সহকারী শিক্ষক
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
একটি জাতির সভ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা যায় সে জাতি তার শিক্ষকদের কতটা সম্মান করে, সেই পরিমাপ দিয়ে। কারণ শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের পাঠদান করেন না; তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও নাগরিক চেতনা নির্মাণ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের লাঞ্ছনা, হেনস্তা ও সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়ার যে ঘটনাগুলো সামনে আসছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়। বরং এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
আমাদের অনেকের শৈশবে শিক্ষক ছিলেন দ্বিতীয় অভিভাবক। শ্রেণিকক্ষে শাসন ছিল শিক্ষারই একটি স্বাভাবিক অংশ। দুষ্টুমি করলে বকুনি, কখনও শাস্তি, এসবকে অভিভাবকেরাও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতেন। বাড়িতে গিয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস অনেকেরই ছিল না। কারণ বাবা-মা বিশ্বাস করতেন, শিক্ষক সন্তানের মঙ্গলের জন্যই শাসন করেন। সময়ের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা বদলেছে। শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধও যেন ক্রমশ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।
আজ দেশের বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে শিক্ষার্থীর আচরণ সংশোধনের সামান্য চেষ্টাও কখনও বড় ধরনের সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক অভিভাবক সন্তানের ভুল স্বীকার করার পরিবর্তে প্রথমেই শিক্ষকের জবাবদিহি দাবি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক অসহিষ্ণুতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে শিক্ষক নিজ কর্মক্ষেত্রেই নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন।
এই সংকট কেবল শিক্ষক ও অভিভাবকের সম্পর্কের সংকট নয়; এটি আমাদের শিক্ষাদর্শনেরও সংকট। বর্তমানে অনেক পরিবারে শিক্ষার সাফল্যকে কেবল পরীক্ষার ফল, জিপিএ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। চরিত্র গঠন, শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং সামাজিক আচরণের মতো মৌলিক বিষয়গুলো ধীরে ধীরে শিক্ষার মূল আলোচনার বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ শিক্ষা যদি কেবল সনদ অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দক্ষ কর্মী তৈরি হতে পারে, কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি হয় না।
শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। শিক্ষককে সম্মান করতে শেখানোর দায়িত্বও সেখান থেকেই শুরু হয়। অভিভাবক যদি সন্তানের সামনে শিক্ষকের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেন, বিদ্যালয়কে কেবল একটি সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করেন কিংবা যেকোনো পরিস্থিতিতে সন্তানকেই নিঃশর্তভাবে সমর্থন করেন, তাহলে সেই শিশু বিদ্যালয়েও একই আচরণ করবে। এটি মানব আচরণের স্বাভাবিক নিয়ম। শিশু শুনে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে দেখে।
অবশ্য এই আলোচনায় শিক্ষকদের দায়িত্বও সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিক্ষকতার পেশায় পেশাগত দক্ষতা, ধৈর্য, সংবেদনশীলতা ও মানবিক আচরণ অপরিহার্য। কোথাও যদি কোনো শিক্ষক অসদাচরণ করেন, তবে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার দায় পুরো শিক্ষক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিংবা শিক্ষকদের সামাজিকভাবে অপমান করার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থায় যেমন শিক্ষকের জবাবদিহি থাকবে, তেমনি তার মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতাও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন, শিক্ষক ও অভিভাবকের বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা, স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং এবং নিয়মিত অভিভাবক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের পারস্পরিক দায়িত্ব ও আচরণবিধি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সময়ের দাবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো শিক্ষককে অপমান বা অভিযুক্ত করার প্রবণতাও নিরুৎসাহিত করতে হবে।
একটি জাতি তার শিক্ষকদের দুর্বল করে কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। যে সমাজে শিক্ষক প্রতিনিয়ত অপমানের ভয় নিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, সেখানে স্বাধীনভাবে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। আর যে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ভীত, সেখানে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরাই। কারণ শিক্ষা কখনোই ভয়, অবিশ্বাস ও সংঘাতের পরিবেশে বিকশিত হতে পারে না।
আজ আমাদের প্রয়োজন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি নতুন সামাজিক সমঝোতা, যার ভিত্তি হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও দায়িত্ববোধ। মতভেদ থাকবে, অভিযোগ থাকবে, কিন্তু তার সমাধান হতে হবে সংলাপ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। অপমান, হুমকি কিংবা সামাজিক লাঞ্ছনা কখনোই সেই সমাধানের পথ হতে পারে না।
আমরা যদি সত্যিই আগামী প্রজন্মকে কেবল পরীক্ষায় নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফল মানুষ হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে শিক্ষকদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতেই হবে। কারণ একজন শিক্ষককে সম্মান করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মান করা নয়; বরং জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎকে সম্মান করা। শিক্ষক সম্মানিত হলে শিক্ষাঙ্গন নিরাপদ হয়। শিক্ষাঙ্গন নিরাপদ হলে জাতির ভবিষ্যৎও নিরাপদ হয়।
১৩
১৫ মন্তব্য