Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ জুলাই, ২০২৬ ০২:৫৭ অপরাহ্ণ

নগর ও নাগরিকের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক: চট্টগ্রাম ও আমাদের দায়বদ্ধতার ব্যবচ্ছেদ

নগর ও নাগরিকের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক: চট্টগ্রাম ও আমাদের দায়বদ্ধতার ব্যবচ্ছেদ
মানুষের আদি বসতি গড়ে উঠেছিল নদীর কূলে, পাহাড়ের কোলে—যেখানে প্রকৃতি অকাতরে বিলিয়েছে তার অমৃতের পাত্র। সেই প্রাচীন মিতালি ছিল শিকড়ের মতো গভীর। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য যখন প্রকৃতির সেই স্বাভাবিক ছন্দকে পদদলিত করে অগ্রসর হলো, তখন নগর হয়ে উঠল এক শ্বাসরুদ্ধকর পিঞ্জর। শাহাদত তাহের চৌধুরীর বেদনার্ত উচ্চারণ—‘আমার চট্টগ্রাম ভালো নেই’—কেবল একটি আবেগী অনুভূতি নয়; এটি একটি বিপন্ন জনপদের দীর্ঘশ্বাস, যার প্রতিধ্বনি আমাদের প্রতিটি অলিগলিতে বিদ্যমান। কিন্তু এই দীর্ঘশ্বাসের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা শ্লেষ হলো—আমরা, যারা এই নগরের বাসিন্দা, আমরা কি আদৌ চট্টগ্রামকে ভালো রাখতে পেরেছি? নাকি আমাদের নির্বিকার বিলাসিতা, অপরিকল্পিত উন্নয়নের নেশা এবং প্রকৃতিকে জয় করার মোহ এই শহরকে জলাবদ্ধতার আবর্তে ঠেলে দিয়েছে? সময় এসেছে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর; এখন প্রশ্নটি ‘চট্টগ্রাম কেন ভালো নেই’ নয়, বরং ‘আমরা কেন চট্টগ্রামকে ভালো রাখতে পারিনি’—এই অমোঘ সত্যটি আমাদের স্বীকার করতেই হবে।
প্রাকৃতিক নিষ্কাশনের নকশা ও আমাদের অন্ধকার হস্তক্ষেপ
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বিন্যাস যেন প্রকৃতির এক নিখুঁত শিল্পকলা—পূর্বে পাহাড়ের সারি, পশ্চিমে সমুদ্রের বেলাভূমি, মাঝে বয়ে চলা খাল-নালা ও নদী। জন্মগতভাবেই এই শহর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের এক অনন্য ব্যবস্থা ধারণ করত। পাহাড়ি ঢল থেকে সমভূমির জলধারা—সবই নির্দিষ্ট ঢাল মেনে অগ্রসর হতো। অথচ গত কয়েক দশকে আমরা সেই প্রাকৃতিক নকশাকে পদদলিত করেছি। উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, খাল দখল এবং জলাভূমি ভরাট করে বাণিজ্যিক আবাসন গড়ে তোলার যে উন্মাদনা চলছে, তা প্রকৃতিকে এক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
চট্টগ্রামের জলপ্রবাহের ঐতিহাসিক প্রাণরেখা ছিল চাক্তাই খাল, মহেশখাল, রাজাখালী খালসহ অসংখ্য প্রাকৃতিক খাল, যেগুলো শেষ পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিলিত হতো। দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত জলপ্রবাহ আবার সাঙ্গু (শঙ্খ) নদীর অববাহিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করত। কিন্তু দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং সংকীর্ণ সেতু-কালভার্টের কারণে এই প্রাকৃতিক ধমনিগুলো আজ কার্যত রুদ্ধ। কোথাও খালের বুক দখল হয়েছে, কোথাও নদীতীর বাণিজ্যিক স্থাপনায় গ্রাস হয়েছে। ফলে বর্ষার পানি তার স্বাভাবিক পথ হারিয়ে নগরের রাজপথ, আবাসিক এলাকা ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করছে। প্রকৃতির পথ রুদ্ধ করে মানুষ কখনো স্থায়ী উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না; প্রকৃতি একসময় নিজের পথ নিজেই ফিরিয়ে নেয়—আর সেই প্রত্যাবর্তনের মূল্য দিতে হয় মানুষকেই।
বর্জ্য ও অভ্যাস: নীরব ঘাতকের জোয়ার
জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারিগর আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে আমরা যেন এক অবৈধ ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহারের অলিখিত লাইসেন্স পেয়েছি। গৃহস্থালির পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল, নির্মাণবর্জ্য—সবকিছুর চূড়ান্ত গন্তব্য এখন শহরের খাল ও নালা। যান্ত্রিক শহরের নাগরিক হয়েও আমাদের মানসিকতা এখনো আদিম বর্জ্য অপসারণের স্তরেই রয়ে গেছে। একটি শহরের স্বাস্থ্য নির্ভর করে তার নাগরিকদের রুচি ও পরিবেশবোধের ওপর। আমরা যখন যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে নালার গতিপথ রুদ্ধ করি, তখন বর্ষাকালে প্লাবিত হওয়ার দায়ভার প্রকৃতির ওপর চাপানো সমীচীন নয়। এটি এক ধরনের আত্মবিনাশী আচরণ—আমরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতির বীজ বপন করি, অথচ দায় চাপাই প্রশাসন বা প্রকৃতির ওপর।
অবকাঠামোগত আত্মঘাতী পরিকল্পনা: খুঁটি, কালভার্ট ও কৃত্রিম বাঁধ
আমরা যখন সড়ক বা সেতু নির্মাণ করি, তখন আমাদের দৃষ্টি থাকে কেবল যানবাহনের গতির দিকে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহের দিকে নয়। নদী বা খালের প্রস্থ না বাড়িয়ে তার মাঝে সারি সারি খুঁটি বসিয়ে যে সেতু তৈরি করা হয়, তা পানির জন্য এক কৃত্রিম বাধা হিসেবে কাজ করে। এই খুঁটিগুলোতে ভাসমান বর্জ্য আটকে গিয়ে যে জাল তৈরি হয়, তা জলপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। অন্যদিকে, কালভার্টের পানির ধারণক্ষমতা সঠিকভাবে হিসাব না করায় সেগুলো পরিণত হয় ছোট ছোট ড্যামে। প্রকৌশল বিদ্যার যে নিখুঁত হিসাব থাকা জরুরি ছিল, সেখানে প্রায়ই রাজত্ব করে অদূরদর্শিতা। পার্বত্য অঞ্চল থেকে নেমে আসা তীব্র জলস্রোত যখন এই সংকীর্ণ ও বাধাপ্রাপ্ত পথে আছড়ে পড়ে, তখন তা উপচে পড়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় পায় না।
পাহাড় ও মানুষের দ্বন্দ্ব: রক্ষাকবচ বনাম শিকার
পাহাড় শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি চট্টগ্রামের বাস্তুসংস্থানিক রক্ষাকবচ। পাহাড়ের গাছপালা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করে এবং ভূমিধস প্রতিরোধ করে। অথচ পাহাড়ের বুক চিরে কংক্রিটের দালান তোলার প্রতিযোগিতা আমাদের এই সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। যখন পাহাড় ন্যাড়া হয়ে যায়, যখন গাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে রাখার ক্ষমতা হারায়, তখন সামান্য বৃষ্টিও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিক হিসেবে আমরা কি এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদ করেছি? নাকি সস্তায় জমির লোভে বা উন্নয়নের নামে নগরের ফুসফুস কেটে ফেলার দৃশ্যকে নীরব সমর্থন দিয়েছি? আমরা ভুলে গেছি, পাহাড়-বন আমাদের সহযাত্রী, প্রতিপক্ষ নয়।
গ্রাম থেকে শহর: বিস্তীর্ণ জনপদের অভিন্ন যন্ত্রণা
এই সংকট কেবল চট্টগ্রাম শহরের নয়, এর ছোবল পৌঁছেছে উপকণ্ঠের গ্রামগুলোতেও। গ্রামীণ জনপদের জলাধারগুলো ভরাট করে আবাসন তৈরির ফলে পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি ফসলি জমি ধ্বংস করছে এবং জনবসতি ভাসিয়ে দিচ্ছে। পুরো অঞ্চল—পাহাড় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত—যেন একই সুতোয় বাঁধা; এক প্রান্তে আমরা যতই সংকট ঘনীভূত করি, অন্য প্রান্তে তার প্রভাব বিস্তৃত হয়। প্রকৃতির কোনো অংশই বিচ্ছিন্ন নয়; আমরা যেখানে অপরিকল্পিত উন্নয়নের হাত বাড়াই, সেখানেই বিপর্যয়ের শিকড় বিস্তার লাভ করে।
আইনের ধারার অভাব নেই: তবে কে মানে কার আইন?
আমাদের দেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জলাধার রক্ষা বিধিমালা ও বিল্ডিং কোড—অক্ষরে অক্ষরে সবিস্তারে লেখা আছে। তবুও বর্ষায় চট্টগ্রাম ডুবে যায়, পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঘটে।
১. শক্তির প্রতি বশ্যতা: প্রভাবশালীদের খাল ভরাট বা পাহাড় কাটার অপরাধে আইন যেন অনেক সময় চোখ বন্ধ রাখে। অথচ দুর্বল মানুষের ওপর আইনের কঠোর প্রয়োগ দেখা যায়।
২. উন্নয়নের বলি: উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায়শই পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (EIA) প্রতিবেদনের সুপারিশ উপেক্ষিত হয়। রাষ্ট্র যখন নিজেই আইনকে উন্নয়নের কাছে বলি দেয়, তখন নাগরিকের কাছে আইনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩. নাগরিকের সম্মিলিত উদাসীনতা: ড্রেনে বর্জ্য ফেলার মতো ক্ষুদ্র আইন অমান্য করার সংস্কৃতি আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লাখো মানুষের এই সম্মিলিত উদাসীনতাই নগরকে বিপদের প্রান্তে ঠেলে দেয়।
৪. প্রকৃতির অমোঘ আইন: মানুষের তৈরি আইন ফাঁকি দেওয়া গেলেও প্রকৃতির আইন ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। পাহাড় কাটলে ধস নামবে, খাল ভরাট করলে জলাবদ্ধতা হবেই। এটি প্রকৃতির অনিবার্য প্রতিক্রিয়া।
দায়িত্ব ও স্বীকারোক্তির অভাব
আমরা প্রায়ই প্রশাসনিক অবহেলা ও রাজনৈতিক স্বার্থের দোহাই দিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত দায় এড়াই। কিন্তু একটি শহর কেবল সরকারি দপ্তরের নির্দেশে চলে না; এটি পরিচালিত হয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ ও সচেতনতায়। যখন আমরা অনিয়ম দেখে নীরব থাকি, যখন আমরা নিজেরা নিয়ম ভাঙি, তখন আমরা নগরের অবক্ষয়ের সহযোগী হয়ে উঠি। ‘আমরা চট্টগ্রামকে ভালো রাখতে পারিনি’—এই দায় স্বীকারোক্তিই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
উপসংহার: আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময়
চট্টগ্রাম কেবল ইট-পাথর, বন্দর বা বাণিজ্যের শহর নয়; এটি পাহাড়, নদী, খাল, সমুদ্র ও মানুষের সহাবস্থানের এক জীবন্ত ভূগোল। এই শহরকে রক্ষা করতে হলে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত পরিবেশদর্শন।
প্রথমত, চাক্তাই খালসহ দখলকৃত সব খাল পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করে পাহাড় ও বন সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যালয় থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরে নাগরিক পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করতে হবে, যাতে মানুষ তার প্রতিদিনের আচরণের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হয়। চতুর্থত, আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; প্রভাবশালী কিংবা সাধারণ নাগরিক—পরিবেশবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বোপরি, পাহাড়, খাল, নদী, জলাধার, নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় রেখে একটি সমন্বিত নগর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
চট্টগ্রামকে ভালোবাসার অর্থ কেবল সামাজিক মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ নয়; বরং প্রতিদিনের আচরণে এই নগরের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। আমরা যদি প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ নয়, সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করি, তবে চট্টগ্রাম আবারও তার স্বাভাবিক প্রাণ ফিরে পেতে পারে। কিন্তু যদি আজও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের দায় স্বীকার না করি, তবে আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা রেখে যাব এক ক্ষতবিক্ষত নগরের ইতিহাস। নদী যেমন শেষ পর্যন্ত নিজের পথ খুঁজে নেয়, তেমনি মানুষেরও এখনই খুঁজে নিতে হবে সহাবস্থানের সেই পথ—যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। তখনই চট্টগ্রামের দীর্ঘশ্বাস একদিন আশার নিঃশ্বাসে রূপ নেবে।
মুফিদুল আলম
১৩ জুলাই ২০২৬

মন্তব্য করুন

ব্লগ