সহকারী অধ্যাপক
১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:১১ পূর্বাহ্ণ
বাক্-সংযম (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসের আলোকে) মোঃ মুজিবুর রহমান
বাক্-সংযম
(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসের আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
হাদিস
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে; অন্যথায় সে যেন নীরব থাকে।"
মানুষ পেল ভাষার দান, অমূল্য এক রতন,
বাক্য দিয়ে জাগে আবার ভালোবাসার জীবন।
একটি কথা সূর্য হয়ে আঁধার ভেঙে যায়,
একটি কথা বিষের মতো হৃদয় ভস্ম খায়।
মধুর বচন শান্ নদীর নির্মল জলের ঢেউ,
রূঢ় বাক্য ঝড়ের মতো ভেঙে ফেলে নৌ।
যে মুখে ঝরে সত্যবাণী, করুণা আর প্রেম,
সে-ই মানুষ পৃথিবীজুড়ে ছড়ায় শুভ ক্ষেম।
আল্লাহ দিলেন জিহ্বা আমাদের সত্য বলার তরে,
মানুষ যেন মানুষ থাকে মানবতার ঘরে।
অহংকারের আগুন যেন না জ্বলে সেই মুখে,
মিথ্যার কালো ছায়া যেন না নামে কোনো সুখে।
নবীর বাণী দীপের মতো পথ দেখায় সদা,
"ভালো কথা বলো সবাই"—এ তাঁর পবিত্র সদা।
যদি না পাও কল্যাণময় কোনো কথা বলার,
নীরবতাই শ্রেষ্ঠ তখন অন্তর রাখো সামলাও।
=নীরবতা দুর্বলতা নয়, প্রজ্ঞার দীপ্তি সে,
যে নিজেকে জয় করেছে, জয় করেছে শেষে।
রাগের আগুন উঠলে যখন কাঁপে অন্তরখানি,
চুপটি করে থেমে যাওয়াই জ্ঞানের প্রথম বাণী।
একটি কটু বাক্যের দাহ বহু বছর রয়,
একটি স্নেহের শব্দ আবার জীবন ভরায় সয়।
ক্ষত শুকায় দেহের পরে, মুছে যায় তার দাগ,
কথার আঘাত থেকে যায় বহু দিনের ভাগ।
মায়ের মুখের কোমল বাণী শিশুর প্রথম গান,
শিক্ষকের সেই মধুর কথা গড়ে ভবিষ্যৎ প্রাণ।
বন্ধুর মুখে সাহস দিলে জাগে নতুন ভোর,
সান্ত্বনারই একটি বাক্য খুলে আশার দ্বার।
বৃক্ষ যেমন ফল বিলায় নীরব মহিমায়,
সাধুজনও মধুর ভাষায় হৃদয় জয় করে যায়।
উচ্চ কণ্ঠে নয় যে মহৎ, মহৎ তারই প্রাণ,
যার কথাতে ফুটে ওঠে বিনয় আর সম্মান।
গীবত, নিন্দা, অপবাদ আর বিদ্রূপের ভাষা,
সমাজজুড়ে ছড়িয়ে দেয় বিভেদেরই আশা।
হিংসার আগুন কথার মাঝে জ্বলে যখন ধীরে,
ভালোবাসার সবুজ বন শুকিয়ে যায় নীরে।
সত্য বলো, তবে যেন তা সৌজন্যের সুরে,
কঠিন সত্য ফুলের মতো ফুটুক কোমল নূরে।
সত্য যদি কাঁটার মতো বিদ্ধ করে প্রাণ,
মমতারই পরশ দিয়ে বলো সেই বাণীখান।
ক্ষমার ভাষা মহৎ ভাষা, শান্তির ভাষা শ্রেষ্ঠ,
অহংকারের কোলাহল নয় মানুষের কৃষ্টি।
যে ক্ষমা করে হাসিমুখে, সে-ই বিজয়ী হয়,
রাগের আগুন নেভায় সে, সুখের আলো রয়।
অকারণে তর্ক করে বাড়ে শুধু ক্ষয়,
জ্ঞানী মানুষ নীরব থেকে জয় করে সেই লয়।
যেখানে বাক্য ফল দেয় না, বাড়ায় শুধু ক্লেশ,
সেখানে নীরব থাকাই শ্রেষ্ঠ উপদেশ।
বইয়ের পাতায় লিখো তুমি সত্যের অক্ষর,
কণ্ঠে রাখো সৌন্দর্যময় আলোরই স্বর।
শিশুরা শিখুক ছোটবেলা বাক্-সংযমের পাঠ,
ভদ্রতারই প্রথম ধাপ এই সোনালি প্রভাত।
পরিবারে মধুর ভাষা সুখের বীজ বোনে,
অভিমানও গলে যায় ভালোবাসার সনে।
স্বামী-স্ত্রী, ভাই আর বোন, পিতা-মাতার ঘর,
মধুর বচন রাখে সেথা আনন্দ নিরন্তর।
বিদ্যালয়ের প্রতিটি কক্ষে উঠুক এই গান—
ভালো কথা বলাই হোক জীবনের সম্মান।
শিক্ষা শুধু বইয়ের নয়, চরিত্র গঠনের,
মধুর ভাষা সেতু গড়ে হৃদয় থেকে মনে।
সমাজ গড়ে মানুষেরই শিষ্ট ব্যবহারে,
কথার মাঝে ফুটুক সদা সত্যের আলোকধারে।
অন্যায় দেখে সত্য বলো, থেকো না নির্লিপ্ত,
তবু যেন ভাষা থাকে শালীনতায় দীপ্ত।
আল্লাহ দেখেন প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উচ্চারণ,
কথারও আছে হিসাব এক, হবে তারও গণনা।
যা বলেছি পৃথিবীতে, ফিরবে তারই ফল,
ভালো কথার বাগান ফলে জান্নাতেরই দল।
পরকালের বিশ্বাস যার অন্তরে অটল,
সে জানে—একটি শব্দও নয় কখনো বিফল।
এই বিশ্বাস জাগায় মনে সতর্কতার দীপ,
জিহ্বাকে তাই রাখে সদা সত্যপথের নীড়।
বলো এমন বাক্য, যাতে মানুষ পায় আলো,
বলো এমন শব্দ, যাতে পৃথিবী হয় ভালো।
না পারিলে কল্যাণময় কোনো কথা বলতে,
নীরব থাকাই শ্রেষ্ঠ তখন হৃদয় রেখে চলতে।
এসো তবে গড়ি সবাই মধুর ভাষার দেশ,
অপমানের কালো মেঘে না ঢাকে মানব রেশ।
হাদিসের এই অমর বাণী হোক জীবনের মন্ত্র—
ভালো কথা বলো সবাই, নইলে নীরব অন্তর।
***
বাক্-সংযম
সৃষ্টির আদিতে ছিল নীরব অনন্ত আকাশ,
আলো ছিল, বাতাস ছিল, ছিল না ভাষার প্রকাশ।
মানুষ এল পৃথিবীতে রবের অশেষ দানে,
বাক্শক্তি হলো শ্রেষ্ঠ উপহার তারই প্রাণে।
জিহ্বা শুধু মাংসের টুকরো—এ কথা সত্য নয়,
এরই মাঝে লুকিয়ে থাকে সুখের কিংবা ক্ষয়।
একটি বাক্য হৃদয় জয় করে নিমেষকালে,
একটি বাক্য আগুন জ্বালে সংসারেরই ডালে।
মধুর ভাষা শিশিরবিন্দু ভোরের ঘাসের বুকে,
রূঢ় ভাষা দাবানলের শিখা শুকনো বনমুখে।
স্নিগ্ধ বচন নদীর জলের শান্ত নির্মল ধারা,
তিক্ত ভাষা বিষের মতো করে জীবন হারা।
আল্লাহ দিলেন বাক্শক্তি সত্যের সেবায় দিতে,
মিথ্যার বোঝা কাঁধে তুলে অহংকারে নিতেতে নয়।
সত্য যেন হয় সুবাসিত প্রস্ফুটিত এক ফুল,
করুণারই শিশিরধারা থাকুক তারই মূল।
বাতাস যেমন ছুঁয়ে যায় সব, করে না অহংকার,
তেমনি হোক মানুষেরও প্রতিটি উচ্চারণ।
বাক্যে যেন না থাকে ঘৃণা, না থাকে বিদ্বেষ,
ভাষায় ফুটুক ভ্রাতৃত্বের চিরসবুজ আবেশ।
সূর্য ওঠে নীরব ভঙ্গি, দেয় আলোর উপহার,
চাঁদও বলে না কোনো কথা, তবু জয় করে পার।
নদী বয়ে যায় শব্দহীন সাগর-পানে ধীরে,
মহত্ত্ব তাই কোলাহলে নয়—নম্রতারই নীড়ে।
হে মানব, ভেবে বলো কথা, বলো জেনে শুনে,
অযথা শব্দ ঝরিও না ক্ষণিক রাগের বশে।
শব্দ একবার মুখ ছেড়ে গেলে ফেরে না আর পিছু,
তাই তো জ্ঞানী নীরব থাকেন অকল্যাণের নিচু।
একটি হাসি, একটি সান্ত্বনা, একটি শুভবাণী,
অন্ধকারে প্রদীপ হয়ে জ্বালতে পারে প্রাণই।
একটি অপবাদ, একটি গালি, একটি মিথ্যা কথা—
বহু বছরের বিশ্বাস ভাঙে, বাড়ায় শুধু ব্যথা।
শিশুর কানে প্রথম বাজে মায়ের মধুর বাণী,
সেই সুরেতে গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের প্রাণী।
শিক্ষকেরও কোমল ভাষা জাগায় জ্ঞানের দীপ,
সুন্দর কথায় প্রস্ফুটিত হয় চরিত্রের নীড়।
হাদিস ডাকে—"বল কল্যাণ, নইলে নীরব হও",
এই বাণীতে লুকিয়ে আছে জীবনেরই নৌ।
যে জিহ্বাকে সংযত রাখে রবের ভয়ে সদা,
তারই মুখে ফুটে ওঠে শান্তির শুভকথা।
নীরবতা পরাজয় নয়, নীরবতা শক্তি,
রাগের বুকে সংযম আনে প্রজ্ঞারই ভক্তি।
যে নীরব হয় অন্যায়ে নয়, অকল্যাণের কালে,
সে-ই তো সত্য সাহসী জন রবের সন্তোষ পায়।
কথা হবে সত্যের মতো নির্মল দীপ্তিময়,
কথা হবে প্রেমের মতো কোমল হৃদয়ময়।
কথা হবে ন্যায়ের পথে সাহস জাগানো দীপ,
কথা হবে কল্যাণময় ঈমানেরই নীড়।
যেখানে ভাষা মানুষ গড়ে, সেথায় বলো কথা,
যেখানে ভাষা মানুষ ভাঙে, সেথায় থামাও ব্যথা।
একটি নীরব মুহূর্তও হতে পারে দান,
যদি তাতে রক্ষা পায় কোনো মানুষের প্রাণ।
এসো তবে আজ প্রতিজ্ঞা করি হৃদয়ের অন্তরে—
বাক্য হবে সত্যের সাথি, মমতারই ঘরে।
আল্লাহ যিনি শুনছেন সদা প্রতিটি উচ্চারণ,
তাঁর সন্তুষ্টিই হোক আমাদের ভাষার অলংকার।
***
বাক্-সংযম
জিহ্বা শুধু অঙ্গ নয়, রবের অর্পিত ধন,
এরই মাঝে লুকিয়ে থাকে জীবনের স্পন্দন।
কল্যাণময় একটি বাক্য আলোকিত করে প্রাণ,
অবিবেচক একটি শব্দ ডেকে আনে অবসান।
চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া যতটা সহজ হয়,
মুখের কথা ফিরিয়ে নেওয়া ততটা সহজ নয়।
ধন হারিয়ে ফিরে আসে শ্রমের বিনিময়ে,
হারানো সম্মান ফেরে না সহজ কোনো উপায়ে।
তাই তো নবী শিখিয়েছেন, ভেবে তবে বলো,
হৃদয় ভরে সত্য রাখো, মুখে ফুটুক ভালো।
যে বাক্যে নেই উপকার, নেই যে কোনো মঙ্গল,
সেই বাক্যের নীরবতাই সর্বোত্তম সম্বল।
শব্দ আগে বন্দী থাকে মানুষেরই মুখে,
মুখ থেকে তা বেরোলেই মানুষ পড়ে দুঃখে।
যতক্ষণ তা অন্তরে রয়, ততক্ষণ সে দাস,
বেরিয়ে গেলে সেই কথারই মানুষ হয় পরাভূত আজ।
কত ঘর যে ভেঙে গেছে একটি কঠিন বাণে,
কত প্রাণ যে জেগে উঠেছে স্নেহভরা আহ্বানে।
কত বন্ধুত্ব টিকে থাকে একটি মধুর কথায়,
কত সম্পর্ক হারিয়ে যায় অহংকারের ব্যথায়।
বৃক্ষ কখনো ফলের কথা উচ্চস্বরে কয় না,
নদী নিজের মহিমা নিয়ে গর্বভরে বয় না।
ফুলও নিজের সৌরভ নিয়ে করে না বিজ্ঞাপন,
মহৎ মানুষ তাই বিনয়ে খুঁজে নেয় আপন।
জ্ঞানীর ভাষা নদীর মতো গভীর, শান্ত, ধীর,
অজ্ঞের মুখ ঝড়ের মতো অস্থির অশান্ত নীর।
যে যত বড় জ্ঞানী হয়, ততই কম সে বলে,
প্রজ্ঞার আলো নীরবতায় আপন দীপ্তি জ্বলে।
রাগের আগুন উঠলে আগে নীরব হও ক্ষণ,
সেই নীরবতাই রক্ষা করে বিবেক আর মন।
রাগের বশে বলা কথা ফিরিয়ে আনা ভার,
সেই কথাতেই জ্বলে ওঠে অনুতাপের ভার।
হাসিমুখে বলা কথা দানের সমান হয়,
ক্লান্ত হৃদয় সান্ত্বনা পায়, মুছে অন্তরক্ষয়।
ভালোবাসার ভাষা যত ভাগ করে দাও প্রাণে,
ততই বাড়ে আলোর শিখা মানুষেরই টানে।
অপবাদ আর কুৎসাবাক্য কালো ধোঁয়ার ঢেউ,
নিজেকেও সে অন্ধ করে, জ্বালায় অন্য ঢেউ।
মিথ্যার প্রাসাদ ভেঙে পড়ে সত্যের প্রথম ছোঁয়ায়,
সত্যের আলো চিরকালই জয়ী হয়ে রয়।
প্রতিটি শব্দ লিখে রাখেন মহামহিম রব,
কিছুই তাঁর অগোচরে নয়, গোপন কিংবা সব।
তাই তো মুমিন ভয় মিশিয়ে উচ্চারণ করে,
আল্লাহ যেন সন্তুষ্ট হন প্রতিটি অন্তরে।
এসো তবে আজ প্রতিজ্ঞা করি অন্তরেরই তলে—
সত্য বলব, মধুর বলব, ন্যায়ের পথে চলব ফলে।
না পারিলে কল্যাণময় কোনো কথা বলতে,
নীরবতাকেই বেছে নেব রবের সন্তুষ্টি পেতে।
যে জিহ্বাকে সংযত রাখে আল্লাহভীতি ধরে,
সে-ই সফল দুনিয়া জুড়ে, আখিরাতের ঘরে।
হাদিসের এই অমর বাণী রাখি হৃদয় মাঝে—
"ভালো কথা বলো সবাই, নইলে নীরব সাজে।"
৬
৬ মন্তব্য