Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ জুলাই, ২০২৬ ০৬:২৪ অপরাহ্ণ

বিদ্যালয়ে উপস্থিতির পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রাপ্তি নিশ্চিত হোক

শিক্ষকদের সময়মতো উপস্থিতি, কর্তব্যনিষ্ঠ করার যে কোনো ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। দেশ তথা জাতির উন্নয়ন সুদৃঢ় করার প্রয়াসে শিক্ষার গুরুত্ব সর্বাধিক। আমাদের শিক্ষায় ব্যাপক ঘাটতি। এ ঘাটতি নিরসনে সকল স্তরের শিক্ষক, কর্মচারীসহ উচ্চপর্যায়ের সকলের কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রজন্ম সময়নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা শিক্ষা নিয়ে থাকে। সে শিক্ষায় যদি এর ঘাটতি থাকে, তবে প্রজন্মের নাগরিক সময়নিষ্ঠ ও কর্তব্যনিষ্ঠ হয়ে গড়ে উঠবে না। শৃঙ্খলাহীন জাতি হিসেবে আমাদের সমাজ এগোতে থাকবে।

সময়নিষ্ঠ ও কর্তব্যপরায়ণ করার পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিখন ঘাটতি নিরসনে ব্যাপক উদ্যোগ প্রায় সব সরকারই গ্রহণ করে আসছেন। বেশিরভাগ উদ্যোগ শিক্ষককেন্দ্রিক। প্রাথমিক শিক্ষার শিখন ঘাটতি দূর করার প্রয়াসে স্কুল পর্যায়ে জনগণকে এর সঙ্গে জড়িত করার জন্য হরেক রকমের কমিটি আছে। উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সব কর্মকর্তাকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া জনপ্রতিনিধিসহ প্রাথমিক শিক্ষা দেখভাল করার জন্য রয়েছে অসংখ্য কর্মকর্তা। অতীতে শিখন ঘাটতি দূর করার প্রয়াসে রমজানের বন্ধ ও বর্তমানে ১০টি শনিবারকে কর্মদিবস হিসেবে দেখানো হয়েছে। অতীত থেকে শিক্ষা উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই, অনেক সহায়তা রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। অন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাথমিক শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষিত ও শিশু শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

বর্তমান সরকার শিক্ষার্থীদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, ড্রেস, জুতা প্রদানের প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। 

এত উদ্যোগের পরও প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়। তবে যেসব বিদ্যালয় সমস্যাবিহীনভাবে চলে আসছে, সেগুলোর শিখন কার্যক্রম, সময়নিষ্ঠা, উন্নত পাঠদান আকর্ষণীয়।

সরকারের পুরো প্রশাসনের তদারকি, শিখন ঘাটতি রোধে বার্ষিক ছুটি কমানো, রমজানে ও ১০টি শনিবারের ক্লাস, শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা আগেও ছিল, বর্তমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক, তদুপরি রাস্তাঘাটে সরকারের উচ্চ থেকে নিম্ন পর্যায়সহ সর্বত্র শুধু একই বুলি—সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ, শিক্ষকেরা ঠিকমতো পড়ায় না, রিডিং স্কিল অতি দুর্বল। সব কিছুর জন্য দায়ী শিক্ষক। বাকি ডিপার্টমেন্ট, সরকার শুধু বসে বসে দেখে, আর বদনাম করে শিক্ষকদের। এ বদনামের দায় কী তাদের বেশি নয়?

যেসব চ্যালেঞ্জের কারণে প্রাথমিক শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে না, সেগুলো উপস্থাপন করছি।

শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা: শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তার অন্যতম কারণ অধিকাংশ দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাদের পারিবারিক কাজে সহযোগিতা করতে হয়ে থাকে। প্রাথমিকে দীর্ঘ সময়সূচির ফলে বিশেষ করে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পরিবারকে সহযোগিতা করার কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারছে না। পরিবারকে খানিকটা সহযোগিতায় তাদের পরিবার অনেকটা উপকৃত হয়ে থাকে, যা মাসিক ২০০/১০০ টাকা শিক্ষা উপবৃত্তি, বিদ্যালয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, স্কুল ড্রেস থেকে পাওয়ার চেয়েও পরিবারকে সহযোগিতায় বেশি উপকৃত হয়ে থাকে। শিক্ষা উপবৃত্তি, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, স্কুল ড্রেসের পাশাপাশি তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করার জন্য দুপুর ২টার মধ্যে পাঠদান কার্যক্রম শেষ করা উচিত। অনেক অভিভাবক দরিদ্র হও...

শিক্ষক সংকট: এ সংকট স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসছে। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য পিটিআই ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিক্ষিত জনবলের প্যানেল ছিল। শিক্ষক পদ শূন্য হওয়ার পর থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগ দেওয়া যেত। পরবর্তীতে অদ্যাবধি পর্যন্ত প্যানেল ব্যবস্থা না থাকায় প্রাথমিকে শিক্ষক সংকটে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। এ শিক্ষক সংকট অনেকটা নদীর ‘এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা’ গানের কলির মতো। সাধারণত ২, ৩ ও ৫ বছর পরপর নতুন শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম হয়ে থাকে। একদিকে নিয়োগ হয়, অপরদিকে অবসর, মৃত্যু, মেধাবীদের অন্য পেশায় চলে যাওয়া, মাতৃত্ব, চিকিৎসা ছুটিসহ নানাভাবে শিক্ষক শূন্যতা বিরাজ করে থাকে। নন-ট্রেইন্ড শিক্ষক একটুখানি বিদ্যালয়ে যোগদান করে উঁকি দিয়ে পিটিআই ট্রেনিংয়ে কমপক্ষে ১ বছরের জন্য চলে যায়।

শিক্ষাদান বহির্ভূত কাজের চাপ শিশুশিক্ষার পাঠদানকে ব্যাহত করে। মহান সৃষ্টিকর্তার অপরিসীম দয়া বা করুণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর। সৃষ্টিকর্তা তাদের অভাবের সীমাহীন যন্ত্রণা তথা থার্ড ক্লাস মর্যাদা রাখলেও সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি পাঠদান-বহির্ভূত কাজের দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষকেরা গর্বিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের পাঠদান কার্যক্রম। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় এ বাড়তি চাপ শুধু বেড়েই চলেছে। এ চাপ কমানোর ভাবনা কোনো সরকারের মাঝে দৃশ্যমান নয়। এ কাজের চাপের মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চলছে। শিক্ষকদের নানা বদনামে জর্জরিত করছে।

আলাদা প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার গঠন জরুরি: দক্ষ, অভিজ্ঞ জনবলের সংকটে প্রাথমিক শিক্ষা অভীষ্ট লক্ষ্যে যেতে হোঁচট খাচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ, মেধাবী ও প্রাথমিক শিক্ষায় ট্রেনিংপ্রাপ্ত জনবল নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সহকারী শিক্ষক পদকে এন্ট্রি ধরে শতভাগ পদোন্নতি দিতে হবে। এতে প্রাথমিক শিক্ষা সমৃদ্ধ হবে। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে।

প্রাথমিক শিক্ষার সর্বস্তরে জবাবদিহি: শুধু প্রাথমিক শিক্ষকদের অমানবিক প্রেসার দিলেই সমৃদ্ধ প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন হবে না। প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা দূরীকরণের পাশাপাশি সময়মতো শিক্ষকদের সকল সমস্যা নিরসন করতে হবে। শিক্ষার সর্বত্র ঘাটতি বিদ্যমান। তবে কেবলমাত্র শনিবার কেন প্রাথমিকে? কেবলমাত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের সময়মতো এনে, বাকি সকলে যথাসময়ে কাজ না করলে সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। শিক্ষার উন্নয়নের জন্য সময়মতো কাজ করার জন্য সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের সময়মতো কর্তব্য পালনের সঙ্গে তাদের সমস্যা দূরীকরণের বিষয়টিও সময়মতো হোক।

লেখক: মোঃ সিদ্দিকুর রহমান, শিক্ষাবিদ।

মন্তব্য করুন

ব্লগ