সহকারী শিক্ষক
১১ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মৃত্যুর মুহূর্তটি মানুষের জীবনের সবচেয়ে চরম ও গুরুত্বপূর্ণ সত্য। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এই সময়কার আত্মিক, শারীরিক ও অদৃশ্যের যে ভয়াবহ ও স্পষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা মানুষকে তার ক্ষণস্থায়ী জীবন এবং আখিরাতের জবাবদিহিতা সম্পর্কে সতর্ক করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, "প্রত্যেক জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে" (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫)। মানুষের মৃত্যুর ক্ষণটি কেমন হবে—তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার ঈমান ও ইহকালের আমলের ওপর। মুমিন ও পাপাচারী ব্যক্তির জন্য মৃত্যুর অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।
আল্লাহ তাআলা বলেন, "অবশেষে যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে: হে আমার রব! আমাকে পুনরায় ফেরত পাঠান, যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি পূর্বে ছেড়ে দিয়েছিলাম" (সূরা আল-মু'মিনূন: ৯৯-১০০)। মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের চোখ স্থির হয়ে যায় এবং গোপন চোখের পর্দা উন্মোচিত হয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন, "তোমাদের সামনে থেকে পর্দা তুলে দেওয়া হয়েছে, তাই আজ তোমাদের দৃষ্টি অত্যন্ত প্রখর" (সূরা ক্বাফ: ২২)। এই সময় ফেরেশতাদের আগমন ঘটে—যাদের সাধারণ চোখ দিয়ে দেখা যায় না, কিন্তু মুমূর্ষু ব্যক্তি তাদের স্পষ্ট দেখতে পায়।
হাদিসে মৃত্যুর এই কঠিন সময়ের এক বিস্তারিত ও হৃদয়স্পর্শী চিত্র পাওয়া যায়। হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত এক প্রসিদ্ব দীর্ঘ হাদিসে রাসূলে আকরাম (সা.) বর্ণনা করেন—
মুমিনের মৃত্যুসংবাদ: যখন কোনো মুমিন বান্দার দুনিয়ার জীবনের শেষ মুহূর্ত ও আখিরাতের প্রথম মুহূর্ত উপস্থিত হয়, তখন আসমান থেকে উজ্জ্বল ও দ্যুতিময় চেহারার ফেরেশতারা জান্নাত থেকে সুগন্ধি ও পোশাক নিয়ে অবতীর্ণ হন। মৃত্যুর ফেরেশতা (আজরাঈল আ.) এসে অত্যন্ত মৃদু ও কোমল সুরে বলেন, "হে পবিত্র আত্মা! আল্লাহর ক্ষমা ও তাঁর সন্তুষ্টির দিকে বের হয়ে এসো।" তখন সেই আত্মাটি এত সহজে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে, যেন কোনো পাত্র থেকে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। ফেরেশতারা সম্মানের সাথে সেই আত্মাকে গ্রহণ করেন এবং আসমানের দিকে নিয়ে যান।
কাফের ও ফাসিকের মৃত্যুসংবাদ: পক্ষান্তরে, কোনো পাপাচারী বা কাফেরের মৃত্যুর সময় আসমান থেকে কঠোর ও ভয়ঙ্কর চেহারার ফেরেশতারা অবতীর্ণ হন। আজরাঈল (আ.) এসে গর্জন করে বলেন, "হে খবীস (অপবিত্র) আত্মা! আল্লাহর গজব ও অসন্তোষের দিকে বের হয়ে এসো।" তখন সেই আত্মা ভয়ে দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আত্মগোপন করতে চায়। হাদিসে এসেছে, ভিজা পশমের ওপর বহু কাটাওয়ালা আঁকড়া চালিয়ে দিলে যেভাবে পশম ছিঁড়ে আসে, ঠিক তেমনিভাবে অত্যন্ত নির্মম কষ্টে তার আত্মা শরীর থেকে টেনে বের করা হয়।
কুরআনে জালেমদের মৃত্যুর সেই ভয়াবহ দৃশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, "যদি তুমি দেখতে পেতে, যখন জালেমগণ মৃত্যুযন্ত্রনায় পতিত থাকে এবং ফেরেশতারা হাত বাড়িয়ে বলে: তোমাদের প্রাণ বের করে দাও! আজ তোমাদের অবমাননাকর শাস্তি দেওয়া হবে..." (সূরা আল-আনআম: ৯৩)।
মৃত্যুর মুহূর্তে ঘাড়ের রগ টান ধরে, পা দুটি একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায় এবং 'গড়গড়া' বা আত্মা কণ্ঠনালীতে এসে ঠেকে—যাকে কুরআনে 'আল-হুলকূম' (الحلقوم) বা 'আল-তারা ক্বী' (Тহাঁসুলি) বলা হয়েছে। রাসূলে আকরাম (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা বান্দার তাওবা কবুল করেন যতক্ষণ না তার শরীরে গড়গড়া (মৃত্যুর চূড়ান্ত লক্ষ্মণ) শুরু হয়।" চূড়ান্ত মুহূর্তে যখন বান্দার তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সে নিজের চোখের সামনে জান্নাত বা জাহান্নামের ঠিকানা স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। সার্বিকভাবে, মৃত্যুর সময়কার হাল মূলত একজন মানুষের সারাজীবনের উপার্জিত ঈমান ও আমলেরই চূড়ান্ত প্রতিফলনের সূচনা।
১৩
১৫ মন্তব্য