সহকারী অধ্যাপক
০৯ জুন, ২০২৬ ০৩:৪৫ পূর্বাহ্ণ
চিন্তার ডানায় ঈমানের আলো সূরাঃ আলে-ইমরান আয়াতঃ ১৯০-১৯৪ মাদানী -মোঃ মুজিবুর রহমান
চিন্তার ডানায় ঈমানের আলো
সূরাঃ আলে-ইমরান আয়াতঃ ১৯০-১৯৪ মাদানী
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি হৃদয় ছোঁয়া গান,
রবের কুদরতের নিদর্শনে জাগুক ঈমানের প্রাণ।
আকাশভরা নক্ষত্রমালা, অসীম নীলের ঢেউ,
স্রষ্টার মহিমা ঘোষণা করে প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি ঢেউ।
সূর্য ওঠে পূর্ব দিগন্তে সোনালি আলোর রথে,
দিনের বুকে কর্মের ডাক দেয় নবীন প্রত্যুষ সাথে।
সন্ধ্যা নামে, রাতের আঁধার ছড়ায় আপন ডানা,
চাঁদের আলো ফিসফিসিয়ে বলে রবের গৌরবগাঁথা।
কত বিস্ময় আকাশজুড়ে, কত রহস্য ঘিরে,
কত তারা জ্বলছে নীরব, আপন কক্ষপথে ফিরে।
কেউ তাদের পথ শেখায় না, কেউ দেয় না নির্দেশ,
রবের হুকুমে চলছে সব, নেই কোথাও বিভ্রান্তি শেষ।
পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর বুকে স্থির,
নদী বয়ে যায় আপন তালে, সাগর থাকে ধীর।
বাতাস আসে, মেঘের ভেলা আকাশপথে ভাসে,
বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে শস্যভরা আশে-পাশে।
মরুভূমির উত্তপ্ত বুকে ফোটে জীবনের ফুল,
ঘন অরণ্যে পাখির কণ্ঠে ওঠে সুমধুর কূল।
সবুজ পাতায় শিশিরকণা মুক্তার মতো হাসে,
প্রতিটি দৃশ্য স্রষ্টার পরিচয় মনের মাঝে ভাসে।
বিবেকবান মানুষ যখন তাকায় গভীর মনে,
দেখে না শুধু দৃশ্যপটকে বাহ্যিক রঙিন ক্ষণে।
সে খুঁজে ফেরে স্রষ্টার চিহ্ন সৃষ্টি জগত জুড়ে,
চিন্তার নৌকা ভাসিয়ে দেয় জ্ঞানের মহাসমুদ্রে।
সে কখনো দাঁড়িয়ে থাকে রবের স্মরণে মগ্ন,
কখনো বসে চোখের জলে করে হৃদয় স্নিগ্ধ।
কখনো শুয়ে রাতের নীরব আকাশপানে চায়,
সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টার মহিমা খুঁজে বেড়ায়।
তখন তার হৃদয় বলে, “হে আমার মহান রব,
এ জগৎ তুমি সৃষ্টি করেছ সত্যের অটল সব।
এত শৃঙ্খলা, এত সৌন্দর্য, এত নিখুঁত রূপ,
অনর্থক নয় কিছুই এখানে, নেই কোনো ভুলসূত্র।”
“তুমি পবিত্র, তুমি মহান, সকল ত্রুটির ঊর্ধ্বে,
তোমার জ্ঞানের সীমাহীনতা বিশ্বজগতে স্পষ্ট রবে।
তোমার হিকমত অগাধ সাগর, অতল যার তল,
তোমার ইচ্ছায় সৃষ্টির মাঝে ফুটে জীবনের ফল।”
তখন মুমিন কাঁদতে কাঁদতে করে বিনম্র প্রার্থনা,
“হে আমাদের রব, রক্ষা কর আগুনের শাস্তি থেকে না।
যে আগুনে প্রবেশ করবে হারাবে সম্মান সব,
সেই ভয়াবহ পরিণতি থেকে আশ্রয় চাই রব।”
“যাকে তুমি দূরে সরাবে তোমার রহমতের ছায়া,
তার চেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত আর কে আছে হায়!
সেদিন কোনো বন্ধু হবে না, হবে না সাহায্যকারী,
নিজ কর্ম ছাড়া কেউ থাকবে না কাছে দাঁড়াবারই।”
“হে আমাদের রব, আমরা শুনেছি এক মহান আহ্বান,
যে ডাকছিল মানুষকে তোমার প্রতি আনতে ঈমান।
সে বলেছিল—এসো সবাই রবের প্রতি ফিরে,
সত্যের পথে জীবন গড়ো আলোর শপথ নিয়ে।”
“সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা ঈমান এনেছি,
অন্ধকারের পথ ছেড়ে তোমার দ্বারেই ফিরেছি।
আজ আমাদের অন্তর জুড়ে তোমার প্রেমের আলো,
তোমার সন্তুষ্টি পাওয়াই হোক জীবনের একমাত্র ভালো।”
“হে আমাদের রব, ক্ষমা কর আমাদের সকল পাপ,
অবহেলায় করা ভুলগুলো মুছে দাও অনুপম মাফ।
যা করেছি অজ্ঞানতায় কিংবা দুর্বলতার তরে,
তোমার দয়ার সাগরে সেগুলো হারিয়ে যাক ঝরে।”
“আমাদের হৃদয় পবিত্র কর, আমল করো শুদ্ধ,
সত্যের পথে অবিচল রাখো, করো না কখনো বুদ্ধিহীন।
জীবনের শেষ মুহূর্তটুকু হোক ঈমানের সাথে,
নেককারদের দলে রেখো মৃত্যুর শেষ প্রভাতে।”
“যারা তোমার প্রেমে জীবনভর করেছে আত্মদান,
যারা সত্যের পথে থেকেছে অটল, দৃঢ় প্রাণ,
আমাদেরকেও তাদের সাথে রেখো হাশরের ময়দানে,
তোমার রহমতের ছায়াতলে, জান্নাতের সুবাসখানে।”
“হে আমাদের রব, পূর্ণ কর তোমার সেই ওয়াদা,
যা শুনিয়েছ রাসূলদের মুখে যুগে যুগে সাধা।
যে জান্নাতের সুখের কথা দিয়েছ তুমি বার্তা,
আমাদেরকেও দিও তারই অনন্ত শান্তিধারা।”
“কিয়ামতের কঠিন দিনে করো না অপমান,
যেদিন মানুষ দাঁড়াবে সবাই নিয়ে নিজ অবদান।
সেদিন তোমার রহমত ছাড়া নেই তো কোনো আশ্রয়,
তোমার ক্ষমাই হবে তখন মুক্তির একমাত্র পরিচয়।”
নিশ্চয় তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না কখনো,
তোমার বাণী সত্য চিরন্তন, বদলায় না কোনো।
তোমার প্রতিশ্রুতি সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল আলো,
তোমার ন্যায়বিচারের সামনে মিথ্যা থাকে না ভালো।
তাই হে মুমিন, চোখ মেলে দেখো সৃষ্টির অপরূপ রূপ,
আকাশভরা নক্ষত্রমালা, ফুলের রঙিন কূপ।
দিনের পরে রাতের আগমন, রাতের পরে দিন,
সবকিছুতে লুকিয়ে আছে রবের অশেষ ঋণ।
চিন্তা করো, শিক্ষা নাও, বাড়াও ঈমানের দীপ,
স্রষ্টার পথে চলার মাঝে রয়েছে মুক্তির নীড়।
যে হৃদয়ে জাগে তাফাক্কুর, জাগে স্মরণের গান,
সেই হৃদয়ে নেমে আসে রহমতের বর্ষণ।
দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে থেকেও স্মরণ করো রব,
প্রতিটি শ্বাসে উচ্চারিত হোক তাঁরই পবিত্র নাম সব।
জীবনের প্রতিটি ক্ষণে থাকুক তাঁরই ভয়,
তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনেই হোক সকল কর্মময়।
আকাশ বলে—“এক রব আছেন, তিনিই মহান স্রষ্টা”,
পৃথিবী বলে—“তাঁরই হুকুমে সাজানো আমার ব্যপ্ততা।”
বাতাস বলে—“তাঁরই আদেশে আমি বয়ে যাই”,
সাগর বলে—“তাঁরই সীমার মাঝে আমি থেমে থাকি ভাই।”
চাঁদ বলে—“তাঁরই নির্দেশে রাতকে করি আলোকিত”,
সূর্য বলে—“তাঁরই হুকুমে হই প্রতিদিন উদ্ভাসিত।”
পাখি বলে—“তাঁরই নামে গাই সকাল-সন্ধ্যার গান”,
মুমিন বলে—“তাঁরই সন্তুষ্টি আমার জীবনের প্রাণ।”
অতএব এসো সবাই মিলে করি সেই প্রার্থনা,
যা শিখিয়েছে কুরআনের এই মহিমান্বিত বাণীখানা।
ক্ষমা, রহমত, জান্নাত আর ঈমানের অবিচল পথ,
হোক আমাদের জীবনের চিরদিনের রত্নসম রথ।
হে আমাদের রব, তুমি দয়াময়, তুমি করুণাধার,
তোমারই হাতে জীবন-মরণ, তোমারই অধিকার।
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি চিহ্ন করুক হৃদয় জাগ্রত,
আর তোমার স্মরণে কাটুক জীবন—পবিত্র, সফল, ধন্য ও আলোকিত।
***
যখন রাতের নিস্তব্ধতা নেমে আসে ধরার বুকে,
নক্ষত্রগুলো জ্বলে ওঠে আকাশজোড়া সুখে।
তখন মুমিন চেয়ে থাকে বিস্ময়ভরা নয়ন মেলে,
কত রহস্য লুকিয়ে আছে সৃষ্টির প্রতিটি খেলায় মেলে।
দেখে সে চাঁদের কলা ক্ষয় আর পূর্ণতার রূপ,
দেখে ঋতুর পরিবর্তনে প্রকৃতির অপার কূপ।
শীতের পরে বসন্ত আসে, বর্ষা আসে গ্রীষ্ম শেষে,
সবই চলে নির্ধারিত পথে মহান রবের নির্দেশে।
একটি বীজ মাটির নিচে নিভৃতে পড়ে রয়,
সেখান থেকে বৃক্ষ জন্মে, ফল ও ছায়া হয়।
কে দিল তাকে বেড়ে ওঠার অদৃশ্য সেই শক্তি?
কার ইশারায় প্রাণের সঞ্চার, কার অসীম যুক্তি?
মায়ের গর্ভে ক্ষুদ্র প্রাণের গোপন বেড়ে ওঠা,
রক্ত-মাংসে মানুষ হওয়া, কত বিস্ময়ের কথা!
কে রাখে তার হিসাব-নিকাশ, কে দেয় আকার রূপ?
স্রষ্টার কুদরতের সামনে স্তব্ধ হয় জ্ঞানীর কূল।
তখন হৃদয় সিজদায় নত হয়ে বলে বারবার,
“হে রব, তুমি ছাড়া আর নেই কোনো উপাস্য আর।
তুমি আদি, তুমি অন্ত, তুমি প্রকাশ্য, গোপন,
তোমার জ্ঞানের বাইরে কিছু নয় কখনো গমন।”
“তুমি সৃষ্টি করেছ মানুষকে উদ্দেশ্য দিয়ে স্পষ্ট,
পরীক্ষার এ ক্ষণিক জীবন নয় তো কোনো নষ্ট।
প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি মুহূর্ত আমানত তোমার দান,
একদিন সব ফিরিয়ে দেব, শেষ হবে এ ভুবন।”
তখন স্মরণে আসে হাশরের সেই ভয়াল দিন,
যেদিন কেঁপে উঠবে ধরিত্রী, স্তব্ধ হবে জিন।
সূর্য হবে নিকটবর্তী, ঘাম ঝরিবে ধারায়,
প্রত্যেকে ব্যস্ত থাকবে শুধু নিজেরই পরিণাম চিন্তায়।
সেদিন কারো ধন থাকবে না, থাকবে না অহংকার,
রাজা-প্রজা দাঁড়াবে সবাই একই বিচারদ্বার।
যার আমলনামা হবে ভারী নেকির উজ্জ্বলতায়,
সে-ই পাবে সফলতার সুখ জান্নাতের ছায়ায়।
আর যে ভুলে গেছে রবকে দুনিয়ার মোহে মত্ত,
যে জুলুম করে কাটিয়েছে জীবন অন্ধচিত্ত,
তার জন্য অপেক্ষা করবে কঠিন পরিণাম,
ন্যায়বিচারে প্রতিফল পাবে প্রতিটি অন্যায় কাজ।
তাই তো মুমিন কেঁদে বলে—
“হে আমাদের রব, ক্ষমা করো সকল অপরাধ,
অজ্ঞতায় করা পাপগুলো মুছে দাও আজ।
আমাদের অন্তর করো নির্মল, করো ঈমান দৃঢ়,
সত্যের পথে রাখো অটল, করো না হৃদয় নিঃস্ব।”
“যখন নফসের ডাকে মন ছুটে যেতে চায়,
তখন তোমার ভয়ের আলো পথ দেখিয়ে যায়।
যখন শয়তান মিথ্যা আশা দিয়ে করে প্ররোচনা,
তখন তোমার কালামের নূর জাগায় হিদায়াতের বাণীখানা।”
“হে রব, আমাদের চোখকে করো পাপ থেকে হেফাজত,
জিহ্বাকে রাখো সত্যের পথে, দূরে থাকুক গীবত।
হাতকে রেখো নেক আমলে, পা চলুক হকের রথে,
সারা জীবন কাটুক যেন তোমার সন্তুষ্টির পথে।”
“আমাদের ঘরগুলো ভরিয়ে দাও কুরআনের আলোয়,
সন্তানদের হৃদয় ভরুক তাকওয়া আর আমলে ভালোয়।
দাম্পত্যে দাও ভালোবাসা, আত্মীয়তায় দাও বন্ধন,
সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক ঈমানের সুবাসময় স্পন্দন।”
হে মুমিন, চিন্তা করো আকাশের বিস্তার দেখে,
কোটি কোটি ছায়াপথ ঘুরে চলে নিয়ম রেখে।
একটুও হয় না সংঘর্ষ, একটুও হয় না ভুল,
স্রষ্টার জ্ঞানের সামনে মানবজ্ঞান অতি ক্ষুদ্র কূল।
সাগরের অতল গভীরতা, পাহাড়ের সুউচ্চ শির,
সবই যেন তাসবীহ পড়ে রবের মহিমা ধীর।
পাখির কূজন, বাতাসের সুর, নদীর কলকল ধ্বনি,
সকল সৃষ্টি একসাথে বলে—“পবিত্র আমার ধনী।”
তবু মানুষ কত উদাসীন, কত ভুলে যায় পথ,
ক্ষণিক সুখের মোহে ডুবে হারায় সত্যের রথ।
যে হৃদয় কুরআনের আলো থেকে দূরে সরে যায়,
সে হৃদয়ে শান্তির নদী কখনো প্রবাহিত না হয়।
আর যে হৃদয় আল্লাহর স্মরণে সদা জাগ্রত রয়,
তার অন্তরে নেমে আসে প্রশান্তির অমৃতময় স্রোতধারায়।
দুঃখ এলে ধৈর্য ধরে, সুখে করে শুকরিয়া,
প্রতিটি অবস্থায় খুঁজে নেয় রবের নৈকট্য দিয়া।
অবশেষে মুমিন তোলে দু’হাত অশ্রুসজল নয়নে,
কাঁপা কণ্ঠে মিনতি জানায় গভীর বিনয়বচনে—
“হে আমাদের রব, পূর্ণ করো তোমার মহান ওয়াদা,
রাসূলগণের মাধ্যমে যে সুসংবাদ দিয়েছ সদা।
জান্নাতের সেই চিরসুখে আমাদেরও স্থান দিও,
তোমার আরশের ছায়াতলে রহমতের পরশ দিও।
কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে করো না অপমান,
ক্ষমার চাদরে ঢেকে রেখো আমাদের সব অবদান।
তুমি তো কখনো ভঙ্গ করো না প্রতিশ্রুতির বাণী,
তোমার ওয়াদা সত্য চিরকাল, সত্য তোমার কুরআনী।
আমাদের জীবন শেষ হোক ঈমানের সাক্ষ্য নিয়ে,
শেষ নিঃশ্বাস বের হোক শুধু তোমার নামটি দিয়ে।
নেককারদের সাথেই রেখো মৃত্যুর শেষ প্রহরে,
আর পুনরুত্থানের দিন তুলো তাদেরই কাতারে।
তোমার সন্তুষ্টিই হোক আমাদের সর্বশেষ চাওয়া,
তোমার দীদারই হোক জান্নাতে শ্রেষ্ঠ পাওয়া।
সৃষ্টির মাঝে চিন্তার নূর জাগুক অবিরাম,
তোমার স্মরণে কাটুক জীবন, তোমার স্মরণে অবসান।”
***
তারাভরা সেই আকাশতলে মুমিন যখন রয়,
চোখের জলে হৃদয় ধুয়ে রবের সান্নিধ্য লয়।
নীরব রাতে মনের মাঝে জাগে কত প্রশ্ন,
কে সাজালো এই মহাবিশ্ব এত সুশৃঙ্খল, স্পষ্ট?
কে দিল সূর্যকে উত্তাপ, চাঁদকে স্নিগ্ধ আলো,
কে দিল ফুলের পাপড়িতে রঙের অপরূপ ভালো?
কে দিল পাখির কণ্ঠে সুর, মৌমাছিকে গান,
কে দিল সাগর-বক্ষে ঢেউ, নদীকে গতিমান?
কে দিল মেঘের ভেলাগুলো আকাশজুড়ে ভাসা,
কে দিল বৃক্ষে ফলের ভার, শস্যক্ষেতে আশা?
কে দিল শিশুর হাসির মাঝে নিষ্পাপ আলোর ছোঁয়া,
কে দিল মায়ের হৃদয়জুড়ে মমতার নদী বওয়া?
তখন অন্তর উত্তর পায় গভীর উপলব্ধিতে,
এসব কিছুই চলছে শুধু মহান রবের ইচ্ছাতে।
তাঁর কুদরতের সীমা নেই, নেই কোনো তুলনা,
তাঁর মহিমার সামনে নত বিশ্বজগতখানা।
তখন মুমিন বলে উঠে—
“হে আমাদের পরওয়ারদিগার,
তুমি মহান, তুমি দয়ালু, তুমি ক্ষমার অধিকার।
তোমার নামে জেগে ওঠে সূর্যের সোনার হাসি,
তোমার নামে রাতের বুকে চাঁদের রূপের বাতি।
তুমি ছাড়া আশ্রয় কোথায়, কে শুনিবে ডাক?
কে মোছাবে দুঃখের অশ্রু, ভাঙা হৃদয়ের ফাঁক?
তুমি দিলে জীবন আমাদের, তুমিই দিবে মৃত্যু,
তোমার কাছেই ফিরতে হবে শেষ হবে সব ঋতু।
হে রব, যখন কবর হবে নিঃসঙ্গ অন্ধকার,
যখন সাথী হবে না কেউ, থেমে যাবে সংসার,
সেই সময়ে রহমতের এক ফোঁটা আলো দিও,
ঈমানের নূর হৃদয়জুড়ে অবিরাম জ্বালিয়ে দিও।
যখন আমলনামা খুলে দেখানো হবে সবার,
যখন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকবে বিচারের দরবার,
সেদিন তুমি ক্ষমার চাদর বিছিয়ে রেখো হে,
লজ্জার দিনে অপমান হতে রক্ষা করো যে।
হে রব, আমাদের গুনাহ যত আকাশসমান হয়,
তোমার দয়ার সামনে সেগুলো কিছুই নয়।
তুমি যদি ক্ষমা না করো কে করবে ক্ষমাদান?
তুমি যদি দয়া না করো কোথায় পাবো প্রাণ?
আমরা শুনেছি রাসূলদের সত্যের সেই বাণী,
শুনেছি কুরআনের মাঝে হিদায়াতের গল্পখানি।
তাই তো আমরা ঈমান এনেছি তোমারই আহ্বানে,
রেখো আমাদের অটল সদা সত্যেরই ময়দানে।
নেককারদের সাথে রেখো জীবনের প্রতিক্ষণ,
তাদের মতো করো আমাদের চরিত্র ও মন।
তাদের মতো চোখে দাও তাকওয়ার অশ্রুধারা,
তাদের মতো হৃদয় দাও বিনয়ভরা সারা।
হে রব, পূর্ণ করো ওয়াদা যা দিয়েছ তুমি,
জান্নাতের সেই সুখের বাগান, শান্তির চিরভূমি।
যেখানে নেই কোনো কষ্ট, নেই বিচ্ছেদের বেদনা,
শুধুই রহমত, শুধুই শান্তি, শুধুই সুখের সোনা।
যেখানে নদী প্রবাহিত হবে নির্মল জলের ধারা,
যেখানে থাকবে না মৃত্যু, থাকবে না হাহাকারা।
যেখানে মুমিন মিলবে আবার প্রিয়জনের সাথে,
যেখানে তোমার সন্তুষ্টি ছড়াবে অনন্ত প্রভাতে।
হে রব, সেই জান্নাতের পথে রাখো অবিচল,
দুনিয়ার মোহ, নফসের ধোঁকা করো বিফল।
তোমার প্রেমে জাগুক হৃদয়, তোমার ভয়ে প্রাণ,
তোমার স্মরণে কাটুক জীবন, এ আমাদের আরমান।”
এভাবেই তাফাক্কুরে মগ্ন যে হৃদয় থাকে,
সে তো স্রষ্টার নিদর্শন সব সৃষ্টি মাঝে দেখে।
দিনের পরে রাতের আগমন, রাতের পরে দিন,
প্রতিটি দৃশ্য শেখায় তাকে—রবই মহান ঋণ।
আকাশ শেখায় বিশালতা, সাগর শেখায় গভীরতা,
পাহাড় শেখায় দৃঢ়তা আর নদী শেখায় নম্রতা।
ফুল শেখায় সৌন্দর্য, ফল শেখায় দান,
পাখির কূজন শেখায় সদা রবের গুণগান।
তাই হে মানুষ, জাগো এবার, চিন্তা করো প্রাণে,
কেন এসেছ, কোথায় যাবে, ভাবো নির্জন ক্ষণে।
দুনিয়াটা ক্ষণিক সফর, আখিরাতই ঘর,
সেই ঘরেরই পাথেয় জোগাও, করো নেকির পর।
যারা চিন্তা করে সৃষ্টি নিয়ে, স্মরণ করে রব,
তাদের জন্য সুসংবাদ আছে অনন্ত সুখের সব।
তাদের হৃদয় আলোকিত হয় ঈমানেরই আলোয়,
তাদের জীবন ধন্য হয় রবের সন্তুষ্টি পাওয়ায়।
চলুক তবে এই প্রার্থনা নিশিদিন অন্তরে,
“হে আমাদের রব, রেখো তুমি হিদায়াতের পথ ধরে।
ক্ষমা করো, দয়া করো, দাও জান্নাতের ঠিকানা,
তোমার সন্তুষ্টিই হোক জীবনের শেষ কামনা।”
***
প্রভাত যখন উঁকি দেয় পূর্বাকাশের কোণে,
সোনার আলো ছড়িয়ে পড়ে শিশিরভেজা বনে।
পাখিরা সব ডানা মেলে গায় নতুন দিনের গান,
মুমিন তখন স্মরণ করে দয়াময় রহমান।
সে দেখে সূর্যের আলোয় জেগে ওঠে ধরার প্রাণ,
প্রতিটি প্রাণী খুঁজে ফেরে আপন জীবিকার স্থান।
কে দিল তাদের রিযিকের এই অদৃশ্য ব্যবস্থা?
কে চালায় এই বিশ্বময় নিখুঁত কর্মব্যস্ততা?
তখন অন্তর বলে উঠে—
“আমার রবই মহান,
তাঁরই হাতে সবকিছুর শুরু এবং অবসান।
তিনি ছাড়া নেই তো আর কোনো ক্ষমতাধর,
তাঁরই কুদরতে দাঁড়িয়ে আছে সৃষ্টি অপরিসর।”
দুপুরের সেই প্রখর রোদে, সন্ধ্যার লালিমায়,
রাতের কালো আবরণে, চাঁদের মিষ্টি ছায়ায়,
প্রতিটি ক্ষণ সাক্ষ্য দেয় এক মহান সত্যের,
এই জগৎ পরিচালিত এক রবের হুকুমে নিরন্তর।
বজ্রধ্বনির গর্জন শুনে কেঁপে ওঠে প্রাণ,
বিদ্যুতের ঝলকে দেখা যায় শক্তির প্রমাণ।
মেঘের ভেতর জমে থাকে কত অজানা রহস্য,
মানুষ যতই জানুক কিছু, রবের জ্ঞান অসীম স্পষ্ট।
কত মানুষ এ পৃথিবীতে এল আবার গেল,
কত রাজা সিংহাসন পেয়ে মাটির নিচে ঢলল।
কত ধনী জমিয়েছিল সোনা-রূপার ভাণ্ডার,
আজ তাদের নামটুকুও নেই মানুষের স্মৃতিধার।
এ দুনিয়া ক্ষণিক ছায়া, পথিকের বিশ্রাম,
আখিরাতের তুলনায় সে স্বপ্নসম এক নাম।
তাই তো মুমিন পথ চলিতে ভুলে না কখনো,
একদিন তাকে ফিরতে হবে রবের কাছেই পুনঃ।
যখন চুলে বার্ধক্যের শুভ্রতা নেমে আসে,
যখন শরীর ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে ভাসে,
যখন জীবনের হিসাবগুলো সামনে আসে ধরা,
তখন বুঝে—রবের দয়া ছাড়া নেই তো পথ সরা।
তখন সে কাঁদে একাকী তাহাজ্জুদের রাতে,
অশ্রুধারা ঝরে পড়ে সিজদার পবিত্র মাটিতে।
কাঁপা কণ্ঠে মিনতি করে বিনয়ের ভাষায়,
“হে রব, তুমি ক্ষমা করো আমায় শেষ আশায়।
আমি কত ভুল করেছি জানি না তার হিসাব,
তবু তোমার রহমতের কাছে ক্ষুদ্র সব আজাব।
তুমি যদি ফিরিয়ে দাও, কোথায় পাবো ঠাঁই?
তোমার দর ছাড়া আর তো আশ্রয় কোনো নাই।
হে রব, আমার অন্তর হতে অহংকার দূর করো,
রিয়া, হিংসা, লোভের আগুন চিরতরে নিভিয়ে ধরো।
তোমার ভালোবাসা দিয়ে হৃদয় ভরে দাও,
তোমার ভয়ের আলো দিয়ে জীবন সাজিয়ে নাও।
আমার চোখে দাও সে অশ্রু যা তোমার জন্য ঝরে,
আমার মুখে দাও সে কথা যা সত্যের পথে ধরে।
আমার হাতে দাও সে শক্তি যা মজলুমকে সাহায্য করে,
আমার পায়ে দাও সে গতি যা হকের পথে চলে।
হে রব, আমার সন্তানদের করো দ্বীনের আলো,
তাদের জীবন হোক আমলে, চরিত্রে অতুল ভালো।
তাদের অন্তরে দাও কুরআনের নূরের দীপ,
যাতে তারা আঁকড়ে ধরে সিরাতে মুস্তাকীম।
হে রব, আমার দেশ ও জাতিকে করো হেদায়াত,
দূর করো জুলুম, অন্যায় আর বিভেদের আঘাত।
মানুষ যেন মানুষকে ভালোবাসে তোমার তরে,
ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় পৃথিবীর ঘরে ঘরে।
হে রব, যেদিন কবর হবে আমার প্রথম ঘর,
সেদিন তুমি রহমতের নূর দিও অবিরত ঝর।
মুনকার-নাকীরের প্রশ্নে দিও সঠিক জবাব,
ঈমানের দৃঢ়তায় যেন সফল হয় হিসাব।
যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে পুনরায়,
যেদিন মানুষ উঠবে কবর থেকে দলে দলে হায়,
সেদিন তুমি রেখো আমায় নেককারদের সাথে,
রাসূলপ্রেমে আলোকিত ঈমানদারদের কাতারে।
হাউযে কাউসারের পানীয় দিও প্রিয় নবীর হাতে,
তৃষ্ণার্ত হৃদয় জুড়িয়ে যাক তাঁরই শাফাআতে।
মীযানের পাল্লা ভারী করো নেক আমলের দ্বারা,
সিরাত সেতু পার করিও রহমতেরই ধারা।
তারপর দিও জান্নাতের সেই অনন্ত নিবাস,
যেখানে নেই দুঃখের ছায়া, নেই বিচ্ছেদের নিঃশ্বাস।
যেখানে শান্তি চিরদিন, নেই কোনো অবসান,
যেখানে রবের সন্তুষ্টিই সর্বোচ্চ সম্মান।
আর যদি দাও সে মহাসুখ, শ্রেষ্ঠ পুরস্কার,
তোমার পবিত্র দীদার যেন হয় বারংবার।
সেই আশাতেই কাটে জীবন, সেই আশাতেই প্রাণ,
তোমার সন্তুষ্টি লাভই মুমিনের মহা-আরমান।
তাই হে মানুষ, চিন্তা করো আকাশ-পাতাল দেখে,
রাত-দিনের পরিবর্তনের গভীর শিক্ষা রেখে।
সৃষ্টির মাঝে লুকিয়ে আছে তাওহীদেরই আলো,
যে তা দেখে, তার হৃদয় হয় ঈমানে উজ্জ্বল ভালো।
দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে থেকেও স্মরণ করো রব,
প্রতিটি শ্বাসে উচ্চারিত হোক তাঁরই পবিত্র নাম সব।
তাফাক্কুর আর তাওয়াক্কুল হোক জীবনের পথ,
তবেই সফল হবে মানুষ, পাবে জান্নাতের রথ।
হে আমাদের রব, কবুল করো এই ক্ষুদ্র প্রার্থনা,
ক্ষমা, রহমত, হিদায়াত আর জান্নাতের কামনা।
তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না, তুমি সত্য মহান,
তোমারই দয়ায় আলোকিত হোক আমাদের প্রাণ।
৭৩
১৪৬ মন্তব্য