সহকারী শিক্ষক
১৭ জুলাই, ২০২৬ ০৩:৫৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
"Children have never been very good at listening to their elders,
but they have never failed to imitate them."
-James Baldwin
আমরা শিশুদের সাথে যেভাবে কথা বলি, সেটাই তাদের অন্তরের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।
তারা যা শোনে, তা ই আত্মস্থ করে।
তারা যা দেখে, তাই পুনরাবৃত্তি করে।
সমাজ তাদের যেভাবে উৎসাহিত করে, তারা সেভাবেই আচরণ করে।
আমি বিশ্বাস করি, আজ আমরা যা ঘটতে দিই, কাল তা ই আমাদের গ্রাস করে।
একজন শিক্ষার্থীর পরিচয় শুধু তার পোশাক বা শ্রেণিকক্ষ দিয়ে নয়, বরং প্রশ্ন করার,
তথ্য গ্রহণ করার এবং নিজেকে বিকশিত করার ইচ্ছার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়।
বেড়ে ওঠা মানে কি?
আপনি কি 'ব্যক্তিগত বিকাশ' শব্দটির সাথে পরিচিত?
শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে তার ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। প্রকৃত শিক্ষা আচরণের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
(আচরণের মধ্যে আপনার ভাষা ও বাচনভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত।) এটি ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করে।
শিক্ষা দিয়ে কী লাভ, যদি আচরণই না বদলায়।
তারা জানেই না কখন এবং কোথায় থামতে হবে।
মা হলেন সন্তানের প্রথম শিক্ষক এবং পরিবার হলো প্রথম প্রতিষ্ঠান।
পরিবারেই প্রাথমিক শিষ্টাচার ও যোগাযোগের শিক্ষা দেওয়া হয়।
একটি পরিবার গঠনে পারিবারিক মূল্যবোধ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর আচরণ গঠনেও পারিবারিক মূল্যবোধ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সেক্ষেত্রে স্কুল ও কলেজের ভূমিকা গৌণ।
তথাকথিত প্রজন্ম গত আচরণ, ট্রেন্ড বা নতুন ফ্যাশনের অজুহাতে যদি আপনি আপনার সন্তানের
ভুল আচরণকে সমর্থন করেন, তাহলে আপনি পুরোপুরি ভুল করছেন।
এই ধরনের ভুল সমর্থনের মাধ্যমে আপনি আপনার সন্তানের পাশাপাশি পুরো প্রজন্মকে ধ্বংস করছেন।
আপনার অভিভাবকত্ব তাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়। আপনার সন্তানকে বড় করার ব্যর্থতার গন্ধ তাদের কথার মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
আপনার সন্তান যদি অভদ্র হয়, অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে বা খারাপ আচরণ করে, তাহলে এর দায়ভার আপনারও (বাবা-মা ও পরিবার উভয়েই)।
আপনার সন্তানের উপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
তারা খারাপ ভাষা ব্যবহার করে, কারণ আপনি তাদের বাড়িতে তা করতে দেন।
এটা তাদের কাছে একটি স্বাভাবিক ভাষা বলে মনে হয়।
তারা তাদের শিক্ষক এবং বড়দের অসম্মান করে, কারণ তারা আপনাকে (বাবা-মা বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের) সম্মান করেনা।
তারা বাড়িতেই অসম্মান করার শিক্ষা পেয়েছে। তারা এই ধরনের আচরণে অভ্যস্ত।
তাদের ভুলত্রুটি ধামাচাপা দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার সামান্য সমর্থন ও প্রশ্রয় তাদেরকে এবং সেই সাথে পুরো প্রজন্ম কেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সত্যি বলতে এই আচরণের কারণে আপনার সন্তানকে বুদ্ধিমান, স্পষ্টভাষী বা আকর্ষণীয় দেখায় না,
বরং সে একটি খারাপ উদাহরণ, এক অসভ্য, অভদ্র অপদার্থ হয়ে ওঠে।
একজন স্পষ্টভাষী মানুষ আর একজন অভদ্র মানুষ সম্পূর্ণ আলাদা। যারা জানে, তারা জানে।
আপনার সন্তানকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পাঠানোর আগে একজন শিক্ষার্থীর গুণাবলী সম্পর্কে তাকে সচেতন করুন, শেখান।
আমি শিক্ষকদেরও অনুরোধ করছি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই শিখিয়ে দিন কোথায়, কীভাবে আচরণ করতে হয়,
বিশেষ করে যখন তারা ইউনিফর্ম পরে থাকে। ইউনিফর্ম পড়ে থাকা মানে আপনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
তাদেরকে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলোও শেখান।
নতুন কিছু শিখতে হলে, প্রথমে আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে আপনি সবকিছু জানেন না।
নম্রতা এমন একটি গুণ যা একজন শিক্ষার্থীকে তার গুরুজনদের সম্মান করতে এবং যে কারো কাছ থেকে শিখতে সাহায্য করে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই অহংকারী; তারা মনে করে তারা সবকিছু জানে।
যা কিছু তারা জানে না, তা তাদের কাছে মাত্র এক ক্লিকের দূরত্বে। কিন্তু তারা সেই প্রজন্ম যারা সেই ক্লিক টি করার জন্যও যথেষ্ট অলস।
বলা বাহুল্য, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সততা ও নৈতিকতার অভাব রয়েছে।
তারা শুধু উত্তর দেওয়ার জন্য শোনে, বোঝার জন্য নয়। তারা কখনো উন্নতির চেষ্টা করে না।
তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে কখনো শেখে না। তাদের মাঝে সহনশীলতা নেই।
পরমতসহিষ্ণুতা নেই।
তারা প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে পর্যবেক্ষণ করে না। ফলস্বরূপ আমরা এক ভয়াবহ সামাজিক চিত্র পাচ্ছি।
মানুষ সর্বত্র আছে কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো মানুষ নেই।
ছাত্রছাত্রীদের জন্য খারাপ লাগে। আমার খুব ইচ্ছে করে, যদি তাদেরকে গতকালের চেয়ে আরেকটু ভালো অবস্থায় রেখে যেতে পারতাম।
আমি লিখছি, এটি বাবা-মা, পরিবার এবং সমাজের প্রতি একটি সতর্কবার্তা যে, আপনারা আপনাদের সন্তানের দিকে নজর দিন, তাদের যত্ন নিন।
এখনই তাদের শুধরে দেওয়ার উপযুক্ত সময়।
এই অবস্থা চলতে থাকলে, আমার মনেহয় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা কলেজগুলোতে
শিক্ষার্থী ভর্তির আগে একটি 'সামাজিক যাচাইকরণ' করা উচিৎ।
ভবিষ্যতে ভর্তি পরীক্ষায় নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের পরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন মনে করছি ।
শিক্ষার্থী কোনো পূর্ণ করার পাত্র নয়, বরং প্রজ্বলিত করার এক অগ্নিশিখা।
আপনিই সিদ্ধান্ত নিন, আপনার শিখা পৃথিবীকে আলোকিত করবে নাকি পুড়িয়ে দেবে।
মনে হচ্ছে আমি এক ত্রুটিপূর্ণ অভিভাবকত্বের প্রজন্ম দেখতে পাচ্ছি!
প্রিয় বাবা-মা,
যখন আপনি আপনার সন্তানের দিকে তাকাবেন, তখন তাকে লেখার জন্য একটি খালি খাতা হিসেবে দেখবেন না,
বরং আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকা একটি অনবদ্য শিল্পকর্ম হিসেবে দেখবেন।
ভালো না খারাপ, তা আপনিই ঠিক করুন।
(অভিযোগ নয়, একটুখানি সচেতন হবার চেষ্টা
ভিন্নমত সাদরে আমন্ত্রিত, যেকোন মতামত কমেন্ট করে জানানোর অনুরোধ রইল।)
©️মুমতাহীনা খুশবু
১৩
১৫ মন্তব্য