সহকারী অধ্যাপক
১২ জুলাই, ২০২৬ ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ণ
লম্বা জীবনের পাথেয়? (দুনিয়ার পর কবর) — মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
লম্বা জীবনের পাথেয়?
(দুনিয়ার পর কবর)
— মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
হে মন! এত অহংকার কিসের বলো?
এ পৃথিবী কি চিরদিন তোমারই রইল?
আজ যে রাজা, কাল সে পথিক,
সময় সবার নামই ধীরে ধীরে মুছে দিল।
একদিন তোমাকেও যেতে হবে,
ফিরে আসার কোনো পথ থাকবে না।
তুমি নিজে যাবে না—
মানুষই কাঁধে তুলে নিয়ে যাবে
নীরব কবরের দুয়ারে।
যে হাত গড়েছিল অট্টালিকা,
সেই হাত একদিন নিথর হবে।
যে চোখে ছিল গর্বের আগুন,
সে চোখ মাটির নিচে
চিরনিদ্রায় বন্ধ হবে।
যে কণ্ঠে ছিল ক্ষমতার ভাষা,
সেখানে নেমে আসবে নীরবতা।
যে পায়ে ছিল দম্ভের পদচারণা,
সেই পা আর চলবে না
একটুও নিজের ইচ্ছায়।
হে মন!
আজ যে আয়নায় নিজেকে দেখে মুগ্ধ হও,
আগামীকাল সেই মুখে
সাদা কাফনের পর্দা পড়বে।
আজ যে সম্পদের হিসাব রাখো,
কাল কেউ গুনবে না তোমার ধন।
গোনা হবে কেবল—
কতটি সৎকর্ম,
কতটি অশ্রু মোছালে,
কতটি হৃদয় ভাঙনি,
কতটি অন্যায় থেকে ফিরে এলে।
দুনিয়ার সব দরজা
একদিন বন্ধ হয়ে যাবে।
কিন্তু আমলের দরজা
বন্ধ হবে মৃত্যুর মুহূর্তে।
তাই হে মন!
অহংকার নয়—বিনয় শিখো।
বিদ্বেষ নয়—ভালোবাসা শিখো।
অন্যায় নয়—ন্যায়ের পথে চলো।
মানুষকে ছোট নয়,
সম্মান করতে শেখো।
কবরের মাটি
কাউকে রাজা বলে না,
কাউকে ভিখারি বলেও না।
সেখানে সবাই মানুষ,
সেখানে পরিচয় একটাই—
কে ছিল আল্লাহভীরু,
কে ছিল অবাধ্য।
তুমি কি ভেবেছ,
ক্ষমতা তোমাকে রক্ষা করবে?
তুমি কি ভেবেছ,
সম্পদ কিনে দেবে মুক্তি?
তুমি কি ভেবেছ,
মানুষের প্রশংসা
রবের বিচারে কাজে আসবে?
না, কখনোই না।
সেদিন সাক্ষী দেবে
তোমার প্রতিটি কথা,
প্রতিটি কাজ,
প্রতিটি দৃষ্টি,
প্রতিটি নিয়ত।
যে সালাত তুমি অবহেলা করেছিলে,
সে-ই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
যে কুরআন তাকেই রেখে দিয়েছিলে,
সে-ই সাক্ষী হবে।
যে গরিব ফিরেছিল তোমার দুয়ার থেকে,
তার দীর্ঘশ্বাসও হারিয়ে যাবে না।
হে মন!
আজও সময় আছে।
সেজদায় কেঁদে নাও।
ক্ষমা চেয়ে নাও।
অন্যের হক ফিরিয়ে দাও।
মিথ্যা ছেড়ে সত্য ধরো।
হিংসা ছেড়ে ভালোবাসা শেখো।
লোভ ছেড়ে সন্তুষ্টি গ্রহণ করো।
কারণ মৃত্যু
কোনো বয়স দেখে আসে না।
সে দরজায় কড়া নাড়ে না।
সে সংবাদ দিয়ে আসে না।
সে অপেক্ষাও করে না।
একদিন দুপুরের আলোয়,
অথবা গভীর রাতের নীরবতায়,
হয়তো হঠাৎই ডাক আসবে—
"ফিরে চলো তোমার প্রতিপালকের কাছে।"
তখন?
ব্যাংকের খাতা থাকবে।
বাড়ি থাকবে।
জমি থাকবে।
অলংকার থাকবে।
প্রিয় মানুষগুলোও থাকবে।
শুধু থাকবে না—
তুমি।
তোমার সঙ্গে যাবে
এক টুকরো সাদা কাফন,
কিছু অশ্রু,
আর তোমার আমল।
তাই হে মন!
লম্বা জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করো।
সালাতকে সঙ্গী করো।
কুরআনকে বন্ধু করো।
সত্যকে পথপ্রদর্শক করো।
তাকওয়াকে অলংকার করো।
সবরকে শক্তি করো।
শুকরকে অভ্যাস করো।
তাওবাকে প্রতিদিনের অশ্রু বানাও।
এমন দান করো
যার সওয়াব মৃত্যুর পরও বয়ে চলে।
এমন জ্ঞান রেখে যাও
যা মানুষকে আলোর পথে ডাকে।
এমন সন্তান গড়ে তোলো
যে তোমার জন্য দোয়া করবে।
মনে রেখো—
কবর শেষ নয়,
এটি অনন্ত যাত্রার প্রথম বিশ্রাম।
তারপর আছে পুনরুত্থান,
হাশরের ময়দান,
হিসাবের দিন,
আমলের পাল্লা,
সিরাতের সেতু,
তারপর চিরস্থায়ী ঠিকানা।
তাই আজই বদলে যাও।
অহংকারের পোশাক খুলে ফেলো,
নম্রতার বস্ত্র পরিধান করো।
রাগের আগুন নিভিয়ে
ক্ষমার ফুল ফুটাও।
অন্যের দোষ খুঁজে নয়,
নিজের হৃদয় শুদ্ধ করো।
মানুষের বাহবা নয়,
রবের সন্তুষ্টিই হোক
জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
হে মন!
এই পৃথিবী পথ,
গন্তব্য নয়।
এই জীবন পরীক্ষা,
পুরস্কার নয়।
এই দেহ আমানত,
চিরস্থায়ী ঠিকানা নয়।
আজ যে শ্বাস নিচ্ছ,
তা-ও একদিন থেমে যাবে।
কিন্তু নেক আমল—
সে কখনো মরে না।
হে পরম দয়াময় আল্লাহ!
আমাদের অন্তরকে অহংকার থেকে পবিত্র করুন।
আমাদের সালাতে একাগ্রতা দিন।
আমাদের রিজিক হালাল করুন।
আমাদেরকে মানুষের হক আদায় করার তাওফিক দিন।
আমাদের জবানকে সত্যের অলংকারে সাজিয়ে দিন।
আমাদের চোখকে হারাম থেকে হেফাজত করুন।
আমাদের কবরকে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান বানিয়ে দিন।
হাশরের ভয়াবহ দিনে আপনার আরশের ছায়া দান করুন।
আমাদের হিসাব সহজ করুন।
সিরাতের সেতু নিরাপদে পার করে দিন।
আর আপনার অসীম রহমতে
জান্নাতুল ফিরদাউসকে আমাদের চিরস্থায়ী নিবাস করুন।
আমিন।
***
লম্বা জীবনের পাথেয়
হে মন!
কিসের এত অহংকার?
কিসের এত দম্ভ?
যে দেহ নিয়ে আজ
এত গর্বে বুক ফুলিয়ে চলছ,
একদিন সেই দেহই
নিথর হয়ে পড়ে থাকবে।
তুমি যাবে না—
লোকেরাই তোমাকে নিয়ে যাবে।
প্রিয়জনেরা কাঁধে তুলে
ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে
চিরনীরব এক ঠিকানার দিকে।
যে ঘরে নেই কোনো অলংকার,
নেই কোনো পদ-পদবি,
নেই কোনো রাজসিংহাসন—
আছে শুধু মাটির বিছানা,
আর আমলের পরিচয়।
দুনিয়ার পর কবর—
এ সত্য চিরন্তন।
যে জন্মেছে,
সে মরবেই।
যে মরবে,
সে কবরে প্রবেশ করবেই।
তারপর একদিন
মহান রবের সামনে
হিসাবের জন্য দাঁড়াতেই হবে।
হে মন!
আজ যে বাড়ি বানাও,
কাল তা অন্যের হবে।
আজ যে সম্পদ জমাও,
কাল তা উত্তরাধিকারীর হবে।
আজ যে আসন আঁকড়ে রাখো,
কাল সেখানে বসবে অন্য কেউ।
শুধু তোমার আমলই
তোমার সঙ্গী হবে।
অহংকার নিয়ে
কেউ কখনো কবর আলোকিত করতে পারেনি।
সম্পদের পাহাড়
কোনো মৃতকে
এক মুহূর্তও ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
ক্ষমতার মুকুট
আজও কাউকে
মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
হে মন!
বুদ্ধিমান সে-ই,
যে মৃত্যুকে স্মরণ করে,
যে জীবনের প্রতিটি দিন
শেষ দিনের মতো সাজায়,
যে প্রতিটি সিজদায়
ক্ষমা ভিক্ষা করে,
যে প্রতিটি অন্যায়ের জন্য
তওবার অশ্রু ঝরায়।
নামাজকে আঁকড়ে ধরো,
কারণ সেটিই
মুমিনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কুরআনকে হৃদয়ের আলো বানাও,
কারণ সেটিই
অন্ধকার পথের প্রদীপ।
সত্যকে ভালোবাসো,
ন্যায়ের পাশে দাঁড়াও,
মানুষের হক ফিরিয়ে দাও,
কারণ হকের বিচার
একদিন হবেই।
সদকা দাও,
যেন মৃত্যুর পরও
সওয়াবের নদী বয়ে চলে।
জ্ঞান ছড়িয়ে দাও,
যেন তোমার কবরেও
আলোর ফুল ফুটে।
সন্তানকে ঈমান শেখাও,
যেন সে একদিন
তোমার জন্য অশ্রুসজল দোয়া করে।
হে মন!
লোভের পেছনে ছুটো না।
হিংসার আগুন জ্বালিও না।
মিথ্যার প্রাসাদ গড়ো না।
মানুষকে কষ্ট দিও না।
কারণ একটি দীর্ঘশ্বাসও
রবের দরবারে হারিয়ে যায় না।
যেদিন মৃত্যুর দূত আসবে,
সেদিন আর সময় চাইতে পারবে না।
বলতে পারবে না—
"আর একটি দিন দাও,
আর একটি সিজদা করি,
আর একটি তওবা করি,
আর একটি দান করি।"
সময়ের দরজা
চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
তখন
সাদা কাফনই হবে
তোমার শেষ পোশাক।
চারজন মানুষের কাঁধই হবে
শেষ বাহন।
কবরই হবে
প্রথম নিবাস।
হে মন!
আজই নিজেকে বদলে নাও।
অহংকারকে বিদায় দাও।
বিনয়কে বরণ করো।
ক্ষমাকে আপন করো।
সবরকে হৃদয়ে স্থান দাও।
তাকওয়াকে জীবনের অলংকার বানাও।
মনে রেখো—
দুনিয়া সফর,
আখিরাতই ঘর।
দুনিয়া পরীক্ষা,
আখিরাতই ফলাফল।
দুনিয়া ক্ষণিক,
আখিরাত অনন্ত।
তাই আজই
লম্বা জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করো।
সংগ্রহ করো
বিশুদ্ধ ঈমান,
নিয়মিত সালাত,
খাঁটি তওবা,
নিষ্কলুষ তাকওয়া,
হালাল উপার্জন,
সৎ চরিত্র,
মানুষের প্রতি দয়া,
পিতা-মাতার সন্তুষ্টি,
অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর সাহস,
এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য
নিঃস্বার্থ আমল।
এই পাথেয়ই
কবরের নিঃসঙ্গ রাতে সান্ত্বনা দেবে।
এই পাথেয়ই
হাশরের উত্তপ্ত প্রান্তরে ছায়া হবে।
এই পাথেয়ই
মীযানের পাল্লাকে ভারী করবে।
এই পাথেয়ই
সিরাতের সেতু পার হওয়ার শক্তি দেবে।
এই পাথেয়ই
রহমতের দরজা খুলে দেবে।
হে দয়াময় আল্লাহ!
আমাদের অন্তর থেকে
অহংকার দূর করুন।
আমাদেরকে মৃত্যুর আগে
সত্যিকার তওবার তাওফিক দিন।
আমাদের কবরকে
জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান বানিয়ে দিন।
হাশরের ভয়াবহ দিনে
আপনার রহমতের ছায়া দান করুন।
আমাদের হিসাব সহজ করুন।
আমাদের আমল কবুল করুন।
আমাদেরকে
সিরাতের সেতু নিরাপদে পার করে
জান্নাতুল ফিরদাউসের চিরস্থায়ী বাসিন্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
আমিন।
***
লম্বা জীবনের পাথেয়
হে মন!
অহংকার করে কী হবে?
ক্ষমতার মুকুট, সম্পদের পাহাড়,
খ্যাতির অট্টালিকা—
সবই তো একদিন
সময়ের স্রোতে মিলিয়ে যাবে।
আজ তুমি চলছ
নিজের পায়ে, নিজের ইচ্ছায়;
কাল কিন্তু চলবে না।
চারটি কাঁধ
নিঃশব্দে তোমাকে বহন করবে
শেষ বিদায়ের পথে।
তুমি যাবে না—
লোকেরাই তোমাকে নিয়ে যাবে
কবরের নির্জন দুয়ারে।
সেখানে থাকবে না
রাজা-প্রজার ভেদ,
ধনী-গরিবের গৌরব,
পদ-পদবির অহমিকা।
মাটির বুকে সবাই সমান—
সঙ্গে থাকবে কেবল
ঈমান আর আমলের পরিচয়।
হে মন!
দুনিয়ার জীবন
ভোরের শিশিরবিন্দু,
রৌদ্র উঠলেই মিলিয়ে যায়।
কিন্তু আখিরাতের জীবন—
অন্তহীন,
অবিনশ্বর,
চিরস্থায়ী।
তাই ক্ষণিকের জন্য
চিরন্তনকে বিস্মৃত হয়ো না।
মরীচিকার পেছনে ছুটে
সত্যের সাগর হারিয়ে ফেলো না।
যে হাতে অট্টালিকা গড়ো,
সে হাতই একদিন
বুকের ওপর নিশ্চল হয়ে থাকবে।
যে চোখে অহংকারের আগুন,
সে চোখ
এক মুঠো মাটির নিচে
চিরনিদ্রায় নিমগ্ন হবে।
যে কণ্ঠে উচ্চারিত হয়
ক্ষমতার ভাষণ,
সেই কণ্ঠও একদিন
নীরবতার কাছে আত্মসমর্পণ করবে।
যে হৃদয়
মানুষকে অবহেলা করেছে,
সেই হৃদয়ই
হিসাবের দিনে কাঁপবে।
হে মন!
আজও সময় আছে।
আজও আকাশের দরজা খোলা।
আজও তওবার অশ্রু
রবের কাছে অমূল্য।
আজও একটি সিজদা
জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সংগ্রহ করো
লম্বা জীবনের পাথেয়—
বিশুদ্ধ ঈমান,
খুশুখুজু ভরা সালাত,
আন্তরিক তওবা,
হালাল উপার্জন,
মানুষের হক আদায়,
নিঃস্বার্থ সদকা,
করুণাময় চরিত্র,
আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য
নিবেদিত প্রতিটি নিঃশ্বাস।
মনে রেখো—
দুনিয়ার ধন
কবরে পৌঁছায় না;
পৌঁছায় দান।
দুনিয়ার পরিচয়
কবরে টিকে না;
টিকে থাকে তাকওয়া।
দুনিয়ার প্রশংসা
হাশরে মুক্তি দেয় না;
মুক্তি দেয়
রহমানের সন্তুষ্টি।
যেদিন ডেকে উঠবে
মৃত্যুর অবধারিত আহ্বান,
সেদিন আর বলার সুযোগ থাকবে না—
"আর কিছু সময় চাই।"
তখন
সাদা কাফন হবে শেষ পোশাক,
চারজন মানুষ হবে শেষ বাহন,
কবর হবে প্রথম নিবাস,
আর নেক আমল হবে
একমাত্র সহযাত্রী।
হে দয়াময় প্রতিপালক!
আমাদের অন্তরকে অহংকারমুক্ত করুন।
আমাদের জীবনকে নেক আমলে সমৃদ্ধ করুন।
আমাদের কবরকে শান্তির উদ্যান বানান।
হাশরের কঠিন দিনে
আপনার রহমতের ছায়া দান করুন।
আমাদের হিসাব সহজ করুন,
মীযান ভারী করুন,
সিরাত সহজ করুন,
আর আপনার অনন্ত করুণায়
জান্নাতুল ফিরদাউসকে
আমাদের চিরস্থায়ী আবাস করুন।
আমিন।
৪
৪ মন্তব্য