সহকারী অধ্যাপক
১৩ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০৪ পূর্বাহ্ণ
বিশ্বস্ততার জয় - মোঃ মুজিবুর রহমান
বিশ্বস্ততার জয়
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বনের পথে শিয়াল চলে বুদ্ধির দীপ্তি নিয়ে,
কৌশলেরই অগণিত রঙ লুকিয়ে থাকে হিয়ে।
ক্ষণে ক্ষণে সে পথ বদলায়, হিসাব কষে চলে,
নিজের স্বার্থ রক্ষার তরে কতই না ছল বলে।
তবু মানুষ ঘরের পাশে রাখে না তাকে স্থান,
ভরসার সেই আসনটি পায় না তার প্রাণ।
কারণ শুধু তীক্ষ্ণ বুদ্ধি জীবন গড়ে না ভাই,
বিশ্বাসহীন চাতুর্যে তো শান্তির আলো নাই।
মানুষ যখন পথের শেষে ক্লান্ত হয়ে ফেরে,
চায় একটি হৃদয় শুধু পাশে এসে ঘিরে।
যে চোখ দুটি বলবে নীরব—"আমি আছি সাথেই",
দুঃখ-বেদনায় ছাড়ব না হাত, থাকব তোমার পাশেই।
কুকুর জানে না জটিল কোনো তর্কের ভাষা কই,
জানে শুধু প্রভুর ডাকে ছুটে যেতে নির্ভয়।
আনন্দ পেলে লেজ নেড়ে সে হাসির গান শোনায়,
বিপদ এলে বুকের শক্তি ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
ক্ষুধার দিনে অল্প খাবার ভাগ করে নেয় হেসে,
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ক্লান্তিহীন প্রভুর ফেরার শেষে।
অভিমান তার ক্ষণিক হলেও ভালোবাসা গভীর,
স্বার্থহীন সে স্নেহের কাছে নত হয় ধরণীর।
চাতুর্য যদি চরিত্রহীন অহংকারে ভরে,
সে বুদ্ধি একদিন মানুষকেই আঘাত করে।
প্রজ্ঞা যখন সততার সাথে মিলেমিশে যায়,
তখন সে আলো সমাজজুড়ে কল্যাণ বয়ে আয়।
বুদ্ধি মহৎ, জ্ঞানও মহৎ, মহৎ বিচক্ষণতা,
কিন্তু সবার শীর্ষে থাকে সত্য আর বিশ্বস্ততা।
যে মানুষটি কথার দামে জীবনভর অটল,
তারই জন্য খুলে যায় সব শ্রদ্ধার সোনার দুয়ার।
সম্পদ থাকে, সম্পদ যায়, যশও ক্ষণিক সাথি,
বিশ্বাস যদি ভেঙে যায় তবে শূন্য হয় গাঁথি।
স্বর্ণের চেয়েও মূল্যবান মানুষের আস্থা,
সেই আস্থাতেই দাঁড়িয়ে থাকে সভ্যতারই রাস্তা।
বন্ধু সে নয়, হাসিমুখে কাছে এসে থাকে,
সুযোগ পেলেই আপনজনের স্বপ্ন ভেঙে ফাঁকে।
বন্ধু সেই, যে অন্ধকারে আলোর প্রদীপ জ্বালে,
নিজের সুখও বিলিয়ে দেয় অন্যের সুখের তালে।
পরিবারের বন্ধন গড়ে বিশ্বাসেরই ডোরে,
মমতা তার সুবাস ছড়ায় হৃদয়েরই ঘোরে।
স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান কিংবা ভাই,
বিশ্বস্ততার ভিত্তি ছাড়া টেকে না সম্পর্ক তাই।
শিক্ষকেরও শ্রেষ্ঠ গুণ যে সত্যনিষ্ঠ প্রাণ,
শিষ্যের মনে জাগিয়ে তোলেন জ্ঞানের সম্মান।
নেতার শক্তি ক্ষমতায় নয়, প্রতিশ্রুতির মানে,
বিশ্বাস রাখে যে জনগণ, সে-ই নেতা প্রাণে।
ব্যবসায়ীর মূলধন শুধু অর্থের অঙ্ক নয়,
সততারই পরিচয়েতে সাফল্যের পরিচয়।
বিচারকের মহিমা থাকে ন্যায়ের দীপ্ত আলোয়,
বিশ্বাসেরই বীজ বপনে সভ্যতা ফল ফলায়।
চিকিৎসকের কোমল হাতে আশার প্রদীপ জ্বলে,
রোগীর প্রাণে সাহস জাগে স্নেহের সুধা ঢলে।
কৃষকের ঘামে শস্য ফলে, শ্রমিক গড়ে দেশ,
বিশ্বস্ত হাতে উন্নয়নের রচিত হয় পরিবেশ।
যে শিশু আজ সত্য শিখে বড় হবে ধীরে ধীরে,
আগামীর সে আলোকধারা মানবতার নীড়ে।
তাকে শেখাও—জয় নয় শুধু, চরিত্র সবার আগে,
বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে শিখলে জীবন সুখে জাগে।
চাতুর্য যদি ন্যায়ের পথে মানবসেবায় মেশে,
সেই বুদ্ধিই আশীর্বাদ হয়ে পৃথিবীজুড়ে হেসে।
কিন্তু যদি স্বার্থলোভে সত্যকে দেয় হার,
সে বুদ্ধি আর আশীর্বাদ নয়—ডেকে আনে অন্ধকার।
জীবনের এই মহাপাঠটি রাখি সবার মনে—
বিশ্বাস গড়ে ধৈর্য দিয়ে, ভালোবাসার ক্ষণে।
সত্যের পথে অটল থাকি, রাখি সবার মান,
বিশ্বস্ততার সৌরভে হোক সুন্দর এই প্রাণ।
চল আমরা আজ শপথ করি অন্তরেরই তলে—
কাউকে নয় প্রতারণাতে ফেলব জীবনের ছলে।
কথা দেব যে, কথা রাখব; করব ন্যায়ের সাধনা,
সততারই দীপ জ্বালিয়ে গড়ব শুভ মানবতা।
শেষে এই আহ্বান রইল সকল মানুষ পানে—
প্রজ্ঞা থাকুক, জ্ঞানও থাকুক কর্মময় জীবনে।
তবু সবার ঊর্ধ্বে থাকুক চরিত্রের দীপ্ততা—
কারণ চতুরতার চেয়ে মহৎ বিশ্বস্ততা।
***
বিশ্বস্ততার জয়গান
বনের বুকে শিয়াল চলে তীক্ষ্ণ প্রখর বুদ্ধি নিয়ে,
চলার পথে কৌশল বোনে নিভৃত বনের হাওয়া পিয়ে।
পরিস্থিতির রঙ বুঝে সে বদলে ফেলে পথের ঢঙ,
বাঁচার তাগিদে শেখে কত বিচিত্র রীতি, বিচিত্র সঙ্গ।
প্রকৃতি তাকে দিয়েছে প্রখর বিচার, ক্ষিপ্র গতি,
অরণ্যেরই আপন নিয়ম—সেই তো তার জীবনস্মৃতি।
তবু মানুষ ঘরের মাঝে ডাকে না তাকে আপন করে,
কারণ তার জীবন গড়া মুক্ত বনানীরই অন্তরে।
অন্যদিকে কুকুরটি বহু যুগের আপন সাথি,
মানুষের সুখ-দুঃখ জুড়ে লিখেছে নীরব ভালোবাসার গাথা।
হাজার বছরের সহযাত্রায় গড়েছে বিশ্বাসের সেতু,
অটল থেকে শিখিয়েছে সে বন্ধুত্বের সত্য ঋতু।
সে বলে না—"আমায় দেখো", চায় না কোনো সম্মান,
নীরব স্নেহে আগলে রাখে প্রিয় মানুষের প্রাণ।
প্রভুর পায়ের শব্দ শুনে ছুটে আসে আনন্দভরে,
স্নেহের ভাষা ফুটে ওঠে নিষ্পাপ দুটি চোখের নীড়ে।
ঝড়ের রাতে, দুঃসময়ে, নির্জন পথের বাঁকে,
অটল থাকে প্রহরী হয়ে বিপদ যতই ডাকে।
ক্ষুধার কষ্ট, দীর্ঘ প্রতীক্ষা—সবই যেন তুচ্ছ তার,
বিশ্বস্ততার দীপ জ্বালিয়ে রাখে ভালোবাসার দ্বার।
মানুষ খোঁজে এমন হৃদয়, ভাঙবে না যে কোনোদিন,
স্বার্থের টানে বদলাবে না প্রতিশ্রুতির পবিত্র ঋণ।
সম্পদের চেয়ে দামী যার সত্যনিষ্ঠ পরিচয়,
তারই কাছে নিরাপদ হয় জীবনপথের আশ্রয়।
চাতুর্য যদি সত্যহারা, স্বার্থলোভে হয় অন্ধ,
সে বুদ্ধি একদিন ডেকে আনে বিভেদ, ভয় ও দ্বন্দ্ব।
আর প্রজ্ঞা যদি ন্যায়ের সাথে মানবতার হাত ধরে,
সে-ই আলো ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে।
বুদ্ধি মানুষকে দেয় উন্নতির বিস্ময়কর সম্ভাবনা,
জ্ঞান খুলে দেয় অজানাকে জানার অনন্ত জানালা।
কিন্তু চরিত্রহীন প্রজ্ঞা মরুভূমির মরীচিকা,
দেখতে উজ্জ্বল—স্পর্শ করলে মেলে শুধু শূন্য দিশা।
বিশ্বাস এমন এক সম্পদ, চুরি যায় না শক্তি দিয়ে,
কেনা যায় না অর্থের দম্ভ, ক্ষমতারও গর্ব নিয়ে।
ধৈর্য, সততা, ত্যাগ আর প্রেম—এই চারটি তার মূল,
এদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে মানবতার মহাফুল।
বন্ধু সে নয়, হাসি মুখে পাশে থাকে ক্ষণিককাল,
সুযোগ বুঝে আঘাত হানে, ভেঙে দেয় সব স্বপ্নজাল।
বন্ধু সেই, যে দুঃখ এলে কাঁধ বাড়িয়ে দেয় নীরবে,
নিজের সুখও বিলিয়ে দেয় অন্যের সুখের তরে।
পরিবারের শান্তি গড়ে বিশ্বাসেরই ভিত্তিপ্রস্তর,
ভালোবাসা তার অলংকার, মমতা তার অন্তরাত্মার ঘর।
পিতা-মাতা, সন্তান, স্বামী, স্ত্রী কিংবা সহোদর—
বিশ্বস্ততার বন্ধন ছাড়া সম্পর্ক হয় না অমর।
শিক্ষকের মহত্ত্ব থাকে সত্যের পথে চলায়,
শিক্ষার্থীর হৃদয়জুড়ে আদর্শের প্রদীপ জ্বালায়।
চিকিৎসকের কোমল সেবায়, বিচারকের ন্যায়বোধে,
বিশ্বস্ততার আলো জ্বলে মানবকল্যাণের রথে।
কৃষকের ঘামে ধান পাকে, শ্রমিক গড়ে সেতু,
সৈনিক রাখে সীমান্ত জেগে অটুট শপথ বুকে।
যে যার কাজে নিষ্ঠাবান, সত্যে থাকে অটল,
সেই মানুষই সমাজজুড়ে শ্রদ্ধার আসন পায় অবিচল।
শিশুকে শেখাও—বুদ্ধিমান হও, জ্ঞান অর্জন করো,
কিন্তু সত্য, দয়া, বিশ্বস্ততা কখনো যেন না হারাও।
চালাক হও, তবে নয় ছলনায়; প্রাজ্ঞ হও, তবে ন্যায়ে;
মানুষ হও এমনভাবে, মানুষ তোমায় চায়।
শিয়াল তার আপন বনে প্রকৃতিরই এক বিস্ময়,
কুকুর ঘরের আপন সাথি—বিশ্বাস যার পরিচয়।
প্রাণী দুটি আপন গুণে আপন জগতে সম্মানিত,
মানুষ শেখে তাদের দেখে জীবনের সত্য অমলিন।
অতএব মনে রেখো সদা—
চাতুর্য পথ দেখাতে পারে,
প্রজ্ঞা খুলতে পারে জ্ঞানের দ্বার,
কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে
সততা, বিশ্বস্ততা ও নির্মল চরিত্র।
এসো আমরা প্রতিজ্ঞা করি—
কথায় ও কাজে সত্য থাকব,
বিশ্বাস রাখব, বিশ্বাস রাখবই;
প্রতারণা নয়, সহযোগিতা;
অহংকার নয়, বিনয়;
স্বার্থ নয়, মানবকল্যাণ—
এই হোক আমাদের জীবনের পথচলা।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী—
বুদ্ধিমানের প্রশংসা হয়,
কিন্তু বিশ্বস্ত মানুষের ওপরই
গড়ে ওঠে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র
এবং সমগ্র মানবসভ্যতার স্থায়ী ভিত্তি।
***
চাতুর্যের চেয়ে বিশ্বস্ততা
অরণ্যের পথে শিয়াল চলে প্রখর প্রজ্ঞার দীপ জ্বেলে,
বিপদ এলে বুদ্ধির ডানায় পথ খুঁজে নেয় অবহেলে।
প্রকৃতি তাকে দিয়েছে কৌশল, ক্ষিপ্রতা আর বিচক্ষণতা,
বনের নিয়মে বাঁচার জন্য এ-ই তার সহজ সক্ষমতা।
তবু মানুষ আপন ঘরে ডাকে না তাকে সঙ্গী করে,
নয় অবজ্ঞা—প্রকৃতিরই ভিন্ন বিধান এ সংসারে।
কারণ শিয়াল স্বাধীন প্রাণ, বনই তার চির আবাস,
মানুষের সংসার গড়ে অন্যরকম বিশ্বাস।
অন্য প্রান্তে কুকুর আসে মানুষেরই আপন হয়ে,
সহস্র বছরের সহযাত্রায় হৃদয় মিলেছে হৃদয় লয়ে।
কৃষিক্ষেতে, জনপদে, নির্জন পথে, যুদ্ধভূমি জুড়ে,
বিশ্বস্ততার ইতিহাস সে লিখেছে যুগে যুগে।
সে জানে না কূটকৌশল, জানে না ছলনার ভাষা,
জানে শুধু ডাকে সাড়া দিতে, জানে ভালোবাসা।
প্রভুর মুখের হাসি দেখেই তার সকল সুখের শুরু,
প্রভুর দুঃখ দেখলে নীরব চোখে নামে অশ্রুধারা গুরু।
রাত্রি যখন অন্ধকারে ঢেকে ফেলে চারিধার,
সে-ই থাকে প্রহরী হয়ে জাগিয়ে ভালোবাসার দ্বার।
ক্ষুধা, কষ্ট, দীর্ঘ প্রতীক্ষা—কোনোটাই তার বাধা নয়,
ভরসার ডোর অটুট রেখে বলে—"আমি আছি, ভয় কিসের হয়?"
মানুষ খোঁজে এমন সাথি, স্বার্থ যার নয় পরিচয়,
বিপদে যে পিছু হটে না, দুঃসময়েও থাকে অটলময়।
যে সম্পর্ক লাভের নয়, কেবল হৃদয়ের অঙ্গীকার,
সেই সম্পর্কই যুগে যুগে সভ্যতার ভিত্তিপ্রাচীর।
বুদ্ধি মহান—সন্দেহ নেই; জ্ঞান মানুষের দীপ্ত আলো,
তবু যদি না থাকে সততা, সে আলোও হয় কালো।
চাতুর্য যদি বিবেকহীন স্বার্থের রথে চড়ে,
মানুষ তখন মানুষকেই কষ্ট দিয়ে পথ গড়ে।
বিশ্বাস এমন এক বৃক্ষ, ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে,
স্নেহের জলে, সত্যের আলোয়, ত্যাগের মাটিতে শিকড় গাঁথে।
একদিন যদি ভেঙে যায় তার কোমল সবুজ ডাল,
সহসা তাকে ফিরিয়ে আনা হয় না কোনো কাল।
বন্ধু সেই নয়, হাসিমুখে কাছে এসে সুখের গান গায়,
সুযোগ বুঝে আঘাত হেনে আপনজনকে ভুলে যায়।
বন্ধু সেই, যে ঝড়ের দিনে ছাতা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,
নিজের কাঁধে অন্যের দুঃখ নীরবে তুলে নেয়।
পরিবারের সুখের ভিত্তি অর্থ কিংবা ঐশ্বর্য নয়,
পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা আর দায়িত্ববোধের পরিচয়।
স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান কিংবা সহোদর—
বিশ্বস্ততার বাঁধন ছাড়া সম্পর্ক হয় না অমর।
বিদ্যালয়ে শিক্ষক যদি আদর্শের প্রদীপ জ্বালান,
শিক্ষার্থীর মনে জেগে ওঠে সত্যের নির্মল গান।
চিকিৎসকের সেবায় যেমন রোগীর ভরসা বাঁচে,
বিচারকের ন্যায়পরায়ণতায় সমাজ নতুন আলো পায়।
কৃষকের ঘামে শস্য ফলে, শ্রমিক গড়ে সেতু,
সৈনিক জাগে সীমান্তজুড়ে দেশরক্ষার শপথ বুকে।
সবার কাজে একটিই শক্তি—অটল নিষ্ঠা, সত্যের পথ,
বিশ্বস্ততার এই ভিত্তিতেই রচিত হয় মানবমত।
শিশুকে শেখাও—জ্ঞান অর্জন করো, হও প্রখর মেধাবী,
কিন্তু কখনো হারিয়ো না সততার নির্মল ছবি।
চালাক হও, তবে নয় প্রতারণায়; প্রাজ্ঞ হও ন্যায়ের তরে,
মানুষ হও এমনভাবে, মানুষ তোমায় মনে ধরে।
শিয়াল তার বনের গৌরব, কুকুর মানুষের সাথি,
দুজনেই প্রকৃতির আপন সৃষ্টি, দুজনেরই আছে গাথা।
কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রায় যে শিক্ষা অম্লান থাকে—
বিশ্বস্ত হৃদয়ই শেষ পর্যন্ত সকল ভালোবাসা ডাকে।
তাই এসো আজ প্রতিজ্ঞা করি—
জ্ঞান অর্জন করব, কিন্তু অহংকার নয়;
চতুর হব, কিন্তু প্রতারণা নয়;
শক্তিমান হব, কিন্তু অন্যায় নয়;
সফল হব, কিন্তু বিশ্বাস ভেঙে নয়।
কারণ পৃথিবী মনে রাখে না কেবল চতুর মানুষের নাম;
পৃথিবী যুগে যুগে শ্রদ্ধা করে
সেই মানুষকে,
যার চরিত্র অটল,
যার বাক্য সত্য,
যার হৃদয় নির্মল,
আর যার বিশ্বস্ততা
সময়ের পরীক্ষায়ও অক্ষয় থাকে।
***
বিশ্বাসের বিজয়
প্রখর বুদ্ধি দীপের মতো আলোক ছড়ায় প্রাণে,
তবু সে আলো পূর্ণ হয় না চরিত্রের সম্মানে।
চাতুর্য পারে জটিল পথে পথের দুয়ার খুলতে,
বিশ্বস্ততা পারে হৃদয়জয়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
অরণ্যের গভীর পথে শিয়াল চলে ধীর,
প্রকৃতি-দেওয়া বুদ্ধিবলে করে জীবন স্থির।
বিপদ এলে কৌশল বোনে মুহূর্তেরই মাঝে,
বনের নিয়ম মেনে সে চলে আপন কর্মসাজে।
সে তো বনের স্বাধীন প্রাণ, অরণ্যেরই সন্তান,
বনভূমিই তার আপন ঘর, সেখানেই তার প্রাণ।
তাই তো মানুষ ঘরের কোণে ডাকে না তাকে এনে,
প্রকৃতিরই স্বাভাবিক সেই ভিন্ন জীবনের বেণে।
অন্যদিকে কুকুর যেন মানুষেরই আপনজন,
সহস্র বছরের সখ্য গড়ে হয়েছে অনুক্ষণ।
ঘরের দ্বারে, মাঠের পথে, প্রহর গোনে নীরব,
ভালোবাসার বিনিময়ে সে হয়েছে অপরূপ।
সে জানে না বড়ো বড়ো কথা, জানে না কূটবুদ্ধি,
জানে শুধু প্রভুর ডাকে ছুটে যাওয়ার সিদ্ধি।
স্নেহের ছোঁয়ায় চোখ দুটিতে ফুটে ওঠে হাসি,
প্রভুর সুখেই তার যে সুখ, এ-ই তার ভালোবাসি।
রাত্রি যখন ঘন অন্ধকার ঢেকে দেয় চারিধার,
সে-ই তখন প্রহরী হয়ে রাখে নিরাপদ দ্বার।
বিপদ এলে বুক বাড়িয়ে দাঁড়ায় নির্ভীক প্রাণ,
বিশ্বস্ততার মুকুট পরে জয় করে সম্মান।
মানুষ খোঁজে এমন সাথি, যে দুঃখে ছেড়ে যায় না,
স্বার্থের মোহে আপনজনের বিশ্বাস ভেঙে দেয় না।
যে হাত ধরে ঝড়ের দিনে, রৌদ্র-ছায়ার পথে,
সেই হাতই অমূল্য হয়ে থাকে জীবনের সাথে।
চালাক হও—এ শিক্ষা ভালো; জ্ঞান অর্জন করো,
কিন্তু সত্য, ন্যায় আর দয়া হৃদয়ভরে ধরো।
চাতুর্য যদি বিবেকহীন স্বার্থলোভে মাতে,
নিজের জয়ও একদিন হারায় লজ্জার প্রভাতে।
বিশ্বাস একটি অমূল্য রত্ন, কেনা যায় না দামে,
সততা তার দীপ্ত অলংকার, ভালোবাসা নামে।
ধৈর্যের জলে বেড়ে ওঠে আস্থার সবুজ বৃক্ষ,
একটি মিথ্যা মুহূর্তেই করে তাকে নিঃশেষ।
বন্ধু সে নয়, হাসি দিয়ে কাছে এসে রয়,
সুযোগ পেলে আঘাত হেনে আপনজনকেই ক্ষয়।
বন্ধু সেই, যে নীরবে কাঁধ বাড়িয়ে দেয়,
অন্যের চোখের অশ্রুবিন্দু নিজের বুকে নেয়।
পরিবারের সুখের ভিত বিশ্বাসেরই পাথর,
শ্রদ্ধা, মমতা, দায়িত্ব মিলে গড়ে ভালোবাসার ঘর।
স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান কিংবা ভাই,
বিশ্বস্ততার বাঁধন ছাড়া স্থায়ী সুখ আর নাই।
বিদ্যালয়ে শিক্ষক যদি সত্যের বীজ বোনেন,
শিক্ষার্থীরা আদর্শ হয়ে আলোকমালা গড়েন।
চিকিৎসকের সেবায় যেমন জাগে নতুন আশা,
ন্যায়বান বিচারকের হাতে বাঁচে সমাজভাষা।
কৃষকের ঘামে ফসল ফলে, শ্রমিক গড়ে দেশ,
সৈনিক রাখে সীমান্ত জেগে অটল দৃঢ় বেশ।
প্রত্যেক কাজে একটিই শক্তি—নিষ্ঠা আর আস্থা,
এদের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে সভ্যতার ব্যস্ততা।
শিশুকে শেখাও—মেধাবী হও, জ্ঞান করো আহরণ,
তবু যেন না হারায় হৃদয় সত্যের অনুরণন।
বুদ্ধি হবে কল্যাণময়, যদি থাকে নীতি,
বিশ্বস্ততার সুরে বাঁধা মানবতার গীতি।
শিয়াল তার বনরাজ্যে প্রজ্ঞার এক নিদর্শন,
কুকুর ঘরে বিশ্বস্ততার জীবন্ত অনুপ্রেরণ।
উভয়েই প্রকৃতির দান, উভয়েরই আছে মান,
তবু মানুষের জীবনপথে আস্থা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান।
এসো তবে আজ প্রতিজ্ঞা করি অন্তরেরই তলে—
চাতুর্য নয় প্রতারণায়, জ্ঞান নয় অহংকারে।
সত্যকে রাখব জীবনের দীপ,
ন্যায়কে রাখব পথের সাথি,
বিশ্বাসকে রাখব হৃদয়ের শপথ,
ভালোবাসাকে রাখব মানবতার ভাষা।
কারণ ইতিহাসে অমর হয় না কেবল তীক্ষ্ণ বুদ্ধির জয়,
অমর হয় সেই মহামানব,
যার চরিত্র নির্মল,
যার বাক্য সত্য,
যার প্রতিশ্রুতি অটল,
যার হৃদয় করুণাময়,
আর যার বিশ্বস্ততা
সময়ের প্রতিটি পরীক্ষায়
স্বর্ণের মতোই দীপ্তিমান হয়ে ওঠে।
৬
৬ মন্তব্য