প্রভাষক
১০ জুলাই, ২০২৬ ০২:৫২ অপরাহ্ণ
ধানের ব্লাইট রোগ (Bacterial Leaf Blight of Rice) ধানের অন্যতম বিধ্বংসী ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ
ধানের ব্লাইট রোগ (Bacterial Leaf Blight of Rice)
ধানের অন্যতম বিধ্বংসী ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ
ভূমিকা
ধান বাংলাদেশের প্রাণ ও প্রধান খাদ্যশস্য। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির ভিত্তি হলো ধান। কিন্তু নানা রোগের আক্রমণে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফলন নষ্ট হয়। এর মধ্যে ধানের ব্যাকটেরিয়াজনিত ব্লাইট রোগ (Bacterial Leaf Blight বা BLB) সবচেয়ে ভয়ংকর ও ক্ষতিকর রোগগুলোর একটি। অনুকূল আবহাওয়ায় এ রোগে ২০–৭০% পর্যন্ত ফলনহানি হতে পারে। মারাত্মক আক্রমণে পুরো ধানক্ষেত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রোগের জীবাণু
বৈজ্ঞানিক নাম: Xanthomonas oryzae pv. oryzae (Xoo)
বাংলা নাম: ধানের ব্যাকটেরিয়াজনিত ব্লাইট রোগের জীবাণু
শ্রেণিবিন্যাস:
রাজ্য (Kingdom): Bacteria
পর্ব (Phylum): Pseudomonadota (Proteobacteria)
শ্রেণি (Class): Gammaproteobacteria
বর্গ (Order): Lysobacterales
পরিবার (Family): Lysobacteraceae
গণ (Genus): Xanthomonas
প্রজাতি (Pathovar): Xanthomonas oryzae pv. oryzae
জীবাণুর বৈশিষ্ট্য
১. গ্রাম-নেগেটিভ (Gram-negative) ব্যাকটেরিয়া।
২. দণ্ডাকার (Rod-shaped) আকৃতি।
৩. একটি মেরু ফ্লাজেলাম (Polar flagellum) থাকায় সচল।
৪. স্পোর উৎপাদন করে না।
৫. হলুদ বর্ণের জ্যান্থোমোনাডিন (Xanthomonadin) রঞ্জক উৎপন্ন করে।
৬. উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত বংশবিস্তার করে।
৭. পাতার ক্ষতস্থান, হাইডাথোড (Hydathode) এবং স্টোমাটার মাধ্যমে উদ্ভিদে প্রবেশ করে।
৮. সংক্রমিত বীজ, খড়, আগাছা ও আক্রান্ত গাছের অবশিষ্টাংশে কয়েক মাস জীবিত থাকতে পারে।
রোগের কারণসমূহ
ধানের ব্লাইট রোগ ছড়িয়ে পড়ে মূলত নিম্নলিখিত কারণে:
সংক্রমিত বীজ ব্যবহার
আক্রান্ত খড় ও ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে ফেলে রাখা
অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ
ঘন করে চারা রোপণ
ঝড়-বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও পোকামাকড়ের আঘাতে পাতায় ক্ষত সৃষ্টি
জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকা
উচ্চ তাপমাত্রা (২৫–৩৪° সে.) ও উচ্চ আর্দ্রতা
প্রবল বাতাস ও বৃষ্টির মাধ্যমে জীবাণুর দ্রুত বিস্তার
রোগের লক্ষণ
চারা অবস্থায় (ক্রেসেক স্টেজ):
চারা হঠাৎ করে শুকিয়ে যায়।
গাছ বিবর্ণ হয়ে মরে যায়।
আক্রান্ত চারা খুব সহজেই উপড়ে আসে।
পূর্ণবয়স্ক গাছে:
পাতার ডগা থেকে হলুদাভ-সাদাটে দাগ দেখা যায়।
দাগ ধীরে ধীরে পাতার কিনারা বরাবর নিচের দিকে বিস্তার লাভ করে।
পরবর্তীতে দাগ বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায়।
পুরো পাতা খড়ের মতো শুকনো ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
সকালবেলায় আক্রান্ত পাতায় হলুদাভ ব্যাকটেরিয়াল রস (Bacterial ooze) দেখা যায়।
শীষ ছোট হয়, দানা কমে যায় এবং দানার ওজন হ্রাস পায়।
তীব্র আক্রমণে পুরো ক্ষেত আগুনে পোড়া অবস্থার মতো দেখায়।
রোগের বিস্তার
ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়—
সংক্রমিত বীজের মাধ্যমে
বৃষ্টি ও সেচের পানির মাধ্যমে
প্রবল বাতাসের মাধ্যমে
কৃষি যন্ত্রপাতি ও মানুষের চলাচলের মাধ্যমে
আক্রান্ত খড় ও আগাছা থেকে
রোগের প্রতিকার ও ব্যবস্থাপনা
১. রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার
সুস্থ, প্রত্যয়িত ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করুন।
২. রোগ সহনশীল জাত নির্বাচন
স্থানীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশকৃত ব্লাইট-সহনশীল জাত চাষ করুন।
৩. সুষম সার ব্যবস্থাপনা
অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। পটাশ ও জিঙ্ক সারের সুষম প্রয়োগ গাছকে রোগপ্রতিরোধী করে।
৪. আক্রান্ত অংশ অপসারণ
আক্রান্ত গাছ ও পাতা দ্রুত কেটে সরিয়ে ধ্বংস করুন।
৫. জমি পরিষ্কার রাখা
ফসল কাটার পর আক্রান্ত খড় ও অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে বা গভীরভাবে পুঁতে ফেলুন।
৬. পানি ব্যবস্থাপনা
জমিতে অতিরিক্ত পানি জমতে দেবেন না। সঠিক সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।
৭. যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্তকরণ
ব্যবহারের আগে-পরে কৃষি যন্ত্রপাতি ভালোভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করুন।
৮. ব্যাকটেরিনাশক ব্যবহার
প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুসারে কপারভিত্তিক ব্যাকটেরিনাশক ব্যবহার করুন। তবে রাসায়নিকের উপর এককভাবে নির্ভর না করে সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনা (IPM) অনুসরণ করাই উত্তম।
রোগ প্রতিরোধে করণীয়
রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার
ব্লাইট সহনশীল জাত চাষ
সুষম সার প্রয়োগ ও অতিরিক্ত নাইট্রোজেন পরিহার
আগাছা দমন
সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ
আক্রান্ত খড় জমিতে না রাখা
নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন
বৃষ্টির পরপরই লক্ষণ দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ মেনে চলা
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
ফলন ২০–৭০% পর্যন্ত হ্রাস
দানার গুণগত মান কমে যাওয়া
কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি
জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব
সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনা (Integrated Disease Management)
একক কোনো পদ্ধতি দিয়ে এ রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই সকল ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে গ্রহণ করতে হবে:
রোগমুক্ত বীজ + সহনশীল জাত
সুষম সার ও পানি ব্যবস্থাপনা
জমি ও যন্ত্রপাতির পরিচ্ছন্নতা
আক্রান্ত অংশ দ্রুত অপসারণ
প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী রাসায়নিক ব্যবহার
শিক্ষণীয় বার্তা
ধানের ব্লাইট রোগ যতই মারাত্মক হোক না কেন, সচেতনতা, সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ, পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সচেতন কৃষকই সুস্থ ধানের খেত গড়ে তুলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন।
লেখক:
মোঃ উসমান গনি
প্রভাষক, জীববিজ্ঞান
মুসলিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, ময়মনসিংহ
১৩
১৫ মন্তব্য