Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৫২ অপরাহ্ণ

গিবত বা পরনিন্দা: কোরআন ও হাদিসের আলোকে এর ভয়াবহতা এবং বাঁচার উপায়

গিবত বা পরনিন্দা: কোরআন ও হাদিসের আলোকে এর ভয়াবহতা এবং বাঁচার উপায়

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

বর্তমান সমাজের অন্যতম একটি বড় ব্যাধি হলো গিবত বা পরনিন্দা। চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া—সবখানেই কারো অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করা যেন একটি স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলামে এটি অত্যন্ত জঘন্য এবং কবিরা গুনাহ। একজন ইসলামিক স্কলার হিসেবে কোরআন এবং সুন্নাহর আলোকে এই মারাত্মক পাপের ভয়াবহতা এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

গিবত কী?

গিবত শব্দের অর্থ হলো পরনিন্দা করা, পিঠপিছে কথা বলা বা কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষের কথা বলা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে।

হাদিসের আলোকে গিবতের সবচেয়ে চমৎকার ও সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি জানো গিবত কী?" সাহাবিরা বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।" তখন তিনি বললেন, "তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।" কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, "আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যিই থেকে থাকে, তবুও কি তা গিবত হবে?" রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, "তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গিবত করলে। আর যদি না থাকে, তবে তুমি তাকে অপবাদ (বুহতান) দিলে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৮৯)

কোরআনের আলোকে গিবতের ভয়াবহতা

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা গিবতকে নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো বীভৎস ও ঘৃণ্য কাজের সাথে তুলনা করেছেন।

১. মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমতুল্য:

"হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কতক ধারণা গুনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারো পশ্চাতে নিন্দা (গিবত) না করে। তোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

২. গিবতকারীর জন্য ধ্বংস:

"ধ্বংস প্রত্যেক এমন ব্যক্তির জন্য, যে (সামনে) নিন্দা করে এবং (পেছনে) গিবত করে।" (সূরা হুমাযাহ, আয়াত: ১)

হাদিসের আলোকে গিবতের শাস্তি

পরকালে গিবতকারীর জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

  • ভয়ংকর শাস্তি: আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, "মেরাজের রাতে আমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো, যাদের নখগুলো তামার তৈরি। তারা তাদের নখ দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরাইল (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা সেসব মানুষ, যারা মানুষের গোশত খেত (গিবত করত) এবং তাদের মানসম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলত।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৮৭৮)

  • নেক আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়া: গিবতের কারণে পরকালে মানুষের নেক আমল অন্যের খাতায় চলে যাবে। কিয়ামতের দিন গিবতকারী দেখবে তার অনেক নেক আমল নেই, কারণ সেগুলো তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে যার সে গিবত করেছিল। আর যদি নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে যার গিবত করা হয়েছিল তার গুনাহ গিবতকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে।

গিবত থেকে বাঁচার উপায়

গিবত একটি আত্মার ব্যাধি। এটি থেকে বাঁচতে হলে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে:

  1. নিজের দোষের দিকে নজর দেওয়া: অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজের ভুল-ত্রুটিগুলো নিয়ে চিন্তা করা। যে ব্যক্তি নিজের সংশোধনে ব্যস্ত থাকে, সে অন্যের দোষ খোঁজার সময় পায় না।

  2. গিবতের আসর ত্যাগ করা: যেখানে গিবত হয়, সেখান থেকে ভদ্রভাবে উঠে যাওয়া। কোরআনে বলা হয়েছে, "আর যখন তারা কোনো অসার বাক্য শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।" (সূরা কাসাস: ৫৫)

  3. গিবতকারীর প্রতিবাদ করা: কেউ আপনার সামনে অন্যের গিবত করলে তাকে থামিয়ে দেওয়া এবং যার গিবত করা হচ্ছে তার সম্মান রক্ষা করা। রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার মুখমণ্ডল থেকে জাহান্নামের আগুন দূরে সরিয়ে দেবেন।" (তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯৩১)

  4. জিহ্বাকে সংযত রাখা: চুপ থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা। রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়।" (তিরমিজি, হাদিস নং: ২৫০১)

গিবত হয়ে গেলে তওবা করার নিয়ম

যেহেতু গিবত 'হাক্কুল ইবাদ' বা বান্দার হকের সাথে জড়িত, তাই শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে এর মাফ পাওয়া কঠিন। ইসলামিক স্কলারদের মতে, গিবত থেকে তওবা করার নিয়ম হলো:

  • যার গিবত করা হয়েছে সে যদি জেনে যায়: তাহলে সরাসরি তার কাছে গিয়ে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।

  • সে যদি না জানে: তাকে জানিয়ে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। বরং আল্লাহর কাছে নিজের জন্য এবং যার গিবত করা হয়েছে তার জন্য ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। তার জন্য দোয়া করতে হবে, "হে আল্লাহ! আমাকে এবং তাকে ক্ষমা করে দিন।"

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে গিবতের মতো জঘন্য ও ধ্বংসাত্মক গুনাহ থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের জিহ্বা ও অন্তরকে পবিত্র রাখার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্য করুন