Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ জুন, ২০২৬ ১২:২৫ অপরাহ্ণ

অহংকারের পরিণতি ও শয়তানের শপথ মোঃ মুজিবুর রহমান

অহংকারের পরিণতি শয়তানের শপথ

সূরাঃ আল-আ'রাফ আয়াতঃ ১২-১৮ মাক্কী

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

আদি কালের এক বিস্ময়কর ঘটনা, শিক্ষা যার গভীর,
যে কাহিনি শুনলে জাগে হৃদয়, খুলে বিবেকের নীর।
রহমানের অশেষ কুদরতে সৃষ্টি হলো ধরার মানুষ,
মাটি দিয়ে গড়লেন আদমকে, দিলেন জ্ঞানের অমূল্য স্পর্শ।

ফেরেশতারা দাঁড়িয়ে তখন রবের হুকুমের অপেক্ষায়,
সকল সৃষ্টি নত হলো তাঁর আদেশের মহিমায়।
সিজদার নির্দেশ এলো যখন মহান প্রভুর পক্ষ হতে,
নত হলো সব অনুগত প্রাণ বিনম্র শ্রদ্ধাভরে তাতে।

কিন্তু একজন দাঁড়িয়ে রইল অহংকারের মেঘে ঢাকা,
নিজের মর্যাদা ভেবে সে সত্যের পথ হতে গেল ফাঁকা।
সে ছিল ইবলিস, বহুদিন যার ইবাদতে ছিল নাম,
কিন্তু অন্তরে লুকিয়ে ছিল গর্বের বিষাক্ত ঘূর্ণিঝড় থাম।

রব বললেন, “কীসে তোমায় করল সিজদা থেকে বিরত?
আমি যখন আদেশ দিলাম, কেন করলে না আনুগত্য?”
ইবলিস তখন উত্তর দিল উদ্ধত অহংকার ভরে,
আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, কেন নত হব তার তরে?

আমাকে সৃষ্টি করেছেন আপনি জ্বলন্ত আগুন দিয়ে,
আর তাকে গড়েছেন মাটি থেকে ধূলিকণা নিয়ে।
আগুন কি কখনো মাটির চেয়ে নিচু হতে পারে?
আমি কেন তার সামনে মাথা নত করি সংসারে?”

এই ছিল তার পতনের মূল, সর্বনাশের বীজ,
অহংকারে অন্ধ হয়ে গেল, হারাল সত্যের দিশ।
রব বললেন, “নেমে যাও আজ সম্মানের স্থান হতে,
এখানে থেকে অহংকারের কোনো অধিকার নেই তোমাতে।

বের হয়ে যাও অপমানিত, লাঞ্ছিত ঘৃণিত হয়ে,
সত্যকে যে তুচ্ছ করেছে সে থাকবে দূরে সরে।
এক মুহূর্তে ভেঙে গেল তার দীর্ঘ সাধনার মান,
অহংকারের আগুন জ্বালল নিজের ধ্বংসের সন্ধান।

তবুও সে নত হলো না, করল না অনুতাপ,
বরং বিদ্রোহের পথ বেছে নিল, বাড়াল পাপের চাপ।
সে বলল, “আমায় অবকাশ দিন পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত,
মানুষ যখন উঠবে কবর হতে সেই সময় অবধি যুক্ত।

রব বলিলেন, “অবকাশ পেলে নির্ধারিত সেই ক্ষণ,
আমার হিকমতে থাকবে তুমি নির্দিষ্ট সময় গুণ।
অবকাশ পেয়ে ইবলিস তখন করল ভয়ংকর শপথ,
মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার নিল সে প্রতিজ্ঞার রথ।

সে বলল, “যেহেতু আপনি আমাকে পথচ্যুত করেছেন আজ,
আমি বসে থাকব আপনার সোজা পথে সাজিয়ে ফাঁদের সাজ।
মানুষ যখন চলবে হেদায়াতের উজ্জ্বল আলোর দিকে,
আমি বাধা হব প্রতিটি পদে, ছুটব তাদের পিছু নিকে।

আমি আসব তাদের সামনে হয়ে মিথ্যা আশার দালাল,
দুনিয়ার মোহে ডুবিয়ে দেব, করব হৃদয় বেহাল।
আমি আসব তাদের পেছন দিক হতে অতীত স্মৃতি নিয়ে,
পাপের পথে ডাকব তাদের পুরনো অভ্যাস জাগিয়ে দিয়ে।

আমি আসব ডান দিক হতে নেক আমলের ছদ্মবেশে,
রিয়ার বিষ ঢালব অন্তরে গোপন কৌশল মেশে।
আমি আসব বাম দিক হতে খোলা পাপের আহ্বান নিয়ে,
অবাধ্যতার রঙিন স্বপ্ন তাদের চোখে তুলে দিয়ে।

অধিকাংশকে পাব না আমি কৃতজ্ঞতার পথে স্থির,
তারা ভুলবে রবের নিয়ামত, হবে গাফেল অধীর।
কত ভয়াবহ সেই ঘোষণা, কত গভীর সেই ভাষা,
মানুষকে পথভ্রষ্ট করার অন্ধকারের সর্বনাশা।

রব বলিলেন, “বের হয়ে যাও ধিক্কৃত বিতাড়িত হয়ে,
আমার রহমত হতে দূরে থাকবে চিরকাল সরে।
আর যে কেউ তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে চলবে পথে,
তোমাদের সবার স্থান হবে জাহান্নামের আগুনের রথে।

এই কাহিনি শুধু ইতিহাস নয়, জীবনের আয়না,
এতে লুকায় শিক্ষা অগণিত, সত্যের দীপ্ত গাঁথা।
অহংকার যখন হৃদয়ে ঢোকে, মানুষ হারায় জ্ঞান,
নিজের গুণেই মুগ্ধ হয়ে ভুলে যায় রবের দান।

ইবলিসের ছিল ইবাদত, ছিল দীর্ঘ সাধনার পথ,
তবুও এক বিন্দু অহংকার ডুবিয়ে দিল সব রত্ন।
তাই যে মুমিন বিনয়ী থাকে, মাথা নত করে রবের তরে,
আল্লাহ তাকে মর্যাদা দেন পৃথিবী আখিরাতে ভরে।

শয়তান আজও থেমে নেই তার পুরনো সেই চেষ্টাতে,
দিনরাত ব্যস্ত মানুষকে টানতে গোমরাহির রাস্তাতে।
কখনো সে ডাকে লোভের সুরে, কখনো ক্রোধের ছলে,
কখনো হিংসা, কখনো রিয়া, কখনো মিথ্যার দলে।

কখনো বলে, “এখন নয়, পরে করো তওবা গিয়ে,
কখনো বলে, “পাপটা ছোট, বিবেকটাকে ঘুম পাড়িয়ে।
কখনো মানুষকে ব্যস্ত রাখে অর্থ সম্মানের নেশায়,
কখনো ডুবায় কামনার স্রোতে, গাফেলির আবেশায়।

তাই হে মানুষ, জাগো আজই, চিনে নাও শত্রুর রূপ,
যে চায় তোমার চিরবিনাশ, করে প্রতারণার কূপ।
ধরে রাখো কুরআনের আলো, সুন্নাহর দৃঢ় হাত,
তবেই তুমি পার হবে এই ফিতনার অন্ধ রাত।

সালাতে রাখো হৃদয় জাগ্রত, জিকিরে রাখো মন,
তওবার অশ্রু ধুয়ে দিক সব অবাধ্যতার ক্ষণ।
বিনয় দিয়ে সাজাও প্রাণ, কৃতজ্ঞতায় ভরো হৃদয়,
রবের পথে অবিচল থাকো, সেখানেই প্রকৃত বিজয়।

যেদিন হবে শেষ হিসাবের মহামহিম বিচার,
সত্য-মিথ্যার পার্থক্য হবে সবার কাছে স্পষ্ট আর।
সেদিন সফল সেই বান্দা, যে ছিল রবমুখী প্রাণ,
আর ব্যর্থ সেই, যে শুনেছিল শয়তানের আহ্বান।

হে আল্লাহ, রাখুন আমাদের ঈমানের পথে অটল,
শয়তানের সব কুমন্ত্রণা করুন চিরতরে বিফল।
বিনয়, তাকওয়া, কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দিন অন্তরখানি,
আপনার সন্তোষেই কাটুক জীবন, আমাদের প্রার্থনা জানি।

***

বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি সত্যের পবিত্র গান,
যে ইতিহাসে লুকিয়ে আছে শিক্ষা অগণন।
আদি কালের সেই ঘটনা আজও জাগায় মন,
যেখানে স্পষ্ট ফুটে ওঠে আনুগত্য বিদ্রোহের ক্ষণ।

যখন প্রভু সৃষ্টির মাঝে করলেন নতুন ঘোষণা,
মাটির দেহে প্রাণের পরশ, জ্ঞানের মহান রচনা।
আদম নামে সৃষ্টি হলো মানবজাতির পিতা,
তাঁর মর্যাদায় বিস্মিত হলো আসমান-জমিনের চিতা।

ফেরেশতাদের দিলেন তখন সম্মানের নির্দেশ,
"
আদমকে করো সিজদা সবাই"—প্রকাশ পেল আদেশ।
সঙ্গে সঙ্গে নত হলো সব অনুগত ফেরেশতা,
রবের হুকুম পালন করা ছিল তাদের বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু এক জন দাঁড়িয়ে রইল মাথা উঁচু করে,
অহংকারের কালো ধোঁয়া উঠল অন্তর ভরে।
সে ছিল ইবলিস, বহু যুগের ইবাদতের দাবিদার,
তবু তার অন্তর গহীনে লুকিয়ে ছিল অহংকার।

রব জিজ্ঞাসিলেন, "কীসে তোমায় করল বিরত আজ?
আমার আদেশ অমান্য করে কেন করলে লাজ?"
উত্তরে সে বলল তখন ঔদ্ধত্যের সুরে,
"
আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রভু, বিচার করুন ধীরে।

আমার সৃষ্টি আগুন হতে, দীপ্তি যার অপরূপ,
আর সে গঠিত কাদা-মাটি, মলিন তার রূপ।
আগুন কি কখনো মাটির কাছে মাথা নত করে?
তাই আমি সিজদা করিনি তার সম্মানের তরে।"

এই ছিল তার পতনের মূল, সর্বনাশের দ্বার,
নিজেকে বড় ভাবার রোগেই হারাল সে অধিকার।
যোগ্যতা নয়, আনুগত্যই সম্মানের মাপকাঠি,
অহংকারে অন্ধ হলে ডুবে যায় সব সাথী।

রব বলিলেন, "নেমে যাও আজ পবিত্র স্থান হতে,
এখানে থেকে অহংকারের সুযোগ নেই তোমাতে।
বের হয়ে যাও লাঞ্ছিত হয়ে, হারিয়ে সব মান,
সত্যকে যে অস্বীকার করে তার এটাই পরিণাম।"

এক মুহূর্তে ভেঙে গেল তার ইবাদতের মিনার,
অহংকারের এক স্ফুলিঙ্গে জ্বলে গেল সংসার।
কত বছরের সিজদা-সাধনা মুছে গেল নিমেষে,
কারণ সে সত্য প্রত্যাখ্যান করল অহংকারের নেশে।

তবুও তার হৃদয় ভাঙল না, এল না অনুতাপ,
বরং সে বিদ্রোহের আগুনে বাড়িয়ে দিল পাপ।
সে বলল, "হে প্রভু, আমায় অবকাশ দিন কিছু কাল,
যেদিন হবে পুনরুত্থান, শেষ হবে দুনিয়ার জাল।"

রব বলিলেন, "তুমি পেলে নির্ধারিত অবকাশ,
নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকবে তোমার বাস।"
এই সুযোগ পেয়ে ইবলিস তখন শপথ করল কঠিন,
মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করা হবে তার সাধন-দিন।

সে বলল, "আমি বসে থাকব আপনার সরল পথে,
যে পথে চলে মানুষ পায় মুক্তির দিশা হাতে।
সামনে এসে দেখাব তাদের মিথ্যা সুখের স্বপ্ন,
দুনিয়ার মোহে হারিয়ে ফেলবে আখিরাতের জ্ঞান।"

"পেছন থেকে ডাকব তাদের অতীত পাপের টানে,
পুরনো নেশা জাগিয়ে দেব হৃদয়ের গোপন খানে।
ডান দিক থেকে প্রবেশ করব নেকির ছদ্মবেশে,
রিয়ার আগুন ঢেলে দেব ইবাদতের পরিবেশে।

বাম দিক থেকে আহ্বান করব প্রকাশ্য পাপের পথে,
সত্যকে তারা তুচ্ছ করবে প্রবৃত্তিরই রথে।
চারদিক হতে ঘিরে রাখব ফাঁদের জাল বিছিয়ে,
অধিকাংশকে পাব না আমি কৃতজ্ঞতার দলে নিয়ে।"

কী ভয়ংকর সেই ঘোষণা! কী গভীর সেই ষড়যন্ত্র!
মানুষকে ধ্বংস করাই যেন তার একমাত্র মন্ত্র।
যে নিজে হারিয়েছে পথ, সে চায় সবাই হারাক,
নিজের সাথে অন্যদেরও অন্ধকারে ডুবাক।

রব বলিলেন, "বের হয়ে যাও ধিক্কৃত অবস্থায়,
আমার রহমত হতে দূরে চিরকাল নির্বাসন পায়।
আর যে তোমার অনুসরণে চলবে পথভ্রষ্ট হয়ে,
জাহান্নামের আগুনে সে থাকবে তোমার সঙ্গ নিয়ে।"

এই কাহিনি শুধু নয় কোনো অতীত দিনের কথা,
আজও এর শিক্ষা বয়ে চলে সত্যের মহাবার্তা।
শয়তান এখনো ব্যস্ত আছে মানুষকে ভোলাতে,
প্রতিটি ক্ষণে ফাঁদ পাতে ঈমান থেকে সরাতে।

কখনো সে বলে, " পাপ খুব ছোট, এতে ক্ষতি কী?"
কখনো বলে, "এখন নয়, পরে হবে তওবা ঠিকই।"
কখনো লোভের সোনার জাল বিছিয়ে রাখে পথে,
কখনো খ্যাতির মোহ জাগায় মানুষেরই রথে।

কখনো হিংসা, কখনো ক্রোধ, কখনো মিথ্যা অহং,
কখনো দুনিয়ার চাকচিক্যে ডুবিয়ে রাখে সঙ্গ।
কখনো গাফেল বানিয়ে দেয় নামাজের সময়ে,
কখনো সন্দেহ ছড়িয়ে দেয় ঈমানের উপমায়ে।

তাই হে মুমিন, সাবধান হও, চিনে নাও শত্রুকে,
যে চায় তোমার ধ্বংস শুধু প্রতারণার কৌশলে।
ধরে রাখো কুরআনের আলো, সুন্নাহর দৃঢ় হাত,
সত্যের পথে অবিচল থাকো দিন হোক কিংবা রাত।

বিনয় যার হৃদয়ভরা, সে- প্রকৃত বড়,
নম্রতারই ছায়াতলে মানুষ পায় পথ ঘর।
অহংকারের মুকুট মাথায় যতই করো বাস,
একদিন তা ভেঙে যাবে হয়ে অপমানের নিশ্বাস।

ইবলিস ছিল তার প্রমাণ, শিক্ষা যার সুস্পষ্ট,
অহংকারে পুড়ে হয়ে গেল রহমত হতে বিচ্ছিন্ন।
আর আদম পেলেন মর্যাদা বিনয় আর আনুগত্যে,
সত্যের পথে মাথা নত করাই সফলতার নীতি।

যেদিন হবে শেষ বিচার, কাঁপবে সকল প্রাণ,
প্রকাশ পাবে কারা ছিল সত্যপথের যাত্রী মহান।
সেদিন ধন্য সেই বান্দা, যে রবকে ভালোবেসে,
শয়তানের সব কুমন্ত্রণা করেছে পায়ে মাড়িয়ে শেষে।

হে আল্লাহ! রাখুন মোদের অহংকার হতে দূরে,
সত্যের পথে অটল রাখুন জীবনভর সুরে।
শয়তানের সব কুমন্ত্রণা করুন চিরতরে ক্ষয়,
আপনার সন্তোষ লাভেই হোক আমাদের পরিচয়।

ঈমানের আলোয় আলোকিত হোক হৃদয়ের ভুবন,
বিনয়, তাকওয়া, কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠুক জীবন।
যতদিন প্রাণ থাকবে বুকে, থাকুক এই আহ্বান
রবের হুকুম মান্য করাই বান্দার শ্রেষ্ঠ সম্মান।

***

অহংকারের পরিণতি শয়তানের শপথ

বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি সত্যের দীপ্ত গান,
যে ইতিহাসে লুকিয়ে আছে যুগে যুগে কল্যাণ।
যে কাহিনি শুধু অতীত নয়, আজও জীবন্ত শিক্ষা,
যেখানে স্পষ্ট ফুটে ওঠে আনুগত্য আর দীক্ষা।

যখন ছিল না মানবজাতি, ছিল না কোনো জন,
রবের ইচ্ছায় সৃষ্টি জগৎ চলত নিজ নিয়মে তখন।
ফেরেশতারা রবের তাসবীহে ব্যস্ত দিন-রজনী,
প্রতিটি ক্ষণে পালন করত মহান প্রভুর বাণী।

তখন এল এক মহা ঘোষণা আরশের ছায়াতলে,
নতুন এক সৃষ্টি হবে জ্ঞানের মহিমা নিয়ে চলে।
মাটি থেকে গড়া হবে এক সম্মানিত মানবজাতি,
যার মাঝে থাকবে চিন্তার শক্তি, জ্ঞানের আলোকভাঁটি।

রবের কুদরতে গঠিত হলো আদম আলাইহিস সালাম,
রূহের পরশে জেগে উঠল তাঁর জীবন, তাঁর নাম।
তাঁকে শেখানো হলো এমন জ্ঞান, এমন প্রজ্ঞার কথা,
যার সামনে বিস্মিত হলো ফেরেশতাদের ব্যাকুলতা।

অতঃপর এলো সেই নির্দেশ মহান রবের পক্ষ হতে,
"
সিজদা করো আদমকে সবাই আমার হুকুম মতে।"
সঙ্গে সঙ্গে নত হলো সব অনুগত ফেরেশতা,
আনুগত্যই ছিল তাদের সম্মান আর বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু একজন দাঁড়িয়ে রইল অবাধ্যের অহংকারে,
নিজেকে বড় ভাবার নেশা জড়িয়ে ধরল তারে।
সে ছিল ইবলিস, দীর্ঘকাল যার ইবাদতের খ্যাতি,
তবু অন্তরে লুকিয়ে ছিল আত্মগর্বের অন্ধ মতি।

রব বললেন, "কীসে তোমায় করল আদেশ হতে দূরে?
আমি যখন নির্দেশ দিলাম, দাঁড়িয়ে আছ কেন সুরে?"
ইবলিস তখন উত্তর দিল উদ্ধত কণ্ঠস্বরে,
অহংকারের বিষ মিশিয়ে নিজের যুক্তির ঘোরে

"আমি তার চেয়ে উত্তম প্রভু, আমার বিশ্বাস,
আগুন থেকে সৃষ্টি আমার, তাতে রয়েছে উজ্জ্বল আভাস।
আর সে তো সৃষ্টি হয়েছে মাটি আর কাদায়,
আমি কেন তার সামনে মাথা নত করি দায়ে?"

হায়! ছিল না যুক্তির কথা, ছিল না জ্ঞানের আলো,
ছিল অহংকারের আগুন, আত্মম্ভরিতার কালো।
যে চোখে নিজের শ্রেষ্ঠত্বই সত্যের মাপকাঠি হয়,
সে চোখ কখনো রবের হুকুমের সৌন্দর্য বুঝতে নয়।

আগুনের গৌরব দেখল সে, দেখল না রবের দান,
উপাদানকে বড় ভাবল, ভুলে গেল স্রষ্টার সম্মান।
মাটি থেকেই ফলে ফসল, মাটি থেকেই জীবন,
মাটির বুকেই মানুষ পায় আশ্রয় আপনজন।

রব বললেন, "নেমে যাও আজ পবিত্র স্থান হতে,
অহংকারীর কোনো অধিকার নেই এখানে থাকতে।
বেরিয়ে যাও লাঞ্ছিত হয়ে, হারিয়ে সব সম্মান,
সত্যের সামনে মাথা না নত করলে এটাই পরিণাম।"

এক মুহূর্তে ভেঙে গেল তার ইবাদতের অহং মিনার,
শত শত বছরের সাধনা হলো ব্যর্থ, হলো ছারখার।
এক বিন্দু গর্বের আগুন জ্বালিয়ে দিল সব,
অবাধ্যের কালো ছায়ায় হারিয়ে গেল রব।

কিন্তু তবুও তার অন্তরে জাগল না অনুশোচনা,
নিজের ভুল স্বীকার করার এলো না প্রেরণা।
বরং সে আরও কঠিন হলো বিদ্রোহের আগুনে,
নিজেকে দায়ী না করে দোষ দিল ভাগ্যের গুণে।

সে বলল, "হে আমার রব, দিন আমাকে অবকাশ,
পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত থাকুক আমার বাস।"
রব বললেন, "নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অবকাশ পাবে তুমি,
আমার হিকমতে চলবে সব, জানি আমি ভূমি-আসমানি।"

অবকাশ পেয়ে ইবলিস তখন ভয়ংকর শপথ নিল,
মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার অঙ্গীকারে মন দিল।
সে বলল, "আমি বসে থাকব আপনার সরল পথে,
যে পথে চলে মানুষ পায় মুক্তির আলো হাতে।

সামনে থেকে দেখাব তাদের মিথ্যা স্বপ্নের রঙ,
দুনিয়ার ক্ষণিক সুখে বাঁধব তাদের মন-সংযোগ।
তারা ভুলবে আখিরাতের স্থায়ী পুরস্কার,
মায়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে হবে পথহারা।"

"পেছন দিক থেকেও আমি ডাকব অবিরাম,
অতীত পাপকে সাজিয়ে দেব সুখস্মৃতির নাম।
পুরোনো ভুলকে সুন্দর করে দেখাব বারবার,
যেন তারা ফিরে যায় সেই অন্ধকারের দ্বার।"

"ডান দিক থেকে আসব আমি নেকির ছদ্মবেশে,
ইবাদতের মাঝেও ঢুকিয়ে দেব আত্মপ্রশংসার নেশে।
মানুষ ভাববে সে বড় সাধু, বড় নেককার,
রিয়ার আগুনে পুড়ে যাবে তার আমল অপার।"

"বাম দিক থেকে আহ্বান করব প্রকাশ্য গুনাহে,
প্রবৃত্তির স্রোতে ভাসিয়ে দেব অবাধ্যের চাহিদায়।
একেকটি পাপকে দেখাব আনন্দের আয়োজন,
ধীরে ধীরে নিভিয়ে দেব ঈমানের প্রদীপবরণ।"

"চারদিক থেকে ঘিরে রাখব প্রতারণার জালে,
সন্দেহ, লোভ, হিংসা ছড়াব মানুষেরই কালে।
অধিকাংশকে পাব না আমি কৃতজ্ঞতার পথে স্থির,
নিয়ামতের মালিককে ভুলে হবে তারা অধীর।"

কত ভয়ংকর সেই শপথ, কত গভীর তার ভাষা!
আজও তার প্রতিধ্বনি বয়ে আনে সর্বনাশা।
সে নিজে হারিয়েছে পথ, তাই চায় সবাই হারাক,
নিজের সাথে সমগ্র মানুষ অন্ধকারে ডুবাক।

রব বললেন, "বেরিয়ে যাও ধিক্কৃত বিতাড়িত হয়ে,
আমার রহমত হতে দূরে থাকবে যুগের পরে যুগ বয়ে।
আর যে তোমার অনুসরণে চলবে অবাধ্য হয়ে,
জাহান্নাম হবে তার ঠিকানা তোমার সাথী হয়ে।"

হে মানুষ! কাহিনি শুধু ইতিহাসের পাতা নয়,
আমাদের প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের পরিচয়।
আজও শয়তান বসে আছে হেদায়াতের পথপাশে,
কাউকে লোভে, কাউকে ক্রোধে, কাউকে সন্দেহে বাঁধে।

কখনো সে বলে, "আরেকটু পরে করো নামাজ",
কখনো বলে, " পাপ ছোট, এতে কোথায় লাজ?"
কখনো বলে, "তুমি তো ভালো, ভয় কিসের আর?"
এভাবেই মানুষ পড়ে যায় ধ্বংসের অন্ধকার।

কখনো অর্থের মোহ দেখায়, কখনো ক্ষমতার,
কখনো সৌন্দর্যের নেশা, কখনো খ্যাতির ভার।
কখনো হিংসার আগুন জ্বালে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই,
কখনো মিথ্যার পথ দেখিয়ে সত্যকে আড়াল করাই।

তাই হে মুমিন! সতর্ক হও প্রতিটি ক্ষণ-প্রহর,
শত্রুকে চিনে রাখো সদা, করো না তাকে অবহেলার।
কুরআন হোক পথের আলো, সুন্নাহ হোক ঢাল,
তাকওয়া হোক হৃদয়ের শক্তি, সত্য হোক অবিচল কাল।

বিনয় যার অলংকার হয়, সে- প্রকৃত মহান,
নম্রতারই ছায়াতলে বাড়ে মানুষের সম্মান।
অহংকারের প্রাসাদ যত উঁচু হোক না কেন,
এক ঝড়ে তা ভেঙে পড়ে অপমানের ধুলায় যেন।

ইবলিস তার জীবন্ত প্রমাণ, শিক্ষা যার অমলিন,
অহংকারের কারণে হলো সে রহমত হতে বিলীন।
আর আদম পেলেন মর্যাদা রবের আনুগত্যে,
সত্যের সামনে মাথা নত করাই সফলতার নীতিতে।

যেদিন হবে হিসাবের দিন, কাঁপবে সৃষ্টি জগৎ,
খুলে যাবে সব আমলনামা, প্রকাশ পাবে সত্য।
সেদিন ধন্য সেই বান্দা, যে ছিল রবমুখী প্রাণ,
যে শয়তানের ফাঁদ চিনে রেখেছে ঈমানের সম্মান।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তর রাখুন বিনয়ে ভরা,
অহংকারের অন্ধকার হতে রাখুন দূরে সরা।
শয়তানের সব কুমন্ত্রণা করুন চিরতরে ব্যর্থ,
ঈমান, তাকওয়া, কৃতজ্ঞতায় করুন জীবন সমৃদ্ধ।

কুরআনের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের প্রাণ,
সুন্নাহর পথে কাটুক মোদের প্রতিটি দিনমান।
যতদিন বুকের মাঝে থাকবে জীবনের স্পন্দন,
রবের হুকুম মান্য করাই হোক আমাদের পরিচয়-চিহ্ন।

অবশেষে যখন শেষ হবে দুনিয়ার সকল আয়োজন,
থেমে যাবে সময়ের চাকা, নিভে যাবে সব গর্ব-গৌরবের প্রদীপ তখন।
সেদিন শুধু টিকে থাকবে ঈমান, আমল আর সত্য জ্ঞান,
আর রবের সন্তোষ লাভই হবে বান্দার শ্রেষ্ঠ সম্মান।

মন্তব্য করুন