীবিকা হারিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে, যা জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির (Climate-induced displacement) এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।
প্রকৃতির অনুপ্রেরণায় সমাধানের পথঃ
প্রকৃতি নিজেই অনেক সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম, যদি আমরা তাকে নিজের মতো করে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিই। এই মহাবিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের উন্নয়ন মডেলে মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি:
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারঃ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর কোনো বিকল্প নেই।
প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান (Nature-based Solutions): উপকূলীয় বনায়ন, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ এবং ব্যাপক হারে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করতে হবে। গাছের শিকড় শুধু মাটিকেই ধরে রাখে না, এটি কার্বন শোষণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে মজবুত ঢাল হিসেবেও কাজ করে।
টেকসই নীতি ও অভ্যাসের পরিবর্তনঃ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (Single-use plastic) বর্জন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগবাদী দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে।
আমাদের অঙ্গীকারঃ
পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। নীতি-নির্ধারক, নাগরিক সমাজ এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত ও আন্তরিক উদ্যোগ ছাড়া এই বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব। ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক— শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিদিনের চর্চায় আমরা প্রকৃতিকে রক্ষা করব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের কেবল দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র শর্ত।
৭১
১৪৫ মন্তব্য