প্রভাষক
১০ জুলাই, ২০২৬ ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ
পেঁপের রিং স্পট রোগ (Papaya Ring Spot Disease): কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ
পেঁপের রিং স্পট রোগ (Papaya Ring Spot Disease): কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ
লেখক:
মোঃ উসমান গনি
প্রভাষক (জীববিজ্ঞান)
মুসলিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, ময়মনসিংহ
ভূমিকা
পেঁপে (Carica papaya L.) বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর ফল। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন A, C, ফলিক অ্যাসিড, খাদ্যআঁশ এবং পেপেইন (Papain) এনজাইম বিদ্যমান। কিন্তু ভাইরাসজনিত পেঁপের রিং স্পট রোগ (Papaya Ring Spot Disease) বিশ্বের অন্যতম ধ্বংসাত্মক রোগ হিসেবে পরিচিত। এই রোগের আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফলের গুণগত মান নষ্ট হয় এবং ফলন ৮০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশে, বিশেষ করে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভারত, তাইওয়ান, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশে এ রোগ ব্যাপকভাবে দেখা যায়। ১৯৪৯ সালে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ Jensen সর্বপ্রথম এই রোগকে Ring Spot Disease নামে অভিহিত করেন।
রোগের কারণ
পেঁপের রিং স্পট রোগের প্রধান কারণ হলো Papaya Ringspot Virus – Type P (PRSV-P)।
ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক পরিচয়
- রাজ্য: Virus
- পরিবার: Potyviridae
- গণ: Potyvirus
- প্রজাতি: Papaya ringspot virus (PRSV)
ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য
- এটি একটি একক সূত্রবিশিষ্ট (Single-stranded) Positive Sense RNA Virus।
- ভাইরাসটি আবরণীবিহীন (Non-enveloped)।
- আকৃতি দণ্ডাকার (Flexuous Rod)।
- দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৬০–৮০০ ন্যানোমিটার।
- ব্যাস প্রায় ১২ ন্যানোমিটার।
- একই ভাইরাসের অন্য রূপ কুমড়া জাতীয় উদ্ভিদে মোজাইক রোগ সৃষ্টি করে।
রোগের সংক্রমণ পদ্ধতি
এই রোগ সাধারণত যান্ত্রিক সংস্পর্শে এবং এফিড (Aphid) জাতীয় পোকার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধান বাহক
- Green Peach Aphid (Myzus persicae)
- Cotton Aphid (Aphis gossypii)
এফিড আক্রান্ত গাছ থেকে মাত্র ১০–১৫ সেকেন্ড খাদ্য গ্রহণ করলেই ভাইরাস তার মুখাংশে লেগে যায়। পরে সেই এফিড সুস্থ গাছে বসলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভাইরাস সংক্রমিত হয়।
রোগ দ্রুত ছড়ানোর কারণ
- ঘনবদ্ধ বাগান
- আগাছার আধিক্য
- আক্রান্ত চারা ব্যবহার
- এফিডের অধিক বিস্তার
- আক্রান্ত গাছ ছাঁটাইয়ের সময় জীবাণুমুক্ত যন্ত্র ব্যবহার না করা
রোগের লক্ষণ
১. কাণ্ডে লক্ষণ
- সাধারণত রোপণের ৩০–৪০ সপ্তাহ পরে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
- গাছ খর্বাকার হয়ে যায়।
- কাণ্ডে গাঢ় সবুজ রঙের আঁকাবাঁকা দাগ দেখা যায়।
- কাণ্ডে লম্বালম্বি ফাটল সৃষ্টি হতে পারে।
- কচি গাছের বৃদ্ধি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
- মারাত্মক সংক্রমণে গাছ শুকিয়ে বা পচে মারা যায়।
২. পাতায় লক্ষণ
- প্রথমে কচি পাতায় লক্ষণ দেখা যায়।
- পাতা হলুদ (Chlorosis) হয়ে যায়।
- পাতায় সবুজ-হলুদ মোজাইক সৃষ্টি হয়।
- পাতার আকার ছোট, কুঞ্চিত ও বিকৃত হয়।
- পাতায় চক্রাকার (Ring Spot) দাগ দেখা যায়।
- শিরা মোটা ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
- অনেক সময় পাতার অধিকাংশ অংশ নষ্ট হয়ে শুধু শিরাগুলো অবশিষ্ট থাকে (Shoestring Symptom)।
- গাছের মাথায় ছোট ও বিকৃত পাতার গুচ্ছ (Bunchy Top) সৃষ্টি হয়।
৩. ফলে লক্ষণ
- ফলে গাঢ় সবুজ বর্ণের বৃত্তাকার বা চক্রাকার দাগ সৃষ্টি হয়।
- পানিভেজা গোলাকার ক্ষত দেখা যায়।
- ফলের গায়ে উঁচু-নিচু ফোলা অংশ সৃষ্টি হয়।
- ফল ছোট হয়।
- অপরিপক্ব ফল ঝরে পড়ে।
- ফলের স্বাদ, মিষ্টতা ও পেপেইনের পরিমাণ কমে যায়।
- পাকা ফলে রিং দাগ কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
- মারাত্মক আক্রান্ত গাছে ফল হয় না অথবা ফলন ৮০–৯০% পর্যন্ত কমে যায়।
রোগ নির্ণয়
নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সহজেই রোগটি শনাক্ত করা যায়—
- পাতায় মোজাইক
- রিং স্পট
- বিকৃত পাতা
- কাণ্ডে সবুজ দাগ
- ফলে বৃত্তাকার রিং
গবেষণাগারে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার জন্য ELISA এবং RT-PCR পরীক্ষাও ব্যবহার করা হয়।
রোগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব
- ফলন ৯০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
- ফলের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
- পেপেইন শিল্পে কাঁচামালের ঘাটতি সৃষ্টি হয়।
- কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
- বাণিজ্যিক বাগান ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
রোগের প্রতিকার
রিং স্পট রোগের কোনো কার্যকর ওষুধ নেই। তাই আক্রান্ত গাছ দ্রুত অপসারণ এবং বাহক পোকা দমনই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।
করণীয়
১. আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে অথবা মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে।
২. আক্রান্ত পাতাগুলো সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে।
৩. নিয়মিত এফিড পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৪. প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী নিবন্ধিত কীটনাশক ব্যবহার করে এফিড নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৫. হলুদ আঠালো ফাঁদ (Yellow Sticky Trap) ব্যবহার করা যেতে পারে।
৬. বাগান আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
৭. ছাঁটাইয়ের যন্ত্র জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করতে হবে।
৮. গাছে অপ্রয়োজনীয় ক্ষত সৃষ্টি করা যাবে না।
রোগ প্রতিরোধ
১. রোগমুক্ত বীজ ও চারা ব্যবহার
সর্বদা প্রত্যয়িত উৎস থেকে রোগমুক্ত চারা সংগ্রহ করতে হবে।
২. এফিড নিয়ন্ত্রণ
এফিড দমনই রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
৩. জাল ব্যবহার
চারা অবস্থায় ইনসেক্ট-প্রুফ নেট ব্যবহার করলে সংক্রমণ অনেক কমে যায়।
৪. আক্রান্ত গাছ দ্রুত অপসারণ
রোগ দেখা মাত্র আক্রান্ত গাছ ধ্বংস করতে হবে।
৫. মিশ্র চাষ
পেঁপের সারির মাঝে ভুট্টা, জোয়ার বা অন্যান্য বাধা ফসল লাগালে এফিডের চলাচল কমে।
৬. আগাছা নিয়ন্ত্রণ
অনেক আগাছা ভাইরাসের আশ্রয়দাতা হওয়ায় নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
৭. কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা
আক্রান্ত অঞ্চল থেকে চারা বা কলম অন্যত্র নেওয়া যাবে না।
৮. প্রতিরোধী বা ট্রান্সজেনিক জাত
যেসব দেশে অনুমোদিত, সেখানে Rainbow ও SunUp ট্রান্সজেনিক জাত সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনা (Integrated Disease Management)
- রোগমুক্ত চারা ব্যবহার
- এফিড নিয়ন্ত্রণ
- হলুদ স্টিকি ট্র্যাপ স্থাপন
- আগাছা দমন
- আক্রান্ত গাছ অপসারণ
- পরিচ্ছন্ন কৃষি ব্যবস্থাপনা
- নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ
- কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুসরণ
শিক্ষণীয় বার্তা
- ভাইরাসজনিত রোগের কার্যকর ওষুধ নেই।
- রোগমুক্ত চারা ব্যবহারই সর্বোত্তম প্রতিরোধ।
- এফিড নিয়ন্ত্রণ করলে রোগের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
- আক্রান্ত গাছ রেখে দিলে পুরো বাগান আক্রান্ত হতে পারে।
- সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিক ফলন ও নিরাপদ পেঁপে উৎপাদন সম্ভব।
উপসংহার
পেঁপের রিং স্পট রোগ বাংলাদেশের পেঁপে উৎপাদনের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। রোগটি দ্রুত ছড়ালেও সময়মতো আক্রান্ত গাছ অপসারণ, এফিড দমন, রোগমুক্ত চারা ব্যবহার, আগাছা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে এর ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কৃষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এ রোগ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বৃদ্ধি নিরাপদ ও টেকসই পেঁপে উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
১৩
১৫ মন্তব্য