Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩২ অপরাহ্ণ

নতুন পে স্কেল ২০২৬ ও প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড জটিলতা: বৈষম্য নিরসন ও ন্যায্য অধিকারের দাবি

নতুন পে স্কেল ২০২৬ ও প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড জটিলতা: বৈষম্য নিরসন ও ন্যায্য অধিকারের দাবি

ভূমিকা:
জাতীয় উন্নয়নের কারিগর হলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ। অথচ অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিধির ভুল ব্যাখ্যার কারণে হাজার হাজার শিক্ষক তাদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা ‘উচ্চতর গ্রেড’ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রে যে আইনি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা কেবল অযৌক্তিকই নয় বরং প্রচলিত বেতন কাঠামোর পরিপন্থী। আসন্ন নতুন পে স্কেল ২০২৬-এ এই বৈষম্যের স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি।

উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তিতে বর্তমান বাধা ও ভুল ব্যাখ্যা

বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি তারিখের ‘স্কেল উন্নীতকরণ’-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে:
১. ০৯ মার্চ ২০১৪ তারিখের উন্নীত স্কেল।
২. ০৯ ফেব্রুরায়ি ২০২০ তারিখের উন্নীত স্কেল।

হিসাব রক্ষণ অফিসগুলোর দাবি, যেহেতু শিক্ষকরা এই দুই সময়ে একটি উন্নত স্কেল পেয়েছেন, তাই তারা ১০ বা ১৬ বছর পূর্তিতে আর কোনো ‘উচ্চতর গ্রেড’ পাবেন না। কিন্তু এই ব্যাখ্যার পেছনে আইনি ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল।

কেন ২০১৪ সালের উন্নীত স্কেল কোনো বাধা হতে পারে না?

২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরির পর পদোন্নতি না পেলে একটি উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবেন। এখানে লক্ষ্যণীয় যে:

  • কার্যকারিতার তারিখ: জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ কার্যকর হয়েছে ১৫/১২/২০১৫ তারিখে। আইনি নীতি অনুযায়ী, কোনো নতুন বিধি তার আগের কোনো সুবিধাকে (যা ২০১৫ সালের আগে অর্জিত হয়েছে) কেড়ে নিতে পারে না।

  • পূর্ববর্তী সুবিধা: ০৯/০৩/২০১৪ তারিখে শিক্ষকরা যে উন্নীত স্কেল পেয়েছিলেন, তা ছিল তৎকালীন কাঠামোর একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। ২০১৫ সালের নতুন বেতন স্কেলের বিধি দ্বারা ২০১৪ সালের সুবিধাকে ‘উচ্চতর স্কেল’ হিসেবে গণ্য করে বর্তমান প্রাপ্যতাকে আটকে দেওয়া একটি চরম আইনি অপব্যাখ্যা।

২০০৮-২০১৯ ব্যাচের শিক্ষকদের বঞ্চনা

২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ তাদের চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্ণ করলেও এই ভুল ব্যাখ্যার কারণে উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন না। ২০২১ সালে শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১৩-তে উন্নীত করা হলেও, এটি ছিল একটি সামগ্রিক ‘পদমর্যাদা ও স্কেল পরিবর্তন’, যা কোনো ব্যক্তিগত পদোন্নতি বা টাইম স্কেল নয়। অথচ এই সামগ্রিক পরিবর্তনকে ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে দেখিয়ে শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।

আসন্ন নতুন পে স্কেল ২০২৬-এ আমাদের প্রত্যাশা ও দাবি

আসন্ন নতুন পে স্কেলে আপামর সুবিধা বঞ্চিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকবৃন্দ নিচের দাবিগুলো কার্যকর করার জোর আবেদন জানাচ্ছেন:

১. স্পষ্টীকরণ পরিপত্র: নতুন পে স্কেলে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সামগ্রিক স্কেল উন্নীতকরণ (যেমন ২০১৪ বা ২০২১ সালের ঘটনা) ব্যক্তিগত উচ্চতর গ্রেড বা টাইম স্কেল প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো বাধা হিসেবে গণ্য হবে না।
২. ১০ ও ১৬ বছরের সুবিধা নিশ্চিতকরণ: চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে যে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার কথা, তা যেন কোনো প্রকার প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়।
৩. বকেয়া সুবিধা প্রদান: বিধির ভুল ব্যাখ্যার কারণে এ পর্যন্ত যে সকল শিক্ষক উচ্চতর গ্রেড থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের বকেয়াসহ (Arrear) পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. বেতন বৈষম্য নিরসন: সহকারী শিক্ষকদের সাথে প্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেডের যে ব্যবধান রয়েছে, তা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে এনে শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার:
প্রাথমিক শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। তাদের মনে ক্ষোভ ও বঞ্চনা রেখে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ০৯/০৩/২০১৪ তারিখের সুবিধাকে বর্তমান বেতন স্কেলের শর্তের বাধা হিসেবে গণ্য করা একটি আইনি ভুল। আমরা আশা করি, সরকার আসন্ন নতুন পে স্কেল ২০২৬-এ এই সকল অসংগতি দূর করে প্রাথমিক শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেবেন।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  • জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫।

  • প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেতন উন্নীতকরণ সংক্রান্ত পরিপত্র (২০১৪ ও ২০২১)।

  • অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চতর গ্রেড সংক্রান্ত বিভিন্ন স্পষ্টীকরণ।

মন্তব্য করুন

ব্লগ