সহকারী শিক্ষক
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:২১ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
শিক্ষা কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। একটি দেশ কতটা এগিয়ে যাবে, তার অর্থনীতি কতটা টেকসই হবে, তার নাগরিকরা বিশ্বমঞ্চে কতটা প্রতিযোগিতা করতে পারবে—এসবকিছুর মূলে থাকে সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষার সংখ্যাগত সূচকে (enrollment rate) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে—প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বেড়েছে, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত হয়েছে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণও বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সংখ্যাগত উন্নতি কি গুণগত মানের উন্নতির সাথে সমান তালে চলছে? এই লেখায় আমরা আলোচনা করব, বাংলাদেশের জন্য গুণগত শিক্ষা কতটা জরুরি, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাদান আদৌ সম্ভব কিনা, এবং এই বাস্তবতা পরিবর্তনের পথ কী হতে পারে।
শুধু স্কুলে ভর্তি হওয়া বা সার্টিফিকেট অর্জন করাই শিক্ষার লক্ষ্য নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, সমস্যার সমাধান করতে শেখায়, নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস দেয়। গুণগত শিক্ষা ছাড়া একটি জাতি কেবল সনদধারী মানুষ তৈরি করে, দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ:
বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু কাঠামোগত ও গুণগত সমস্যা এখনও প্রকট।
দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং শিক্ষকতা পেশার প্রতি সামাজিক মর্যাদা হ্রাস—এসব মিলিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান ব্যাহত হচ্ছে।
শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অবকাঠামো, শিক্ষক মান এবং সম্পদের ক্ষেত্রে বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে। রাজধানী বা বিভাগীয় শহরের একটি স্কুল আর প্রত্যন্ত গ্রামের একটি স্কুলের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার ফারাক শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে বৈষম্য তৈরি করে।
পরীক্ষা পদ্ধতি এখনও অনেকাংশে মুখস্থবিদ্যা-নির্ভর। প্রশ্নপত্রের কাঠামো এমনভাবে তৈরি যে, শিক্ষার্থীরা বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা বা প্রয়োগমূলক দক্ষতার চেয়ে মুখস্থ করা তথ্য পুনরুৎপাদনে বেশি মনোযোগী হয়। এর ফলে GPA-5 পাওয়া শিক্ষার্থীরাও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে হাজির হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের আস্থার সংকট এতটাই বেড়েছে যে, প্রাইভেট টিউশন বা কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। এতে শিক্ষা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে এবং প্রকৃত শ্রেণিকক্ষ-শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও ইতিবাচক নয়। ফলে দক্ষ কারিগরি জনশক্তির ঘাটতি রয়ে গেছে, যা শিল্পখাতের চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষিত বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়ে গেছে—অনেক গ্র্যাজুয়েট উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে চাকরি পাচ্ছেন না।
এই প্রশ্নের উত্তর একবাক্যে দেওয়া কঠিন—বাংলাদেশে বর্তমানে যে কাঠামো আছে, তার মধ্যেই কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে, বিশেষত কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-কেন্দ্রিক বিভাগগুলোতে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখলে, বর্তমান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো—শিক্ষক সংকট, মূল্যায়ন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতার অভাব—আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পথে বড় বাধা।
আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা মানে শুধু ভালো ভবন বা প্রযুক্তি নয়। এর মূল উপাদান হলো:
এই উপাদানগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়ার বাকি। তবে আশার কথা হলো, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, যা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
গুণগত শিক্ষা রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, বহুমুখী প্রক্রিয়া। তবে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ এই যাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য গুণগত শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। সংখ্যাগত অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত রূপান্তর তখনই সম্ভব হবে, যখন প্রতিটি শিক্ষার্থী মানসম্পন্ন শিক্ষকের কাছ থেকে যথাযথ পরিবেশে শিক্ষা লাভ করবে, যখন মূল্যায়ন পদ্ধতি মুখস্থবিদ্যার বাইরে গিয়ে প্রকৃত দক্ষতা বিকাশে সহায়ক হবে, এবং যখন নীতিনির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন—প্রতিটি স্তরে ধারাবাহিকতা ও আন্তরিকতা বজায় থাকবে। এই পথ সহজ নয়, কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই বিনিয়োগ অবশ্যই করতে হবে—কারণ একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ তার মানুষ, আর সেই মানুষ গড়ে ওঠে গুণগত শিক্ষার হাত ধরেই।
১৩
১৫ মন্তব্য